ইউরি গ্যাগারিন

“ভূপৃষ্ঠ থেকে অনেক অনেক উপরে আমি টিনের একটি কৌটার ভেতর বসে আছি। নীচে নীলরঙা পৃথিবী। আমার এখন কিছুই করার নেই“ – এই পঙক্তিগুলো পপ স্টার ডেভিড বউয়ি‘র বিখ্যাত ‘স্পেস অডিটি‘ অ্যালবামের অংশ।

আজ থেকে ৬০ বছর আগে ইউরি গ্যাগারিন যখন প্রথম মহাশূন্যে গিয়েছিলেন তার ভেতরেও সেদিন হয়ত একই বোধ কাজ করছিল।

যে নভোযানে চড়ে গ্যাগারিন সেদিন মহাশূন্যে যাত্রা করেছিলেন সেটি ছিল খুবই ছোট। সেটির ব্যাসার্ধ ছিল মাত্র দুই মিটার। সবচেয়ে বড় কথা ক্ষুদ্র ঐ নভোযানে তার ভূমিকা ছিল নেহাতই একজন যাত্রীর, নভোচারীর নয়। কারণ, সে সময় নভোযানের ভেতর কোনো যন্ত্রপাতি ছোঁয়ার অধিকার পাইলটের ছিলনা।

গ্রাউন্ড কন্ট্রোল অর্থাৎ মাটিতে বসে নভোযানটির নিয়ন্ত্রণ যারা করছিলেন, তাদের সাথে গ্যাগারিনের যে কথোপকথন হয়েছিল তা থেকে জানা যায় যে ক্যাপসুলের মত ছোট ঐ নভোযানের জানালা দিয়ে মহাকাশ থেকে পৃথিবীর “সৌন্দর্যে“ মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। ভূপৃষ্ঠের ওপর মেঘের ছায়া দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন।

উনিশশো একষট্টি সালের ১২ই এপ্রিল গ্যাগারিনের মহাশূন্য যাত্রা এবং নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরে আসার ঘটনাটি ছিল আমেরিকার বিরুদ্ধে সোভিয়েতের ইউনিয়নের অনস্বীকার্য এক টেক্কা।

কিন্তু ঐতিহাসিক সেই সাফল্য পেতে গ্যাগারিনকে চরম বিপজ্জনক এক ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। তখন পর্যন্ত অজানা মহাকাশে এমন একটি ক্ষুদ্র যানে চড়ে তিনি রওনা দিয়েছিলেন যেখানে কোনো বিপদ ঘটলে বিন্দুমাত্র কোনো রক্ষাকবচ তার ছিলনা।

যে রকেট তার নভোযানটিকে মহাশূন্যে নিক্ষেপ করেছিল, সেটি তার আগে বহুবার ব্যর্থ হয়েছিল।ফলে, গ্যাগারিন সেদিন গবেষণাগারের এক গিনিপিগের ভূমিকা নিয়েছিলেন।

তার মাধ্যমে মহাশূন্য সম্পর্কে অজানা কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা হয়েছিল – মহাকাশে কি মানুষ বেঁচে থাকতে পারে? কোনো নভোযানের পক্ষে সেখানে পৌঁছুন কি সম্ভব ? এবং যদি সেটি মহাকাশে পৌঁছুতে পারেও, সেখান থেকে কি ভূপৃষ্ঠের সাথে যোগাযোগ রক্ষা সম্ভব? এবং সেখান থেকে কি নিরাপদে ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসা সম্ভব?

যে নভোযানে চড়ে গ্যাগারিন মহাকাশে গিয়েছিলেন

ঐ সময় রকেট থেকে শুরু করে নভোযান এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে কেউই শতভাগ নিশ্চিত ছিলেন না। এমনকি মহাশূন্যে পৌঁছুতে পারলেও ভেতরের মানুষটি বাঁচবে কিনা তাও ছিল অজানা।

“এখনকার বিজ্ঞানীদের সামনে যদি ভোস্টক নামের ঐ নভোযানটিকে রাখা হতো, কেউই সেটিকে মহাশূন্যে পাঠানোর পক্ষে মত দিতেন না,“ ঐ অভিযানের প্রায় ৫০ বছর পর রুশ প্রকৌশলী বরিস চেরটক তার লেখা ‘রকেট অ্যান্ড পিপল‘ বইতে লিখেছেন।

