তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, ২১ ফেব্রুয়ারি একটি ঐতিহাসিক দিন। ১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করতে গিয়ে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকেই জীবন দিয়েছিলেন। সে হিসেবে এই দিনটি একটি শোকের দিন। আবার ২০০০ সালে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেস্কো একে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করায় এটি একটি আনন্দের দিন।

তবে একটি কেবল শোক কিংবা আনন্দের দিনই নয়, এটি একটি শিক্ষা গ্রহণের দিন। ভাষা শহীদরা তাদের জীবন দিয়ে আমাদের শিখিয়েছেন, একুশ মানে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা। সে অন্যায় কেবল ভাষার ক্ষেত্রেই নয়, যে কোনো বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছেন ভাষা শহীদেরা।

তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, বর্তমান বিশ্বের সাড়ে ৭০০ কোটি মানুষ ছোট-বড় মিলিয়ে সাত হাজারেরও বেশি ভাষায় কথা বলে। তবে ভাষাতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, আগামী একশ বছরের মধ্যে প্রায় তিন হাজার ভাষা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কারণ অতীতেও অনেক ভাষা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। একসময় পাশ্চাত্যের একটি বিখ্যাত ভাষা ছিল ‘ল্যাটিন’। কিন্তু এ ভাষায় এখন আর কেউ কথা বলে না। ভারতীয় উপমহাদেশের এমন একটি ভাষার নাম ‘সংস্কৃত’। ধর্মীয় কাজের বাইরে এর কোনো ব্যবহার নেই।

এক হিসাবে দেখা গেছে, আজকের পৃথিবীতে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে এমন ৫১টি ভাষা আছে যেগুলোর প্রতিটিতে মাত্র একজন করে ব্যবহারকারী রয়েছে! এ চিত্র থেকে একটা বিষয় পরিস্কার যে, বিশ্বের জীবন্ত ভাষাগুলো দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। এই বিলুপ্তির হার বন্যপ্রাণী কিংবা গাছপালা বিলুপ্তির হারের চেয়েও বেশী। কিন্তু বাংলাভাষার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত দেখা যায়।

শহীদ মিনারে দুই শিশু


সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটি মানুষ বাংলাভাষায় কথা বলে। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা বিশ্বে বর্তমানে ৬ষ্ঠ। শুধু বাংলাদেশের মানুষই যে এ ভাষায় কথা বলে তা নয় বরং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, অসম, মণিপুর, বিহার ও উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের রোহিঙ্গারাও বাংলাভাষায় কথা বলে। এছাড়া, ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অন্যতম প্রধান ভাষা বাংলা। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে বাংলা ভাষা ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যের দ্বিতীয় সরকারি ভাষারূপে স্বীকৃত। পাকিস্তানের করাচি শহরে দ্বিতীয় সরকারি ভাষারূপে বাংলাকে গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাই বিশ্বের একমাত্র ভাষা যা ভাষাভিত্তিক একটি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে।

বন্ধুরা, বিশ্বে বাংলাই একমাত্র ভাষা-যার মর্যাদা রক্ষার জন্য ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ঢাকায় পুলিশের গুলিতে আব্দুস, সালাম, রফিক,বরকত,জব্বার সহ আরো অনেকে প্রাণ দিয়েছেন। এই ঘটনার প্রতিবাদে সারা পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ও তীব্র আকার ধারণ করে। অবশেষে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে উর্দুর সম-মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়।

তবে বাংলা ভাষার জন্য কেবল বাংলাদেশের মানুষ জীবন দেয়নি; ভারতের আসামের কয়েকজন মানুষও এ ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন। ১৯৬১ সালের মে মাসে বাংলা ভাষার ব্যবহার বন্ধ করার প্রতিবাদে ভারতের আসামের শিলচর শহরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছেন ১১ জন। ১৯৬১ সালে অসম প্রাদেশিক সরকার শুধু অসমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা ঘোষণা দিলে বাঙালীদের ভেতর ক্ষোভ দানা বাঁধে। ১৯ মে শিলচরে সকাল ৬টা-সন্ধ্যা ৬টা ধর্মঘট পালন করা হয়। ধর্মঘট চলাকালে আসাম রাইফেলসের গুলিতে ঘটনাস্থনে প্রাণ হারান ১১ জন ভাষাবিপ্লবী। রাজ্য সরকার শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়। এরপর অসমে বাংলাকে দ্বিতীয় রাজ্যভাষা হিসাবে ঘোষণা করা হয়।

