[রাজেন্দ্রনাথ রুদ্র]মঙ্গলময় বিধাতার আশীর্বাদে সম্মোহন বিদ্যার চতুর্থ সংস্করণ মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইল। এতদ্বারা জন সাধারণের মধ্যে এই মহদুপকারী বিদ্যা চর্চার আগ্রহ যে দিন দিন বর্ধিত হইতেছে, তাহা বিশেষ ভাবে সূচিত হইতেছে। দ্বিতীয় সংস্করণে ইহার যে সকল ত্রুটি ছিল, তৃতীয় সংস্করণে সেগুলি সম্পূর্ণরূপে সংশোধিত হইয়া ইহার আকার দ্বিগুণ বর্ধিত করা হইয়াছিল। সেজন্য বর্তমান সংস্করণে আর ইহার বিশেষ কোন পরিবর্তনের আবশ্যক হইল না; কেবল দুই এক স্থানে যৎসামান্য পরিবর্ধন করা হইল। পূৰ্ব্ব সংস্করণের ছাপায় যে সকল মুদ্রাকর প্রমাদ ছিল, সেগুলি যথা সম্ভব সাবধানতার সহিত সংশোধন করা গেল। যদি দুর্ভাগ্য বশতঃ এই বারেও ছাপার ভুল বাহির হয়, তবে পাঠকগণ দয়া করিয়া আমাকে তাহা জানাইলে অত্যন্ত বাধিত হইব। এইবার ইহাকে কাপড় দ্বারা সুদৃশ্য বাঁধাই করাতে অনেক ব্যয় বাহুল্য ঘটা সত্ত্বেও দেশের আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করিয়া পূর্ব মূল্যই স্থির রাখা গেল।

যাহাতে শিক্ষার্থিগণকে শিক্ষাকালীন আমার নিকট হইতে চিঠি-পত্রে অতিরিক্ত কোন উপদেশের জন্য প্রার্থী হইতে না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ লক্ষ্য রাখিয়াই ইতিপূৰ্ব্বে ইহার পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হইয়াছে। সুতরাং তাহারা মনোযোগের সহিত ইহা পাঠ করিয়া বর্ণিত নিয়ম-প্রণালীগুলির যথাযথ অনুসরণ করিলেই সমস্ত বিষয় হাতে-কলমে শিক্ষা করিতে পারিবেন এবং তজ্জন্ত আর আমার নিকট হইতে চিঠি-পত্রে কোন উপদেশ লইবার আবশ্যক হইবে না। দুঃখের বিষয় সময় সময় অনেকে পুস্তকখানা চতুর্থ বারের বিজ্ঞাপন ভালরূপে না পড়িয়াই, পুস্তকে যে সকল বিষয় পরিষ্কাররূপে লিপিবদ্ধ আছে, সেই সকল বিষয় সম্বন্ধেও নানারূপ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা পূৰ্ব্বক তিন-চার পৃষ্ঠা ব্যাপী পত্রাদি লিখিয়া থাকেন এবং এই সকল পত্রে অনেক অবান্তর কথাও থাকে। ঐ সকল অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘ পত্রাদির উত্তর দিতে আমার বড়ই সময় নষ্ট হয়। এই নিমিত্ত আমার বিশেষ অনুরোধ এই যে, কোন শিক্ষার্থী যেন এরূপ পত্রাদি আর না লেখেন।

কোন উপদেশ চাহিয়া পত্র লিখিলে যে উত্তরের জন্য অত্যাবশ্যকীয় রূপে ডাক টিকেট দিতে হয়, একথা “নিয়মাবলীতে অত্যন্ত স্পষ্ট থাকা সত্ত্বেও অনেকে তাহা পাঠান না। কোন কোন শিক্ষার্থী আবার পত্রে অতি সংক্ষিপ্ত নাম, অস্পষ্ট ঠিকানা ইত্যাদিও লিখেন, কেহ কেহ আবার ঠিকানাই দেন না। এ সকল পত্রের উত্তর দেওয়া যায় না। কারণ শত শত ব্যক্তির নাম ও ঠিকানা আমার স্মরণ থাকা সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে কেহ এরূপ পত্রাদি লিখিলে উহার উত্তর পাইতে বঞ্চিত হইবেন। ইতি সন ১৩৪২ সাল, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ।

