অধুনালুপ্ত সুতানুটি গ্রামের উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রসারিত চিৎপুর রোডের (অধুনা রবীন্দ্র সরণি) দৃশ্য; উইলিয়াম সিম্পসনের ইন্ডিয়া এনসিয়েন্ট অ্যান্ড মর্ডার্ন বইতে প্রকাশিত হয়, ১৮৬৭।


সুতানুটি (পুরনো ইংরেজি বানানে Suttanuttee) হল পশ্চিমবঙ্গের একটি অধুনালুপ্ত গ্রাম। খ্রিস্টীয় সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে সুতানুটি ও তার পার্শ্ববর্তী দুটি গ্রাম কলিকাতা ও গোবিন্দপুরকে নিয়ে আধুনিক কলকাতা শহরটি গড়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসক জব চার্নক (ইংরেজি ঐতিহাসিকেরা যাঁকে “কলকাতার জনক” আখ্যা দিয়েছিলেন) এই গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন।

বর্তমান উত্তর কলকাতার বাগবাজার, শ্যামবাজার ও তার আশেপাশের এলাকাগুলিই অতীতে সুতানুটি গ্রাম নামে পরিচিত ছিল। সুতানুটি, কলকাতা ও ডিহি কলকাতা ছাড়াও অধুনা কলকাতা ও হাওড়া অঞ্চলের চিৎপুর, সালকিয়া, কালীঘাট ও বেতড় (হাওড়ার শিবপুরের কাছে) অঞ্চল নিয়ে কলকাতা ও হাওড়া শহরদুটি গড়ে ওঠে। সুতানুটি ও বেতড় দুটি গ্রামই ছিল গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। সপ্তদশ শতাব্দীতে কলকাতা ও তার আশেপাশের অঞ্চলে যখন নগরায়ণ শুরু হয়, তখন এই দুটি গ্রাম যথাক্রমে কলকাতা ও হাওড়া মহানগরীর মধ্যে বিলীন হয়ে যায়।

বর্তমানে ভারতীয় রেলের কলকাতা মেট্রো বিভাগ প্রাচীন সুতানুটি-সংলগ্ন শোভাবাজার অঞ্চলের মেট্রো স্টেশনটির নামকরণ করেছে “শোভাবাজার সুতানুটি মেট্রো স্টেশন”।

মুঘল যুগ

পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষভাগে লিখিত বিপ্রদাস পিপলাইয়ের মনসাবিজয় কাব্যে এই অঞ্চলের একটি প্রামাণ্য ভৌগোলিক বিবরণী পাওয়া যায়। ব্যান্ডেল ও ত্রিবেণীর মধ্যবর্তী স্থানে হুগলি নদীর তীরে অবস্থিত সপ্তগ্রাম বা সাতগাঁ ছিল একটি বিরাট বন্দর। নদীর ভাটিতে একই পাড়ে বেতড় গ্রামটি ছিল একটি উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে পথিকেরা কেনাকাটা করত ও দেবী চণ্ডীর পূজা দিত। চিৎপুর ও কলিকাতা গ্রাম ছিল বেতরের নিকটবর্তী গ্রাম। সেই যুগে সুতানুটি ও গোবিন্দপুরের অস্তিত্ব ছিল না।

