দিনের পর দিন জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারছিল না শ্রীময়ী। জোর করে ডাক্তারিতে ভর্তি। একটা বছর কষ্ট করে পড়ে এমবিবিএস দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ঝাঁপ দিল চলন্ত মেট্রোয়।

সহকর্মীরা আড়ালে ঠাট্টা করেছে বিচ্ছেদ নিয়ে। জানতে চায়নি বিষাদমাখা হাসি মুখের ছেলেটা ভাল আছে কি না। ফ্ল্যাটের ছ’তলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যু হয় সুনন্দর।

করোনা আক্রান্ত বৃদ্ধ আত্মঘাতী হলেন শহরের বুকে, কয়েক দিন আগেই।

কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী শুধুমাত্র ২০১৬ সালে ১১ হাজারের বেশি কৃষক আত্মঘাতী হয়েছেন। ন্যাশনাল ক্রাইম ব্যুরো বলছে, ২০১৪ সালে দিনমজুরদের মোট আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছিল ১৫ হাজার ৭৩৫টি। ২০১৪-২০১৯ সময় পর্যায়ে এসে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

কেউ বিত্তশালী, কেউ কর্মহীন, কারও ঋণের বোঝা, কারও মনের ভিতরে বাসা বেঁধে থাকা দীর্ঘকালীন অবসাদের ভার। সারা বিশ্বে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে এক জন মানুষ আত্মহত্যা করেন, এমনই জানাচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। নিজেকে ধ্বংস করে দেওয়ার এই যে প্রবণতা, মনের মধ্যে জমে থাকা মারাত্মক চাপ ক্রমশই বাড়ছে। বিখ্যাত মানুষের আত্মহত্যার খবর কি মানুষকে আরও বেশি বিপন্ন করে তোলে? কী ভাবে মনের ভার লাঘব করা যাবে? শুধুই কি পরিবার কিংবা কাছের বন্ধু? সমাজের কি কোনও দায় নেই? আত্মহত্যা রুখতে কী করা উচিত? সন্তানের বেড়ে ওঠার সময় কী কী বিষয় মাথায় রাখতে হবে? আজ, ১০ সেপ্টেম্বর, বিশ্ব আত্মহত্যা রোধ দিবসে তারই খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করল আনন্দবাজার ডিজিটাল।

পরস্পরের প্রতি অসহিষ্ণু আচরণ করার অভ্যাসটা বোধ হয় মজ্জাগত হয়ে যাচ্ছে। ছোট থেকেই তাই সহিষ্ণুতার পাঠ দেওয়াটা অত্যন্ত জরুরি— এমনই মত মনোবিদ অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তাঁর মতে, পরিবারের কোনও সদস্য আত্মহত্যা করলে কিংবা আত্মহত্যার চেষ্টা করলেও সেই পরিবারের থেকেও মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে সমাজের। সেই আচরণও অভিপ্রেত নয়।

দীর্ঘ মৃত্যুচিন্তা, কিংবা আচমকা যে কোনও কারণে মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন কেউ। কিন্তু তিনি যদি বুঝতে পারেন, তাঁর সবথেকে খারাপ থাকার সময়েও পাশে কেউ এক জন রয়েছে, একটা সাপোর্ট সিস্টেম রয়েছে, তা হলে হয়তো তিনি বেঁচে যেতে পারেন। জীবন অর্থহীন মনে হলেও সে কথাটা ভাগ করে নেওয়া, তাঁকে বোঝা, সহমর্মিতার এই সুরক্ষা বলয় তৈরিতে আরও বেশি জোর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলেই মনে করেন অনুত্তমা।

ছোটবেলা থেকেই ‘একলা খেপু’ হয়ে উঠছে কোনও বাচ্চা। স্কুলে ‘বুলিং’-এর শিকার হলেও বলে উঠতে পারছে না বাড়িতে। সেই পরিবেশটাই পাচ্ছে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রেও তাই এই বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথাই বলেন অনুত্তমা। কারণ শিশুর প্রাথমিক বেড়ে ওঠার সঙ্গে পরিবারের মতোই জড়িয়ে তার স্কুলও।

