শ্রোতা/পাঠক! স্বাস্থ্যকথার আসরে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি গাজী আবদুর রশীদ। আশা করছি সবাই শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ্ আছেন। আমরা স্বাস্থ্যকথার গত আসরে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সমস্যা আত্মহত্যা করা বা আত্মহত্যা প্রবণতা নিয়ে বিশিষ্ট মনোরোগ চিকিৎসক- জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলামের মূল্যবান আলোচনা শুনেছি। তিনি গত আলোচনায় বলেছিলেন- মানুষ মনের সুখে নয় মনের অসুখে আত্মহত্যা করে।

আত্মহত্যা হচ্ছে মনের অসুখ।

মনোসামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে আত্মহত্যা প্রবণতা সৃষ্টি হয়ে থাকে। আত্মহত্যার কারণ হিসেবে হতাশা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠ, আবেগ, মনজগতে বড় কোনো ভাঙন ইত্যাদি। আত্মহত্যার আরও কারণসহ নারী পুরুষভেদে এর তারতম্য বিষয় নিয়ে তিনি আজও কথা বলবেন। তো চলুন আর দেরি না করে বিশিষ্ট এই মনোচিকিৎসকের বক্তব্য শোনা যাক।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম-পৃথিবীতে বহুরোগে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে-সেখানে আত্মহত্যাও রয়েছে-আত্মহত্যায় কি পরিমাণে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে কোনো পরিসংখ্যান যদি থাকে..?  

অধ্যাপক তাজুল ইসলাম: আত্মহত্যার কারণে পৃথিবীতে মানুষের মৃত্যু বেশি। বছরে প্রায় ৮ লাখ মানুষ আত্মহত্যায় মারা যায়। বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ২৮ থেকে ৩৫ জন আত্মহত্যা করেন। আর যত মানুষ আত্মহত্যা করেন তারচেয়ে ৩/৪ গুণ মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করেন এবং আত্মহত্যার চিন্তা করেন, মরতে চায়, মনের ভেতর আত্মহত্যা প্রবণতা আছে কিন্তু পরিবার-পরিজন, ধর্মীয়সহ নানা কারণে আত্মহত্যা করেন না এরকম সংখ্যা তো আরো অনেক বেশি। দুর্ঘটনা এবং হার্ট অ্যাটাক ছাড়া আত্মহত্যার কারণে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি।

রেডিও তেহরান: ডা. তাজুল ইসলাম, আত্মহত্যা যেহেতু একটি মনোরোগ- এই রোগটিকে কিভাবে  বা কতটা গুরুত্বসহ  দেখা হচ্ছে?

অধ্যাপক তাজুল ইসলাম: সারা পৃথিবীতে আত্মহত্যাকে অনেক বেশি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হচ্ছে। একইসাথে আত্মহত্যার কারণ নিয়ে বিশ্লেষণ ও গবেষণা করা হচ্ছে। আর আত্মহত্যা একক কোনো কারণে হয় না। আমি আগেও বলেছি আত্মহত্যা একা কোনো রোগ নয় অনেক রোগের কারণে আত্মহত্যা করে থাকে মানুষ। প্রধানত মানসিক কারণ।

আজকের অনুষ্ঠান যারা শুনছেন তাঁদের সবার উদ্দেশ্যে বলছি, অনেকেই মনে করেন যারা আত্মহত্যা করেন তারা সবাই মানসিকভাবে সুস্থ হঠাৎ কোনো বিপর্যয়, প্রেমে ব্যর্থতা, আকষ্মিকভাবে পরিবারে ধস নামা, আর্থিকভাবে ধস নামার কারণে  কোনো সুস্থ মানুষ আত্মহত্যা করে। ব্যাপারটা আসলে সেরকম না। যাঁরা আত্মহত্যা করেন তারা কোনো না কোনোভাবে মানসিক রোগে ভোগেন অথবা আবেগীয় কোনো সমস্যা, মানসিক কোনো সমস্যা কিংবা ব্যক্তিত্বের কোনো সমস্যা আগে থেকেই বিদ্যমান থাকে। পারিপার্শ্বিক কোনো ঘটনা যখন ঘটে তখন তারা আত্মহত্যার দিকে ধাবিত হয়। পরিপূর্ণভাবে মানসিক দিক থেকে সুস্থ সবল মানুষ কোনো বিপর্যয়ের মধ্যে পড়লেও তারা খুব সহজে আত্মহত্যা করেন না।

রেডিও তেহরান: পাশাপাশি আপনি আগের আলোচনায় আত্মহত্যার বেশ কিছু কারণের কথা বলেছিলেন-আর কি কি কারণ রয়েছে আত্মহত্যার পেছনে?

