zxzxvvযে বয়সে কিছু জানার ও শেখার চেষ্টা করা কোমলমতি ছাত্রদের মূল কাজ সেই বয়সে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া বাঞ্ছনীয় নয়। স্কুল ছাত্রদের সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করাটা কোনো ছাত্রসংগঠনের পক্ষেই একেবারে কাম্য নয়। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মাহবুব উল্লাহ।

তিনি আরো বলেছেন, স্বাধীনতার আগে আমাদের ছাত্ররাজনীতির গুরুত্ব ছিল। তখন সাধারণ মানুষ ছাত্রদের বিশ্বাস করত। বর্তমানে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে যেধরনের সংঘাত ও হানাহানি হয় তাতে মানুষের মধ্যে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, সম্প্রতি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে একটি ঘোষণাপত্র প্রচার করা হয়েছে যাতে বলা হয়েছে- স্কুল পর্যায়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি বিস্তার করতে হবে। এ নিয়ে দেশের পত্র-পত্রিকায় ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নানামুখী আলোচনা চলছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

 অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: দেখুন, আপনার প্রশ্নের জবাব দিতে আমি একটু ইতিহাসের দিকে ফিরে যেতে চাই। আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে-১৯৬৯ সালে যখন আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান হচ্ছিলো, ১১ দফা আন্দোলন হচ্ছিলো তখন স্কুল ছাত্রদেরকে-ছাত্ররাজনীতিতে জড়িত করা হয়েছিল। সেসময় পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে ‘পাকিস্তান দেশ ও কৃষ্টি” নামে একটি বই প্রকাশ করা হয়। বইটি নবম ও দশম শ্রেণির পাঠ্য ছিল। এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করার জন্য স্কুল ছাত্রদের সংশ্লিষ্ট করা হয়। তখন থেকে স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে ছাত্র-সংগঠনের শাখা গঠনের একটা প্রক্রিয়া শুরু হয়। পরবর্তীতে দীর্ঘ দিন এধরনের কোনো প্রক্রিয়া ছিল না।

আপনার প্রশ্নের মধ্যে যে বিষয়টি বলেছেন-স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রলীগের শাখা গঠন করা হবে বা তাদের রাজনীতির বিস্তার করা হবে বলে তাদের ঘোষণাপত্রে প্রচার করেছে। এ বিষয়টি দেশের জন্য কতোটা প্রয়োজন এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর তার প্রতিক্রিয়া কী হবে সেটা গভীরভাবে বিবেচনা করার বিষয়।

তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যারা অত্যন্ত কোমলমতি স্কুলের ছাত্র, যাদের এই বয়সে দেশের অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বোঝার মতো সামর্থ্য হয় নি; তাদেরকে ছাত্ররাজনীতিতে বা দলীয় সংগঠনের রাজনীতিতে জড়িত করাটা খুব একটা মঙ্গলজনক হবে না। এটা না করাই বাঞ্ছনীয়।

রেডিও তেহরান:  জ্বি অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, আপনি ছাত্র রাজনীতির খানিকটা ইতিহাস তুলে ধরলেন। তো অনেকে স্কুল পর্যায়ে ছাত্রলীগের রাজনীতি বিস্তারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সমালোচনামুখর হয়েছেন। তবে অনেকে বলছেন, বহুদিন ধরেই স্কুল পর্যায়ে ছাত্র শিবির ও বাম সংগঠনগুলোর কার্যক্রম আছে। এগুলো থাকতে পারলে ছাত্রলীগের কার্যক্রম থাকবে না কেন? কী বলবেন আপনি?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে যদি বলা হয় তাহলে একটি বা দুটি ছাত্রসংগঠন যদি স্কুলে শাখা গঠন করে তাহলে অন্য আরেকটি সংগঠন শাখা গঠনের অধিকার রাখে কিন্তু বিষয়টা কতটা সঠিক সেটাই প্রশ্ন। এটা শিক্ষার জন্য কতোটা মঙ্গলজনক সেটি অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

আমাকে যদি আপনি জিজ্ঞেস করেন তাহলে আমি বলব- আপনি ছাত্র শিবির ও বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর কথা বলেছেন। তারা অনেক দিন ধরে স্কুল পর্যায়ে ছাত্রসংগঠন করছে। সেই যুক্তি ধরে যদি ছাত্রলীগ বলতে চায়  তারাও ছাত্রসংগঠন করবে তাহলে গণতান্ত্রিক ও সততার  প্রশ্নে আপত্তি করার সুযোগ নেই কিন্তু নৈতিকতার দিক থেকে এটি কতটা গ্রহণযোগ্য সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

যে বয়সে কিছু জানার ও শেখার চেষ্টা করা ছাত্রদের মূল কাজ সেই বয়সে ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া বাঞ্ছনীয় নয়। সেই পর্যায়ে স্কুল ছাত্রদের সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করাটা কোনো ছাত্রসংগঠনের  পক্ষেই একেবারে কাম্য নয়।

