বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেছেন, দুর্নীতি এবং ক্যাসিনোবিরোধী চলমান অভিযানে যদি সরকারের দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী সত্যি সত্যি রাঘববোয়ালরা ধরা পড়ত তাহলে আমরা সবাই আশ্বস্ত হতাম, আনন্দিত হতাম। কিন্তু বাস্তবে তেমনটি দেখছি না।

রেডিও তেহরানকে দেয়া সাক্ষাৎকারে একথা বলেন তিনি। সাইফুল হক বলেন, মাদকবিরোধী, ভেজালবিরোধী অভিযানের মতো এ অভিযানও একসময় মুখথুবড়ে পড়বে। চলমান অভিযান প্রচারসর্বস্ব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বর্তমান অভিযানের পরিণতি সম্পর্কে তিনি বলেন, হয়তো চলমান অভিযান আরও কিছুদিন চলবে। গণমাধ্যম, প্রেস মিডিয়া এ বিষয়টি নিয়ে হৈচৈ করবে, চায়ের আসরে ঝড় উঠবে অনেক আলোচনা হবে তবে শেষ পর্যন্ত এটি মুখথুবড়ে পড়বে কারণ এর শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। যদি শেষপর্যন্ত শেকড় ধরে টানতে চায় তাহলে এই সরকার বা এধরনের সরকারগুলোর  অস্তিত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠবে।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব সাইফুল হক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান শুদ্ধি অভিযানে শুধু চুনোপুঁটি নয়, রাঘববোয়ালরাও রেহাই পাবেন না। যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া যাবে তাকেই আইনের আওতায় আনা হবে- একথা বলেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। আপনার কী মনে হয় ক্ষমতাসীন দল এ ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে পারবে?

সাইফুল হক: দেখুন, আমি এ বিষয়ে প্রথমেই বলব ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যে কথাটি বললেন চুনোপুঁটি নয়, রাঘববোয়ালরাও রেহাই পাবেন না। যদি তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী বিষয়টি সেভাবে সত্যি সত্যি হতো তাহলে আমরা নিশ্চয়ই আনন্দিত হতাম এবং দেশবাসী খানিকটা আশ্বস্ত হতো। কিন্তু বাস্তবে তেমনটি দেখছি না। এ পর্যন্ত আমাদের যে অভিজ্ঞতা তাতে এ ধরনের অভিযানে কিছুটা আগাছা পরিষ্কার করার উদ্যোগ চলে। কিন্তু যখন শেকড়সহ বেরিয়ে আসে তখন দেখা যায় অধিকাংশই সরকারি দল বা সরকারের সংঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। যখন প্রকাশ্যে তাদের নামধাম বেরিয়ে আসে তখন অজ্ঞাত কোনো কারণে অভিযানে ভাটা পড়ে। এবারও অভিযান শুরু হওয়ার প্রথম দিকে মানুষ কিছুটা হতবাক হলেও আগ্রহ নিয়ে দেখেছে তবে এরইমধ্যে অভিযান অনেকখানি প্রশ্নবিদ্ধ হতে শুরু করেছে। সত্যি সত্যি রাঘববোয়ালরা ধরা পড়বে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে এ ব্যাপারে এখনও পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।

রেডিও তেহরান: এপর্যন্ত অভিযান যা চলেছে তাতে কি আপনার মনে হয় যে, রাঘববোয়াল পর্যায়ের কেউ ধরা পড়েছে? যদি না হয় তাহলে তার কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

সাইফুল হক: দেখুন, প্রথমত বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় রয়েছে। বলাচলে প্রায় ১১/১২ বছর ক্ষমতায় আছে। ফলে সঙ্গতকারণে রাঘববোয়ালরা একেবারে সরকারের আঙিনার লোকজন। স্বাভাবিকভাবে তাদেরকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক মাফিয়া বা রাজনৈতিক মাফিয়ারা গড়ে উঠেছে এবং তারা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় রয়েছে। ফলে তাদেরকে ধরার অর্থ হচ্ছে সরকারের শেকড়ে টান পড়বে। ফলে সেরকম একটা  আতঙ্কের জায়গা থেকে দেখলে অভিযানের বিষয়টি অনেকটা প্রচার সর্বস্ব বিষয় হিসেবে পর্যবসিত হয়। শেষ পর্যন্ত দুই একজন রাঘববোয়াল ধরা পড়লেও পড়তে পারে কিন্তু একেবারে শেকড়সহ উপড়ানো বা তুলে ফেলার কোনো লক্ষণ আমি অন্তত এ পর্যন্ত দেখি নি।

নিশ্চয়ই আপনাদের মাদকবিরোধী অভিযানের বিষয়টি মনে থাকার কথা। তাতে দুইশ’রও বেশি লোককে হত্যা করা হয়েছে। তারপরও মাদক কিন্তু বন্ধ হয় নি। আর মাদকসম্রাট হিসেবে যারা পরিচিত তারা অনেকেই ধরাছোয়ার বাইরে। ভেজালবিরোধী অভিযানের কথাও আমরা জানি। সেটাও মুখ থুবড়ে পড়েছে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসাবিরোধী অভিযান নিয়ে এখনও পর্যন্ত আশাবাদী হওয়ার মতো তেমন কোনো জায়গা দেখা যাচ্ছে না।

রেডিও তেহরান: জনাব সাইফুল হক এ বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ আশাবাদ ব্যক্ত করছেন আবার কেউ কেউ ভিন্নমতপোষণ করছেন। তো এই ঘোষণা বাস্তবায়নের পথে আওয়ামী লীগের সামনে কোনো চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে হয় আপনার?

