dtyrtyলন্ডনে বিবিসি বাংলার স্টুডিওতে কাজী হোসনে আরা

বাংলাদেশ বেতারের সবচেয়ে প্রবীণ অনুষ্ঠান উপস্থাপকদের অন্যতম কাজী হোসনে আরা

তিনি বেতারে – তখন যা ছিল রেডিও পাকিস্তান ঢাকা – অনুষ্ঠান উপস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন ১৯৬৬ সালের শেষ দিকে।

মাইক্রোফোনের সামনে কাজী হোসনে আরার এই কেরিয়ার শুরু হয়েছিল অনেকটা আকস্মিকভাবেই। বেতারে কাজ করার কোন ইচ্ছা বা পূর্ব পরিকল্পনা তার ছিল না। কিন্তু তার এক বান্ধবী বেতারে অনুষ্ঠান ঘোষণার জন্য পরীক্ষা দেবার সময় কাজী হোসনে আরার নামও দিয়ে দিয়েছিলেন। দু’জনে এক সাথে রেডিও অফিসে গিয়েছিলেন।

এভাবেই তার অডিশন দেয়া হলো, পাসও করলেন।

কাজী হোসনে আরা ছিলেন রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে। বেতারের অডিশনে পাস করার চিঠি যখন বাড়িতে এলো, তখন তার বাবা বললেন, স্কুল-কলেজে মেয়েরা কাজ করলে অসুবিধে নেই, কিন্তু এ বাড়িতে থেকে রেডিওতে কাজ করা যাবে না।

কাজী হোসনে আরা তখন বিবাহিতা। তাই স্বামীর বাড়িতে উঠে যাবার পর তার রেডিওতে কাজ করতে আর কোন বাধা থাকলো না।

“তখন রেডিও অফিস ছিল ঢাকার শাহবাগে। হোসনে আরার কথায়, তখন রেডিওর পরিবেশ ছিল অন্যরকম। প্রশাসন ছিল খুবই কড়া । সব নিয়মকানুন অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হতো। এখন অতটা নেই। ভালোমন্দ বলবো না – সময়ের সঙ্গে সবকিছুই পরিবর্তন হয়, সেটাই হয়েছে।”

সে যুগে অনুষ্ঠান ঘোষণার কাজটা কেমন ছিল?

কাজী হোসনে আরা বলছিলেন, “অনুষ্ঠানের সূচী তৈরি করা হতো একটা ‘কিউ শীটে’ – এতে লেখা থাকতো কোন অনুষ্ঠান সরাসরি প্রচার হবে, কোনটা টেপ থেকে বাজবে ইত্যাদি।”

“স্টুডিওতে কাচের পর্দার মধ্যে দিয়ে উপস্থাপক, ইঞ্জিনিয়ার বা অনুষ্ঠানের শিল্পীরা একে অপরকে দেখতে পেতেন।”

ইঞ্জিনিয়ার ‘অন এয়ার’ বাতি জ্বালিয়ে দিলে উপস্থাপক ঘোষণাটি পড়তেন, তার পরই সরাসরি শিল্পী গাইতে শুরু করতেন, বা টেপ বাজতে শুরু করতো।

এখনো প্রযুক্তির পরিবর্তন হলেও মোটামুটি একই পদ্ধতি চালু আছে, বলছিলেন কাজী হোসনে আরা। “তবে তখনকার দিনে মানুষ অনেক বেশি ঐকান্তিক এবং নিবেদিতপ্রাণ ছিল। এখন মানুষ অনেক কিছু করে, অনেক কিছুর দিকে মন দেয়, এবং সবাই খুব অস্থির।”

বাংলাদেশর স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালের দিকে টেলিফোনে সময় বলার জন্য একটি সেবা চালু হয়েছিল – যাতে গ্রাহকরা ১৪ ডায়াল করলে তখন সময় কত তা জানতে পারতেন।

এর জন্য একটা ‘বেস্ট ভয়েস’ পরীক্ষা হয়েছিল – তাতে প্রথম হয়েছিলেন কাজী হোসনে আরা। তার কণ্ঠেই ফোনের সেই সময় ঘোষণা বাজতো।

“যখন সংকেত শুনবেন তখন সময় হবে বেলা ১২ বেজে ১০ মিনিট হয়ে ১৫ সেকেন্ড – এই রকম ছিল সেই ঘোষণাটা।”

