ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগামীকাল ঢাকা আসছেন। ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। তবে নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় আসছেন মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে।

অন্যকোনো কারণ না থাকলেও বাংলাদেশ ভারতের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে কোনো আলোচনা এবং ফলপ্রসূ কোনো জায়গায় যাবে কি না এসব বিষয়ে বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার  অধ্যাপক ড.ইমতিয়াজ আহমেদ রেডিও তেহরানকে বললেন,

তিস্তার সমাধান ভারত করবে বলে মনে হয় না। এর সমাধান বাংলাদেশকেই করতে হবে এবং বাংলাদেশ একরকম সমাধান খুঁজে নিয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে থাকতে চীন।

এতে ভারত নড়েচেড়ে বসবে কি না সেটা দেখার বিষয়।

সীমান্ত হত্যা এমনিতেই বন্ধ হবে না। ভারতের ওপর সেদেশের জনগণ, সমাজকর্মী, সাংবাদিকমহলের চাপ তৈরি হলে হয়তো হতে পারে!  সবকিছুর পরও ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ২৬ ও ২৭ মার্চ ঢাকা সফর করবেন। কীভাবে দেখছেন এই সফরকে?

ড.ইমতিয়াজ আহমেদ: দেখুন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরটি মূলত  বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী বা স্বাধীনতার ৫০ বছর উপলক্ষে । তিনি ২৬ তারিখ আসবেন বলে কথা রয়েছে তবে এরইমধ্যে একাধিক নেতা বাংলাদেশে এসে পৌঁছেছেন। ফলে বলা চলে এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে মোদির ঢাকা সফর; অন্যকোনো উদ্দেশ্যে নয়।

রেডিও তেহরান: ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের এখনো নানা ইস্যুতে অপ্রাপ্তি রয়েছে। যেমন তিস্তার পানি বণ্টন না হওয়া, বিএসএফ’র হাতে সীমান্ত হত্যা অব্যাহত থাকা ইত্যাদি। তো আপনি যেকথাটি বললেন সেটি হচ্ছে-নরেন্দ্র মূলত বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে আসছেন। তার বাইরেও যেহেতু এসব এসব ইস্যু বেশ সেনসেটিভ এবং এসব নিয়ে বেশ কথাবর্তা হচ্ছে। তো মোদির আসন্ন সফরে এসব বিষয়ে কি কোনো আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে আপনি মনে করেন।  

ড.ইমতিয়াজ আহমেদ: আমার মনে হয় না; বিশেষ করে তিস্তার বিষয়ে কোনো আলোচনা হবে বলে মনে হয় না।এর বড় দুটো কারণ আছে। একটি হচ্ছে- ভারতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে আগামী মাসে বিধানসভা নির্বাচন হতে যাচ্ছে। যেখানে বিজেপি চেষ্টা করছে প্রাধান্য বিস্তার করতে। তো সেই নির্বাচনের আগে মোদি সরকার কিছু বলবে বলে আমার মনে হয় না।

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশ তিস্তার বিষয়ে অনেকটা নিজেরাই পথ বেছে নিয়েছে। যেহেতু বছরের পর বছর তিস্তার বিষয়টি ঝুলে আছে এবং তাতে বাংলাদেশের যথেস্ট ক্ষতি হয়েছে; এখনও হচ্ছে। বাংলাদেশ মোটামুটিভাবে এ বিষয়ে একটা সমাধান জোগাড় করে ফেলেছে। সেটি হলো নিজ দেশের ভেতরে পানি কিভাবে সংরক্ষণ করা যায়। যখন বৃষ্টির মৌসুমে পানি আসে তখন নিজেদের ভেতরের পানি কিভাবে ধরে রাখা যায় সেই জায়গায় চীনের সাথে চুক্তির চিন্তা ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ বেশ খানিকটা অগ্রসর হয়েছে। সেই হিসেবে মনে হচ্ছে তিস্তার সমাধান বাংলাদেশ নিজেই করবে।