১৫৩০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ বাংলায় পর্তুগিজদের যাতায়াত শুরু হয়। এই যুগে পূর্ববঙ্গের চট্টগ্রাম ও পশ্চিমবঙ্গের সপ্তগ্রাম বন্দরদুটি ছিল বাংলার দুটি প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। পর্তুগিজরা চট্টগ্রামকে বলত “Porto Grande” বা “মহা পোতাশ্রয়” (“Great Haven”) ও সপ্তগ্রামকে বলত “Porto Piqueno” বা “ছোটো পোতাশ্রয়” (“Little Haven”)। সেযুগে টালির নালা বা আদিগঙ্গা ছিল সমুদ্রে যাতায়াতের পথ। সমুদ্রগামী বড়ো বড়ো জাহাজগুলি এখন যেখানে গার্ডেনরিচ, সেই অঞ্চলে নোঙর ফেলত। কেবল মাত্র দেশি ছোটো নৌকাগুলিই হুগলি নদীর আরো উজানের দিকে চলাচল করত।সম্ভবত, সরস্বতী নদী ছিল এই সময়কার আরও একটি জলপথ। এই নদী ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে শুকিয়ে যেতে শুরু করে। ১৫৮০ সালে হুগলি-চুঁচুড়াতে পর্তুগিজরা একটি নতুন বন্দর স্থাপন করে।ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে সপ্তগ্রামের দেশীয় বণিকেরা নতুন একটি বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। তাদের অধিকাংশই হুগলিতে বসতি স্থাপন করলেন। কিন্তু চারটি বসাক পরিবার ও একটি শেঠ পরিবার বেতরের বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে নদীর পূর্বতীরে গোবিন্দপুর গ্রামের পত্তন করেন।ডিহি কলিকাতা গ্রামের উত্তরাংশে বস্ত্রাদি ক্রয়বিক্রয়ের একটি কেন্দ্র গড়ে ওঠে। ১৫৯৬ সালে আকবরের প্রধানমন্ত্রী আবুল ফজল তার আইন-ই-আকবরি গ্রন্থে এই অঞ্চলটিকে সাতগাঁও পরগনার একটি জেলা হিসেবে উল্লেখ করেন। পর্তুগিজদের পর এই অঞ্চলে ওলন্দাজ ও ইংরেজ বণিকেরা পদার্পণ করে।

ব্রিটিশদের আগমন

শোনা যায়, ১৬৫৮ সাল থেকে জব চার্নক ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারী হিসেবে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘোরেন। কাশিমবাজার ও পাটনার পর তিনি কিছুকাল হুগলি, হিজলি ও সুতানুটিতে বসবাস করেন। সুতানুটিতে বসতিস্থাপনকে তিনি সুবিধাজনক মনে করলেও, তার সহকর্মী ও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সে কথা মানতে চাননি। তবে মাদ্রাজের কোম্পানি কর্তৃপক্ষ চট্টগ্রামে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার পর জব চার্নককে সুতানুটিতে বসতি স্থাপনের অনুমতি দেন। ১৬৯০ সালের ২৪ অগস্ট জব চার্নক সুতানুটিতে পদার্পণ করেন। কলকাতার ইতিহাসে এই তারিখটি স্মরণীয়। জব চার্নক প্রায় আড়াই বছর সুতানুটিতে অবস্থান করেছিলেন।

অবস্থানগত নিরাপত্তার কারণে জব চার্নক সুতানুটিকে বসতি স্থাপনের পক্ষে উপযুক্ত মনে করেছিলেন। সেই যুগে সুতানুটি পশ্চিমে হুগলি নদী এবং পূর্বে ও দক্ষিণে দুর্গম জলাভূমির দ্বারা বেষ্টিত ছিল। কেবলমাত্র উত্তর-পূর্ব অংশে প্রহরার প্রয়োজন হত।

সুতানুটি, ডিহি কলিকাতা ও গোবিন্দপুর ছিল মুঘল সম্রাটের খাসমহল অর্থাৎ সম্রাটের নিজস্ব জায়গির বা ভূসম্পত্তি। এই অঞ্চলের জমিদারির দায়িত্ব ছিল বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের উপর। ১৬৯৮ সালের ১০ নভেম্বর জব চার্নকের উত্তরসূরি তথা জামাতা চার্লস আয়ার সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের থেকে এই তিনটি গ্রামের জমিদারির অধিকার কিনে নেন। এরপরই কলকাতা মহানগর দ্রুত বিকাশ লাভ করে। ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিয়মিত এই অঞ্চলের রাজস্ব মুঘল সম্রাটকে দিয়ে এসেছিল।