“ (সে সময়) আমি এমন এক নথিতে আমি সই করেছিলাম যেখানে অমি লিখেছিলাম সবকিছু ঠিকঠাক আছে এবং আমি এই অভিযানের নিরাপত্তার গ্যারান্টি দিচ্ছি। কিন্তু সে রকম কোনো লিখিত গ্যারান্টি আমি আজ কোনোভাবেই দিতাম না। অনেক অভিজ্ঞতার পর আমি এখন বুঝি সেদিন আমরা কতটা ঝুঁকি নিয়েছিলাম।“

ভোস্টকের দুর্বলতা

যে প্রক্ষেপণ যানটির ওপর ভোস্টক নামে ঐ নভোযানটিকে বসানো হয়েছিল সেটির নামও ছিল ভোস্টক। প্রক্ষেপণ যানটির ভিত্তি ছিল আর-সেভেন ধরণের একটি রকেট যেটি ছিল আসলে দুই-ধাপ ভিত্তিক একটি আন্ত:মহাদেশীয় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র।

ঐ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম ব্যবহার হয়েছিল ১৯৫৭ সালের অগাস্ট মাসে। সে বছরই আর-সেভেন প্রযুক্তি প্রয়োগ করে বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক ওয়ান তৈরি করা হয়।

আর-সেভেন রকেটের নকশা খুবই জুতসই বলে প্রমাণিত হয়। এখনও রাশিয়ায় প্রধানত ঐ প্রযুক্তি নির্ভর ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মহাকাশে নভোযান পাঠানো হয়। যদিও অনেক পুরনো প্রযুক্তি, কিন্তু কক্ষপথে নভোযান পাঠাতে এটির নির্ভরযোগ্যতা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু ১৯৬১ সালে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন।

“আমরা যদি আধুনিককালের রকেটের নিরাপত্তা বিবেচনা করি, তাহলে ১৯৬১ সালের আগে ঐ অভিযান নিয়ে আমাদের আশাবাদী হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ ছিল না …“ চেরটক তার বইতে লিখেছেন।

উনিশশো ষাট সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে পাঁচটি কৃত্রিম উপগ্রহ (স্যাটেলাইট) উৎক্ষেপণের চেষ্টা হয় যার মধ্যে তিনটি কক্ষপথে ঢুকতে পারলেও, দুটি ভূপৃষ্ঠে ফিরে আসে। সেই দুটোর একটি বিধ্বস্ত হয়েছিল।

ভোস্টক কর্মসূচির আওতায় প্রথম কোনো মহাকাশযান উৎক্ষেপণ হয় ১৯৬০ সালের মে মাসে, অর্থাৎ গ্যাগারিনের অভিযানের এক বছরেরও কম সময় আগে। ঐ নভোযানে বসানো হয় একটি মানুষের মূর্তি যার নাম দেওয়া হয়েছিল ইভান ইভানোভিচ।নভোযানটি পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছুতে পারলেও সেটিকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ঠিকমত কাজ করেনি।

কয়েক মাস পর ১৯শে অগাস্ট দুটো কুকুর – বেলকা এবং স্ট্রেলকা – মহাশূন্যে গিয়ে প্রাণ নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসে। ১৯৬০ সালে সেটাই ছিল প্রথম মহাকাশে পুরোপুরি সফল একটি যাত্রা। কিন্তু তার পরের আরো কিছু চেষ্টায় সমস্যা দেখা দিয়েছিল।

পহেলা ডিসেম্বর আবারো দুটি কুকুরকে – মুশকা এবং চেলকা – বসিয়ে একটি নভোযান পাঠানো হলে তা ব্যর্থ। হয়। নভোযানটি সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে অন্য কোনো দেশে গিয়ে যাতে না পড়ে, তার জন্য সেটিকে আকাশেই ধ্বংস করে দেয়া হয়।

