বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ করোনাকে একটু ভিন্নভাবে বলেছেন-এটি অত্যন্ত অসাম্প্রদায়িক-নিরপেক্ষ এবং আধুনিক। ফলে করোনা প্রতিরোধে সমগ্র দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন,লকডাউন খেটে খাওয়া মানুষগুলোর একদিকে যেমন ক্ষুধা বৃত্তি বাড়াচ্ছে অন্যদিকে আতঙ্ক ও অসহায়ভাব সৃষ্টি হচ্ছে। লকডাউন সাধারণ মানুষকে নিরাপদ অবস্থায় থাকার ক্ষেত্রে ব্যত্যয় সৃষ্টি করছে।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হল। এটি গ্রহণ, উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

  • লকডাউন একটি ব্যবস্থা। তবে বিশ্বজুড়ে কোথাও লকডাউন কার্যকর হয়নি।
  • করোনা প্রতিরোধে সকলের মধ্যে যদি ঐক্যবদ্ধ একটা চিন্তা একসাথে আসে তাহলে সেটি কার্যকর হবে।
  • প্রতিরোধের দিকে যদি নজর দেয়া যায় তাহলে অনেক বেশি ভালো হয়। আপনি উপরে বাঁধ খুলে দিয়ে মোহনায় গিয়ে বাঁধা দেবেন সেটি যুক্তিসঙ্গত কাজ হচ্ছে না

রেডিও তেহরান: জনাব ড. আবদুল মজিদ, বাংলাদেশ সরকার নতুন করে দেশে কঠোর লকডাউন দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে করোনাভাইরাস মোকাবেলার ক্ষেত্রে লকডাউন কতটা কার্যকর ব্যবস্থা?

ড. আবদুল মজিদ: ধন্যবাদ আপনাকে। দেখুন, লকডাউন একটি পন্থা। সারা বিশ্বের একটি নিয়ম। লকডাউন হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানুষকে পুরোপুরি আটকে রাখা এবং তাদের জীবন ও জীবিকার জন্য যা কিছু প্রয়োজন তা সরবরাহ করা। মানুষকে বাধ্য করা যাতে তারা বাইরে না বের হন। যেহেতু করোনা একটি ভয়াবহ সংক্রমণ ধরনের রোগ সে কারণে লাকডাউনের মাধ্যমে তাদেরকে ঘরে থাকতে বাধ্য করা।

আমরা এরইমধ্যে দেখেছি সারা বিশ্বজুড়ে লকডাউন কার্যকর হয়নি। কারণ কোনো দেশের পক্ষে সম্ভব না দেশের মানুষের পুরোপুরি খাবারসহ অন্যান্য জিনিষপত্রের ব্যবস্থা করে লকডাউনে থাকতে বাধ্য করা। উন্নত বিশ্বেও দেখা গেছে লকডাউন কার্যকর হয়নি।

সেখানে বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশ যেখানে প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ ননফর্মাল সেক্টরের অর্থাৎ নিম্ন আয়ের মানুষ খেঁটে খাওয়া মানুষ। তাঁদেরকে যদি বলা হয় ৩/৪/৫ দিন বা তারচেয়ে বেশি দিন তোমার কোনো কাজ থাকবে না; তুমি ঘরের মধ্যে চুপ করে বসে থাক একইসাথে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো খাবার দাবার দেয়া হচ্ছে না, দিতে পারছে না বা দেয়ার সম্ভাবনাও ক্ষীণ-তাহলে এই লকডাউন তো অর্থবহ হলো না। বরং খেটে খাওয়া মানুষগুলোর একদিকে যেমন ক্ষুধা বৃত্তি বাড়াচ্ছে অন্যদিকে আতঙ্ক ও একধরনের অসহায়ভাব সৃষ্টি হচ্ছে। অর্থাৎ লকডাউন সাধারণ মানুষকে নিরাপদ অবস্থায় থাকার ক্ষেত্রে ব্যত্যয় সৃষ্টি করছে।

