শুরুর দিকে গুরুত্ব না দেয়ায় মহামারি করোনা ব্রিটেনে বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। আমাদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে হতাশা সৃষ্টি হলেও এখন পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন ব্রিটেনের সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকার সম্পাদক তাইসির মাহমুদ।

তিনি বলেন, ব্রিটেনে কাগজপত্রবিহীন বা অবৈধরা একটা সংকটময় মুহূর্ত পার করছেন।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব তাইসির মাহমুদ, বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস মহামারি চলছে। বলা চলে বিশ্ব থমকে গেছে। আর এই করোনায় বিশ্বের যেসব দেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্রিটেন তারমধ্যে একটি। প্রশ্ন হচ্ছে- এত উন্নত এবং অর্থনৈতিক দিক দিয়ে শক্তিশালী দেশ হওয়ার পরেও এইরকম বিপর্যয়কর অবস্থায় কেন পড়ল ব্রিটেন?

তাইসির মাহমুদ: দেখুন, আমরা বেশ  আশাবাদী ছিলাম যে, হয়তোবা  মৃত্যুর সংখ্যা কমবে। কিন্তু আবার বেড়ে গেল। মৃত্যুর সংখ্যা এরইমধ্যে ২১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। আর এজন্য আমাদের মধ্যে কিছুটা হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।

ব্রিটেন এত উন্নত দেশ হওয়ার পরও কেন এরকম বিপর্যকর অবস্থায় পড়ল আপনার এ প্রশ্নের জবাবে বলব, চীনে যখন করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হলো এবং মানুষ মারা গেল তখন ব্রিটেন, আমেরিকাসহ বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বিষয়টিকে ততটা গুরুত্ব দেয় নি। সময়মতো বিমানবন্দরগুলো সাধারণ যাত্রীদের চলাচল বন্ধ করে দেয়ার মতো কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে নি। যুক্তরাজ্যে বহু ট্যুরিস্ট সবসময় আসে। আর মূলত ট্যুরিস্টদের মাধ্যমেই এখানে করোনাভাইরাস ছড়িয়েছে। এককথায় বলব সময় মতো যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় নি।

তবে একইসাথে হতাশার পাশাপাশি আশার খবর আছে। সেটি হচ্ছে- লন্ডন ইমপেরিয়াল কলেজ ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এরইমধ্যে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন পরীক্ষামূলকভাবে মানবদেহে  প্রবেশ ঘটিয়েছে। আশা করা হচ্ছে এ থেকে একটা ভালো আউট কাম পাওয়া যাবে।

রেডিও তেহরান: আপনি করোনা নিয়ে আশার কথা শোনালেন পাশাপাশি সেখানকার আজকের বিপর্যয়কর অবস্থার জন্য প্রথম দিকে যুক্তরাজ্য সরকারের  গুরুত্ব না দেয়ার বিষয়টিও আনলেন। আমরা কিন্তু শুধু ব্রিটেনে নয় পুরো ইউরোপে এই একই অবস্থায় দেখলাম। ইউরোপে এক লাখের বেশী মৃত্যুর সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

তাইসির মাহমুদ: করোনাভাইরাস সংক্রমণের ব্যাপারে ব্রিটেনের যে পরিস্থিতির কথা তুলে ধরলাম গোটা ইউরোপের অবস্থা একইরকম। ইউরোপের কোনো দেশই ভাবতে পারে নি করোনা এত ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। স্পেন, ফ্রান্স এবং ইতালিসহ অন্যান্য দেশে ব্যাপক মৃত্যু ঘটেছে এবং সাঙ্ঘাতিক ধরনের ক্ষতি হয়েছে করোনার কারণে। তারা আসলে এটা ভাবতে পারে নি। যদি ভাবতে পারত তাহলে সীমান্ত বন্ধ করে দিত। ভ্রমণকারীদের চলাচল বন্ধ করে দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যেত।

রেডিও তেহরান: জনাব মাহমুদ আপনি ব্রিটেনে আছেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারাত্মক অসুস্থ হওয়ার পর তিনি হাসপাতালের আইসিইউতে ছিলেন। পরে তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছেন। এখন তার অবস্থা কেমন বলে জানা যাচ্ছে?