এই কাজের জন্য কাজী হোসনে আরাকে তখনকার দিনে দু’হাজার টাকা এবং একটা টেলিফোন দেয়া হয়েছিল। তখন টেলিফোন পাওয়া অনেক কষ্টকর ছিল। কিন্তু তার সেই টেলিফোনের জন্য ফি লেগেছিল ৭০০ টাকা।

তখনকার দিনে রেডিও বিশেষ বিশেষ অনেক অনুষ্ঠান উপস্থাপনার জন্য কাজী হোসনে আরা ডাক পেতেন। ‘ভালো কন্ঠ’ তার – এই স্বীকৃতিটা ছিল, বলছিলেন তিনি।

রেডিও এমন একটি মাধ্যম যা শুধু কানে শোনার জিনিস, ঘোষক-ঘোষিকাকে শ্রোতারা চোখে দেখতে পান না। কিন্তু এর মধ্যে দিয়েই খ্যাতি তৈরি হয়েছিল কাজী হোসনে আরার।

“একদিন দেখলাম ডিউটি রুমের পাশে ওয়েটিং রুমে একজন মহিলা বসে আছেন। কি ব্যাপার? বললেন, কাজী হোসনে আরাকে দেখতে এসেছি। আমার কণ্ঠ তার খুব ভালো লাগে, তাই মাকে সাথে নিয়ে দেখতে এসেছেন। এমন আরো অনেকেই দেখতে আসতেন।”

একজন নারী হিসেবে কাজ করা, একটা পরিচিতি পাওয়া – এগুলো কেমন লাগতো?

প্রশ্ন করতে কাজী হোসনে আরা বললেন, “এসব ভাবার অবকাশ ছিল না। আমার ছিল প্রয়োজন। তবে হ্যাঁ, তখন সমাজ এমন ছিল যে একটি মেয়ে অফিসে কাজ করে শুনলে ভাবা হতো, ও বোধ হয় ভালো না। এটাই ছিল সত্যি কথা, জানিনা বলা ঠিক হলো কিনা।”

“পাড়াপ্রতিবেশী, স্বজনদের মধ্যেও ভেতরে ভেতরে একটা তুচ্ছ করা, অসম্মান করার দৃষ্টিভঙ্গী ছিল, এটা বুঝতে পারতাম। কখনো কখনো খারাপ লাগতো, মনে হতো কাজ করাটাই যেন একটা অন্যায় করা হচ্ছে।”

“আর এখন? এখন এমন হয়েছে যে ‘ও রেডিওতে কাজ করে’ শুনলে লোকে এগিয়ে এসে কথা বলে।”

“এখন যে মেয়েদের কাজ করাটা সামাজিকভাবে গৃহীত হয়ে গেছে, অনেক মেয়ে নানা রকম কাজ করছে – এটা দেখে ভালো লাগে। আমাদের সময় এমন ছিল না।”

এখনকার রেডিও-ও শোনেন কাজী হোসনে আরা – মাঝে মাঝে।

“রেডিও ফুর্তি, আরো কি কি আছে সব শোনা হয় না, তবে শুনি মাঝে মাঝে, প্রতিটা কথার পর ছোট্ট একটুখানি ইংরেজি কথা বলা, মনে হয় যেন এটা ঠিক বাংলাও না ইংরেজিও না। আর ওইরকম দ্রুতগতিতে কথা বলা – তবে মন্দ লাগে না।”

রেডিওতে শব্দের উচ্চারণ বা পড়ার ভঙ্গি – এসব ক্ষেত্রে আগে যেমন মান রক্ষা করা হতো সেটা কি এখন আর অক্ষুণ্ণ আছে? জবাবে কাজী হোসনে আরা বললেন, “স্পষ্ট এবং শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করা এটা তো বদলে যাবার কোন কারণ নেই। কিন্তু ততটা আগের মতো পরিশীলিত নেই।”

তিনি অনেক নবীন অনুষ্ঠান উপস্থাপককে প্রশিক্ষণও দিয়েছেন, এখনো সপ্তাহে তিন দিন কাজ করেন তিনি।

“আমার তিন ছেলেমেয়েকে আমি ঠিকমত মানুষ করতে পেরেছি এটা আমার কাছে এক বড় পাওয়া” – বলেন কাজী হোসনে আরা।

তার কণ্ঠ যে এখনো ঠিক আছে এটা ওপরওয়ালার দান বলেই মনে করেন তিনি। “এ জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।”

বিবিসি

উক্ত প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print