সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন না বলে জানিয়েছিলেন এবং নির্বাচন স্বচ্ছ হয় নি বলেও মন্তব্য করেন। অবশ্য আজ তিনি কিছুটা ভিন্ন কথা বলেছেন, তবে তিনি তার দাবি থেকে পিছিয়ে আসেন নি সেকথাও বলেছেন।

তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের সিনিয়র সাংবাদিক, দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার মতিউর রহমান চৌধুরী রেডিও তেহরানকে দেয়া এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণ গণতন্ত্রের জন্য দুর্ভাগ্যজনক! এতে সেখানকার গণতন্ত্র চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

বিশিষ্ট এই সাংবাদিক বলেন, জো বাইডেন জমানায় ড্রামেটিক পরিবর্তন আসবে।
ক্ষমতা হস্তান্তর করতে না চাওয়া একধরণের ঝামেলা সৃষ্টি করে নিজের ফায়দা নেয়ার চেষ্টা
ট্রাম্প নির্বাচনের ফলাফল মেনে না নিলে-যা হতে পারে-
একটা সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে
একটি নৈরাজ্য তৈরি হবে।
দেশটি একটি গৃহযুদ্ধের দিকে যেতে পারে
সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করতে পারে
বলাবলি আছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা হবে। ট্যাক্সের মামলা তো আছে। সেসব মামলায় তিনি জেলে যাবেন। কেউ কেউ বলছেন তিনি দর-কষাকষি করছেন। যাতে জেলে যেতে না হয়।
পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। উপস্থাপনা এবং সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব মতিউর রহমান চৌধুরী, সম্প্রতি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী জো বাইডেন অনেক বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্প তা মানতে রাজি নন। বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

মতিউর রহমান চৌধুরী: গণতন্ত্রের জন্য এটি একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন দুইশ বছর পেছনে যেতে চাচ্ছেন সে বিষয়টি আসলে স্পষ্ট নয়। আপনার নিশ্চয়ই জানা আছে হোয়াইট হাউজের প্রথম বাসিন্দা ছিলেন জন অ্যাডামস। দুইশ বছর আগে যে মার্কিন প্রেসেডেন্ট নির্বাচন হলো তাতে জন অ্যাডামস (John Adams) হেরে গেলেন থমাস জেফারসনের (Thomas Jefferson) কাছে। কিন্তু তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন না। তিনি একের পর ঝামেলা তৈরি করতে লাগলেন। শপথ অনুষ্ঠানেও যাবেন না বলে ঘোষণা দিলেন। তখন হোয়াইট হাউজের কর্মচারীরা বেকে বসল। তারা জন অ্যাডামসের কোনো কথাই শুনল না। এক পর্যায়ে তারা প্রেসিডেন্টের সব পরিষেবা বন্ধ করে দিল। অবশেষে তিনি বাধ্য হলেন হোয়াইট হাউস ছাড়তে।

তো ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন দুইশ বছর পেছনে যেতে চাচ্ছেন এটা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। আমেরিকার যারা বড় বড় রাজনীতিবিদ, যাদের কথা শুনি টিভিতে তারা বিষয়টিকে অন্যরকম বলছেন। তারা বলছেন, আসলে বিষয়টি নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঝামেলা তৈরি করার চেষ্টা করছেন যেখান থেকে তিনি ফায়দা নিতে পারেন।

যেমন-ইরানের বিরুদ্ধে তিনি একটা যুদ্ধ ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার উপদেষ্টারা এবং রিপাবলিকানরা তাতে সায় দেন নি। ঠিক এইরকম কোনো একটা পাগলামি তিনি করবেন। আফগানিস্তান এবং ইরাক থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বা দিয়েছেন। সেটাও আমার মনে হয় যে তে তাঁর পরিকল্পনার একটি অংশ।

রেডিও তেহরান: ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি নির্বাচনের ফলাফল মেনে না নেন তাহলে দেশটিতে কি ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে?