গ্রন্থকার
সাধনা কুটির
পোঃ আলমনগর, রংপুর

ভূমিকা

বাল্যকাল হইতেই গুপ্ত বিদ্যাদি শিক্ষার জন্য আমার একটা প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল। এজন্য আমি কিছুদিন তান্ত্রিক যকৰ্ম্মাদি শিক্ষার প্রয়াস পাইয়াছিলাম, কিন্তু অভিজ্ঞ গুরুর অভাবে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হইয়াছিল। উহাতে বিফল মনোরথ হইয়া আমি ইং ১৯০২ সালে “পাশ্চাত্য বশীকরণ বিদ্যা” (হিপ্নোটিজ, মেসমেরিজম্ ইত্যাদি) শিক্ষায় প্রবৃত্ত হই এবং ভগবানের প্রসাদে অল্পকালের মধ্যেই ইহা শিক্ষা লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছিলাম।

সম্মোহন বিদ্যা ও শাখা বিজ্ঞানগুলি চৰ্চা করিবার সময় উহাদের কাৰ্যকারিতা দর্শন করিয়া,—উহাদের দ্বারা যে লোকের শরীরিক, মানসিক, নৈতিক, বৈষয়িক ও আধ্যাতিক বিষয়ের প্রভূত উন্নতি সাধিত হইতে পারে, বহুল পরিমাণে তাহার প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাইয়া উহাদের কাৰ্যকলাপ জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করিবার জন্য আমার অত্যন্ত আগ্রহ জন্মিয়াছিল এবং তন্নিমিত্ত ইং ১৯০৫ সালে আমি ক্রীড়া প্রদর্শকের ব্যবসায় অবলম্বন করিয়াছিলাম। তদানীন্তন মৎ প্রদর্শিত সম্মোহন ও চিন্তা-পঠন ক্রীড়া (Hypnotic and Thought-Reading Demonstrations) দর্শন করিয়া কয়েকটি সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি এই বিদ্যা শিক্ষা করিবার জন্য অত্যন্ত আগ্রহান্বিত হইয়াছিলেন এবং ইহা তাহাদিগকে শিক্ষা দিবার জন্য তাহারা আমাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করিয়াছিলেন। তাহাদের অনুরোধে প্রথম আমি এই বিদ্যা ও শাখা বিজ্ঞানগুলি শিক্ষার উপযোগী একখানা ভূমিকা পাণ্ডুলিপি রচনা করিয়াছিলাম। তাহারা তৎকালে ঐ পাণ্ডুলিপির নকল লইয়া এবং আবশ্যক মত আমার মৌখিক বা চিঠি-পত্রে উপদেশ পাইয়া এই বিষয় গুলি হাতে-কলমে শিক্ষা করিয়াছিলেন। কয়েক বৎসরের মধ্যে উক্তরূপে অনেক শিক্ষার্থী এই বিষয়গুলি শিক্ষা করিয়া কৃতকাৰ্য্য হইয়াছিলেন।

উক্ত সময় হইতে ইং ১৯১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চতুর্দশ বৎসর কাল সম্মোহন ও চিন্তা-পঠন ক্রীড়া প্রদর্শকরূপে ভারতবর্ষের বহু স্থান, ব্ৰহ্মদেশ, পারস্য, ইরাক প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করতঃ নানাদেশীয় ও নানাজাতীয় অন্যূন ১৬০০০ হাজার লোক সম্মোহিত করিয়া এবং ৪০০ শতের অধিক ব্যক্তিকে এই বিজ্ঞান গুলি হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়া যে অভিজ্ঞতা লাভ করিয়াছি, তাহার ফলে উক্ত পাণ্ডুলিপি সংশোধিত হইয়া “সম্মোহনবিদ্যা” নামে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হইল।