আত্মহত্যার সঙ্গে হতাশার একটা বড় সম্পর্ক রয়েছে। যে মানুষের জীবনে হতাশার পরিমাণ যত বেশি, তিনি তত বিপন্ন। করোনা আবহে মানসিক চাপের পরিমাণ বেড়েছে, বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতাও। খোলা বাতাস এসে মনের যে জায়গাগুলোতে সার-পুষ্টি দিত, সেগুলোও প্রায় বন্ধ। কী করবে মানুষ?

ইনস্টিটিউট অব সাইকিয়াট্রির ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট প্রশান্তকুমার রায়ের মতে, “ছোট থেকেই অর্থপূর্ণ জীবন গড়ে তোলার চেষ্টা করা উচিত। দায়িত্ববোধ তৈরি করা উচিত বাচ্চাদের মধ্যে। খানিকটা হলেও ঝুঁকি নিতে শেখানো উচিত। ছোটরা কোনও সমস্যা নিয়ে এলে তাঁদের জিজ্ঞাসা করা উচিত, সে নিজে কী ভাবে ওই সমস্যার সমাধান করতে চায়। স্কুলের বন্ধুদের মধ্যে মারপিটের ক্ষেত্রেও এই কথা প্রযোজ্য। বন্ধু মারলে কেন খারাপ লেগেছে এটা বরং খাতায় লিখতে বলে তার পর সেই অনুযায়ী তাকে বুঝিয়ে বলা যায়। এ ভাবে ছোট থেকেই খানিকটা হলেও অর্থপূর্ণ জীবন গড়ে তোলার ভাবনার ভিত তৈরি করা যায়।”

ছোটবেলা থেকে স্নেহ দিয়ে বড় করলে, অভিভাবক ও সন্তানের মানসিক ও শারীরিক সংযোগের জায়গা থাকলে বাচ্চার ক্ষেত্রে নিরাপত্তার বোধ অনেকটাই বেশি তৈরি হয়। পরবর্তীতে একলা জীবন যাপন করলেও মনের জোরের জায়গাটাও পোক্ত হয়। বড় হলেও সে ঝড়ঝাপটা সামলাতে পারে। এমনই মত প্রশান্তবাবুর।

মোবাইল না পেয়ে পঞ্চম শ্রেণির যে ছাত্রী আত্মহত্যার পথে বেছে নিল তার ক্ষেত্রে?

আত্মহত্যার প্রবণতা কিশোরদের মধ্যে মারাত্মক পরিমাণে বেড়ে গিয়েছে। এটার একটা বড় কারণ অপেক্ষা করতে পারার অভাব, এমনই জানান এই মনোরোগ চিকিৎসক। তাঁর কথায়, “অপেক্ষা বিষয়টায় ছোটদের অভ্যস্ত করতে হবে ছোট থেকেই। চাইলেই কোনও কিছু দিয়ে দিতে হবে, এমনটা একেবারেই নয়। পরিশ্রম করে অর্জনের বিষয়টাও নরম ভাবে বোঝাতে হবে।”

গত এক বছরে দেশে আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়েছে ৩.৪ শতাংশ। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো (এনসিআরবি)-র তথ্য অনুযায়ী, আত্মহত্যায় দেশে তৃতীয় স্থানে পশ্চিমবঙ্গ। করোনা আবহে মানসিক চাপের কারণে কর্মহীন হয়েও অনেকে আত্মহত্যা করেছেন। এই অবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যের জায়গাটা আরও বেশি করে নজর দিতে জোর দেওয়া হচ্ছে প্রশাসনিক তরফেও।

বিখ্যাত কোনও ব্যক্তির আত্মহত্যা এবং তা বার বার সামনে নিয়ে আসা কি আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে?