রেডিও তেহরান:  অনেকে বলছেন, ছাত্ররাজনীতি আসলে আমাদের দেশকে খুব বড় কিছু দেয় নি বরং ছাত্ররাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের নামে ছাত্রসমাজকে আচ্ছন্ন করে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সুবিধা হাসিল করেছে। আপনার মূল্যায়ন কী?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: দেখুন, স্বাধীনতার আগে আমাদের দেশে ছাত্ররাজনীতির গুরুত্ব ছিল। তখন ছাত্ররা একট বড় ভূমিকা পালন করত। সাধারণ মানুষ ছাত্রদের কথায় তখন বিশ্বাস করত। কারণ সাধারণ মানুষের তখন ধারনা ছিল যে ছাত্ররা স্বার্থের তাগিদে কোনো কিছু করে না। আর সেজন্য ছাত্রদের ডাকে সাড়া দিয়ে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামত এবং প্রতিবাদ মিছিলে অংশ নিত কিন্তু সময় এবং সমাজ বদলে গেছে। বর্তমানে ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে যেধরনের সংঘাত ও হানাহানি হয় তাতে মানুষের মধ্যে একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এখন ছাত্ররাজনীতি যদি শুদ্ধভাবে করা না হয় তাহলে  হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেজন্যে আমার বক্তব্য হচ্ছে, এ পর্যায়ে ছাত্রদেরকে রাজনীতিতে জড়িত করা উচিত না। এছাড়া বিশ্ব ব্যবস্থাও বদলেছে। আজকে যেসব দেশ উন্নত এবং যেসব উন্নয়নশীল সেসব দেশে আমরা খুব একটা শুনি না যে ছাত্ররাজনীতি দেশীয় রাজনীতিতে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্রসংগঠন আছে তবে তারা রাজনৈতিক দলগুলোর নিয়ামক ভূমিকা পালন করে না। সেখানে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে মূল রাজনৈতিক দল। ছাত্রদের যখন লেখাপড়া করা এবং শেখার বয়স তখন তাদেরকে এ বিষয়ে মনোযোগী করতে উদ্বুদ্ধ করাটাই হচ্ছে শিক্ষক এবং এ বিষয়ে যারা চিন্তাভাবনা করেন তাদের দায়িত্ব। স্কুল পর্যায়ে তো ছাত্ররাজনীতি একেবারেই কাম্য নয়।

রেডিও তেহরান: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়- ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো মূলত সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিসহ নানা অন্যায় কাজের অগ্রভাগে থাকে। এ অবস্থার উন্নতি তো হয়-ই নি বরং দিন দিন অবনতি ঘটেছে। আপনি কী মনে করেন- উত্তরণের কোনো পথ আছে?  

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: আপনি প্রশ্নের মধ্যে যেকথা বলেছেন তার সাথে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই। আর এর উত্তরণ কিভাবে হবে তাও আমার জানা নেই। তবে এটুকু বলতে পারি যারা রাজনীতির কর্ণধার তারা নিজেরা যদি শুদ্ধ না হন এবং দেশকে সুশাসন উপহার দিতে না পারেন তাহলেও কিন্তু ছাত্ররাজনীতিতে একটা বিরূপ প্রভাব পড়তে বাধ্য। সেখানে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বা বিষয় সম্পদ দখলের স্বার্থটাই সামনে আসবে, এরইমধ্যে আমাদের দেশে সেটা এসেছে। এটা দেশের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক একটা ব্যাপার।

রেডিও তেহরান: বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ছাত্র রাজনীতির আদৌ কোনো দরকার আছে কী? আপনি কী বলবেন?

অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ: এখনও আমাদের দেশে বিশেষ করে রাজনীতিবিদদের মধ্যে একটা ধারনা আছে যে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমেই তারা মূল দলের জন্য একটা রিক্রুটমেন্ট গ্রাউন্ড তৈরি করবে। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে আমাদের এখানে ছাত্ররাজনীতি যেভাবে অধ:পাতিত হয়েছে সেই চর্চার ফলে এই ধরনের সুযোগ আছে কী না সেটা একটা বড় প্রশ্ন।

রাজনৈতিক দলগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে তাদের নীতি-নির্ধারণী বক্তব্যগুলো পুস্তিকা আকারে বা অন্য যেকোনোভাবে জনগণের কাছে তুলে ধরা উচিত। তবে এরজন্য আলাদাভাবে ছাত্রসংগঠনের প্রয়োজন নেই। একজন শিক্ষক হিসেবে আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেখেছি যারাই শাসন ক্ষমতায় যায় তারা অন্য সংগঠনগুলোকে আর সেভাবে কাজ করতে দেয় না। এটা আসলে অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। এতে রাজনীতির এবং গণতান্ত্রিক সহনশীলতার কোনো শিক্ষা হচ্ছে না। বরং অসহনশীলতা এবং অন্যদেরকে শক্র মনে করার একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এটা কোনোক্রমেই কাম্য হতে পারে না। এজন্য শিক্ষাবিদ, যারা দেশ পরিচালনা করেন এবং রাজনীতিবিদরা সকলে মিলে একটা সমঝোতার জায়গায় যদি আসতে পারেন সেটাই হবে সবার জন্য মঙ্গলজনক।  পার্সটুডে

উক্ত প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print