তাছাড়া আমার কাছে মনে হয়েছে এই লকডাউনটা দেরিতে দেয়া হয়েছে। লকডাউন সাধারণ একটি প্রতিরোধাত্মক ব্যাপার। যখন প্রতিরোধের দরকার ছিল তখন সেভাবে মনোযোগ ছিল না। রোগটা ছড়িয়ে পড়েছে। সেক্ষেত্রে এই পর্যায়ে এসে প্রতিরোধ করতে চাওয়ায় দুদিকেই সমস্যা সৃষ্টি করেছে।

রেডিও তেহরান: উন্নত বিশ্বেও লকডাউন দেয়া হয়েছে এবং করোনাভাইরাসের টিকা ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু বেশিরভাগ দেশের পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি দেখা যায় নি বরং আমরা এর ভিতরে দেখছি যে,ভারতের পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। এ বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কি?

ড. আবদুল মজিদ: দেখুন, এটি স্বাভাবিক। বিশেষ করে আমরা লক্ষ্য করছি ভারত ,ব্রাজিল,জার্মানিতে প্রতিবাদ উঠেছে লকডাউন দেয়া যাবে না। লকডাউন হবে না এবং তারা করছে না। কারণ ঐটাই যে জীবন এবং জীবিকার মধ্যে সমন্বয়সাধিত না হলে সেটি সম্ভব না। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত। সেখানে সক্রমণের মাত্রা অনেক বেশি।সেখানে সক্রমণের মাত্রা ১ লাখেরও  বেশি।সর্বশেষ করোনা সংক্রমণ বিশ্ব রেকর্ড করেছে ভারত। তারাপরও তারা লকডাউনে যায়নি। তবে এর আগে প্রথমবার তারা পুরো দেশে লকডাউন দিয়েছিল এবং তারফলে বিভিন্ন ধরনের ঘাত-প্রতিঘাত এবং সমালোচনা হয়েছিল। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে আমাদের সীমান্ত জেলাগুলোতে কিন্তু সেভাবে প্রতিরোধের বিষয়টি দেখিনি। এছাড়া উৎসবের কারণে মানুষের পারস্পরিক যাতায়াত বেড়েছিল। এ বিষয়টিতে সতর্ক হওয়া উচিত ছিল।

রেডিও তেহরান: লকডাউন বিস্তৃতি লাভ করেছে। সেসময় বাংলাদেশের বিরোধী এবং সরকারি দলের নেতানেত্রীরা পরস্পরের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছেন। লকডাউন  সম্পর্কে বিরোধী দল বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, যাদের পেটে ভাত নেই তাদেরকে লকডাউন দিয়ে ঘরে আটকে রাখবেন কিভাবে? তার এ বক্তব্য কতটা বাস্তবতার কাছাকাছি?

ড. আবদুল মজিদ: বিষয়টি খুবই স্পষ্ট। এটা খুব স্বাভাবিক। আমি একটু আগে বললাম, যে রিকশাওয়ালা দিন আনে দিন খায় তাকে যদি বলি- তোমার রিকশা চলবে না, কোনো যাত্রী নিতে পারবে না। তোমার রিকশায় কোনো যাত্রী উঠবে না। তাহলে তার অবস্থাটা কী হয়! এমনিতেই তো তাদের সঞ্চয় বলতে কিছু নেই। তাহলে ৩/৪ দিনের মধ্যে সে হুমড়ি খেয়ে পড়বে। তার তো কোনো উপায় থাকবে না। সেজন্য এটা খুব স্পষ্ট যে নিম্ম আয়ের লোকেরা, যারা দিন আনে দিন খায়-আর তাদের সংখ্যা আমাদের অর্থনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। তাদের জন্য তো এটা অত্যন্ত কষ্টকর বিষয়।

