দেওলি'র ব্যারাক, যেখানে চীনা বংশোদ্ভূত নাগরিকদের রাখা হয়েছিল

নভেম্বর মাসের ১২ তারিখ। ১৯৬২ সাল।

সেদিন দুপুরে শিলংয়ের ডন বস্কো স্কুলে হঠাৎই হাজির হয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি দল। স্কুলের সব চীনা বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা ফরম দেওয়া শুরু করেছিল তারা। ১৬-বছরের ইঙ শেং ওয়াঙ-ও ওই ছাত্রদের মধ্যে ছিল।

পরের দিন বিকেল সাড়ে ৪টা নাগাদ সেনাসদস্যদের একটা দল ইঙ শেং’য়ের বাড়ির দরজায় কড়া নেড়েছিল। বলেছিল গোটা পরিবারকেই তাদের সঙ্গে যেতে। তার বাবাকে তারা বলেছিল যে তিনি কিছু ব্যক্তিগত জিনিসপত্র আর কিছু টাকা সঙ্গে নিতে পারেন।

বাবা-মা, চার ভাই আর যমজ বোনকে সেদিনই হেফাজতে নিয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী, নিয়ে যাওয়া হয়েছিল শিলংয়ের জেলে।

ইতিহাসের ওই ঘটনার ওপরে ভিত্তি করেই দিলীপ ডি’সুজা একটি বই লিখেছেন, ‘দ্যা দেওলি ওয়ালাজ’ নামে।

মিস্টার ডি’সুজা জানাচ্ছেন যে ১৯৬২ সালের চীন আর ভারতের যুদ্ধের সময়ে ভারতে যত চীনা বংশোদ্ভূত মানুষ থাকতেন, তাদের সবাইকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছিল।

“যদিও এইসব মানুষেরা কয়েক পুরুষ ধরে কিন্তু ভারতেই বসবাস করতেন, ভারতীয় ভাষাতেই কথা বলতেন।”

“তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন ডিফেন্স অফ ইন্ডিয়া আইনে স্বাক্ষর করার পর থেকেই শত্রু দেশের মূল নিবাসী হওয়ার সন্দেহে কাউকে আটক করা যেতে পারত,” বলছিলেন মিস্টার ডি’সুজা।

এর আগে ১৯৪২ সালে যুক্তরাষ্ট্র পার্ল হারবারে হামলার পরে সেদেশে বসবাসকারী প্রায় এক লক্ষ জাপানি বংশোদ্ভূত মানুষকে গ্রেপ্তার করেছিল।

শিলং থেকে শুরু হল যাত্রা

ওয়াঙ পরিবারকে শিলং জেলে দিন চারেক রাখা হয়েছিল, তারপরে গুয়াহাটির জেলে আরও পাঁচ দিন। এরপর তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল রেলস্টেশনে।

মাকুম স্টেশন থেকে এসে গুয়াহাটিতে একটা ট্রেন তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। ওই ট্রেনে শত শত চীনা বংশোদ্ভূত মানুষকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যাদের মধ্যে ‘দ্যা দেওলি ওয়ালাজ’ বইটির সহ-লেখিকা জয় মা-এর মা এফা মা-ও ছিলেন।

এফা মা বলেন, “ওই রেল যাত্রার সময়ে প্রত্যেক যাত্রীকে দিন প্রতি আড়াই টাকা করে ভাতা দেওয়া হতো। বাচ্চারা সোয়া এক টাকা পেতো। গুয়াহাটি থেকে দুপুরের দিকে ট্রেন রওনা হয়েছিল, আর তিন দিন চলার পরে রাজস্থানের কোটা জেলায় দেওলি গ্রামে পৌঁছেছিল ট্রেনটি।”

“আমাদের সঙ্গে শিলিগুড়ি স্টেশন থেকে আট জন পুলিশ চেপেছিল ট্রেনে। তারা বলে দিয়েছিল কোনও স্টেশনে ট্রেন থামলে আমরা যেন প্ল্যাটফর্মে না নামি, এমনকি কামরার দরজার কাছেও যেন না যাই। কিছুক্ষণ পরেই আমরা এই সাবধানবাণীর কারণ বুঝতে পেরেছিলাম। স্টেশনে ট্রেন দাঁড়ালেই আমাদের ওপরে গোবর ছোঁড়া হত,” বলছিলেন এফা মা।