যাহারা এই গুপ্ত বিদ্যা ও শাখা বিজ্ঞানগুলি হাতে-কলমে শিক্ষা করিবার অভিলাষী অথচ আমার নিকট উপস্থিত থাকিয়া শিক্ষা করিতে অসমর্থ বিশেষভাবে তাহাদের জন্যই এই পুস্তক সরল ভাষায় লিখিত হইয়াছে এবং তজ্জন্য ইহাতে কেবল উৎকৃষ্ট নিয়ম-প্রণালীই প্রদত্ত হইয়াছে। এই নিয়ম-প্রণালী গুলি উৎকর্ষ সম্বন্ধে বোধ হয় ইহা বলিলেই যথেষ্ট হইবে যে, আমি স্বয়ং উহাদের সাহায্য সহস্র সহস্র লোক মোহিত করিয়াছি এবং আমার বহু সংখ্যক ছাত্র ও উহাদিগকে প্রয়োগ করিয়া কৃতকাৰ্য্যতা লাভ করিয়াছেন। অতএব আমার ভরসা আছে যে, বুদ্ধিমান ব্যক্তি মাত্রই এই পুস্তকের সাহায্যে এবং আবশ্যক মত আমার নিকট হইতে চিঠি-পত্রে উপদেশাদি লইয়া বিষয়গুলি শিক্ষা করিতে সমর্থ হইবেন। যাহাদের শিক্ষার আন্তরিক স্পৃহা আছে, তাহারা উপযুক্ত যত্ন, চেষ্টা ও পরিশ্রমের ত্রুটি না করিলে বাড়ী বসিয়া, যথা সম্ভব অল্প সময়ের মধ্যে, এই বিষয় গুলি হাতে-কলমে শিক্ষা করিতে পারিবেন, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। যে সকল শিক্ষার্থী এই পুস্তকোক্ত বিষয়গুলি উত্তমরূপে হৃদয়ঙ্গম করিয়া দৃঢ় বিশ্বাসের সহিত নিয়ম-প্রণালীগুলির অনুসরণ করিবেন, তাহারা আমার নিকট হইতে চিঠি-পত্রে স্বতন্ত্র উপদেশ না লইয়া, কেবল নিজের চেষ্টাতেই শিক্ষা করিতে পারিবেন। শিক্ষার্থীর জ্ঞাতব্য যাবতীয় বিষয়ই যথা সম্ভব সরল ভাষায় লিপিবদ্ধ হইয়াছে, সুতরাং চতুর শিক্ষার্থিগণ আমার নিকট উপদেশ প্রার্থী না হইয়াও শিক্ষায় সাফল্য লাভ করিতে পারিবেন। তথাপি যদি কেহ এই পুস্তকের কোন বিষয় পরিষ্কাররূপে বুঝিতে না। পারেন, তবে আমার নিকট পত্র লিখিলেই (উত্তরের জন্য পাঁচ পয়সা ডাক টিকিট সহ) আমি তাহা সরল ভাবে বুঝাইয়া দিব। এই বিষয়ে শিক্ষার্থিগণের নিকট আমার বিশেষ অনুরোধ এই যে, তাহারা যেন মনাযোগের সহিত পুস্তকখানা না পড়িয়া কোন উপদেশের জন্য পত্র না লেখেন। কারণ যে সকল বিষয় পুস্তকেই লিপিবদ্ধ রহিয়াছে সেগুলি পুনরায় হাতে লিখিয়া জানাইবার অবকাশ আমার নাই। আর যদি কেহ আমার নিকট উপস্থিত থাকিয়া শিক্ষা করিতে ইচ্ছুক হন, তবে আমি তাহাকে সমস্ত বিষয়গুলি সুন্দররূপে হাতে-কলমে শিখাইতে—অর্থাৎ যাহাকে Practical training বলে তাহা দিতেও প্রস্তুত আছি।

