আমরা ক্রুসেডের যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘটনার নেপথ্য কারণ, সেগুলোর প্রভাব বিশেষ করে ইউরোপে ইসলামী সংস্কৃতি প্রচারে এসব ঘটনার প্রভাব নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। ইতিহাসের এইসব ঘটনার কারণে ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশ খনিকটা রুদ্ধ হলেও তা ছিল সাময়িক। পরবর্তীকালে দেখা গেছে সেই পশ্চিমা ভূখণ্ডেই ইসলামী সভ্যতার বিকাশ ব্যাপকভাবে গতি পেয়েছে। তবে মোঙ্গলদের হামলা সেই গতি থামিয়ে দিয়েছিল খানিকটা।

মোঙ্গলদের আক্রমণ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্টতম ঘটনা, কিংবা বলা যায় ঐতিহাসিক বিপর্যয়। কেননা মোঙ্গলদের পাশবিক হামলায় লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। সেইসাথে ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশও বছরের পর বছরের জন্যে রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। হিজরি ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ এবং সপ্তম শতাব্দির শুরুর দিকে অর্থাৎ খ্রিষ্টিয় বারো শতাব্দীর শেষ এবং তেরো শতাব্দির শুরুর দিকে চেঙ্গিস খান মোঙ্গলদের সকল দল বা গোত্রকে এক পতাকার নীচে জড়ো করলেন। তুরস্কের কিছু কিছু গোত্রের সহযোগিতায় তিনি যুদ্ধ করার শক্তি অর্জন করেন এবং সেই শক্তি ও অস্ত্রের সামর্থবলে এশিয়ার বিভিন্ন ভূখণ্ড দখল করেন। মোঙ্গলদের দখলদারিত্ব মানেই হলো সেই ভূখণ্ড বিরান প্রান্তরে পরিণত হওয়া। ঘরবাড়ি সব ভেঙ্গেচুরে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া। বেপরোয়া হামলা চালিয়ে ভূখণ্ডের পর ভূখণ্ড দখল করে মোঙ্গলরা শেষ পর্যন্ত বিরাট এক সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। সমগ্র এশিয়া এবং ইউরোপের জার্মানী সীমান্ত পর্যন্ত আর অ্যাড্রিয়টিক সমুদ্রের উপকূলসমূহ পর্যন্ত মোঙ্গল সাম্রাজ্য বিস্তৃতি লাভ করে।

মোঙ্গলদের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি গোত্র হলোঃ উইগোর, অগাজারি, কারায়েত, নাইমান, বেকরিন এবং কাযকিয। তবে তাতার এবং কিয়াতরাই রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে বেশিরভাগ খ্যাতিমান এবং গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। মোঙ্গলদের সেনানায়ক চেঙ্গিস খান ছিল কিয়াত গোত্রের। ক্ষমতা নিজের হাতে আনা এবং মরুবাসীদের বিচ্ছিন্ন গোত্রগুলোকে একত্রিত করার জন্যে ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু খুব বেশিদিন না যেতেই শক্তিশালী মোঙ্গলরা তাদের সীমান্তের বাইরে পা রাখতে উদ্যত হলো এবং তাদের দেশের পূর্ব ও পশ্চিম দিকের ভূমিগুলো দখল করে নিলো। চেঙ্গিস খান মনে করতো মোঙ্গলদের অনাবাদী সাম্রাজ্য এবং তাদের স্বার্থ সুরক্ষা করা প্রতিবেশী ইরান ও চীনের মতো ঐতিহ্য-সমৃদ্ধ ও ধনী দেশগুলোর সাথে রণবাদ্যের ঝংকার শোনা ছাড়া কিংবা তাদের সম্পদ লুট করে নেওয়া ছাড়া কিছুতেই সম্ভব নয়।

সেজন্যে মোঙ্গলরা হামলা করার জন্যে অগ্রাধিকার দেয় চীনকে। কেননা এ সময় তারা চীনের অভ্যন্তরে বিচ্ছিন্নতার একটা আভাস পেয়েছিল। তাছাড়া ইরানের তুলনায় চীনে হামলা করাটা তাদের জন্যে সহজতরো ছিল। এজন্যে যে ইরানে ব্যাপক পাহাড়-পর্বত ছিল। মোঙ্গলরা চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে বিখ্যাত চীনের প্রাচীরের কাছে গিয়ে পৌঁছলো। সেখানে গিয়ে তারা সীমান্তের গোত্রগুলোকে প্রতারিত করেছিল যার ফলে খুব সহজেই তারা ঐ প্রাচীর পেরিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। চীনের ওপর মোঙ্গলদের হামলা দুই বছর ধরে চলেছিল। এ দুই বছরে মোঙ্গলরা সম্পদশালী চীনকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল।