আর সীমান্ত হত্যার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে খুব একটা লাভ হয়নি। এটা সমাধান করতে ভারতকে। ভারতের যারা হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট ও মিডিয়া আছে-তারা যখন সীমান্ত হত্যা নিয়ে বড় আকারে তাদের সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করবে তখন সেদেশের সরকার উদ্যোগ নিতে পারে। কারণ এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিং হচ্ছে সীমান্তে। যাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে তারা হতে পারে চোরাকারবারী কিন্তু যেহেতু তারা আনআর্মড চোরাকারবারী-তাদের হত্যা করার কথা পৃথিবীর কোনো আইনে নেই এমনকি ভারতের আইনেও না। চোরাকারবারীকে দেখামাত্র গুলি করতে হবে এমন আইন নেই। তো সেই জায়গায় এটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। আমি মনে করি ভারতের জনগণ এবং মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিকরা যখন যখন জেগে উঠবে তখন সমাধান হতে পারে। তবে আমার মনে হয় না এখন কোনো আলোচনায় এর সমাধান হবে। এটি ভারতের রাষ্ট্রীয় বিষয়। ভারত কখন সেদিকে যাবে এবং চাপটা কখন আসবে-সেটা আমার আপাতত জানা নেই। তবে চাপ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ এই ইস্যুর সমাধান হবে, একবারে শূন্যে নেমে আসবে বলে আমি মনে করি না।

রেডিও তেহরান: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা যাচ্ছে- তিস্তা নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীর পানি বণ্টন না হলেও দু দেশের মধ্যকার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হয়েছে। আমরা সম্প্রতি লক্ষ্য করলাম বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন তিস্তার চুক্তি দশ বছর আগেই হয়ে আছে। তো যদি চুক্তি হয়েই থাকে তাহলে সে চুক্তির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি কেন তা নয়ে কিন্তু প্রশ্ন উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের পররাস্ট্রমন্ত্রী ঢাকা সফর করলেন। তিনিও তিস্তা চুক্তির বিষয়ে বললেন।তো আসলে এই তিস্তা চুক্তি হয়েছি কি হয়নি তা নিয়ে কথা হচ্ছে। যে কথাটি বলছিল যে নিশ্চেই এটি বাংলাদেশের উদারতার পরিচয়। এই সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার ক্ষেত্রে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিতর্ক থাকলেও! আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ড.ইমতিয়াজ আহমেদ: তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যেটা বলতে চেয়েছেন সেটি হচ্ছে আমাদের দিক থেকে যে চুক্তি হওয়ার কথা ছিল সেটা মনমোহন সিং যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তখন হয়ে গেছে। তবে পানির বিষয়টি ভারতের সংবিধানে রাজ্যগুলোরও বিষয়। বিশেষ করে এ বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের সংশ্লিষ্টতা আছে এবং সে বেঁকে বসেছে। তাদের বেঁকে বসার কারণ হচ্ছে-মূলত তিস্তা শুরু হয় সিকিম থেকে। সিকিম তাদের ওখানে ১৬/১৮ টা হাইড্রো ড্যাম বানিয়েছে। আমি নিজেও সেখানে গিয়েছিলাম। আমি দেখেছি যে, ঐ হাইড্রো ড্যাম তেরির ফলে সিকিম থেকে যে পানিটা  তিস্তা দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আসে সেটা বলতে গেলে একেবারে নেই বললেই চলে। সেই নেই পানিকে কিভাবে ভাগ করবে সেটাই হলো মমতা ব্যানার্জীর কথা। মমতা ব্যানার্জী চাচ্ছে সিকিমের ঐ হাইড্রো ড্যামগুলো যদি বন্ধ করা না যায় কিংবা ভেঙে ফেলা না যায় তাহলে পানি আসবে না। আর কেন্দ্রীয় সরকার ও সিকিম সরকার সেটি বন্ধ করবে না। ঐ প্রকল্পের সাথে বিশ্ব ব্যাংকও জড়িত। ফলে তিস্তার যেটুকু পানি পশ্চিমবঙ্গে আসছে সেটা দেয়ার মতো নয়। ফলে আমি মনে করি না এটি কেবলমাত্র মমতা বন্দোপাধ্যায়ের বিষয়। কারণ এখানে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন  আমার মনে হয় কেউ এই পানি দিতে রাজী হবে। কারণ আসলেই সেখানে পানি নেই।

অন্যদিকে এরসাথে সিকিমকে আনার কোনো চেষ্টা দিল্লি সরকার করছে না। কারণ অনেকটা তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিকটাই তারা বারবার বাংলাদেশের কাছে তুলে ধরছে। তবে বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের ধৈর্য এত বছর ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই ধৈর্যের বাঁধ এখন ভেঙে গেছে। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতেই বাংলাদেশ মনে করছে এর সমাধান এখন বাংলাদেশকেই করতে হবে।

