১৯৮০’র দশকে ইরানি জাতির জীবনে ভাগ্য নির্ধারণী কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়। এই দশকের গোড়ার দিকে ইরানে ইসলামি বিপ্লব বিজয় লাভ করে এবং দশকের শেষাংশে এসে ইরাকের সাদ্দাম সরকারের চাপিয়ে দেয়া আট বছরের যুদ্ধ শেষ হয়।

দেশ ও বিপ্লবী মূল্যবোধ রক্ষার লক্ষ্যে ইরানি জনগণের অকুতোভয় সেই প্রতিরোধ সংগ্রাম ইরানে ‘পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ওই যুদ্ধের প্রাথমিক দিনগুলোতে বিভিন্ন ফ্রন্টে ইরানি সেনাবাহিনী ও যুবসমাজ বীরবিক্রমে লড়াই করে অনেকগুলো বীরত্বগাঁথা সৃষ্টি করে। ওই সময় আকস্মিকভাবে আগ্রাসন চালিয়ে ইরাকের সাদ্দাম বাহিনী দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের বেশ কিছু গ্রাম ও শহর দখল করে নেয়।

ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে একটি নয়া সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাত্র ১৯ মাস পর ওই যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল বলে স্বাভাবিকভাবেই আকস্মিক আগ্রাসন প্রতিহত করার প্রস্তুতি তেহরানের ছিল না। কিন্তু তাৎক্ষণিক হামলার আকস্মিকতার হতবিহ্বলতা কাটিয়ে ইরানের সেনাবাহিনী ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে এবং আপামর জনসাধারণ সেনাবাহিনীর পাশে দাঁড়ায়। এ সময় ইরানের যেসব শহর রক্ষা করতে গিয়ে দেশের তরুণ ও যুবকেরা প্রশংসনীয় বীরত্বগাঁথা সৃষ্টি করে সেগুলোর মধ্যে খোররামশাহর অন্যতম।  ইরানি যোদ্ধাদের ৩৪ দিনের তীব্র প্রতিরোধ সত্ত্বেও ১৯৮০ সালের অক্টোবরে এই শহরের পতন হয়। তবে ১৯ মাসের বেশি এটির ওপর দখলদারিত্ব ধরে রাখতে পারেনি ইরাক। ১৯৮২ সালের ২৪ মে ইরানের সেনাবাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী পাল্টা আকস্মিক হামলা চালিয়ে খোররামশাহর পুনরুদ্ধার করে। সেই বীরত্বগাঁথাকে স্মরণে রাখতে ওই দিনকে ইরানের ইতিহাসে ‘প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

গত আসরে যেমনটি বলেছিলাম, সামান্যতম অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে ইরানি যোদ্ধাদের অকুতোভয় প্রতিরোধের কারণে আগ্রাসী ইরাকি বাহিনী খোররামশাহরে অনুপ্রবেশ করতে পারছিল না। পরবর্তীতে নির্বিচারে শহরের ওপর গোলাবর্ষণ করে কোনো কোনো অংশ দিয়ে সাদ্দাম বাহিনী শহরে ঢুকে পড়ে।  তারা এ সময় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয় এবং অনেক ধীরগতিতে অগ্রসর হতে থাকে। এদিকে প্রতিরোধ যোদ্ধাদের কাছে সময়মতো রসদ সরবরাহ না আসার কারণে ইরাকি বাহিনী খোররামশাহরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া কারুন নদী পার হতে সক্ষম হয়। প্রয়োজনীয় রসদ ও গোলাবারুদ থাকলে সেদিন আগ্রাসী বাহিনীর পক্ষে ওই নদী পার হওয়া সম্ভব হতো না। এভাবে ইরাকি বাহিনী ধীরে ধীরে নগরীর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে স্থাপিত প্রতিরোধ যুদ্ধের কমান্ড সেন্টারের কাছ পৌঁছে যায়। এতদিন গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সংগঠিত করা, তাদের বিশ্রাম এবং যুদ্ধাহতদের চিকিৎসা সেবা দেয়ার কাজে এই মসজিদ ব্যবহৃত হচ্ছিল।

এদিকে তেহরান থেকে নতুন কোনো সৈন্য না পাঠানোর কারণে প্রতিদিনই খোররামশাহরের প্রতিরোধ যোদ্ধার সংখ্যা কমছিল। এ অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ইরানি যোদ্ধাদের পক্ষে অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে আগ্রাসী বাহিনীর হাতে শহরের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেয়াও ছিল প্রতিরোধ সংগ্রামীদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের বিষয়। ‌১৯৮০‌ সালের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে ইরানি সেনাবাহিনী ও যুবসমাজের প্রতিরোধ ব্যুহ পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং খোররামশাহর থেকে যেসব খবর আসতে থাকে তা থেকে বোঝা যায়, শিগগিরই শহরটির পতন হতে যাচ্ছে।