মতিউর রহমান চৌধুরী: প্রথমত একটা সাংবিধানিক সংকট তৈরি হবে।

দ্বিতীয় সংকটটি হচ্ছে- সেখানে একটি নৈরাজ্য তৈরি হবে।

তৃতীয়ত-দেশটি একটি গৃহযুদ্ধের দিকে যেতে পারে।

আমেরিকার আগের ইতিহাসের দিকে অর্থাৎ হয়তো পেছনে ফিরে যাবে। এরকম একটা পরিস্থিতি সৃস্টি হতে পারে।

দেশটি এমনিতেই দ্বিধা-বিভক্ত। প্রকট বিভাজনের মধ্যে যদি তিনি ক্ষমতা হস্তান্তর না করেন তাহলে এক পর্যায়ে হয়তো বা সেনাবাহিনী হস্তক্ষেপ করতে পারে। এরইমধ্যে এ ধরনের কিছু আভাস- ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সে কারণে আমার মনে হয় যে তিনি জেনে শুনেই এরকম একটা পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছেন।

অথবা, আরেকটা কারণ আছে। বলাবলি আছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অনেকগুলো মামলা হবে। ট্যাক্সের মামলা তো আছে। সেসব মামলায় তিনি জেলে যাবেন। কেউ কেউ বলছেন তিনি দর-কষাকষি করছেন। ডেমোক্রাটরা যদি তাঁর প্রস্তারে রাজি হন এবং তার বিরুদ্ধে মামলা না করার একটা আশ্বাস দেন তাহলে দেখা যাবে কাল সকালেই তিনি বলবেন যে, না ঠিক আছে আমি ক্ষমতা হস্তান্তর করব।

আসলে ডোনাল্ড ট্রাম্প কি চাচ্ছে রিপাবলিকানরাও সেটা বুঝতে পারছেন না। তার কারণটা হচ্ছে- রিপাবলিকানদের অনেক সিনেটরকে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটা বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন। এটি জেনেও তিনি এদিক সেদিক করছেন। এরইমধ্যে তার ফ্যামিলিতেও একটি সংঘাত তৈরি হয়েছে। এই ইস্যুতে তার পরিবার দ্বিধা-বিভক্ত। তিনি একের পর এক পাগলামিই করছেন।  যারা বলেছেন নির্বাচনে কারচুপি হয় নি, স্বচ্ছ হয়েছিল তাদের ওপর খড়গ নামিয়েছেন। তো ঠিক দু’মাসের ক্ষমতার লড়াইকে আমেরিকায় কি হবে আসলে সেটি স্পষ্ট নয়। যদি ডোনাল্ড ট্রাম্প বাস্তবতাকে মেনে না নেন, পরাজয় স্বীকান না করেন তাহলে কি হবে তা বলা এখন মুশকিল।

আমরা দেখেছি নির্বাচনের ক্যাম্পিং যখন চলছিল তখন প্রায় দিনই তিনি বলেছেন আমি ক্ষমতা হস্তান্তর করব না। তখন অনেক বলেছিল এটা বোধহয় পাগলামি কিন্তু বাস্তবে যে তিনি এটা করবেন তা কেউ কল্পনাও করতে পারে নি!

তারপর তার হিসাবটাতেও গোলমাল হয়ে গেছে। ইলেক্টোরাল কলেজের ভোট এত কম পাবেন সেটা আশা করেন নি। জো বাইডেন পেলেন ৩০৬ আর ডোনাল্ড ট্রাম্প পেলেন ২৩২। উনি ভাবেন নি যে এতটা গ্যাপ হয়ে যাবে। তার ধারণা ছিল খুব কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। সেটা না হওয়ার কারণে তিনি বিষয়টিকে অন্যরকম বলে মনে করেছেন এবং বলছেন ক্ষমতা হস্তান্তর করব না। অথবা তার মাথায় অন্য কোনো পরিকল্পনা আছে যেটা আমরা হয়তো এখনও বুঝতে পারছি না।

রেডিও তেহরান: এবারের নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের মধ্য দিয়ে কী মার্কিন গণতন্ত্রের বড় ধরনের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে?

মতিউর রহমান চৌধুরী: অবশ্যই। এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান অবস্থানের মধ্য দিয়ে মার্কিন গণতন্ত্রের বড় ধরনের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। মার্কিন গণতন্ত্র এখন একটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। কারণ আমেরিকা সারা দুনিয়ায় গণতন্ত্র নিয়ে ছবক দিয়েছে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক দেশে তারা হত্যাকাণ্ডও চালিয়েছে। আর সেই দেশে যদি গণতন্ত্রের আজকের এই অবস্থা হয়! তাছাড়া যে নির্বাচনে কোনো কারচুপি হয় নি। সেই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য তিনি যা করছেন তাতে সেখানকার গণতন্ত্র অবশ্যই একটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

