শ্রোতাবন্ধু/পাঠক! স্বাস্থ্যকথার আজকের আসরের শুরুতেই পবিত্র রমজানের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি সবাইকে আমি গাজী আবদুর রশীদ। আশাকরি মহামারি করোনার মধ্যেও সবাই ভালো ও সুস্থ আছেন।

পবিত্র রমজানকে কেন্দ্র করেই স্বাস্থ্যকথার এ আসর সাজানো হয়েছে। মারাত্মক অসুখ বিসুখ না থাকলে সবার পক্ষেই রোজা রাখা সম্ভব। গত আসরে এ নিয়ে কথা হয়েছে। আজকের আসরেও এ বিষয়ে আলোচনা হবে। আর আলোচনা করবেন বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজের ইন্টারন্যাল মেডিসিন বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ইসমাঈল পাটোয়ারি।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক ইসমাঈল পাটোয়ারি, গত আসর শেষ করেছিলেন এ বলে যে মারাত্মকভাবে অসুস্থ না হলে সবার পক্ষেই রোজা রাখা সম্ভব। একথাটি কি আমাদের জন্য একটু ব্যাখ্যা করবেন।

অধ্যাপক ইসমাঈল পাটোয়ারি: জ্বি এ কথাটিকে অবশ্যই ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যেমন ধরুন ডায়াবেটিসের একজন রোগী রোজা রাখতে চান। তাঁকে রোজার আগ থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। যে রোগী আগে তিন বেলা ইনসুলিন নিতেন এই সময় হয়তো তাঁকে দুই বেলা ইনসুলিন নিতে হবে। লং অ্যাক্টিং যে প্রিপারেশনগুলোকে ইফতারের সাথে সাথে সন্ধ্যার সময় তাঁকে নিয়ে নিতে হবে আর শর্ট অ্যাক্টিং ইনসুলিন ইফতারের সাথে সাথে নেবেন এবং সেহরির সময় নেবেন। যদি দেখা যায় সুগারের পরিমাণটা খুব বেশি কমে গেছে এবং শারীরিক কোনো সিমটম যদি দেখা দেয় তখন রোজা ভাঙার নির্দেশনা আছে। এভাবে কিন্তু সমন্বয় করা যায়।

তাছাড়া রোজাতে ‘ম্যাটফরমিন’ যে ট্যাবলেটটা নিয়ে থাকি তিন বেলা সেটা রোজার সময় দুবেলা নিতে হবে। এভাবে ওধুধের মাত্রা এবং পরিমাণটাকে আমরা যদি নিয়ন্ত্রণে এনে যদি ব্যবহার করি তাহলে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য রোজা রাখাটা কষ্টসাধ্য হওয়ার কথা নয়। তবে যদি খুব ঝুঁকি থাকে সেক্ষেত্রে রোজা ভাঙার নিয়ম আছে।

রেডিও তেহরান: আচ্ছা অধ্যাপক পাটোয়ারি,  আপনি ডায়াবেটিস বা বহুমুত্রের রোগীর রোজা রাখার বিষয়ে বললেন। ধরুন যদি উচ্চ বা নিম্ম রক্তচাপ অর্থাৎ হাইপার বা হাইপো টেনশন আছে তাদের মধ্যে কেউ রোজা রাখতে আগ্রহী হলে তখন কি করতে হবে? 

অধ্যাপক ইসমাঈল পাটোয়ারি: হাইপারটেনশনের রোগীদের আমরা বেশি পাই। আর হাইপারটেনশন নানাবিধ কারণে হতে পারে। হাইপারটেনশনের রোগীরাও রোজা রাখতে পারবেন। সেক্ষেত্রে ওষুধের ডোজটাকে একটু অ্যাডজাস্ট করে নিতে হবে। কারণ হাইপারটেনশন অনেকগুলো ফ্যাক্টরের ওপর নির্ভর করে। যেমন কেউ যদি খুব উত্তেজিত হয় অর্থাৎ মানসিক টেনশন থাকে তাহলে প্রেসার বেড়ে যায়।  যে ব্যাক্তি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কাল করে রোজা রাখবে, খুব ঠাণ্ডা মাথায় রোজা রাখবে তাঁর টেনশন কম থাকবে। সেক্ষেত্রে অসুবিধাটা কম হবে। এছাড়া ওষুধের মাত্রাটা সন্ধ্যা ও ভোরে খেয়ে নেবেন এবং প্রেসারটা চেক করে নিতে হবে। সেক্ষেত্রে হাইপার টেনশনের রোগীদের রোজা রাখতে কোনো অসুবিধা হবে না। তবে খাবারের বিষয়ে খেয়াল রাখতে যাতে অতিরিক্ত লবণ খাওয়া না হয়। চর্বি জাতীয় খাবারগুলো কম খেতে হবে। হাইপার টেনশনের রোগীদের ক্ষেত্রে যদি ডায়ারিয়া বেশি হয় কিংবা বোমি হয় অথবা যদি কোনো শকে থাকে তাহলে হাইপারটেনশন ডেভালাপ বাড়তে পারে। তখন হয়তো তার নরমাল স্যালইন নেয়া লাগতে পারে তবে তাতে গ্লুকোজ নেয়া যাবে না।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক পাটোয়ারি, বাংলাদেশে হাইপার এসিডিটির অনেক রোগী আছেন। তাদের অনেকেই রোজ রাখতে একান্তভাবে আগ্রহী। এখন প্রশ্ন হলো- এসব রোগীর পক্ষে কি রোজা রাখা সম্ভব বা রোজা রাখতে হলে তাদের কি করতে হবে ?