আর সমাধান হিসেবে বাংলাদেশ মনে করছে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে বর্ষার সময় যে পানি আসে সেই পানিকে যদি আমরা ধরে রাখতে পারি তাহলে শীতের মৌসুমে সেই পানি ব্যবহার করতে পারব। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে বিষয়টি ব্যয়বহুল। আর সেই বিষয়টিতে যুক্ত হওয়ার জন্য চীন এরইমধ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

অন্যকথায় চীনের এই প্রকল্পে আসাটাও তাদের যতটুকু না স্বার্থ তারচেয়ে বেশি স্বার্থ বাংলাদেশের। এই প্রেক্ষাপটে ভারত নড়েচড়ে উঠবে কি না সেটা বলা মুশকিল। আর তাদেরকে নড়েচড়ে উঠতে হলে সিকিমের একাধিক হাইড্রো ড্যাম ভাঙা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। কিন্তু সেগুলো সে করতে যাবে না। তার উন্নয়নের রাজনীতির মধ্যে এটি অন্যতম একটি বিষয়। আবারও বলব, আলোচনা করে তিস্তার বিষয়টি সমাধান হবে এটি মনে হচ্ছে না। অন্যদিকে চীন এলে- তাতে চীনের প্রভাব অনেকটা বাড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অন্যকথায় ভারতের সাথে চুক্তি আছে কিন্তু সেটাতে পশ্চিমবঙ্গের স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি অধরা থাকবে। কারণ আমি মনে করি না পশ্চিমবঙ্গে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা রাজী হবে না।

রেডিও তেহরান: ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার প্রধান সহযোগী দেশ। কিন্তু অনেকে বলেন, পরবর্তীতে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক সবসময় খুব মধুর হয় নি। এর কারণ কী, তা কী খুব যৌক্তিক ছিল এবং দুদেশের সম্পর্কটা কি সঠিক পথে এগুচ্ছে ?

ড.ইমতিয়াজ আহমেদ: যে কোনো প্রতিবেশী দেশের সাথে সম্পর্কের ওঠানামাটা স্বাভাবিক একটা বিষয়। আমি মনে করি না এটা ব্যতিক্রম। তবে একথাও ঠিক বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক এমন ভালো হয়নি যে সবকিছুতে সাংঘাতিক ভালো সম্পর্ক- এমনটি যেমন হয়নি আবার সবকিছুতে খুব খারাপ তেমনটিও নয়। আপনি যেমনটি বললেন যে এখন বড় ধরনের সম্পর্ক আছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সীমান্ত হত্যা, মাঝে মাঝে নন ট্রেডিশনাল বেরিয়ার দেখতে পাচ্ছি বিভিন্ন ট্রেড রেজিমে। এরপর তিস্তা তো আছেই! তো এগুলোকে আমি অস্বাভাবিক বলে মনে করি না। তবে একথাও সত্য যে ভারতের সাথে সম্পর্ক অন্য দেশের সাথে আমাদের যেমন সম্পর্ক তেমনই; বিশেষ কোনো দিক নিয়ে যে বিশেষ সম্পর্ক করা হয়েছে এমনটি মনে করি না। আমরা সবার সাথে সম্পর্ক করেছি। ভারতের সাথে যেমন সম্পর্ক আছে একইভাবে আমেরিকা,জাপান, চীন-সবার সাথেই সম্পর্ক আছে। এর বড় কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের পররাস্ট্রনীতির যে  নীতি- সবার সাথে বন্ধুত্ব-কারও সাথে শক্রতা নয়’ সেটি কিন্তু বড় আকারে পালন করা হয়েছে। তার ভিত্তিতেই কিন্তু সবার সাথে বন্ধুত্ব আছে। কিন্তু প্রতিবেশী হলে হয়তো মাঝে মাঝে বেশি প্রকাশ পায়। তবে আমি মনে করি না ভারতের সাথে ঐসব ইস্যু নিয়ে  খুব একটা খারাপ হয়েছে সম্পর্ক। শেষ কথা বলব-বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক ভালো এবং এই সম্পর্ক নিয়ে এ অঞ্চলে আরও ভালো উন্নয়ন করা সম্ভব।

রেডিও তেহরান: তো জনাব অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আসন্ন ঢাকা সফর, তিস্তা চুক্তি, সীমান্ত হত্যা, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কসহ নানা বিষয় নিয়ে রেডিও তেহরানের সাথে কথা বলার জন্য আপনাকে আবারও অশেষ ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

ড.ইমতিয়াজ আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print