প্রায় নিখুঁত

উনিশশো একষট্টি সালের ১২ই এপ্রিল গ্যাগারিনের ফ্লাইটের দিন রকেট একদম প্রায় নিখুঁতভাবে কাজ করেছিল। তবে মহাকাশ প্রযুক্তিতে ‘প্রায়‘ শব্দটির তেমন কোনা জায়গা নেই কারণ অল্প গোলমালেও সেদিন গ্যাগারিনের জীবন চলে যেতে পারতো।

ছোটোখাটো কিছু যান্ত্রিক ঝামেলা নিয়ন্ত্রণ-কক্ষের বিজ্ঞানীদের কপালে ভাঁজ ফেলেছিল।

যেমন, তারা আগে যা ভেবেছিলেন গ্যাগারিনের নভোযানটি কক্ষপথে ঢোকার পর তার চেয়ে আরো উঁচুতে উঠে গিয়েছিল। যদিও ভোস্টকে এক সপ্তাহ চলার মত অক্সিজেন, খাবার এবং পানি ছিল, কিন্তু উঁচুতে চলে যাওয়ায় পৃথিবীতে ফিরতে সময় বেশি লেগে যেতে পারতো। ফলে, অক্সিজেন বা খাবারের অভাবে গ্যাগারিনের মৃত্যু হতে পারতো। কিন্তু ভাগ্য ভালো যে নভোযানের ভেতর পাইলটের জন্য ফিট করা ব্রেকটি কাজ করেছিল, এবং ব্রেক চেপে গ্যাগারিন নভোযানটির উঁচুতে ওঠা থামাতে পেরেছিলেন।

আরো বড় সমস্যা হয়েছিল নেমে আসার সময়। নভোযানের মূল ক্যাপসুলকে যে তারটি সার্ভিস ক্যাপসুলের (যন্ত্রপাতি এবং পাইলটের ব্যবহারের জিনিসপত্র ভর্তি অংশ) সাথে যুক্ত করে রাখে ফিরে আসার সময় সেটি আলগা হচ্ছিল না। ফলে ভূপৃষ্ঠে অবতরণের সময় গ্যাগারিনের ক্যাপসুলটি অনেক ভারী ছিল যেটি হওয়ার কথা ছিলনা। ফলে ক্যাপসুলের ভেতরের তাপমাত্রা বিপজ্জনক মাত্রায় গরম হয়ে গিয়েছিল।

“আমি যেন আগুনের ধোঁয়ায় চড়ে ঝড়ের গতিতে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছিলাম, “ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন গ্যগারিন। ক্যাপসুল মাটিতে পড়ার আগে গ্যাগারিন প্যারাসুটে করে সেটি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন। নিরাপদে ভল্গা নদীর কাছে এসে নামেন।

কিন্তু এমনটি হওয়ার কথা ছিলনা। ফেডারেশন অব অ্যারোনটিকস ইন্টারন্যাশনালের (এফএআই) শর্ত-মতো নভোচারীতে পৃথিবীতে নামতে হবে নভোযানে করে, নাহলে সেটিকে সফল অভিযান বলে গণ্য করা হবেনা। গ্যাগারিন যে শেষ কয়েক কিলোমিটার পথ প্যারাসুটে করে নেমেছিলেন তা সোভিয়েত কর্মকর্তারা স্বীকার করেননি।

তবে এফএআই এই অভিযানকে সার্টিফাই করেছিল। এমনকি পরে তারা তারা শর্তও পরিবর্তন করেছিল। তারা মেনে নেয় যে সফল অভিযানের প্রধান কথা – নিরাপদ উৎক্ষেপণ, কক্ষপথে ঢোকা এবং পাইলটের জীবিত ফিরে আসা।

‘আমি অনেক বেশি জানি‘

বিবিসির রুশ সার্ভিস তিনজন রাশিয়ান নভোচারীকে জিজ্ঞেস করেছিল যে ১৯৬১ সালে ভোস্টক যে অবস্থায় ছিল তেমন একটি নভোযানে চড়ে তারা এখন মহাকাশে যাবেন কিনা।

পাভেল ভিনোগ্রাদভ – যিনি ১৯৯৭, ২০০১৬ এবং ২০১৬ সালে মহাকাশে গেছেন- বলেন ঝুঁকি থাকা স্বত্বেও তিনি হয়ত ভোস্টকে চড়বেন, কিন্তু সেটা শুধু অ্যাডভেঞ্চারের কারণে। কিন্তু, তিনি বলেন, গ্যাগারিনের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন, “গ্যাগারিন হয়তো সম্ভাব্য বিপদ নিয়ে ততটা অবগতই ছিলেন না।“