ট্রেনের গায়ে লেখা ছিল ‘শত্রু ট্রেন’

ইঙ শেং ওয়াঙ জানান, “একটা স্টেশনে একশো-দেড়শো লোক জড়ো হয়েছিল। তাদের হাতে চপ্পল ছিল, আর ‘চীনারা ফেরত যাও’ বলে স্লোগান দিচ্ছিল। চপ্পলের সঙ্গেই পাথরও ছুঁড়তে শুরু করেছিল ওরা।”

“আমরা দৌড়ে গিয়ে কামরার জানলাগুলো বন্ধ করে দিয়েছিলাম। গোড়ায় আমরা বুঝতেই পারছিলাম না যে স্থানীয় লোকজন কী করে জানতে পারছে ওই ট্রেনে আমরা চীনারা ছিলাম। তারপরে জানা গেল যে ট্রেনের বাইরে বড় বড় করে লেখা ছিল ‘এনিমি ট্রেন’ বা শত্রু ট্রেন,” জানাচ্ছিলেন মি. ওয়াঙ।

ওই ঘটনার পরে অবশ্য ট্রেনটা স্টেশনের একটু আগেই থামিয়ে দেওয়া হচ্ছিল যাতে সবার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা যায়।

চীনা বংশোদ্ভূতদের আটক করা নিয়ে আরেকটি বই ‘ডুইং টাইম উইথ নেহেরু’র লেখিকা ইন মার্শ তার বইতে লিখেছেন, “আমার বাবার মতে, প্রতিটা স্টেশনে ট্রেনটাকে থামানোর কারণটা ছিল ভারত সরকার নিজের নাগরিকদের দেখাতে চাইছিল যে কীভাবে ভারতের ওপরে চীনের হামলার জন্য চীনাদের সাজা দিয়ে জেলে পাঠানো হচ্ছে।”

তিনি আরও লিখেছেন, “প্রথম সন্ধ্যায় বাবা ট্রেনের অ্যাটেনডেন্টের কাছ থেকে কয়েকটা পরোটা নিয়ে এলো। আমি আরও কয়েকটা পরোটা খেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রত্যেকের জন্য একটা করেই পরোটা বরাদ্দ ছিল। তারপর চা দেওয়া হয়েছিল। তার স্বাদ এত জঘন্য ছিল যে ফেলে দিতে হয়েছিল।”

তিন দিন চলার পরে ট্রেন পৌঁছেছিল দেওলি

সরকার থেকে একটা শিবিরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেটার বাইরে একটা চেয়ার টেবিল পেতে কর্মকর্তারা প্রত্যেকের বিবরণ লিখে রাখছিলেন। প্রত্যেকের কাছে কত সোনা বা নগদ অর্থ আছে, সেটাও লেখা হচ্ছিল।

প্রত্যেক কয়েদীকে একেকটা নম্বর আর পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছিল।

প্রথমে চা আর পাউরুটি দেওয়া হলো। কিন্তু পাউরুটি এতটাই শক্ত ছিল যে চায়ে ডুবিয়ে ছাড়া খাওয়া সম্ভব ছিল না।

দিলীপ ডি’সুজা কথায়, “ওখানে সেনাবাহিনী তাঁবু খাটিয়ে দিয়েছিল। নভেম্বর মাস ছিল সেটা। কয়েদীরা ঠাণ্ডায় থরথর করে কাঁপছিলেন। তাদের কাছে কোনও গরম পোশাক ছিল না।”

“বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে আসার সময়ে বলা হয়েছিল যে একজোড়া পোশাক নিয়ে চলুন। একদিকে পথশ্রমের ক্লান্তি, অন্যদিকে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। তা সত্ত্বেও ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছিল সবার। হঠাৎই মাঝরাত নাগাদ ‘সাপ সাপ’ করে চিৎকার করে উঠেছিল কেউ। সবাই জেগে উঠেছিল,” পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাচ্ছিলেন মিস্টার ডি’সুজা।