ইরানি প্রতিরোধ যোদ্ধারা প্রাণপণে লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত নগরীর পতন পাঠাতে পারেননি। তবে খোররামশাহর দখল করাকে শত্রু সেনারা যতটা সহজ ভেবেছিল ততটা সহজ হয়নি। ইরাকি বাহিনী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নগরীর দখল নেবে বলে মাত্র দুই ব্যাটালিয়ান সেনা নিয়ে এই অভিযান শুরু করেছিল। কিন্তু ইরানের পক্ষ থেকে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হওয়ার পর সেই সেনা সংখ্যা বাড়াতে বাড়াতে শেষ পর্যন্ত দুই ডিভিশন সেনা নিয়ে তারা এই নগরীর পতন ঘটাতে সক্ষম হয়। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে খোররামশাহরের প্রতিরোধ যুদ্ধের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একজন ইরাকি সেনা কমান্ডার পরবর্তীতে বলেন, “তাদের হাতে যে গোয়েন্দা তথ্য ছিল তাতে বলা হয়েছিল, ইরানের অল্প কিছু সৈন্য খোররামশাহর রক্ষার দায়িত্বে রয়েছে। কাজেই সেখানে হামলা চালালে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শহরটির দখল নেয়া যাবে। কিন্তু হামলা চালানোর পর আমরা বুঝতে পারি আমাদের গোয়েন্দা তথ্য সঠিক ছিল না। এ ছাড়া, ইরানের সাধারণ মানুষ যে সেনাবাহিনীর সঙ্গে এভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে তা আমরা বুঝতে পারিনি।”

মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোশিয়েটেড প্রেসের সংবাদদাতা খোররামশাহরের প্রতিরোধ যুদ্ধ সম্পর্কে লিখেছেন: “১৯৮০ সালের অক্টোবর মাসে ইরানি প্রতিরোধ যোদ্ধারা এই শহর রক্ষা করতে গিয়ে এমন বীরত্বগাঁথা সৃষ্টি করে যে, খোররামশাহর ‘রক্তের শহর’ হিসেবে পরিচিতি পায়।” এই নগরীতে এমন কোনো ঘর বা বাড়ি পাওয়া যাবে না যেখানে কামানের গোলা বা গুলিবর্ষণের চিহ্ন নেই। এখান থেকে বোঝা যায়, প্রতিরোধ যোদ্ধারা কীভাবে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলেছিলেন।

এই নগরীর প্রতিরোধ সংগ্রামের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ইরানি তরুণীদের প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশগ্রহণ। ভয়ঙ্কর অস্ত্রে সজ্জিত আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীকে ৩৪ দিন ধরে খোররামশাহরের প্রবেশপথে আটকে রাখার যুদ্ধে ইরানি তরুণীদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। সাদ্দাম বাহিনী তখনই নগরীতে অনুপ্রবেশ করার সুযোগ পায় যখন সেখানে অবস্থানরত প্রতিরোধ যোদ্ধাদের বেশিরভাগই হয় শাহাদাতবরণ করেন অথবা আহত হয়ে যুদ্ধ করার ক্ষমতা হারান। এই শহরের প্রতিরোধ যুদ্ধে উভয় পক্ষের প্রায় সাত হাজার সৈন্য হতাহত এবং কয়েক শ’ সাঁজোয়া যান ধ্বংস হয়। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খোররামশাহরের ৩৪ দিনের প্রতিরোধ যুদ্ধ সম্পর্কে লেখা বহু বই ও উপন্যাস পরবর্তীতে হটকেকের মতো বিক্রি হয়। এই সংগ্রামে কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত হয় বহু ব্যবসা-সফল সিনেমা।

ওদিকে মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে নব্য প্রতিষ্ঠিত ইসলামি সরকারকে পরাভূত করে গোটা ইরান দখলের স্বপ্নে বিভোর ইরাকের সাদ্দাম সরকার এই প্রতিরোধ যুদ্ধের পর তার গোটা যুদ্ধনীতি পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়। ছোট্ট একটি শহর দখল করতে গিয়ে তাদের যে পরিমাণ বেগ পেতে হয় তাতে গোটা দেশ দখলের দিবাস্বপ্ন যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয় সে সম্পর্কে আগাম ধারনা লাভ করে বাগদাদ।

 

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ

জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print