এই প্রসঙ্গে প্রশান্তবাবুর মত, “একটা আত্মহত্যা এবং বার বার তা শিরোনামে এলে প্রচুর মানুষ বিপন্ন বোধ করেন। আরও বেশি সংখ্যক মানুষ আত্মহত্যা প্রবণ হয়ে পড়েন। তাই সামাজিক নির্মাণের জায়গাটা আত্মহত্যা বন্ধ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জরুরি।”

মনোবিদ অমিতাভ মুখোপাধ্যায় সহমত পোষণ করে বলেন, বিপন্ন মানুষ আরও বেশি বিপন্ন হয়ে ওঠেন বিখ্যাত মানুষের আত্মহত্যার খবরের প্রচারে। আত্মহত্যার ভাবনা, পরিকল্পনা এবং তা ঘটিয়ে ফেলা এই তিনটি স্তর রয়েছে। যে মানুষ ইতিমধ্যে মৃত্যুচিন্তা করছেন, যে মানুষের পরিবারে আত্মহত্যার ইতিহাস রয়েছে, সেই মানুষের মধ্যে এটি ঘটিয়ে ফেলার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায় এর ফলে। তবে যে মানুষ আবেগপ্রবণ কিন্তু আত্মহত্যার কোনও পারিবারিক ইতিহাস নেই বা মনের মধ্যে মৃত্যুচিন্তা কাজ করছে না, তাঁদের ক্ষেত্রে খারাপ লাগাটা কাজ করলেও তিনি তা সামলে উঠতে পারেন। বিপন্ন মানুষ আরও বেশি নেতিবাচক ভাবনাকে প্রশ্রয় দেন বিখ্যাত মানুষের আত্মহননের খবরের বারংবার প্রচারে। তাই এ বিষয়ে সমাজের প্রত্যেকেরই সচেতন হওয়া উচিত

কোনও মানুষ আত্মহত্যা প্রবণ হয়ে উঠছেন, মৃত্যু চিন্তা আসছে, এটা বুঝতে পারলে আশপাশের কী করা উচিত?

• কথা বলতে হবে তাঁর সঙ্গে

• ‘ভিক্টিম ব্লেমিং’ বন্ধ করতে হবে

• মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নাক সিঁটকানোর জায়গাটা বন্ধ করতে হবে

•  সবসময় তাঁর খেয়াল রাখতে হবে, যাতে তিনি নিজেকে একলা মনে না করেন। একলা রাখা যাবে না তাঁকে।

সমাজের উপর রাগ কিংবা কর্মস্থলের বিরক্তি, অনিশ্চয়তার অনুভূতি, গার্হস্থ্য হিংসা বা অসহায়তা থেকেও নিজেকে শেষ করে দেওয়ার একটা প্রবণতা তৈরি হয়। তাই প্রথমেই এ জাতীয় ভাবনা এলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেন অনুত্তমা।

ওয়ার্ল্ড সুইসাইড প্রিভেনশন ডে-তে কলকাতার একটি অসরকারি সংস্থা ‘গো-ইয়েলো কলকাতা’ বলে একটি প্রচার করছে আজ। আত্মহত্যা রুখতে, ‘স্টিগমা’ দূর করতে হলুদ পোশাক পরে সবাইকে এক সঙ্গে থাকার এই উদ্যোগের কথা জানান সুখশ্যাম সিং। তিনি বলেন, নিজের আবেগের কথা অন্যকে বলা খুব সহজ নয়। সঠিক মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল এ কথা ভাগ করে নেওয়ার জন্য। সে থেকেই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবনা শুরু এই অ-সরকারি সংস্থার।

পাশে থাকতেই হবে পরস্পরের, সামাজিক পরিকাঠামো, সহমর্মিতার স্পর্শে বেঁচে যাবে আরও একটা মানুষ, আত্মহত্যা রোধ দিবসের শপথ হোক এমনই।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আনন্দবাজার

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print