সাইফুল হক: দেখুন, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়ার পর বর্তমান সরকার যে ক্ষমতায় এসেছে তাতে সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

দেখুন, রাষ্ট্র একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক দল থেকেই হয় সরকার এবং তারা রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দিয়ে থাকে। গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পর সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক কতৃত্ব আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। আর অনিয়মের সাথে যারা যুক্ত ছিলেন তাদেরকে এখন সৎপথে আনা অনেকখানি স্ববিরোধী। কারণ সরকারের নৈতিক জায়গা যেহেতু দুর্বল ফলে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করাটা প্রায় অসম্ভব।

দ্বিতীয়ত যে বিষয়টি আমি বলতে চাইব সেটি হচ্ছে, দেশের রাজনীতি এবং অর্থনীতি এ দুটো বিষয়েই পুরোপুরি দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে। অথবা আমি বিষয়টিকে ঘুরিয়ে বললে এমন হবে-দুর্বৃত্তদের একটি রাজনীতিকরণ হয়েছে। দুটো বিষয়ই দুর্বৃত্তায়নের একটি মহা পঙ্কিলতার মধ্যে পড়েছে। ফলে অবশ্যই এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পুরো দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির উৎপাটন ছাড়া এটির সমাধান আছে বলে আমি মনে করি না।

রেডিও তেহরান: ওবায়দুল কাদের আরেকটি কথা বলেছেন যে, খালেদা জিয়া যা পারেননি শেখ হাসিনা পেরেছেন; খালেদা জিয়ার আমলে এই ধরনের মদ জুয়ার আসর বসলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি। অন্যদিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আওয়ামী লীগ দেশকে জুয়াড়িদের দেশে পরিণত করেছে। এই অভিযোগগুলোর সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কি?

সাইফুল হক: আপনারা জানেন যে ৭২’র পর আমাদের দেশে মদ জুয়া হাউজি এগুলো বন্ধ ছিল। ৭৫’র পটপরিবর্তনের পর যখন দেশের অর্থনীতি অনেক বেশি বাণিজ্যিকীকরণ করা হলো তখন তার পাশাপাশি তৎকালীন সরকার পর্যায়ক্রমে এসব বিষয়কে একধরনের বৈধতা দিল। তাছাড়া পুঁজিবাদী অর্থনীতির অনিবার্য অনুষঙ্গ এই মদ জুয়া হাইজি ক্যাসিনো। রাজনীতির মধ্যে বিকৃত পুঁজিবাদ চলবে, লুন্ঠনের তৎপরতা চলবে তার পাশাপিাশি এসব অনৈতিক কাজ চলবে না সেটি অনেকখানি স্ববিরোধী।

আরেকটি কথা, যদি ধরেও নেই খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে ক্যাসিনো ব্যবসা শুরু হয়েছে এবং তিনি এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেন নি। সেক্ষেত্রে নিশ্চয়ই সেই সরকারের এটি একটি ব্যর্থতা। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই ব্যর্থতার কথা বলে ১২ বছর ধরে যে দলটি ক্ষমতায় রয়েছে তাদের ব্যর্থতাকে আড়াল করার যুক্তিগ্রাহ্য কোনো কারণ নেই। গত এতটি বছর তাহলে বর্তমান সরকার কী করলেন? খুব সঙ্গতভাবে সে প্রশ্নটা আসছে বা আসবে। এগুলো হচ্ছে অপরের ঘাড়ে বন্দুক রেখে নিজেদের পাপের কিছু স্খলন করার চেষ্টা। আমাদের দেশে থাকা সরকার রাজনীতির মধ্যে থাকা কোনো সংকটের গভীরে না গিয়ে ব্লেমগেমের যে রাজনৈতিক খেলা অথবা পরস্পরকে রাজনৈতিকভাবে ঘায়েল করার যে খেলা সেটাই চালাচ্ছে। এরফলে মূল লক্ষ্যটা আসলে হারিয়ে যায়। ফলে এরইমধ্যে ব্লেমগেমের একটা পর্যায়ের মধ্যেই আমরা পড়ে গেছি বলে আমার ধারনা।

রেডিও তেহরান: সর্বশেষ যে প্রশ্নটি আপনার কাছে করতে চাই সেটি হচ্ছে- বলা যায় একেবারে আকস্মিকভাবে অভিযানটি শুরু হয়েছে। এর কারণ কি এবং এই অভিযানের পরিণতি কী হতে পারে বলে আপনার ধারণা?

সাইফুল হক: দেখুন, এরইমধ্যে সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক বৈধতার যে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের বিভিন্ন দুর্নীতির বিষয় এত বেশি বেফাঁস হয়ে যাচ্ছিলো যে সব লিমিট ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ-হরেকরকম লীগের দুর্নীতি-দুর্বৃাত্তয়ন সমস্ত সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল। ফলে চলমান অভিযান কিছুটা সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার উদ্যোগ। সরকারের অবস্থান যেভাবে নড়বড়ে হয়ে গেছে সেই জায়গাটা কিছুটা ফিরিয়ে আনার একটা তৎপরতা হিসেবে দেখছি।

আর এর পরিণতি সম্পর্কে বলব- হয়তো চলমান অভিযান আরও কিছুদিন চলবে। গণমাধ্যম, প্রেস মিডিয়া এ বিষয়টি নিয়ে হৈচৈ করবে, চায়ের আসরে ঝড় উঠবে অনেক আলোচনা হবে তবে শেষ পর্যন্ত এটি মুখথুবড়ে পড়বে বলেই আমার আশঙ্কা। কারণ এর শেকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। যদি শেষপর্যন্ত শেকড় ধরে টানতে চায় তাহলে এই সরকার বা এধরনের সরকারের  অস্তিত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠবে।

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print