আধাসিদ্ধ ভাত আর পুড়ে যাওয়া তরকারি দেওয়া হত

রান্নার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বাইরের এক ঠিকাদারকে, যার এত মানুষের খাবার তৈরি করার কোনও অভিজ্ঞতাই ছিল না।

গোড়ার দিকে আধাসেদ্ধ ভাত আর পুড়ে যাওয়া তরকারি খেতে দেওয়া হত। কিন্তু কয়েদীরা নিয়মিত অসন্তোষ জানানোয় মাস দু’য়েক পর থেকে শিবিরের কমান্ডেন্ট প্রতিটা পরিবারের জন্য রেশন দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। রান্না নিজেদেরই করে নিতে হবে।

সাপ্তাহিক রেশন বরাদ্দে কখনও ডিম, মাছ বা মাংস দেওয়া হত।

‘দ্যা দেওলি ওয়ালাজ’ বইয়ের সহ লেখিকা জয় মা বলছেন, “প্রত্যেককে মাসে পাঁচ টাকা করে দেওয়া হত সাবান, টুথপেস্ট বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কিছু কেনার জন্য। বেশিরভাগ পরিবারই ওই টাকা থেকে কিছুটা বাঁচিয়ে রাখত, কারণ কেউই জানত না কতদিন বন্দী থাকতে হবে ওখানে বা তাদের ভবিষ্যৎ কী হবে।”

ইঙ শেং ওয়াঙ বলছেন, “দিনের বেলাটা কোনমতে কেটে যেত, কিন্তু রাত যেন আর কাটতেই চাইত না। আমি অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখতাম, কিন্তু ঘুম আসার নাম নেই। শুধু ভাবতাম যে কবে এখান থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরব।”

রাজস্থানের মরু অঞ্চলে যেমন শীত, তেমনই গরম

গরমের হাত থেকে বাঁচতে ইঙ শিং আর তার বন্ধুরা চটের বস্তা ভিজিয়ে জানালা-দরজায় টাঙ্গিয়ে দিতেন। কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যেত।

মরুভূমি এলাকা হলেও একটা জিনিসের অভাব ছিল না – সেটা হল পানি।

শৌচালয়গুলোতে কোনও ছাদ ছিল না। তাই বৃষ্টি হলে ভিজে ভিজেই শৌচালয় ব্যবহার করতে হত বন্দীদের।

শিবিরের বন্দীদের মনোরঞ্জনের জন্য একটাই ব্যবস্থা ছিল – হিন্দি সিনেমা দেখানো হত। খোলা জায়গায় পর্দা টাঙ্গিয়ে সিনেমা দেখানো হত, আর বন্দীরা ঘর থেকে চৌকি-বিছানা টেনে এনে তাতে বসেই সিনেমা দেখতেন।

জয় মা বলছেন, “রিক্রিয়েশন রুমে খবরের কাগজ আসতো, কিন্তু তার নানা জায়গায় কাটা থাকত। চীনের সম্বন্ধে বা কোনও রাজনৈতিক খবর থাকলেই তা কাঁচি দিয়ে কেটে দেওয়া হতো। আমরা পোস্টকার্ডে ইংরেজিতে চিঠি লিখতাম। খামে চিঠি লিখলে সেগুলো পৌঁছতে অনেক দেরী হত – কারণ সেগুলো সেন্সর করার জন্য দিল্লিতে পাঠানো হত প্রথমে।”

মনোরঞ্জনের জন্য আরও একটা ব্যবস্থা ছিল – ফুটবল। সকালের জলখাবারের পরে সকলেই ফুটবল খেলতে চাইতেন, কিন্তু গোটা ক্যাম্পে একটা মাত্রই বল ছিল।

বুড়ো উটের মাংস

দেওলি শিবিরের আরেক কয়েদী স্টিভেন বেন জানান, কর্মকর্তারা বন্দীদের জন্য কোনও থালা-বাসন-চামচ কিছুই দেয়নি। বিস্কুটের টিন অথবা গাছের পাতায় খাবার খেতে হত।