মহানগরী কলকাতার বিকাশলাভ

বিদ্রোহ ও ছোটো খাটো সংঘর্ষ থেকে আত্মরক্ষার স্বার্থে ব্রিটিশরা কলকাতায় দুর্গস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। দুর্গটির নামকরণ করা হয় তদনীন্তন ইংল্যান্ড ও হল্যান্ডের রাজা উইলিয়াম অফ অরেঞ্জের নামানুসারে। অনতিবিলম্বেই কলকাতা একটি সমৃদ্ধ নগরী রূপে আত্মপ্রকাশ করে। অনেক বণিক, দক্ষ শ্রমিক ও অভিযাত্রী এই শহরে এসে বসতি স্থাপন করেন। পার্শ্ববর্তী দস্যু-উপদ্রুত অঞ্চলগুলি থেকে অনেক শান্তিপ্রিয় নাগরিকও এখানে চলে আসেন। ১৭০০ সালে কলকাতাকে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির থেকে পৃথক করা হয়। স্থাপিত হয় স্বতন্ত্র বাংলা প্রেসিডেন্সি। এরপরই বাংলা, বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিত্রয় স্বতন্ত্রভাবে কাজ করতে শুরু করে। ১৭১৭ সালে মুঘল সম্রাট ফারুকশিয়ার কোম্পানিকে ব্যবসাবাণিজ্য সংক্রান্ত কিছু ছাড় মঞ্জুর করেন। এর ফলে কোম্পানির আর্থিক বিকাশ দ্রুত হয়।

বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলা কলকাতায় দুর্গপ্রতিষ্ঠা সহ অপমানকর সামরিক আয়োজনে ক্ষুব্ধ হন। ১৭৫৬ সালে তিনি কলকাতা আক্রমণ করেন। কলকাতা অধিকার করে তিনি তার দাদামহাশয় আলিবর্দি খানের নামে শহরের নামকরণ করেন আলিনগর। ১৭৫৮ সালে ব্রিটিশেরা কলকাতা পুনর্দখল করলে শহরের পুরনো নাম আবার বহাল হয়। ইংরেজদের নিকট সিরাজের কলকাতা অধিকার ছিল একটি দুঃস্বপ্নের ঘটনা। চিৎপুর, সুতানুটি, কলিকাতা ও গোবিন্দপুরের মধ্যে একমাত্র কলিকাতা বা ‘শ্বেতাঙ্গ’ কলকাতাই যুদ্ধের ফলে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। দেশীয় অধিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলি নবাবের দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। কেবলমাত্র বড়বাজারে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল এবং গোবিন্দপুর গ্রামটি ইংরেজরা জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ইংরেজরা হুগলি নদীর ৪০ মাইল ভাটিতে ফলতা গ্রামে আশ্রয় নেয়। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পর ব্রিটিশরা পুনরায় কলকাতা দখল করে।

ব্ল্যাক টাউন

উত্তরে হালিশহর থেকে দক্ষিণে কালীঘাট (কোনো কোনো মতে বড়িশা) পর্যন্ত প্রসারিত একটি রাস্তা ছাড়া এই অঞ্চলে কোনো উল্লেখযোগ্য রাস্তা অতীতে ছিল না। কোনো কোনো লেখক এই রাস্তাটিকে তীর্থপথ বলে বর্ণনা করেছেন। শেঠ পরিবার এই রাস্তাটি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে ছিল। জগন্নাথ শেঠ এই রাস্তার দুই ধারে বৃক্ষরোপণ করেছিলেন। এছাড়া জোড়াবাগানে তাদের বাগানবাড়ি ও পুরনো ফোর্ট উইলিয়ামের সংযোগরক্ষাকারী রাস্তাটিরও দেখাশোনা করতেন শেঠেরা। ১৭২১ সালে কয়েকটি রাস্তার নির্মাণকাজ শুরু হয়। কিন্তু অধিকাংশ রাস্তাই নির্মিত হয়েছিল ১৭৫৭ সালের পরে।