তাইসির মাহমুদ: এখনও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন হোম কোয়ারেন্টিনে এবং চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে আছেন। তিনি ঘর থেকে কিছু কাজ করছেন। কিছু কথা বলছেন। তবে পুরোপুরি তিনি এখনও সুস্থ নন। তিনি নিজে বলেছেন, পুরোপুরি সুস্থ্ হতে সময় লাগবে।

বরিস জনসন যখন করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেন। তখন দেখেছি তার প্রতি ব্রিটেনের মানুষের গভীর ভালোবাসার বিষয়টি। সবাই কিন্তু তাঁর জন্য সহানুভূতি প্রকাশ করেছে।

এদিকে ব্রিটেনের অন্যান্য মন্ত্রীরা এখন মানুষের বিষয়টি চিন্তায় না এনে কীভাবে দেশের অথর্নতিকে চাঙ্গা করা যায় সেটি ভাবছেন। টেলিভিশনে এমন বিষয় দেখছি। কিন্তু বরিস জনসন বলেছেন, সবার আগে আমাদের মানুষের কথা চিন্তা করতে হবে। আমার মনে হয় তাঁর এই বোধটি এসেছে-করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর নিজের অবস্থা বিবেচনা করে। এখনও এখানে লকডাউন চলছে। পরিস্থিতি এখন অনেকটা ভালো। মানুষ লকডাউন মেনে চলছে। জরুরি কাজে বের হলেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে মানুষ চলাচল করছে। বলা চলে লকডাউনের অবস্থাটা ভালো।

রেডিও তেহরান: জনাব, তাইসির মাহমুদ আপনি বলছিলেন এখন ব্রিটেনের মানুষ সোশাল ডিসটেন্সিং মেনে চলছে। কিন্তু আপনার কি মনে হয় করোনাভাইরাস মোকাবেলার ক্ষেত্রে ব্রিটিশ সরকারের পদক্ষেপে কোন ভুল বা গাফিলতি ছিল?

তাইসির মাহমুদ: দেখুন, আমি একটা রিপোর্টে দেখেছি, যুক্তরাজ্যে প্যানডেমিক নামে একটা কমিটি আছে। তাঁরা মহামারি প্রতিরোধে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। ২০১৭ সালে ঐ কমিটি সরকারকে একটি প্রতিবেদন দিয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল ভবিষ্যতে যদি ব্রিটেনে কোনো মহামারি আসে তাহলে সেই মহামারি মোকাবেলা করার মতো পর্যান্ত ইক্যুইপমেন্ট এবং ব্যবস্থা নেই। ফলে বিষয়টি নিয়ে তাঁরা একটা পরিকল্পনা দিয়েছিল। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার তখন জানায় এটি করা যাবে না কারণ ঐ পরিকল্পনা ব্যয়বহুল।

করোনাভাইরাস মহামারি মোকাবেলা করার মতো যথাযথ ব্যবস্থা ব্রিটেনের ছিল না। প্রথমদিকে আপনারা দেখেছেন এখানে পিপিই এবং মেডিকেল সরঞ্জামাদি সংকট ছিল অন্যান্য দেশের মতো। আস্তে আস্তে অবশ্য সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠছে। বর্তমানে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষকে করোনার টেস্ট করা হচ্ছে। সরকার বলেছে এপ্রিলের শেষ নাগাদ প্রায় ১ লক্ষ করে মানুষের করোনা পরীক্ষা সম্পন্ন করবেন। যদিও সরকারের ওই বক্তব্যের বিষয়ে বিরোধী দল বলছে- সেটি কি সম্ভব হবে? যেখানে বর্তমানে ২৫/৩০ হাজার মানুষের করোনা পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না!

রেডিও তেহরান: জ্বি,  আপনি সোশ্যাল ডিসটেন্সিং বা সামাজিক দূরত্বের কথাটি বলছিলেন, তবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী প্রথম দিকে কিন্তু অভিযোগ করেছিলেন মানুষ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলছে না, লকডাউন মেনে চলছে না- তাহলে এখন সে অবস্থাটি নেই; করোনাভাইরাস মোকাবেলার ক্ষেত্রে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিং এবং হোম কোয়ারেন্টিনের ক্ষেত্রে  এখন ব্রিটিশ সরকার জনগণের কাছ থেকে সহযোগিতা পাচ্ছে?