“রান্নাঘরে দেখতাম চাল না ধুয়েই বস্তা থেকে সরাসরি পাতিলে ঢালা হচ্ছে ভাত রান্নার জন্য। একসঙ্গে অনেকের জন্য রান্না হতো বলে প্রায় সবসময়েই আধা সেদ্ধ হত, বা পুড়ে যেত ভাত।”

ইন মার্শের অভিজ্ঞতাটাও অনেকটা একই রকম। “একসঙ্গে সবাই লাইনে দাঁড়াত খাবার নেওয়ার জন্য। তাই তাড়াতাড়ি করে ভাত সেদ্ধ হওয়ার আগেই চুলা থেকে নামিয়ে দিত ওরা। অনেকবার হয়েছে ওই আধা সেদ্ধ ভাত নিয়ে আমরা তারপরে আবারও সেদ্ধ করে খেয়েছি।”

“একবার রেশনে আমাদের মাংস দিল। কিন্তু ওই মাংস এতই শক্ত ছিল, মনে হচ্ছিল যেন পুরনো চামড়া খাচ্ছি। পরে জানা গেল যে ওটা বুড়ো উটের মাংস ছিল। খুব খারাপ লেগেছিল সেটা জেনে। আমরা সবাই প্রতিবাদ করায় তারপর থেকে অবশ্য আর উটের মাংস দেওয়া হয়নি,” লিখেছেন মিজ মার্শ।

দেওলি ক্যাম্পের আরেক বন্দী মাইকেল চ্যাং বলেন, “শিবিরের খাবারের স্বাদ আমি সারা জীবনেও ভুলব না। রান্নায় সর্ষের তেল ব্যবহার করা হত। এতবছর পরেও যদি কারও বাড়িতে নিমন্ত্রণে যাই আর তারা সর্ষের তেল দিয়ে রান্না করে, আমার দেওলি ক্যাম্পের কথা মনে পড়ে যায়।”

“যখন থেকে আমাদের নিজেদের রান্না করার ব্যবস্থা করা হলো, তখন আমরা দূরে দূরে গিয়ে কাঠ নিয়ে আসতাম। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই কাঠ আর পাওয়া যেত না। ঝোপঝাড় যা পেতাম তাই নিয়ে আসতাম জ্বালানীর জন্য। গুলতি দিয়ে পাখিও মারতাম খাওয়ার জন্য,” বলছেন মিস্টার চ্যাং।

বাসন মাজতে গিয়ে হাতের চামড়া খসে যাচ্ছিল

ইন মার্শ লিখেছেন, “আমার পরিবারের খাবার বাসনগুলো মাজার দায়িত্ব আমার ওপরে পড়েছে। বাসন মাজার সাবান ছিল না।”

“হিন্দি সিনেমায় দেখেছিলাম যে ছাই দিয়ে বাসন মাজা হচ্ছে, সেটাই নকল করে চকচকে করে তুলতাম বাসন মেজে। কিন্তু ক্যাম্প থেকে যখন আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল শেষমেশ, আমার হাতের চামড়া এমনভাবে খুলে আসত, যেন পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানো হচ্ছে। কয়েক বছর চিকিৎসা করার পর ঠিক হয় হাতের অবস্থা।”

বন্দীদের বেশিরভাগই প্রায় চার বছর দেওলি শিবিরে ছিলেন। সেখানে যেমন বেশ কয়েকজন বন্দীর মৃত্যু হয়েছিল, তেমনই জয় মায়ের মতো বেশ কিছু শিশু জন্মও নিয়েছিল ওই শিবিরেই।

জয় মা জানান, তার মা এফা মা তাকে বলেছিলেন যে ১৯৬৩ সালে একবার ভারতের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী গিয়েছিলেন দেওলি ক্যাম্পে।

যখন বন্দীদের সঙ্গে তার সাক্ষাত করানো হল, তিনি বলেছিলেন কারা ভারতে থাকতে চান আর কারা চীনে চলে যেতে চান। দুই দলকে আলাদা লাইনে দাঁড়াতে বলেছিলেন তিনি।

“আমার বাবা-মা ভারতে যারা থাকতে চায়, তাদের দিকে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরে আর কিছুই হল না। কয়েক মাস পরে আমার মা কমান্ডেন্ট আরএইচ রাওকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে বলেছিলেন ভারতে যারা থাকতে চায় তাদের বাড়ি ফিরে যেতে দেওয়া হবে!