প্রসঙ্গক্রমে একটা বলি, যখন করোনা প্রথম এসেছিল আমাদের দেশে মানুষের কাছে সামান্য হলেও উদ্বৃত্ত কিছু ছিল যে কারণে প্রথম ধাক্কা এলেও তারা কিছুটা মোকাবেলা করতে পেরেছিল। কিন্তু গত এক বছরের আমাদের মানুষেরা আর্থিক, সামাজিক, মানসিকভাবে যে অচলাবস্থায় ভুগেছে, হিমশিম খেয়েছে তারপর এবার যখন করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা এল তখন সে তার ইমিউন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। এখন যদি তাকে একটি বিশেষ অবস্থার মধ্যে যেতে বলি তাহলে সে তা সাসটেইন করতে পারবে না।

রেডিও তেহরান:জ্বি ড.মোহাম্মাদ আবদুল মজিদ এদিকে,বাংলাদেশের সরকারি দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, করোনাভাইরাস দল-মত চিনবে না। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন কি আসে না- করোনাভাইরাস মোকাবেলার ক্ষেত্রে দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা দরকার ছিল? সেটি কি হচ্ছে বাংলাদেশ?

ড. আবদুল মজিদ: দেখুন, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি। আমি করোনাকে একটু অন্যভাবে বলি-এটি অত্যন্ত অসাম্প্রদায়িক-নিরপেক্ষ এবং আধুনিক। কারণ দলমত নির্বিশেষ মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। ফলে করোনা প্রতিরোধে সমগ্র দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বিকল্প নেই।

এই সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার যে কথাগুলো বলা হচ্ছে-তা কেউ মানছি আবার কেউ মানছিনে। আর মানছেনা কেন সে সম্পর্কে বলা হচ্ছে এটা ‘উমুকের’ সেজন্য মানব না। তো এই যে পরস্পরের প্রতি দোষারোপের বিষয়- এটা না করে সবদল যদি একসাথে মিলে একটা বৈঠক করতেন এবং পরস্পর কাজ ভাগাভাগি করে নিতেন এবং সিদ্ধান্ত নিতেন যে আমরা এদিকে দায়িত্ব নিচ্ছি আপনারা ও দিকটা দেখুন। সবাই একসাথে মিলে আহ্বান জানাই যে ভাই আমাদের নিজেদের স্বার্থেই এ কাজটি করতে হবে। আসলে ঐক্যমত্যের ব্যাপারটি খুবই শক্তিশালী বিষয়। সকলের মধ্যে যদি ঐক্যবদ্ধ একটা চিন্তা একসাথে আসে তাহলে সেটা কার্যকর হয়।

অনেকে মনে করছেন, এই যে ৫০ লাখ মানুষকে খাবার কিংবা সাহায্য দেয়া হবে সেখানে একটা ধোঁয়াশা কিংবা সন্দেহ তৈরি হচ্ছে যে কিজানি আমরা বোধহয় পাবোনা; ওমুক বোধহয় পাবে! এ ধরনের ভ্রান্তিগুলোকে দূর করতে হবে। সবাইকে একসাথে বলতে হবে এটা আমাদের সবার রোগ আর আমরা সবাই মিলে এই ঘাতকব্যাধী করোনাকে মোকাবেলা করব। আমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে করোনাকে মোকাবেল করব। যেমনটি আমরা সকলে মিলে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। এই জাতীয় দুর্যোগে আমরা সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হব। ফলে আমাদের সবকিছু করতে হবে সবার ভালোর জন্য। নিজেদের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বিভেদ বা দোষারোপের ব্যাপারটি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাহলে আমি মনে করি আমাদের মানসিক একটি শান্তি এবং স্বস্থি আসত। আর এটি এসময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে মানসিক শক্তি যেন কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

রেডিও তেহরান: জনাব ড. মোহাম্মাদ আবদুল মজিদ আমরা সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে চলে এসেছি। আপনি চমৎকার করে বললেন করোনা ‘অসাম্প্রদায়িক’ এবং করোনার হাত থেকে বাঁচতে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার। করোনা লাঘবের ক্সেত্রে প্রতিরোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তো এ প্রসঙ্গে সবশেষে যে বিষয়টি জানতে চাইছি সেটি হচ্ছে – চীন থেকে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছিল কিন্তু সেই চীনের পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক অথচ সারা বিশ্ব করোনাভাইরাস নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। চীন কিভাবে এটি নিয়ন্ত্রণ করলো অথচ বাকিরা পারছে না?

