দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান বাংলাদেশকে সামগ্রিকভাবে সুশাসনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এটি বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাঈমুল ইসলাম খান।

তিনি বলেছেন, আমি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নিয়ে আশাবাদী। আমার বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রী এ অভিযান এগিয়ে নিয়ে যাবেন। যদিও চ্যালেঞ্জ আছে। তবে তিনি কোনো চ্যালেঞ্জকে পরোয়া করেন না। তিনি নিজ মুখে যে বলেছেন-আমার এখনকার জীবন বোনাস জীবন। তাই তিনি মৃত্যুকেও ভয় পান না।

বিশিষ্ট এ সাংবাদিক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এই টার্মটি ঐতিহাসিক।২০২০ সাল বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী,২০২১ স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী এবং ২০২২ হচ্ছে তাঁর নিজের জন্মের হীরকজয়ন্তী। ফলে তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন কাজের মাধ্যমে তাঁর লিগেসি এস্টাবলিস করার।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব নাঈমুল ইসলাম খান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি বলেছেন, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে। এজন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দুর্নীতির কারণে সমাজে বৈষম্যের সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সরকারের বিশাল সব অর্জন দুর্নীতির কারণে নষ্ট হতে দেয়া যাবে না। তো দুর্নীতি বিরোধী চলমান অভিযান সম্পর্কে আপনি কতখানি আশাবাদী?

নাঈমুল ইসলাম খান: দেখুন, দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান নিয়ে শুরুর দিকে অনেক সাধারণ মানুষের মতো আমিও সন্দিহান ছিলাম যে এই অভিযান হয়তো সাময়িক, লোকদেখানো এবং ফলবিহীন একটি অভিযানের উদারহণ হবে। এ ধরনের একটি আশঙ্কা ছিল আমার মধ্যে।

তবে যতদিন যাচ্ছে ততই বিষয়টি নিয়ে সেই আশঙ্কার জায়গাটা আর থাকছে না। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য থেকে দেখতে পাচ্ছি এই দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযানটা আওয়ামী লীগের নিজের দলের ভেতর থেকে শুরু হয়েছে। আর এই অভিযানের বিষয়ে আওয়ামী লীগের অধিকাংশ সিনিয়র ও শক্তিশালী নেতারা প্রথমে জানতেন না। তারাও দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান নিয়ে হতচকিত। তবে প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্টভাবে এবং দৃঢ়তার সাথে অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন।

আর এ বিষয়ে আমি গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে একটা লেখা লিখেছিলাম। তাতে একটা আশাবাদ ছিল সেটার অনুকূলে যায় সরকারের এই দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের বিষয়টি।

আমি লিখেছিলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবার যদি নির্বাচিত হন তাহলে তার দীর্ঘ শাসনামলের জন্য তো তিনি একটা ইতিহাস সৃষ্টি করবেন। তারপর তাঁর দায়িত্ব হবে দেশে সুশাসন এবং গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে কাঙ্খিত লিগেসির বিষয়টি নিয়ে কাজ করা।

আর সেকারণেই আমি বলছি যে, দুর্নীতিবোধী শুদ্ধি অভিযানটি যদি অব্যাহতভাবে চলে তাহলে সামগ্রিক সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী সে কারণেই এর আগেও বলেছেন এবং সম্প্রতি নিউইয়র্কে বলেছেন, দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযান অব্যাহতভাবে চলবে এবং নিজের ঘর থেকেই তা চলতে থাকবে।

রেডিও তেহরান: জনাব নাঈমুল ইসলাম খান, এ বিষয়টি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। দেশের আপামর জনতা কিন্তু এই অভিযানকে সমর্থন জানিয়েছেন এবং এ ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন যদিও ভিন্নমতও রয়েছে। তো এই ঘোষণা বাস্তবায়নের পথে সরকারের সামনে কি কোনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে? থাকলে তা সরকার কীভাবে কাটিয়ে উঠতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

নাঈমুল ইসলাম খান: দেখুন, প্রধানমন্ত্রীর ওই ঘোষণা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অবশ্যই চ্যালেঞ্জে আছে। আর সেটা নানাভাবে স্পষ্ট হয়েছে।