তবে একথাও ঠিক যে ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যে একদম পাগলামিও আছে। উনি যদি বলেন কাল সকালে সবাইকে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে তাহলে তারা সবাই রাস্তায় দাঁড়াবে। এরকম একটা অবস্থা তাঁর সমর্থকদের মধ্যে। এই অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে আমেরিকার যে গণতন্ত্রের কথা আমরা বলি-অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর অন্যতম গণতান্ত্রিক দেশ আমাদের সেই মূল্যায়নটা হয়তোবা ভুল হতে পারে। কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয় আমেরিকা শেষ মুহূর্তে ঘুরে দাঁড়াবে এবং তাঁদের মধ্যে একটা রিয়ালাইজেশন আসবে। আর যদি সেটা না হয় তাহলে সেটা হবে গণতন্ত্র প্রিয় মানুষের জন্য এক দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা।

রেডিও তেহরান: সবকিছুর পর যদি জো বাইডেন ক্ষমতায় বসতে পারেন তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকার ভূমিকায় কোনো পরিবর্তন আসবে বলে আপনার মনে হয়?

মতিউর রহমান চৌধুরী: আমারও তাই বিশ্বাস। আমার মনে হয় ড্রামেটিক কিছু পরিবর্তন আসছে। জো বাইডেন এরইমধ্যে বলেছেন, তার পররাষ্ট্রনীতি হবে মূল ফোকাল পয়েন্ট। এরইমধ্যে তিনি জলবায়ূ পরিবর্তন বিষয়ে একটা ঘোষণা দিয়েছেন। মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে কি সম্পর্ক হবে সে ব্যাপারেও কিছু কথা বলেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ কয়েকটি মুসলিম দেশকে আমেরিকায় যাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন সেটা জো বাইডেন প্রত্যাহার করবেন বলে জানিয়েছেন। আরব বিশ্বে একটা পরিবর্তন আসতে পারে। চীনের সঙ্গে যে বৈরি মনোভাব সেটা দূর হতে পারে। সব মিলিয়ে একটা গণতান্ত্রিক বিশ্ব আমরা দেখতে পাব বাইডেনের জমানায়।

রেডিও তেহরান:  অন্য সব মার্কিন প্রেসিডেন্টের মতো ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি কোনো দেশ সামরিক আগ্রাসন চালান নি। বিষয়টিকে কেউ কেউ ইতিবাচকভাবে দেখেন তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহু বিতর্কিত ভূমিকা রয়েছে বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব ইস্যুতে। সামগ্রিকভাবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের শাসনামলকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

মতিউর রহমান চৌধুরী: দেখুন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরের শাসনামলে আমেরিকার অর্থনীতি ভালো ছিল। কিন্তু আমেরিকাকে তিনি একদম গুটিয়ে নিয়েছেন। প্রতিনিয়ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনে নতুন সিদ্ধান্ত তিনি নিয়েছেন। আরো বড় কথা করোনা ভাইরাস নিয়ে আমেরিকার যে বর্তমান অবস্থা! তিনি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় ফান্ডিং বন্ধ করে দিয়েছেন। এটি যুক্তিসঙ্গত কিংবা বাস্তবসম্মত কোনো সিদ্ধান্ত হয় নি। এসব সিদ্ধান্তে তিনি বিতর্কিত হয়েছেন। আমেরিকার মধ্যে তিনি পপুলিজমের চূড়ান্ত রূপ দিতে চেয়েছেন। আর এটি করতে গিয়ে তিনি দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন।

আর মুসলিম বিশ্বের সাথে ট্রাম্পের জমানায় সম্পর্ক ছিল না সেকথা একেবারে বলা যাবে না তবে এককেন্দ্রীক ছিল। তার পছন্দের কিছু দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছেন। কিন্তু বেশিরভাগ মুসলিম দেশের সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল অন্যরকম।

আর ডোনাল্ড ট্রাম্প যেভাবে মৌলবাদী রাজনীতির চর্চা করেছেন সেটা চলতে থাকতে শুধু আমেরিকা নয় সারা বিশ্বের জন্য হয়তো হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। তবে আমার মনে হয় আমরা একটা নতুন কিছু দেখতে পাব।

রেডিও তেহরান: তো জনাব মতিউর রহমান চৌধুরী, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন এবং পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে রেডিও তেহরানের সঙ্গে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য আবারও আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

মতিউর রহমান চৌধুরী: ধন্যবাদ আপনাদেরকে এবং আপনাদের শ্রোতাদেরকে।

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print