ড. আবদুল মজিদ: খুব সুন্দর প্রসঙ্গ বা প্রশ্ন। আমেরিকান ভাষাবিজ্ঞানী আব্রাম নোয়াম চমস্কি বিষয়টি নিয়ে গতবছর এপ্রিলে বলেছিলেন, রাজনৈতিক অন্য ধরনের একটা ঘেরাটোপের ভেতরে থাকার কারণে চীনে যে অগ্রগতি হয়েছে কিংবা তারা করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে তা থেকে শিক্ষা না নিয়ে বরং করোনাকে নিয়ে তাদের আবর্তিত হওয়ার বিষয়টিকে বড় করে দেখা হয়েছে।

সেজন্য আমি মনে করি, চীন থেকে শুরু হয়েছিল যে করোনা সেই চীন আজ সফল হয়েছে করোনা নিয়ন্ত্রণে। ফলে সেদিকে সবার দৃষ্টি দেয়া উচিত। কিভাবে তারা এটা করতে পেরেছে সে বিষয়গুলোকে অনুসরণ করা। prevention is bettar than cure. কিন্তু আমরা সব দেশেই লক্ষ্য করছি কিওরের ব্যাপারটি নিয়ে সবাই লাফালফি করছেন, হা-হুতাশ করছেন। তবে প্রতিরোধের দিকে যদি নজর দেয়া যায় তাহলে অনেক বেশি ভালো হয়। আপনি উপরে বাঁধ খুলে দিয়ে মোহনায় গিয়ে বাঁধা দেবেন সেটি যুক্তিসঙ্গত কাজ হচ্ছে না। সেজন্য করোনা মোকাবেলায় চীনসহ আরও যেসব দেশ সফলতা অর্জন করেছে তাদের দিকে তাকাতে হবে। আক্রান্ত হওয়ার আগে প্রতিরোধে কোথায় কোথায় কাজ করা যায় সেটার প্রতি নজর দিতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নে কি কি করা সম্ভব হয়েছে সেটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গত একটি বছর আপনারা সময় পেয়েছেন সে সময়টাতে কি করেছেন? অনেক দেশ এরইমধ্যে কিন্তু চীনসহ অনেক স্বয়ংম্ভরতা  এবং সক্ষমতা অর্জন করতে পেরেছে। সেক্ষেত্রে আমাদের মতো দেশ যারা এখন ভুগছে তারা কি সক্ষমতা অর্জন করতে পারল? এখন আমাদের অক্সিজেনের অভাব, আইসিইউ’র অভাব দেখা যাচ্ছে এসব বিষয়ে আমরা কৃত্রিম বা অন্যকোনোভাবে  কিছু করতে পারতাম কিনা, পারার কোনো স্কোপ রেখেছি কি না সেটার দিকে নজর দেয়া উচিত বলে আমি মনে করি। অর্থাৎ প্রতিরোধের দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। শেষের দিকে হা-হুতাশ করার চাইতে কোথায় বাঁধ দেয়া যায় সেটার দিকে লক্ষ্য রাখা উচিত।

রেডিও তেহরান: তো জনাব ড. মোহাম্মাদ আবদুল মজিদ, বাংলাদেশে করোনার দ্বিতীয় পর্যায়ের যে ঢেউ চলছে যেখানে কঠোরভাবে লকডাউন দেয়া হয়েছে। তো লকডাউন এবং সেখানকার বাস্তবতা নিয়ে রেডিও তেহরানের সাথে কথা বলার জন্য আপনাকে আবারও অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

ড.আবদুল মজিদ: ধন্যবাদ আপনাকেও।

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print