ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে অসমসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছে। এ সম্পর্কে রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে অসমের কংগ্রেস নেতা ও বিধায়ক শেরমান আলী আহমেদ বলেছেন, এটি বিজেপি সরকারের ষড়যন্ত্র।

তিনি বলেন, ভারত ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ। অথচ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন করে ভারতকে তারা হিন্দু রাষ্ট্র বানাতে চাচ্ছে। তারা হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে ভারতকে ধ্বংস করতে চায়।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ। পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।

রেডিও তেহরান: জনাব শেরমান আলী, ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল বা ক্যাব লোকসভা এবং রাজ্যসভায় পাস হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট সই করেছেন এবং সেটি আইনে পরিণত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে অসমসহ বিভিন্ন রাজ্যে তীব্র প্রতিবাদ বিক্ষোভ চলছে। তো আপনার কাছে প্রথমে জানতে চাইব-ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ অভিযোগ করেছেন- বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন না থামার কারণেই তারা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল এনেছেন। কীভাবে দেখছেন এই অভিযোগকে? 

শেরমান আলী আহমেদ: দেখুন, যদি সত্যিই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হয়ে থাকে তাহলে দুই মেয়াদে মোদি সরকারের ৬ বছরের শাসনামলে কোনো দিনই তো এর প্রতিবাদ করতে দেখি নি। বিজেপি বলে থাকে নরেন্দ্র মোদির ছাপ্পান্ন ইঞ্চি বুকের ছাতি এবং তিনি বিশ্ব নেতা হতে যাচ্ছেন। তাহলে মোদি এবং অমিত শাহ’র কাছে আমার প্রশ্ন বাংলাদেশের মতো ছো্ট্ট একটি দেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে অথচ তারা দুজন এর বিরুদ্ধে কবে প্রতিবাদ করেছেন? উপরন্তু বারবার আমরা দেখতে পাই নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহ বাংলাদেশে গিয়ে সেদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে কথা বলেন। নানারকমের সহযোগিতা বাংলাদেশকে করে থাকেন। বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারত অনেক সহযোগিতা করেছে অতীতে এবং বর্তমানে মোদিজীর শাসনামলে করা হচ্ছে।

আমি আবারও বলছি, যদি সত্যিই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার হয়ে থাকে তাহলে কেন একবারও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক বা আন্তঃরাষ্ট্রীয় বৈঠকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কিংবা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সেই অত্যাচার নির্যাতনের প্রতিবাদ জানায় নি?

এখানে আসল কথাটা হচ্ছে তারা মানুষের মধ্যে পোলারাইজেশন করতে চায়। আর সেই পোলারইজেশন বা বিভক্তি সৃষ্টির জন্য নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল বা ক্যাব বিল এনেছে এবং সংসদে পাস করানোর পর প্রেসিডেন্টও সই করেছেন। এখন তা আইনে পরিণত হয়েছে।

দেখুন, ভারত একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। সেই ধর্ম নিরপেক্ষ কাঠামোকে বদল করে তারা সারা ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র এবং হিন্দুদের ‘মেশিয়া’ হিসেবে প্রমাণ করতে চায়। সে কারণেই এ বিল আনা হয়।

দেখুন, আমাদের কাছে যে তথ্য আছে তাতে বাংলাদেশের অনেক জেলায় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার রয়েছেন। এছাড়া অন্যান্য কর্মকর্তাও রয়েছেন। সংখ্যানুপাতে সেটি বেশ। ফলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের কথা নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহ’র মুখে শোভা পায় না। এটি তাদের একটি ষড়যন্ত্র।

রেডিও তেহরান: অমিত শাহের এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন বাংলাদশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে না; বরং তারা শান্তি ও সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করছে। এ বক্তব্য প্রসঙ্গে আপনি কী বলবেন?

শেরমান আলী আহমেদ: যথার্থ বলেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। আমরা যতটুকু জানি তাতে বাংলাদেশ সরকার গতবছরও প্রায় বিশ হাজার পূজামণ্ডপে কত হাজার কোটি টাকা সাহায্য দিয়েছে। ঢাকাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের যেসব ব্যবসায়ী আছেন তাদের সাথে ব্যক্তিগত আলোচনায় জেনেছি তারা বলেছেন, আমরা এখানে শান্তিতে আছি, কেন আমরা ভারতে যাব। আমরা এখানে ভালো আছি। আসল কথাটা হচ্ছে নরেন্দ্র মোদি সরকার গোটা ভারতবর্ষকে ধ্বংস করতে চাচ্ছে।

ভারতের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খৃষ্টান, জৈনসহ সব জাতি-গোষ্ঠী পরস্পর সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ব বন্ধনের মধ্যে দিয়ে বাস করে এসেছেন। মোদি সরকার সেই বন্ধনকে, সেই পরম্পরাকে ধ্বংস করতে চায়। আর সে কারণে তারা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল এনে সংসদে পাস করিয়েছে।