সবাই বলে ফর্সা আকাশ / আমি বলি মেঘলা, একটু পরেই বৃষ্টি এলো / তবু আমি একলা।

চীনের পরে মোঙ্গলরা ইরানকে টার্গেট করলো আক্রমণ করার জন্যে। সংস্কৃতি ও সভ্যতায় সমৃদ্ধ এই বিশাল দেশটিতে সে অনুযায়ী তারা সেনা সমাবেশও ঘটালো। সেই সময়কার বোখারা ও সমরকন্দের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে পাশবিক হামলাও চালালো তারা। বোখারা প্রাচীনকাল থেকেই রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকে ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বাগদাদের মতো শহর ছিল জ্ঞানী-গুণী মনীষী আর ওলামায়ে দ্বীনের পদচারণায় মুখরিত। জ্ঞানীদের মিলনকেন্দ্র হিসেবেও খ্যাত ছিল বাগদাদ। সুন্দর এবং সমৃদ্ধ এই শহরটিও মোঙ্গলরা দখল করেছিল। মোঙ্গলদের দুর্ধর্ষ আক্রমণে জনতার রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল বাগদাদের মাটি, তলোয়ারের আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়েছিল পবিত্র গ্রন্থ আল-কুরআনও। কেবল জামে মসজিদটি ছাড়া পুরো শহর, লাইব্রেরিগুলো পর্যন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। শিশু আর নারীদেরকে তারা বন্দী করে রেখেছিল।

সমরকন্দ শহর এক সময় পৃথিবীব্যাপী পরিচিত ও খ্যাতিময় ছিল। এর কারণ ছিল এখানকার ঘরগুলোতে পানির ধারা বহমান ছিল। সমরকন্দের অলিগলি, বাজারঘাটের রাস্তাঘাটগুলো পাথর দিয়ে এতো সুন্দর করে বাঁধানো ছিল যে যে-কোনো পর্যটকই এগুলো দেখে ভীষণ আকৃষ্ট হতেন এবং হওয়াটাই স্বাভাবিক। মেসোপোটেমিয়ার সবচেয়ে বড়ো বাণিজ্যিক বন্দর হিসেবে পরিচিত এখানকার বন্দরটি। সুন্দরের এই সকল আয়োজন মোঙ্গলদের আক্রমণে বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। বারো শ’ একুশ খ্রিষ্টাব্দের ঘটনা এটি। তারপর মোঙ্গলদের হামলার শিকারে পরিণত হয়েছিল খাওয়ারেযম। এই খাওয়ারেযম ছিল সে সময়কার বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ স্থান এবং সংস্কৃতি ও সভ্যতার প্রধান লালনকেন্দ্র। এই শহরের লোকজন সাত মাস প্রতিরোধ করেছিল। কিন্তু চেঙ্গিস তার ছেলের সহযোগিতায় এই শহরকেও চূড়ান্তভাবে দখল করেছিল।

পরবর্তী পর্বে মোঙ্গলরা বাগদাদকে টার্গেট করে। এই শহরে ঢুকেই তারা গ্রন্থাগারগুলো ধ্বংসে হাত দেয় এবং কয়েক লাখ বইতে আগুন ধরিয়ে দেয়। বাগদাদের পতনের মধ্য দিয়ে অন্যান্য শহর দখল করাটা মোঙ্গলদের জন্যে সহজ হয়ে যায়। বাগদাদ বিজয়ের পর চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরি হালাকু খান ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আজারবাইজানের দিকে যাত্রা করে এবং মারা’গেহ’তে এসে আবাস গড়ে তোলে। পরবর্তীকালে তাব্রিযে তাদের রাজধানী স্থানান্তর করে। এরপর তারা হামলার পরিকল্পনা নেয় সিরিয়া এবং তার বিভিন্ন উপকণ্ঠে। কিন্তু মিশরের দিকে যখন মোঙ্গলরা যাত্রা করেছিল, তখন তাদের সেনারা ফিলিস্তিনে এসে ভীষণভাবে প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল। সেই প্রতিরোধ মোকাবেলা করতে গিয়ে মোঙ্গলরা মারাত্মকভাবে পরাস্ত হয়েছিল। এভাবেই অবিশ্বাস্যরকমভাবে মোঙ্গলরা পরাজিত হবার মধ্য দিয়ে বিশ্বজয়ের যে বাসনা মনে লালন করে চেঙ্গিস খান যাত্রা করেছিলো,তা বাধার সম্মখিন হয়ে পড়ে।

ইসলামী ভূখণ্ডে মোঙ্গলদের শাসনের ইতিহাস ছিল সবচেয়ে অপ্রিয় এবং দুঃখজনক একটি অধ্যায়। তাদের শাসনের মধ্য দিয়ে বিচিত্র অবক্ষয়েরও জন্ম হয়। তাদের হামলায় ইসলামী জ্ঞান ও সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। বড়ো বড়ো নেক আলেম ওলামা আধ্যাত্মিক মনীষী মারা যায় কিংবা কারাবন্দী হয়। মসজিদ মাদ্রাসাসহ প্রাচীন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যায়। ইসলামের শেকড় যদি আধ্যাত্মিকতার গভীরমূলে প্রোথিত না থাকত তাহলে হয়তো ইসলাম নামের কোনো দ্বীন অথবা মুসলমান নামের কোনো উম্মাতের অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যেত না। ইসলামের পুনর্জাগরণে জ্ঞানী গুণী মনীষীদের মধ্য থেকে যারা ব্যাপক চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন, তাদের ক’জন হলেন মাওলানা জালালুদ্দিন বালখি, সাদি শিরাযি, হাফেজ, আতা মুলকে জুভেইনি, খাজা নাসিরুদ্দিন তূসিসহ আরো অনেকেই। মজার ব্যাপার হলো তলোয়ারের বিরুদ্ধে মনীষীদের কলমযুদ্ধই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়েছিল।

 

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবু সাঈদ

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print