শহরের বিকাশলাভের পর এখানে গড়ে ওঠে নানা পাড়া। মেছুয়াবাজার (বর্তমান জোড়াসাঁকো) ছিল একটি মাছের বাজার। কলুটোলা ছিল কলু অর্থাৎ তেলপ্রস্তুতকারক ও ব্যবসায়ীদের প্রধান আস্তানা ও ব্যবসাকেন্দ্র। কুমারটুলি অঞ্চলের নামকরণ হয় এখানকার কুমোর অর্থাৎ মৃৎশিল্পীদের নামানুসারে। জোড়াবাগানের আদিনাম ছিল শেঠবাগান; এখানে ১১০ বিঘা জমির উপর শেঠ পরিবারের একটি বাগানবাড়ি ছিল। আরও উত্তরে গড়ে ওঠে সেযুগের কলকাতার বাঙালি অভিজাতপল্লি বাগবাজার ও শ্যামবাজার। হুগলি অঞ্চল থেকে বসু ও পাল পরিবার কলকাতায় এসে বোসপাড়া গড়ে তোলেন। মনে করা হয়, বসু পরিবারের আদিপুরুষ নিধুরাম বসু ইংরেজদেরও আগে সুতানুটিতে পদার্পণ করেছিলেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার গাছের নামেও অঞ্চলগুলির নামকরণ করা হত। যেমন বড়তলার নামকরণ করা হয় জোড়া বটগাছের নামানুসারে এবং তালতলার নামকরণ করা হয় তালগাছের নামানুসারে। সেযুগে এন্টালি ছিল লবণ হ্রদ এবং বালিগঞ্জ ও রসাপাগলা (অধুনা টালিগঞ্জ) নিঝুম গ্রাম।

১৭৪২ সালে মারাঠা বর্গিদের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য পুরনো কলকাতাকে ঘিরে একটি তিন মাইল দীর্ঘ পরিখা খনন করা হয়। এটির নাম ছিল মারাঠা খাত। মারাঠারা শেষ পর্যন্ত কলকাতা আক্রমণ করেনি। ১৭৫৬ সালে বর্তমান শিয়ালদহের নিকট সিরাজদ্দৌলা অতি সহজেই এই খাত অতিক্রম করে কলকাতা আক্রমণ করেন। এই সময় কলকাতার শ্বেতাঙ্গ বসতির চারিদিকে শক্ত বেড়া দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে একটি ‘white ghetto’ বা ‘শ্বেতাঙ্গ সীমাবদ্ধতা’র সমস্যা উদ্ভূত হয়।

সিরাজদ্দৌলার কলকাতা আক্রমণের বহু পূর্বেই উত্তরের শ্বেতাঙ্গপ্রধান দুর্গএলাকায় ‘হোয়াইট টাউন’ ও দেশীয় অধিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় ‘ব্ল্যাক টাউন’ নামে একপ্রকার মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন ঘটে গিয়েছিল। ইংরেজরা সুতানুটি পরিত্যাগ করলে এই বিভাজনেরও অবসান ঘটে।১৭১০ সালে সুতানুটিতে যে ১৬-১৮ ফুট চওড়া খাতটি খনন করা হয়েছিল সেটি সম্ভবত ব্ল্যাকটাউনকে হোয়াইট টাউন থেকে পৃথক করার জন্যই নির্মিত হয়।ইংরেজরা সুতানুটি ত্যাগ করার পূর্বে সুতানুটির উত্তরভাগে তাদের একটি প্রমোদকানন ছিল। পেরিন’স গার্ডেন নামে পরিচিত এই বাগানে কোম্পানির ইংরেজ কর্মচারীরা তাদের ‘লেডি’দের নিয়ে সান্ধ্যভ্রমণে আসতেন। পরে এটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ১৭৫২ সালে বিক্রয় করে দেওয়া হয়।গোবিন্দপুর গ্রামে নতুন ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের নির্মাণকার্য শুরু করে, সেখানকার অধিবাসীদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে তালতলা, কুমারটুলি ও শোভাবাজারে জমি দেওয়া হয়। ইউরোপীয় অধিবাসীরা ধীরে ধীরে পুরনো ‘হোয়াইট গেটো’র বেড়া ভেঙে দক্ষিণে ময়দান পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বসতি স্থাপন করতে শুরু করে।

শেঠ ও বসাক

ব্রিটিশদের আগমনের পূর্বে সুতানুটি অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী বণিক পরিবার ছিল শেঠ ও বসাকেরা। তারা ছিলেন সুতানুটি বাজারে প্রধান বস্ত্রব্যবসায়ী। ব্রিটিশদের আগমনের পর এই সকল পরিবারের দ্রুত সমৃদ্ধি ঘটতে থাকে। জনার্দন শেঠ ব্রিটিশদের ব্যবসা সংক্রান্ত দালালির কাজ করতেন। শোভারাম বসাক (১৬৯০-১৭৭৩) নামে আর এক কোটিপতি ব্যবসায়ী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বস্ত্র সরবরাহ করত।