যেমন ধরুন, এই অভিযানের সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা প্রধানমন্ত্রীর জায়গা থেকে শেখ হাসিনাকে দিতে হয়েছে। এটি কিন্তু কোনো মন্ত্রী, পুলিশের কর্তাব্যক্তির সিদ্ধান্ত নয়। তাছাড়া মন্ত্রী ও নিরাপত্তাবাহিনীর কর্মকর্তারা বলেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত না দিলে আমরা এই অভিযানে যেতে পারতাম না। তারপর আরও একটি বিষয় বলতে চাই। আপনার হয়তো মনে আছে যে, অভিযান শুরুর পর যুবলীগের চেয়ারম্যান বলেছিলেন, যদি এভাবে আঘাত আসতে থাকে তাহলে সেটি হবে বিরাজনীতিকরণের একটি ষড়যন্ত্র। তিনি এমনটি মনে করেছিলেন। এটি কিন্তু সিরিয়াস অ্যাটেম্পট। এরপর যুবলীগ নেতা বলেছিলেন আমরা কিন্তু চুপ করে থাকব না। তিনি ভেবেছিলেন তাদের যে অর্থ এবং পেশিশক্তি হয়তো হাইকমান্ডকে বিচলিত করবে। কিন্তু তেমনটি  দেখা যায় নি।

দেখুন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাঝে মাঝে বলেন, তিনি বোনাস লাইফে আছেন। এতবার ওনার উপর হামলা হয়েছে যে ওনার তো বেঁচে থাকারই কথা ছিল না। আমিও সেটি বিশ্বাস করি। ফলে প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত জীবনের পরোয়া করেন না। আর যিনি পরোয়া করেন না তাকে তো ভয় দেখানো যায় না।

প্রধানমন্ত্রী আরও একটি কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ১/১১ এর পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে তিনি এটি করেছেন। সেসময় ১/১১ করে বস্তা বস্তা টাকা উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে আমরাই সেই উদ্যোগ নেব যাতে ১/১১ প্রয়োজন না পড়ে। আর সে কাজটি আমার ঘর থেকেই শুরু করব। প্রধানমন্ত্রীর একথাটি কি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রণিধানযোগ্য নয়। ফলে আমি এখন একটু আশাবাদী হয়ে উঠেছি। এ অভিযান শুধু দুর্নীতি নয় সামগ্রিক একটা সুশাসনের দিকে বাংলাদেশকে  এগিয়ে নিয়ে যাবে। শুধু তাই নয় এটা সম্ভবত বাংলাদেশে গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে।

রেডিও তেহরান: সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যা পারেননি শেখ হাসিনা পেরেছেন; খালেদা জিয়ার আমলে এই ধরনের মদ জুয়ার আসর বসলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি। প্রশ্ন হচ্ছে, যে কাজ সাবেক প্রধানমন্ত্রী পারেননি তা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কীভাবে পারছেন?

নাঈমুল ইসলাম খান: দেখুন, সিভিল ও মিলিটারি প্রশাসন দিয়ে শেখ হাসিনার অবস্থান সুসংহত। বাহ্যিকভাবে আমরা এমনটিই দেখছি। তবে শেখ হাসিনার অবস্থান যে সুসংহত তার ইনডিকেশনও আমরা দেখতে পাই। পাশপাশি এর দুর্বল দিকও আছে। আবার শক্তিশালী সুসংহত দিকও আছে। উভয় দিকের বিবেচনায় আমরা যারা পর্যবেক্ষণের দৃষ্টিতে দেখি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি ইউনিক পজিশন হোল্ড করেন। ব্যাপারটি এরকম যে তাঁকে ছাড়া আমাদের দেশের যেকোনো ইনস্টিটিউশন কাজ করতে ভয় পায়। এতটাই নির্ভরতা প্রধানমন্ত্রীর উপরে। এটি কিন্তু আবার একদিক থেকে উইকনেসও কিন্তু। এমনটি হওয়ার কথা না!