এই পুস্তক একবার মাত্র পাঠ করিয়াই সকল বিষয় শিক্ষা করা যাইবে, কোন শিক্ষার্থী এরূপ আশা করিবেন না। সে প্রত্যকটি পাঠ বিশেষ ভূমিকা মনোনিবেশ সহকারে পড়িয়া এবং উহার অর্থ উত্তমরূপে উপলদ্ধি করিয়া শিক্ষায় প্রবৃত্ত হইবে। কোন বিজ্ঞানের ব্যবহারিক অংশ শিক্ষা করিতে হইলে যে, যযোপযুক্ত যত্ন, চেষ্টা ও পরিশ্রম করিতে হয়, ইহা প্রত্যেক শিক্ষাথীকেই বিশেষরূপে স্মরণ রাখিতে হইবে। কেহ কেহ পুস্তক খান। দুই-একবার পাঠ করিয়া কৌতূহল নিবৃত্তি হইলেই ফেলিয়া রাখে, আবার কেহ কেহ বা কদাচিৎ দুই-একজন লোকের উপর চেষ্টা করিয়া অকৃতকার্য হইলেই নিরাশ হইয়া পড়ে। এরূপ প্রকৃতির লোকেরা কখনও এই সকল গুপ্ত বিদ্যা শিক্ষা করিতে সমর্থ হয় না। প্রকৃত শিক্ষালাভাকাঙ্ক্ষী উপদেশগুলিকে বিশ্বাস ও সততার সহিত অনুসরণ করিবে এবং প্রথম প্রথম দুই-একবার অকৃতকার্য হইলেও ধৈর্যের সহিত উপর্যুপরি কয়েকবার চেষ্টা করিবে। যদি তাহাতেও সে বিফলমনোর হয়, তবে সে উহা আমাকে লিখিয়া জানাইলে, আমি তৎসম্বন্ধে যযোপযুক্ত উপদেশ প্রদান করিব। শিক্ষার্থিদিগের কোন বিষয় জানিবার আবশ্যক না হইলেও, তাহারা শিক্ষায় কিরূপ অগ্রসর হইতেছেন, তাহা মাঝে মাঝে আমাকে সংবাদ দিবেন। কারণ তাহা প্রত্যেক ব্যক্তির নিকট পত্র লিখিয়া অবগত হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়; যেহেতু আমার সময় নিতান্ত অল্প। তবে কেহ কোন উপদেশ চাহিয়া পত্র লিখিলে সেই পত্রের উত্তর অবিলম্বেই দেওয়া হইয়া থাকে। উপদেশ প্রার্থী সৰ্ব্বদ। সংক্ষেপে তাহার জিজ্ঞাস্য বিষয় সকল ব্যক্ত করিবেন, অন্যথায় তাহার পত্রের উত্তর পাইতে বিলম্ব হইবে।

যে সকল শিক্ষার্থী বিশ্বাস ও সততার সহিত যথাযথরূপে এই পুস্তকের অনুসরণ করিবে, আমি তাহাদের প্রত্যেককে এই বিজ্ঞানগুলি হাতে কলমে শিখাইয়া দিব; কিন্তু যদি কেহ এই উপদেশগুলির যথার্থতা সম্বন্ধে সন্দিহান হইয়া অবহেলা পূর্বক বা আলস্য বশতঃ শিক্ষায় যত্নবান না হয়, তবে তাহার কৃতকাৰ্য্যতার জন্য আমি কিছুমাত্র দায়ী হইব না। শিক্ষার্থীদিগকে কৃতকাৰ্য্য করিয়া দিবার নিমিত্ত আমি সকল প্রকার সম্ভবনীয় উপায়ে সাহায্য করিতে প্রস্তুত আছি, তথাপি যদি কেহ উপযুক্ত পরিশ্রম স্বীকার পূর্বক শিক্ষার প্রয়াস না পায়, তবে তাহার অকৃতকাৰ্যতার জন্য ন্যায় সঙ্গত রূপে আমার কোন দায়িত্বই থাকিতে পারে না।

পরিশেষে ইহা অত্যন্ত দৃঢ়তার সহিত বলা যাইতে পারে যে, যে শিক্ষার্থী সদুদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত হইয়া এই বিদ্যা-চৰ্চ্চা রূপ সাধনায় প্রবৃত্ত হইবে, সে নিশ্চিতরূপে তাহার মনঃশক্তি বর্ধিত করিয়া নিজের শারীরিক, মানসিক, বৈষয়িক ও অধ্যাত্মিক উন্নতি লাভে সমর্থ হইবে এবং অপর লোকেরও বহু প্রকার উপকার করিতে পারিবে, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। বন্ধো, একবার সদুদ্দেশের সহিত শিক্ষায় প্রবৃত্ত হও, তোমার সাধন অবশ্য সিদ্ধ হইবে।

গ্রন্থকার
আলমনগর, রংপুর।
১৬ই বেশাখ, ১৩২৭ সন।

আগামী পর্বের জন্য অপেক্ষায় থাকুন

 

 

 

 

বাংলা লাইব্রেরি

জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print