জবাবে মিস্টার রাও বলেছিলেন, আপনি তো চেয়েছেন ভারতে থাকতে। তো ভারতেই তো আছেন আপনি,” বলছেন জয় মা।

যুদ্ধবন্দীদেরও আনা হয়েছিল ওই শিবিরে

চীন সরকার যেমন এদের জন্য কিছু করেনি, তেমনই ভারত সরকারও যেন এই বন্দীদের কথা একসময় ভুলেই গেল।

রফিক ইলিয়াস এই নিয়ে একটা তথ্যচিত্র বানিয়েছেন, যার নাম ‘বিয়ন্ড বার্বড ওয়ায়ার্স: আ ডিস্ট্যান্ট ডন’।

ব্রিটিশ সরকার ১৯৩১ সালে এই দেওলি শিবির ব্যবহার করত রাজনৈতিক বন্দীদের রাখার জন্য।

চল্লিশের দশকে জয়প্রকাশ নারায়ণ, জওহরলাল নেহেরু, কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা শ্রীপদ অমৃত ডাঙ্গে এবং বিটি রণদিভের মতো মানুষকে এই শিবিরে বন্দী রাখা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানি, জাপান আর ইতালির যুদ্ধবন্দীদেরও রাখা হত এখানেই।

ভারত ভাগের পর পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা প্রায় দশ হাজার সিন্ধি সম্প্রদায়ের মানুষকেও কিছুদিনের জন্য এই শিবিরে রাখা হয়েছিল।

১৯৫৭ সালে দেওলি ক্যাম্পটি রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স বা আরপিএফ’কে দেওয়া হয়। সেখানে তাদের একটা ব্যাটালিয়ন থাকত। ১৯৮০ সাল থেকে এটা সিআইএসএফ বা কেন্দ্রীয় শিল্পোদ্যোগ সুরক্ষা বাহিনীর অধীনে। তারা সেখানে বাহিনীতে ভর্তি এবং প্রশিক্ষণ ক্যাম্প চালায়।

কিছু বন্দী বাধ্য হয়ে চীনে চলে যান

চীন যখন জানতে পারল যে দেওলিতে চীনা বংশোদ্ভূতদের বন্দী করে রাখা হয়েছে, তখন তারা প্রস্তাব দিল যে এদেরকে তারা চীনে নিয়ে যেতে চায়।

অনেক বন্দী এই প্রস্তাব মেনে নিয়ে চীনে চলে গেলেন।

আরও অনেক মানুষ চীনে যেতে চাননি, কারণ একটা গুজব ছড়িয়েছিল যে চীনে খরা চলছে – খাদ্যের অভাব।

আবার অনেকে চীনে যেতে চাননি এই কারণে যে তারা আগে চীনের কমিউনিস্ট সরকারের বিরোধিতা করে তাইওয়ানকে সমর্থন করেছিলেন।

কিন্তু ভারতে যে তাদের কোনও ভবিষ্যৎ নেই, সেটা মেনে নিয়ে তাদের অনেকেই ভারাক্রান্ত মনে চীনে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

এদের অনেকেই কয়েক প্রজন্ম ধরে ভারতের বাসিন্দা এবং তারা হিন্দি, বাংলা কিংবা নেপালি ভাষাতেই কথা বলেন। তাদের কাছে চীন বিদেশ।

ঘর বেহাত হয়ে গেছে

জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে তারা যখন নিজের নিজের বাড়ি ফিরলেন, দেখলেন অন্য লোকে বাড়ি দখল করে নিয়েছে।

