বাংলাদেশে পৌরসভা নির্বাচন চলছে। ২৮ ডিসেম্বর ২০২০ থেকে শুরু হয়েছে এবং কয়েক ধাপে এ নির্বাচন চলবে। তো চলমান পৌরসভা নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে আমরা কথা বলেছি সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। তিনি বললেন, নির্বাচনের পরিবেশ বর্তমানে বিশেষ কিছু নয়!

তিনি বলেন, দেশে নির্বাচনের পরিবেশ অনেক আগে থেকে নষ্ট হয়ে গেছে। এখানে নির্বাচন নিয়ে এক ধরনের ছিনতাইকরণ হচ্ছে। রাতের বেলায় ভোট হয়েছে। সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হাতে গোণা কয়েকটি নির্বাচন ছাড়া কোনো নির্বাচনই মান সম্পন্ন ছিল না।

সাক্ষাৎকারের প্রথম পর্ব তুলে ধরা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব, ড. এম সাখাওয়াত হোসেন, বাংলাদেশে পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে এরইমধ্যে কিছু বিতর্ক উঠেছে এবং নেতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। সামগ্রিকভাবে নির্বাচনের পরিবেশকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: দেখুন,বাংলাদেশে নির্বাচনের পরিবেশ অনেক আগে থেকে নষ্ট হয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে এখন নির্বাচনের পরিবেশ বিশেষ কিছু নয়! ২০১৪ এবং ২০১৮ তে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো সুষ্ঠু পরিবেশ ছিল না। ২০১৮ সালে নতুন ধরনের নির্বাচন হয়েছে। রাতের বেলায় ভোট হয়েছে। তারপরের নির্বাচনও একইরকম। আসলে ওসব নির্বাচনকে আমি নির্বাচনই বলতে পারি না। নির্বাচন নিয়ে আমি যেটা বলব সেটি হচ্ছে একধরনের ছিনতাইকরণ। নির্বাচনে মানি, মাসল এবং মেনুপ্যুলেশন এই তিনটি জিনিষ এখন হচ্ছে।

আর সরকারি দল থেকে কেউ নমিনেশন পেলে কিংবা সরকারি দলের আদর্শপুষ্ট হলে নিশ্চিতভাবে আপনি জিতে যাচ্ছেন। সেখানে বলা হচ্ছে সন্মুখে সিল মারো। অর্থাৎ সিক্রেট ব্যালট আর সিক্রেট থাকছে না। ভোটারকে ডেকে নিয়ে সামনে সিল মারা হচ্ছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে যে ভোটের মেশিন তৈরি করা হয়েছে তাতে চোরটামি করা হচ্ছে। কারণ আইডেনটিফিকেশনের পর কর্তব্যরত ব্যক্তির সামনে মেশিনের বাটনে টিপ দিতে হয়। এই যে নির্বাচনে সম্পূর্ণ অব্যবস্থা- আমি বলব নির্বাচন স্থলে সরকারের কিংবা প্রশাসনিক যারা  আছেন এমনকি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাসহ সবাই ইনলিজি করছে। এরকম অবস্থাকে ক্লাসিক্যাল টার্মও বলা হয়। অর্থাৎ নির্বাচন ব্যবস্থা বলতে কোনো ব্যবস্থা থাকে না,  পুরো ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়ে।

নির্বাচন কমিশন আছে এবং তাদের হাতে যথেষ্ট ক্ষমতা আছে। ক্ষমতার প্রয়োগ নেই। তাঁরা ক্ষমতার প্রয়োগ করতে পারছে না বা পারবে না কিংবা পারার উদ্দেশ্য তাদের নেই। এরকম অবস্থায় নির্বাচনকে কন্ট্রোল করা যায় না। কন্ট্রোলটা করবে কে? একদিকে সরকারি দল-তাদের উদ্দেশ্য যেমন করেই হোক নির্বাচনে জিততে হবে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন-আমার কিছু করার নেই! এমতাবস্থায় বাংলাদেশের এখন নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার যে পরিস্থিতি আছে তাতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার উপরে মানুষের বিশ্বাস আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে। নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর মানুষের বিশ্বাস কমে যাচ্ছে। লিবারেল ডেমোক্রেসি বলতে এখন আর কিছুই নেই। এরকম অবস্থা বাংলাদেশে চলতে গত ৯/১০ বছর ধরে এবং ভবিষ্যতে নির্বাচন নিয়ে মানুষের মাথাব্যথা আছে বলে আমর মনে হয় না। আর এগুলো কোনো বিশ্লেষণের দাবি রাখে না।

রেডিও তেহরান: জনাব ড. এম সাখাওয়াত হোসেন, নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে আপনি যেসব কথা বললেন তা অত্যন্ত দুঃখজনক। বিশেষ করে রাজনৈতিক দল যারা আছেন; যখন যারা-ক্ষমতায় থাকেন তারা বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হয়েছে। আর বিরোধী দলের অভিযোগের শেষ থাকে না। যেমন ধরুন বর্তমান বিরোধী দল বিএনপি অভিযোগ তুলেছে-এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছে এবং তারা দখলবাজির মাধ্যমে নির্বাচন শেষ করতে চায়। এর আগে যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল তখনও একই চিত্র দেখা গেছে। আপনি একজন সাবেক নির্বাচন কমিশনার, আপনি বললেন, নির্বাচন কমিশনের যথেষ্ট ক্ষমতা আছে -তারপরও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ  নির্বাচন হওয়া নিয়ে বিতর্ক উঠছে। কেন এমনটি হচ্ছে-আপনার কাছে কি মনে হয়?