অধ্যাপক ইসমাঈল পাটোয়ারি: আপনি যেটা বললেন- আমরা যেটাকে প্যাপটিক আলসার বলি। সেটা গ্যাসটিক আলসারও হতে পারে। সেক্ষেত্রে রোগী যদি সতর্ক থাকেন এবং পরিমিত খাবার খান তাহলে তাঁর রোজা রাখতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। অনেকগুলো এক্সপেরিমেন্টে দেখা গেছে কনডিশনিং একটা রিফ্লেক্ট আছে। আপনার যদি মাথা ঠাণ্ডা থাকে তাহলে এসিড সিক্রেশনটা কম হবে। কারণ আপনি আল্লাহর উদ্দেশ্যে রোজা রাখছেন, আল্লাহ আপনাকে সাহায্য করবেন ফলে আপনার ব্রেনও কুল অ্যান্ড কাম থাকবে। এছাড়া আরেকটি জিনিষ হচ্ছে আমাদের এখন প্রচুর পরিমাণে মেডিসিন আছে যেগুলো সন্ধ্যা রাতে কিংবা ভোর রাতে সেবন করলে দীর্ঘ সময়ের জন্য কাভার করতে পারে যাতে করে এসিডিটি কম হয়।

রেডিও তেহরান: আজেকর আসরের সবশেষ যে প্রশ্নটি করব অধ্যাপক পাটোয়ারি, সেটি হচ্ছে- আর্থারাইটিস বা অন্য কোনো ব্যথা বেদনা যাদের আছে তারা চাইলে কি রোজা রাখতে পারবে ?

অধ্যাপক ইসমাঈল পাটোয়ারি: সেগুলোতে খুব একটা অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে যদি কোনো অ্যাকিউট কনডিশন হয় অর্থাৎ তিনি যদি মনে করেন তার চলাফেরায় এবং ওষুধসেবন না করার জন্য ব্যথা বেড়ে গেছে তখন ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তিনি তখন রোজা ভাঙতে পারেন। কিন্তু স্বাভাবি ব্যথা কিংবা সাধারণ আর্থারাইটিসের জন্য রোজা ভাঙার কোনো কারণ নেই। কারণ সাপোজেটরি ফর্মে, ইনজেকটেবল ফর্মে কিন্তু ব্যথার ওষুধ নিতে পারেন।

শ্রোতা/পাঠক! ডায়াবেটিস এবং আর্থারাইটিসের রোগী রোজা রাখতে পারবেন কি না সে প্রসঙ্গে এতক্ষণ –অধ্যাপক ইসমাইল পাটোয়ারির আলোচনা শুনলেন।

আজকের আলোচনা থেকে বুঝতে পারছি মারাত্মক অসুখ বিসুখ না থাকলে সবার পক্ষেই  রোজা রাখা সম্ভব। আগামী আসরেও এ প্রসঙ্গে কথা হবে। সে আসরেও এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক কথা বলবেন।

এবার বিদায় নেব স্বাস্থ্যকথার আজকের আসর থেকে। তার আগে বলে নেই, রোজার সংযমের শিক্ষা আত্মিক ক্ষমতাই কেবল বাড়ায়  না বরং সুস্থ থাকতেও সহায়তা করে। রোযার শিক্ষাকে গ্রহণ করে সবাই সংযমী হবো। গত রোযায় আমাদের যেসব ভুল-ভ্রান্তি হয়েছে এবারের রোযায়  তা থেকে সবাই দূরে থাকার চেষ্টা একান্তভাবে সবাইকে – এ আহ্বান জানাচ্ছি। সবাই ভালো ও সুস্থ থাকুন-স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন।

আজকের স্বাস্থ্যকথার সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা। সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print