তারপরও আমি উত্তরোত্তর আশাবাদী হয়েছি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নিয়ে। আমার বিশ্বাস উনি এটিকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান ৫ বছরের টার্মটা তার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। এর কারণ হচ্ছে, আপনারা জানেন এই টার্মের মধ্যে পড়ছে ২০২০ হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী। আর বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবাষির্কী উদযাপনের সময়ে তিনি দেশে সুশাসন ও গণতন্ত্রকে ইতিবাচক করতে চান। গণতান্ত্রিক নেতা হিসেবে বিশ্বপরিসরে বঙ্গবন্ধুর যে মর্যাদা সেই মর্যাদার জন্য এটি প্রয়োজনীয়। শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর মর্যাদা রক্ষার জন্যই এটি করবেন। তারপর ২০২১ হচ্ছে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো সবসময় থাকবেন না। সেক্ষেত্রে উনি কী লিগেসি রেখে যাচ্ছেন এ বিষয়টি ওনার মাথায় সবসময় অনেক বেশি কাজ বলে আমি মনে করি। প্রধানমন্ত্রী প্রায়ই বলেন, বয়স হয়েছে; অনেক কিছু মনে থাকে না তিনি অবসরে যাবেন ইত্যাদি। এসব কথা তিনি বলছেন। তারমানে হচ্ছে তিনি তার পক্ষে সম্ভব এমন সর্বোচ্চটা দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন একজন শক্তিশালী গণতান্ত্রিক নেতা হিসেবে।

এরপর ২০২০ হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭৫ তম জন্মবার্ষিকী বা হিরকজয়ন্তী। ফলে আগামী ২০২০, ২০১২১ ও ২০২২ এই তিনটি বছর অত্যন্ত মাহেন্দ্রক্ষণ। ফলে এরচেয়ে আর কী হতে পারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার চূড়ান্ত লিগেসি এস্টাবলিস করার?

রেডিও তেহরান: সর্বশেষ যে প্রশ্নটি আপনার কাছে করতে চাই সেটি হচ্ছে- বলা যায় একেবারে আকস্মিকভাবে অভিযানটি শুরু হয়েছে। এর কারণ কি? বিএনপি অভিযোগ করছে যে, অনেক বড় অপরাধ ধামাচাপা দেয়ার জন্য এই অভিযান চালানো হচ্ছে। এরই বা কতখানি সত্যতা রয়েছে?

নাঈমুল ইসলাম খান: দেখুন, আপনি যে প্রশ্নটি করলেন তার উত্তরে বলব-বিষয়টি দুরকম হতে পারে। আমি কিন্তু আশাবাদের কথা বলেছি। আমি কিন্তু নিশ্চিত নই। পৃথিবীর রাষ্ট্রগুলোকে পর্যালোচনা করলে আমরা কিন্তু কোথাও দেখি না একটি দেশ একটি শর্ট প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতিমুক্ত হয়ে যায়। আমি বলতে চেয়েছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার এবারের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাকালীন সময়ে গণতন্ত্র এবং সুশাসনের শুরুটা করে যাবেন। এটি আমাদের জাতীয় জীবনে সুদৃঢ় হতে আরও একটা বা দুইটা টার্ম লাগতে পারে। তবে আমি এটা আশাকরি না আগামী ছয়মাসের মধ্যে সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে ব্যাংকের যেসব অনিয়ম দুর্নীতি রয়েছে আমার ধারনা সেখানেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছু করার চেষ্টা করবেন। তিনি সূচনা করলেন এবং ধাপে ধাপে বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করবেন।

আর কৌশলগতভাবে প্রধানমন্ত্রী যদি সব ফ্রন্টকে একসাথে ধরেন সেক্ষেত্রে ওনার অস্তিত্ব বিপন্ন হতে পারে। সুতরাং এক্ষেত্রে কিছু কৌশলও থাকবে তাঁর। তবে আমি যেকথা আগেই বলেছি-আগামী তিনটা বছর আমাদের জন্য অসাধারন একটা সময়। এরকম একটা ঐতিহাসিক সময়ে বঙ্গবন্ধু কন্যা সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক নেতার লিগেসিটা এস্টাবলিস করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন বলে আমি আশা করছি।

আমি কখনই একথা বলব না যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবকিছুই অতি দ্রুততম সময়ে ঠিক করে ফেলবেন। আর এধরনের আশা করাটা সম্ভবত বোকামি হবে।বিরোধী দল অনেক কিছুই বলতে পারে। তাদের বলার অধিকার আছে। তবে আমার আশা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে এবং কৌশলের সাথে এগোবেন।

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print