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: আপনি ঠিকই বলেছেন। আজকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার জন্য সবকিছু করছে। অতীতে বিএনপি ক্ষমতায় ছিল। তারা নির্বাচনে মেনুপ্যুলেশন  শুরু করেছিল। ১৯৯৪ সালে তারা শিল্পপতিদের নির্বাচনে আনলেন। শুরু হয়েছিল টাকার খেলা। সেই থেকে শুরু হয়েছে। কিন্তু বিষয়টি হচ্ছে নির্বাচন কমিশন কেন পারছে না। দেখুন, নির্বাচন কমিশন আল্লাহর তরফ থেকে  প্রেরিত কোনো মহাপুরুষ বা শক্তিশালী পুরুষদের সমন্বয়ে নয়। নির্বাচন কমিশনের কতগুলো বিষয় আছে। যেমন ধরুন তারা স্বাধীন ঠিকই কিন্তু সরকারি সহযোগিতা ছাড়া তাদের পক্ষে নির্বাচন করা সম্ভব না। যেমন ধরুন- পুলিশ প্রয়োজন। এছাড়া অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রয়োজন। নির্বাচনে প্রায় বারো লক্ষ লোকের প্রয়োজন হয়। এরা সবই কিন্তু সরকারের লোক। নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এই প্রায় বারো লক্ষ লোক নির্বাচন কমিশনের স্থায়ী কোনো লোক নন। এটি সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। কাজেই এই এলিমেন্ট যদি নিরপেক্ষ না হয় এবং তারা যদি টাকা পয়সা নেয়া কিংবা ভয়-ভীতির মধ্যে থাকে তাহলে এই নির্বাচন কমিশন শুধু নয় কোনো নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

রেডিও তেহরান: আচ্ছা জনাব ড. এম সাখাওয়াত হোসেন- নির্বাচন কমিশনের গঠন প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক আছে- এ সম্পর্কে কি বলবেন আপনি?

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: দেখুন, নির্বাচন কমিশনের যে গঠন প্রক্রিয়া তাতে কখনই নিরপেক্ষ লোকজন পাওয়া যাচ্ছে না। যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে তারা কোনো না কোনো উপায়ে তাদের নিজস্ব কিংবা সমমনা লোকদেরকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আনবেন। নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আসার পর তারা এটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন না। তারা একটি হাইডিগনিফাইড সার্ভিস বলে মনে করে। যে কারণে তারা সরকারের সাথে পেরে ওঠে না। আর সেজন্যই প্রথম থেকেই তারা হাল ছেড়ে দেয়। তারা বলে আমাদের কিছু করণীয় নেই। কিন্তু তাদের তো কিছু করণীয় আছে। আমি যেটা মনে করি সেটি হচ্ছে, কমপক্ষে নির্বাচন কমিশনকে নিজেদের মতো করে চেষ্টা করা উচিত। নির্বাচনের যেসব আইন কানুন আছে সেগুলো প্রয়োগের চেষ্টা করা। সেসব আইন প্রয়োগ করার পরও যদি না পারা যায় তখন ফ্যাক্টরগুলো আলাদা করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হচ্ছে- ধরুন আমি নির্বাচন কমিশনার আমাকে চেষ্টা করতে হবে কন্ট্রোল করার। যদি অভিযোগ আসে নির্বাচনে ক্রটি সম্পর্কে তখন সে ব্যাপারে অ্যাকশান নিতে হবে। আর যদি তা না করা হয় তাহলে বুঝতে হবে আমরা পার্টিজন। সরকারের ভয়-ভীতি কাজ করে। একারণে  ১৯৭৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত ব্যতিক্রম শুধুমাত্র- নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে কয়েকটি নির্বাচন; এর বাইরে সব নির্বাচনই কোনো স্ট্যান্ডার্ট নির্বাচন হয় নি। ফলে প্রথম বিষয়টি হচ্ছে- নির্বাচন কমিশনের গঠন প্রক্রিয়ায় সমস্যা আছে। নিরপেক্ষ ব্যক্তি পাওয়া যায় না। সর্বজনবিদিত মানুষ দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করা সম্ভব হয় না। কাজেই শুরু থেকেই তারা দুর্বল থাকে। শুধুমাত্র আমরা দেখেছি নিরপেক্ষ সরকারের আওতায় যে কয়টি নির্বাচন হয়েছিল সেই নির্বাচন ছিল অন্য যেকোনো নির্বাচন কমিশনের তুলনায় অনেক অনেক আলাদা। আমার কাছে হাতে গোণা মাত্র চারটি নির্বাচন কমিশন খুবই আলাদা ছিল। বাকি সবাই একই পথের পথিক-সেটি বিএনপির আমলে হোক কিংবা অন্য যেকোনো আমলে হোক।

১৯৯১ সালে একটি খুব ভালো নির্বাচন হয়েছিল। সেই নির্বাচনে বিএনপি জিতল। তারপর তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার যিনি ছিলেন তিনি চাপ সহ্য করতে পারলেন না। তখন উনি মাগুরা নির্বাচনের কাণ্ডটা ঘটিয়ে ফেললেন। তারপর তিনি সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলিয়েট ডিভিশনের জাজ হলেন। ফলে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের ইতিহাস যদি আপনি খোঁজেন তাহলে হাতে গোণা চারটি নির্বাচন কমিশন ছাড়া বাকিদের সত্যিকারার্থে নির্বাচন কমিশন বলা যাবে না।

রেডিও তেহরান: তো জনাব ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশের চলমান পৌরসভা নির্বাচনসহ সামগ্রিক নির্বাচন ব্যবস্থা, প্রক্রিয়া এবং সরকারি দল ও বিরোধীদলের মত নিয়ে রেডিও তেহরানের সাথে কথা বলার জন্য আপনাকে আবারও অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print