বন্ধুরা, যে ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করতে গিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষ জীবন দিয়েছে আসরের এবারে রয়েছে সেই বাংলা ভাষার বর্ণমালা নিয়ে একটি গান। গানের কথা, সুর ও কণ্ঠ রুহুল আমিন সরকার এবং কয়েকজন শিশুশিল্পী।

তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করতে গিয়ে বাঙালীরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন ইউনেস্কো ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর তাতে স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকে সারা বিশ্বে প্রতি বছর পালিত হয়ে আসছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।’ ইউনেস্কোর পর জাতিসংঘও একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০৮ সালের ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ স্বীকৃতির ফলে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে যারা জীবন দিয়েছিলেন তাদের আত্মত্যাগ স্বার্থক হয়।

বন্ধুরা, তোমাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে- ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি আসলে কী হয়েছিল? তোমাদের কৌতুহল মেটাতে বাংলাদেশে প্রধান কবি আল মাহমুদ একটি চমৎকার কবিতা লিখেছেন। একুশের কবিতা শিরোনামের বিখ্যাত ওই কবিতাটি আবৃত্তি করেছে খুলনার বন্ধু ফারজানা রেজা স্নিগ্ধা।

ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ
দুপুর বেলার অক্ত
বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায় ?
বরকতের রক্ত।

হাজার যুগের সূর্যতাপে
জ্বলবে এমন লাল যে,
সেই লোহিতেই লাল হয়েছে
কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে !

প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে
ছড়াও ফুলের বন্যা
বিষাদগীতি গাইছে পথে
তিতুমীরের কন্যা।

চিনতে না কি সোনার ছেলে
ক্ষুদিরামকে চিনতে ?
রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে
মুক্ত বাতাস কিনতে ?

পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায়
ঝাঁপ দিল যে অগ্নি,
ফেব্রুয়ারির শোকের বসন
পরলো তারই ভগ্নী।

প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী
আমায় নেবে সঙ্গে,
বাংলা আমার বচন, আমি
জন্মেছি এই বঙ্গে।

বন্ধুরা, জাতিসংঘের স্বীকৃতি অনুযায়ী একুশে ফেব্রুয়ারি এখন ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। বাংলাদেশ সরকার কয়েক বছর ধরেই বাংলাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা করার দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু তোমরা যদি ভালোভাবে লক্ষ্য করো তাহলে দেখতে পাবে যে, বাংলাদেশেই এখন পর্যন্ত সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু হয়নি। উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা এখনও উপেক্ষিত। আইন-আদালত ও প্রশাসনে চলছে ইংরেজি ভাষা। ডাক্তাররা মানুষকে ব্যবস্থাপত্র দেন ইংরেজিতে। এতে জনসাধারণকে পড়তে হয় অসুবিধায়।

মহান ভাষা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল- ‘অফিস আদালতে সর্বত্র বাংলাভাষা ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথমেই শেখা আছে, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। কিন্তু তারপরও সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু এবং ‘শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলাভাষা’ চালু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। এ অবস্থায় সর্বস্তরে বাংলা চালুর ব্যাপারে সরকারের যেমন দায়িত্ব আছে তেমনি জনগণকেও দায়িত্ব নিতে হবে। আর তোমরা যারা ছোট তারাও কিছু দায়িত্ব নিতে পারো। তোমাদের মধ্যে যেসব বন্ধু লেখাপড়া জানে না, বর্ণমালার সাথে এখনো যাদের পরিচয় হয়নি, তাদেরকে তোমরা অক্ষরজ্ঞান শিক্ষা দিতে পারো। সেইসঙ্গে এখন থেকেই শুদ্ধভাষায় কথা বলার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারো। তাহলেই ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।

 

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান

জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print