তাই অনেকে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনও দেশে চলে গেলেন।

দেওলি ক্যাম্প থেকে ছাড়া পাওয়া অনেকে এখন কানাডার টরোন্টো শহরে থাকেন। তারা ‘অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া দেওলি ক্যাম্প ইন্টার্নিজ ১৯৬২’ নামে একটি সংগঠন বানিয়েছেন।

২০১৭ সালের গোড়ার দিকে তারা কানাডায় ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে একটা বিক্ষোভ দেখিয়ে দাবি করেছিলেন যে তাদের সঙ্গে যে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে, তার জন্য ভারত সরকার ক্ষমা চাক।

‘দ্যা দেওলি ওয়ালাজ’ বইয়ের লেখক দিলীপ ডি’সুজা বলছেন, “তারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশ্যে একটা চিঠি হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কেউ সেই চিঠি গ্রহণ করেনি।”

“তারা ওই চিঠিটা হাইকমিশনের দরজায় লাগিয়ে চলে যান। তারা সবাই একই রকম টি-শার্ট পড়েছিলেন, যার ভেতরে দেওলি ক্যাম্পের একটা ছবির আদল ছিল।”

মেঘালয়ের শিলং থেকে কানাডা

বাসে চেপে ওই সমাবেশ থেকে যখন সবাই ফিরছিলেন, তখন ইঙ শেং ওয়াঙ-কে সবাই চেপে ধরেন একটা গান শোনানোর জন্য।

সবাই হয়তো ভেবেছিলেন যে সেদিনের সেই ১৬ বছরের যুবক, আজকের ৭০ পেরোনো ইঙ শেং ওয়াঙ হয়তো কোনও চীনা গান শোনাবেন।

কিন্তু তিনি সেদিন গেয়েছিলেন একসময়ের হিট হিন্দি ছবি ‘দিল আপনা অউর প্রীত পরাই’য়ের গান … ‘আজীব দাস্তাঁ হ্যায় ইয়ে, কহাঁ শুরু কহাঁ খতম …” যার মানে হলো, অদ্ভুত জীবন — কোথায় শুরু, কোথায় তার শেষ!

গানটা শুনে বাসে সবার চোখেই জল এসে গিয়েছিল।

যে শিবিরে ইঙ শেং ওয়াঙ ১৬ বছর বয়সে পরিবারের সবার সঙ্গে বন্দী হয়েছিলেন, সেই বন্দীশিবিরেই তার বাবার মৃত্যু হয়। দাফন করা হয়েছিল সেখানেই, কিন্তু ছাড়া পাওয়ার পরে মিস্টার ওয়াঙ তার বাবার অস্থি নিয়ে ফিরে গিয়েছিলে শিলংয়ে।

তার নিজের শহর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে কানাডা। কিন্তু মন খারাপের সময়ে, বন্দিজীবনের কথা মনে পড়লে, তার মনে পড়ে হিন্দি সিনেমার গানই।

দিলীপ ডি’সুজা বলছেন, এর দুটো কারণ থাকতে পারে বলে তার মনে হয়েছে।

“এরা তো ভারতীয় চীনা। কয়েক দশক ধরে তারা ভারতেই থাকতেন। একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে পড়ে মনের দুঃখে তাদেরকে ভারত ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। তাই অটোয়া থেকে টরোন্টোর চলতি বাসে তাদের তো স্বাভাবিকভাবেই হিন্দি গানের কথাই মনে পড়বে!”

তার মন্তব্য, “ওই গানটা সেদিন উনি কেন গেয়েছিলেন, সেটা ভাবতে গিয়ে আমি একটা ব্যাপার অনুভব করি, চীনাদের মতো চেহারা আর গায়ের রঙয়ের ব্যাপারে আমার নিজের যা ধারণা ছিল, সেটা কমবেশি ওই ধারণাটাই – যার বশবর্তী হয়ে ওয়াঙয়ের মতো আরও কয়েক হাজার মানুষকে দেওলি ক্যাম্পে বন্দী করা হয়েছিল।”

“তাদের একটাই দোষ ছিল, তারা চীনাদের মতো দেখতে ছিলেন।”

রেহান ফজল

বিবিসি হিন্দি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

 

 

 

image_pdfimage_print