শোনা যায়, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথমার্ধে মুকুন্দরাম শেঠ সপ্তগ্রাম থেকে গোবিন্দপুরে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন। গোবিন্দপুর দুর্গনির্মাণের জন্য ধ্বংস করা হলে শেঠেরা উত্তর সুতানুটি হাট (বর্তমান বড়বাজার) অঞ্চলে সরে আসেন। এরপর এই বংশের সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ছিলেন জনার্দন শেঠ। তিনি ছিলেন কেনারাম শেঠের (কোনো কোনো মতে কিরণচন্দ্র শেঠের) পুত্র। তার দুই ভাই ছিল – বারাণসী শেঠ ও নন্দরাম শেঠ। জনার্দন শেঠের পুত্র বৈষ্ণবচরণ শেঠ বোতলবন্দী গঙ্গাজল বিক্রি করে এক বিরাট ব্যবসা পত্তন করেছিলেন।

পরে মাড়োয়ারিদের আগমনের ফলে শেঠ ও বসাকেরা কোণঠাসা হয়ে পড়েন। সুতানুটি হাটের নামও পরে পরিবর্তিত হয়ে বড়বাজার হয়।তবে তা সত্ত্বেও এঁদের ব্যবসায়িক সমৃদ্ধি ক্ষুণ্ণ হয়নি। শোভারাম বসাকের উত্তরসূরি রাধাকৃষ্ণ বসাক (মৃত্যু ১৮১১) বেঙ্গল ব্যাংকের দেওয়ান হয়েছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীতে শহরের প্রধান ব্যবসায়িক পরিবারগুলি নগরাঞ্চলীয় সম্পত্তিতে বিনিয়োগ করতে শুরু করেন। শোভারাম বসাক তার উত্তরসূরিদের জন্য সাঁইত্রিশটি বাড়ি রেখে গিয়েছিলেন। রাধাকৃষ্ণ বসাক কেবল বড়বাজারেই রেখে যান ষোলোটি বাড়ি।অষ্টাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে কলকাতার বিকাশ শুরু হলে শেঠ ও বসাকদেরও পতন শুরু হয়।

শেঠ ও বসাকদের সঙ্গে সঙ্গে সুতানুটিও কলকাতায় বিলীন হয়ে যায়। এই অঞ্চলে গড়ে ওঠে অনেকগুলি পাড়া। সুতানুটির উল্লেখ থেকে যায় কেবলমাত্র পুরনো গ্রন্থে ও মানপত্রে। শোনা যায়, নবকৃষ্ণ দেবকে সুতানুটির তালুকদারি দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল।বিশিষ্ট সংস্কৃতি-ইতিহাসবিদ বিনয় ঘোষ, আদি কলকাতার সংস্কৃতিকে চার ভাগে বিভক্ত করেছেন। যথা: সুতানুটি সংস্কৃতি (নবকৃষ্ণ দেব প্রবর্তিত শহুরে-সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতি), কলিকাতা সংস্কৃতি (শেঠ ও বসাক কর্তৃক প্রবর্তিত বাঙালি ব্যবসায়িক শ্রেণির সংস্কৃতি), গোবিন্দপুর সংস্কৃতি (ইউরোপীয় নব্য ধনী সংস্কৃতি) ও ভবানীপুর সংস্কৃতি (বাঙালি মধ্যবিত্ত হিন্দু শ্রেণির সংস্কৃতি)।১৬৯০ সালে সুতানুটিতেই জব চার্ণক প্রথম পদার্পণ করেন। এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে শুধুমাত্র কলকাতা শহরটিই বিকশিত হয়ে ওঠেনি, বরং ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূচনায় এখানেই ঘটেছিল। আদি কলকাতার ব্ল্যাক টাউন তথা কলকাতার সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর সুতানুটি আজও কলকাতার ইতিহাস সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিদের কাছে এক পরম আগ্রহের বিষয়। বর্তমানে পুরনো কলকাতার স্মৃতিরক্ষার্থে কলকাতা মেট্রোর শোভাবাজার স্টেশনটির নামকরণ করা হয়েছে “শোভাবাজার-সুতানুটি”।

 

 

 

 

উইকিপিডিয়া

জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print