অধ্যাপক তাজুল ইসলাম: আত্মহত্যার কারণের বিষয়ে প্রথমে বলব মানসিক রোগ। আর এরমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন। আত্মহত্যার ক্ষেত্রে ৬০ থেকে ৭৫ ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় বিষণ্ণতার কারণে তাঁরা আত্মহত্যা করেন। এটাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলি মুড ডিসঅর্ডার। মুড ডিসঅর্ডারের একটি অংশ মেনিয়া। মেনিয়া’র মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা আরো বেশি। এরপর সিজোফ্রেনিয়া। সিজোফ্রেনিয়াতেও বিষণ্ণতার চেয়ে আত্মহত্যা প্রবণতা বেশি। মাদকাসক্তির কারণে আত্মহত্যা করে থাকেন। এছাড়াও আরও অনেক মানসিক রোগের কারণে আত্মহত্যা প্রবণতা দেখা যায়। যেমন ব্যক্তিত্বের ক্রটি এবং আবেগগত সমস্যা থেকে আত্মহত্যা প্রবণতা তৈরি হয়। এধরনের সমস্যায় যারা ভোগেন তারা প্রায়ই আত্মহত্যার চেষ্টা করেন এবং নিজেদের ক্ষতি করার চেষ্টা করেন।

তাছাড়া শারীরিক দূরারোগ্য কোনো ব্যাধীতে ভোগার কারণে আত্মহত্যার প্রবণতা দেখা যায়।

পারিবারিক নানাবিধ সমস্যার কারণেও আত্মহত্যা প্রবণতা দেখা যায়। যেমন ধরুন, যৌতুক, দারিদ্র্য, বেকারত্বের কারণেও আত্মহত্যা করে থাকেন অনেক। তবে যখন মানুষ নিজের পরিবারে নিজেকে লাঞ্ছিত, অপমানিত এবং হেয় মনে করেন তখন আত্মহত্যা করেন। ধরুন-ইভটিজিং, প্রেমে ব্যর্থতা, বিবাহ-বিচ্ছেদ, স্বামী-স্ত্রীর মনোমালিন্য কিংবা পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনায় ভিকটিম নারী কিংবা পুরুষ মনে করেন তাকে অপমান করা হয়েছে। তার জীবনটা মূল্যহীন হয়ে গেছে। সমাজের কাছে সে অপাংক্তেও খুব ছোটো হয়ে গেছে। এ ধরনের ঘটনা যখন ভিকটিমের মনে আসে তখন আত্মহত্যার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম আপনি সুন্দরভাবে আত্মহত্যার কারণগুলোর কথা বললেন। আচ্ছা আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কোন বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায় কিংবা নারী পুরুষভেদে কি তারতম্য আছে?

অধ্যাপক তাজুল ইসলাম: আপনি খুব ভালো একটি প্রশ্ন করেছেন। হ্যাঁ দুটো বয়সে এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। একটি হচ্ছে টিন এজ বয়স। এটি আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি। আরেকটি হচ্ছে বৃদ্ধ বয়স।

টিন এজ গ্রুপের আত্মহত্যা বেশি হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ।  তাদের আত্মহত্যা দুইভাবে হয়। একটা হচ্ছে পরিকল্পনা করে আত্মহত্যা করে। অপরটি আবেগীয় তাড়না থেকে আত্মহত্যা। একটু আগে বলছিলাম বিভিন্ন মানসিক রোগ। এইসব মানসিক রোগ অনেক দিনের সমস্যা থেকেই সৃষ্টি হয়। এই ধরনের রোগীরা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে যে আমি এভাবে মরে যাব- আর সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে তারা আত্মহত্যা করে। আবেগতাড়িত বিষয়গুলো হচ্ছে যেমন-পরীক্ষায় ফেল করল, অথবা বাবা মা বকা দিল অথবা কিছু একটা প্রত্যাশা করল অথচ পেল না, স্বামী স্ত্রীর সেপারেশন। এসব কারণে হঠাৎ করে আবেগতাড়িত হয়ে আত্মহত্যা করেন। এভাবে আত্মহত্যার সংখ্যাও অনেক বেশি।

আর নারী-পুরুষভেদে আত্মহত্যার ক্ষেত্রে- নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা সবসময় বেশি থাকে। তারা পুরুষের চেয়ে ৩ থেকে ৪ গুণ বেশি আত্মহত্যার চেষ্টা করে। তবে দেখা যায় আত্মহত্যা করতে সমর্থ্য হয় পুরুষরাই বেশি। এটা বৈশ্বিক একটি বিষয়। ভারত, বাংলাদেশ, চীন- এসব এলাকায় আবার কমপ্লিট সুইসাইডের ক্ষেত্রে কিন্তু নারীরা এগিয়ে। একইসাথে আত্মহত্যার চেষ্টাও তাদের মধ্যে বেশি। এককথায় সারাবিশ্বে যতলোক আত্মহত্যা করেন তারমধ্যে বেশিরভাগ পুরুষ। তবে পুরুষের চেয়ে ৪ গুণ বেশি নারী আত্মহত্যার চেষ্টা করে। বাংলাদেশের চিত্রটা এমন- আত্মহত্যার চেষ্টা নারীরা বেশি করে এবং আত্মহত্যা করতে সমর্থ্য হয় নারীরাই বেশি।

তো শ্রোতা/পাঠক! স্বাস্থ্যকথার আজকের আসর এখানেই গুটিয়ে নিচ্ছি। আত্মহত্যার চিকিৎসা নিয়ে আগামী আসরে আমরা কথা বলব। সে আসরেও এই মনোচিকিৎসক আলোচনা করবেন।

আর এ সাক্ষাৎকার গ্রহণ, উপস্থাপনা ও অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

তো সবাই ভালো থাকবেন এবং সুস্থ্য থাকবেন এবং সবাই নিয়মিত ব্যায়ম করবেন, পরিমিত ও সুষম খাবার খাবেন এবং মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্মশীল হবেন এই প্রত্যাশা রাখছি।

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print