তাইসির মাহমুদ: দেখুন, প্রথম দিকে তো মানুষ অবাধে চলাফেরা করত। হঠাৎ করে যখন প্রধানমন্ত্রী লকডাউনের ঘোষণা দিলেন তখন সবাই সেটি মেনে না চললেও আস্তে আস্তে কিন্তু মানুষ তা মেনে নিয়েছে এবং ঘরবন্দি থেকেছে। অবস্থা যখন প্রতিদিন খারাপ দিকে যাচ্ছিলো অর্থাৎ প্রতিদিন মৃত্যুর সংখ্যা যখন-৭/৮ কিংবা ৯ শ পর্যন্ত উঠেছে তখন মানুষ ভীত হয়ে গেছে। তারাঁ ভয়ে লকডাউন যথাযথভাবে মেনে চলছে। ঘর থেকে বের হচ্ছে না। খুব দরকার না হলে বিশেষ করে ওষুধ কেনা বা জরুরি কোনো কাজ না থাকলে মানুষ কিন্তু বাইরে বের হচ্ছে না।

রেডিও তেহরান: জনাব তাইসির মাহমুদ, আপনি সাংবাদিক-ফলে এবারে জানতে চাইব যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশিদের অবস্থা কেমন, এখন পর্যন্ত কতজন মারা গেছেন করোনায় এবং আক্রান্তের সংখ্যাই বা কেমন-যদি পরিসংখ্যান জানা থাকে..

তাইসির মাহমুদ: দেখুন, আমরা যেখানে থাকি সে এলাকাটির নাম টাওয়ার হ্যামলেট। আর এই টাওয়ার হ্যামলেটকে বাঙালিদের( বাংলাদেশিদের) রাজধানী বলা হয়। কারণ এখানে প্রায় ৩ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ১ লাখ বাংলাদেশি। আর গোটা যুক্তরাজ্যে প্রায় ৬ লাখের মতো বাংলাদেশি আছেন। আর টাওয়ার হ্যামলেটেই বেশি বাংলাদেশি করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গেছেন। আর যুক্তরাজ্যে কতজন বাংলাদেশি মারা গেছে তার অফিসিয়ালি সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে সাংবাদিক হিসেবে আমাদের কাছে গত বুধবার পর্যন্ত যে তথ্য আছে তাতে প্রায় দেড়শর মানুষ মারা গেছে।

রেডিও তেহরান: জনাব তাইসির মাহমুদ সবশেষে জানতে চাইব, বাংলাদেশিরা বিশেষ করে যারা অবৈধভাবে আছেন তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না?

রেডিও তেহরান: যারা ব্রিটেনের স্থায়ী বাসিন্দা অর্থাৎ বৈধ তাদের ঘরবাড়ি আছে। তারা ভালো আছেন। তাদের তেমন কোনো অসুবিধা নেই। আর সরকারি সুযোগ সুবিধা মোটামুটিভাবে কিছু দেয়া হচ্ছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে অর্থনৈতিক কিছু সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া সামাজিক সুযোগ-সুবিধাও কিছু বাড়ানো হয়েছে।

কিন্তু যারা কাগজপত্রবিহীন বা অবৈধভাবে ব্রিটেনে আছেন তারা প্রকৃতপক্ষে একটা সংকটময় মুহূর্ত পার করছেন। আর এক্ষেত্রে শুধু বাংলাদেশিদের কথা বলব না-আরও অন্যান্য দেশের মানুষও রয়েছেন। কারণ তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা নেই।

তবে অবৈধ বাংলাদেশিদের কিন্তু বাঙালি কমিউনিটি খুব সহযোগিতা করছে। এখানে ইস্ট লন্ডন মসজিদ নামে খুব বড় একটি মসজিদ আছে। সেখানে প্রায় ১০ হাজার মানুষ একসাথে নামাজ পড়তে পারে। এই মসজিদের পক্ষ থেকে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। অসহায় যেসব বাংলাদেশি আছেন, যাদের খাবারের ব্যবস্থা নেই; তাঁদের খাবারের ব্যবস্থা করার ঘোষণা দিয়েছে। গাড়িতে করে খাবার নিয়ে তাদের কাছে পৌঁছে দেয়া হবে বলে জানিয়েছে। এছাড়া আরও বেশ কিছু সংগঠন Vulnerable মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

 

 

 

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print