তবে এর বিরুদ্ধে অসমের মানুষ জেগে উঠেছে। বিক্ষোভ আন্দোলন চলছে। যদি বাংলাদেশের হিন্দুদেরকে অসমের নাগরিকত্ব দেয়া হয় তাহলে অসমের ভাষা-সংস্কৃতি ভীষণ সংকটে পড়বে। এরইমধ্যে অসমে অহমিয়ভাষী মানুষের সংখ্যা মাত্র ৪৮ শতাংশ যা একসময় ৭০ শতাংশ ছিল। আজ এই ক্যাব পাস করানোর ফলে অসমের ভাষা সংস্কৃতি সংকটে পড়বে। অহমিয়ভাষী মানুষ এখানে সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। আর সে কারণেই অসমের মানুষ জেগে উঠেছে। অসমের সর্বস্তরের লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমেছে। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করছে ক্যাবের বিরুদ্ধে।

আমি অসমের একজন বিধায়ক। আমি গৌঁহাটি নিজ বাড়িতে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু যেতে পারলাম না। অর্ধেক রাস্তা থেকে ফিরে এসেছি। আমি বলব বিজেপি সরকারের এখনও যদি শুভ বুদ্ধির উদয় না হয় তাহলে ভবিষ্যতে নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ উপযুক্ত শিক্ষা দেবে।

রেডিও তেহরান: ভারত যে নাগরিকত্ব বিল পাস করেছে তা মুসলমান বাদে সব সম্প্রদায়কে সুরক্ষা দেবে। অর্থাৎ বিভিন্ন দেশ থেকে ভারতে যাওয়া সব সম্প্রদায়ের লোকজন নাগরিকত্ব পাবে; শুধু পাবে না মুসলমানেরা। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

শেরমান আলী আহমেদ: দেখুন, আপনার প্রশ্নের মধ্যে যেকথাটি বললেন, মুসলিম ছাড়া সবাই নাগরিকত্ব পাবে একথাটি একেবারে ঠিক নয়। শ্রীলঙ্কায় লক্ষ লক্ষ তামিল নিগৃহীত। কয়েক লক্ষ তামিল অত্যাচারিত হয়ে ভারতের তামিলনাড়ুতে আশ্রয় নিয়েছে। এই বিল কী তাহলে তাদেরকে নাগরিকত্ব দেবে? নিশ্চয়ই না। এই বিলের মাধ্যমে তামিলদেরকে নাগরিকত্ব দেয়া হবে না। ধরুন নেপালে, মিয়ানমারে বা অন্য কোনো দেশের হিন্দু অত্যাচারিত হয়ে এখানে এলে তাদেরকেও নাগরিকত্ব দেয়া হবে না। ফলে আমি বলব এসব কথা বা কাজ বিজেপি সরকারের আইওয়াশ মাত্র। এই বিল পাসের মাধ্যমে তারা মুসলিম বাদে বাকি সবাইকে নাগরিকত্ব দেবে একথা ঠিক নয়। তবে হ্যাঁ তারা মুসলিমদেরকে টার্গেট করেছে। তারা হিন্দু মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। বিজেপি সরকার ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। হিন্দুদের ভোট নিয়ে তারা ভারতকে শাসন করতে চায়। আর এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতেই তারা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা ক্যাব বিল এনেছে এবং সংসদের উভয়কক্ষে  পাস করেছে। পরে তা আইনে পরিণত হয়ছে।

রেডিও তেহরান: নাগরিকত্ব সংশোধন বিল পাস হওয়ার পর অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন,  বিজেপি ভারতকে কোথায় নিচ্ছে? আপনি কী বলবেন?

শেরমান আলী আহমেদ: জ্বি আপনি ঠিকই বলেছেন। এটি খুবই চিন্তার ও উদ্বেগজনক বিষয়। আসলে বিজেপি সরকার নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস করে ভারতকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে! ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে সারাবিশ্বে এ দেশটি একটি সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছে। নন অ্যালায়েন মুভমেন্টের সময় যে ভারতবর্ষ প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল, ফিলিস্তিনে ইসরাইলের আগ্রাসনের ক্ষেত্রে ভারত যে ভূমিকা নিয়েছে, শ্রীলঙ্কায় তামিলদের ওপর অত্যাচারের সময় এর বিরুদ্ধে যে ভূমিকা নিয়েছে এভাবে অনেক উদাহরণ রয়েছে ভারতের ভূমিকার কথা ইতিহাসের পাতায়। আর এসব কারণে বিশ্বে ভারত একটি ন্যায়পরায়ণ এবং মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা বলে যে অবস্থানে পৌঁছেছিল আজ অমিত শাহ’র নেতৃত্বে নরেন্দ্র মোদি সরকার সেই অবস্থানকে অবনমন করেছে। আজ ভারত এমন নিচে চলে এসেছে যে বিশ্ব ভারতের দিক থেকে ঘৃণায় মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছে। এমন সময় হয়তো আসবে যে ভারত বিশ্ব দরবারে যথেষ্ট অপমানিত হবে। বিভিন্ন রাষ্ট্র ভারততে ছি ছি বলবে। আর এসব কারণে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন।

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print