“আমি যখন প্রথম মহাকাশের যাত্রী হয়েছিলাম, আমি অনেক কিছু জানতাম, “ বলেন ভিনোগ্রাদভ। “আমি একজন প্রকৌশলী, অনেক কিছু জানি। কিন্তু গ্যাগারিন সম্ভবত কিছুই জানতেন না।“

নভোচারী মিখাইল করনিয়েনকো, যিনি ২০১০ এবং ২০১৫ সালে মহাকাশে গেছেন, বলেন ১৯৬১ সালে তিনিও হয়তো গ্যাগারিনের মত ভোস্টকে চড়ে বসতেন, কিন্তু এখন হয়ত তিনি যাবেন না। কারণ, তিনি বলেন, ঝুঁকি অনেক।

সের্গেই রিয়াজানস্কিও দুই বার মহাকাশে গেছেন। তিনি বলেন, শুরুর দিকে নভোচারী হিসাবে বাছা হতো সামরিক বিমান চালকদের যারা দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত থাকতেন। প্রথম প্রজন্মের রুশ ঐসব নভোচারীরা ছিলেন কমবয়সী।

“আমারও যদি এখন বয়স কম থাকতো আমিও হয়তো অ্যাডভেঞ্চারের টানে ভোস্টকে চড়ে রওয়ানা হতাম। কিন্তু আমার এখন পরিবার রয়েছে। চার সন্তান।“ রিয়াজানস্কি বলেন, মহাকাশে যাওয়া এখন অনেক বিপজ্জনক এবং ভীতিকর। “সাধারণ মানুষের মনে ভয় থাকে। সেটা ভালো কারণ মানুষ তখন অনেক মনোযোগী হয়, দায়িত্বশীল হয়।“

‘আমাদের জীবন আমূল বদলে গেছে‘

কৃষক বাবার ছেলে গ্যাগারিন অতশত চিন্তা করে মহাকাশে যাননি। কিন্তু জীবন্ত ফিরে আসার পর সারা বিশ্বে তার নাম ছড়িয়ে পড়ে। জাতীয় নায়কে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। বিশ্বজুড়ে সেলিব্রেটির মর্যাদা পেয়েছিলেন। মহাকাশ বিজ্ঞানে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাফল্য প্রচারে বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন।

“অবশ্যই আমাদের জীবন আমূল বদলে গিয়েছিল, “ ২০১১ সালে বিবিসিকে বলেন ইউরি গ্যাগারিনের মেয়ে এলেনা গ্যাগারিনা। “আমার বাবা-মায়ের ব্যক্তিগত জীবন ছিলনা বললেই চলে। বাবার ঐ অভিযানের পর মায়ের জন্য সময় বের করা বাবার কঠিন হয়ে পড়েছিল।“

“হয়ত নেহাতই ব্যক্তিগত কারণে বাবা কোথাও গেলেন, সাথে সাথে মানুষজন তাকে ঘিরে ধরতো। তার সাথে কথা বলতে চাইতো, তাকে স্পর্শ করতে চাইতো। বাবাও মনে করতেন এটা তার কাজের অংশ। তিনি মেনে নিতেন।“

গ্যাগারিন আবারো মহাকাশে যেতে চাইতেন, কিন্তু জাতীয় নায়কের মর্যাদা পেয়ে যাওয়ার তাকে আর পাঠানো হয়নি।

বেশ কজন নভোচারীতে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন তিনি। পরে রাশিয়ার প্রখ্যাত জুকোভস্কি ইন্সটিটিউট অব অ্যারোনটিক্যাল ইন্সটিটিউটে ভর্তি হয়ে ১৯৬৮ সালে অনার্স সহ গ্রাজুয়েট ডিগ্রি লাভ করেন।

ঐ বছর মার্চে মিগ-১৫ যুদ্ধবিমানের একটি টেস্ট ফ্লাইট চালানোর সময় সেটি বিধ্বস্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়। তখন তার বয়স হয়েছিল ৩৪।

বিবিসি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print