জামায়াত-বিএনপি সম্পর্ক নিয়ে রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেছেন, বিএনপি যদি জামায়াতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তার প্রভাব এই মুহূর্তে বাংলাদেশের রাজনীতিতে পড়বে না। আর তাতে জামায়াত একেবারে মরে যাবে না। নিজেদের মতো করে তারা গোছানোর চেস্টা করবে।

পুরো সাক্ষাৎকারটি উপস্থাপন করা হলো। এটি গ্রহণ,উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল সম্প্রতি দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে যে জামায়াতে ইসলামিকে ত্যাগ করতে যাচ্ছে বিএনপি। এ ব্যাপারে দলের শীর্ষ পর্যায়ে নেতৃত্ব চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কাছাকাছি। প্রশ্ন হচ্ছে- বিএনপি কেন এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে এবং তাতে বিএনপির আসলে কতটা লাভ হবে?

মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল: দেখুন, বিএনপি কেন এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সেটি অনুসন্ধানযোগ্য বিষয়। তবে আমি একটু গোড়ার দিকের কথা দিয়ে আলোচনা শুরু করতে চাই। বিএনপি এবং জামায়াতের সম্পর্কটা কিছুটা অস্পষ্ট কিছুটা রহস্যময়। কারণ হচ্ছে যখনই জিজ্ঞাসা করা হতো বিএনপির সাথে জামায়াতের সম্পর্কটা কী? তারা একেক সময় একেকরকম কথা বলতেন। তারা বলতেন এটা নির্বাচনী ঐক্য, ভোটের রাজনীতি ইত্যাদি। তবে বাস্তবে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি বিএনপির নানা সময়ে নানা আচরণ। বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য গড়েছেন কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে যখন জামায়াত নেতাদের ফাঁসী হতো তখন বিএনপি চুপচাপ থাকত। কোনো বিবৃতি দিত না। তাদের এই অবস্থান জামায়াতের পক্ষে নাকি বিপক্ষে, না জনগণের আবেগ অনুভূতির পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য এ ধরণের কৌশল গ্রহণ করতেন সেটি প্রশ্ন। আর ঐ ধরণের কৌশলের কারণে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

আবার যখনই প্রশ্ন উঠত যে, জামায়াত বিএনপিকে গ্রাস করে ফেলছে তখন বিএনপি বলত না;  বিএনপি কারো নিয়ন্ত্রণে নয়, বিএনপির নিয়ন্ত্রণে জামায়াত। অন্যদিক থেকে জামায়াত বারবার বলে এসেছে জামায়াত একটি স্বাতন্ত্র্য দল। তার নিজস্ব আদর্শের জায়গা নিয়েই তারা প্রবাহিত হবে। বিএনপির সাথে ঐক্য থাকা না থাকায় তাদের খুব বেশি কিছু আসে যায় না। তবে আমরা প্রত্যক্ষ করেছি যখন জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায় তখন বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয় যে, জামায়াতকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে থাকলে হলে একটি বড় দলের ছায়া লাগে। আর সেই ছায়াটি হচ্ছে বিএনপি। তারা বিএনপিকেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে।

রেডিও তেহরান:  প্রায় দুই যুগ ধরে জামায়াত এবং বিএনপির রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ছিল এবং দীর্ঘদিন ধরে তারা জোটবদ্ধ হয়ে রাজনীতি করেছে। এখন যদি বিএনপি জামাতকে ত্যাগ করে তাহলে দেশের রাজনীতিতে তার প্রভাবটা কি হতে পারে?

মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল :দেখুন, বাংলাদেশে সমসাময়িক কালে যেহেতু কোনো জাতীয় নির্বাচন নেই সেই হিসেবে এইমুহূর্তে প্রভাবের বিষয়টি সেভাবে আসবে না। তবে জামাতের সাথে বিএনপির ঐক্যের একটা স্পষ্ট হিসাব হলো-বিএনপির নিজস্ব ভোট এবং আওয়ামী লীগ জোটের ভোটের সংখ্যাটা প্রায় কাছাকাছি। কাজেই জামায়াতের ভোটটা যাদের সাথে যুক্ত হবে তারাই নির্বাচনে ভালো করবে। আর সেই অঙ্ক কষেই বিএনপি আসলে জামাতের সঙ্গে তার সখ্যতা গড়েছিল। ফলে আবাারও বলছি সমসাময়িক কালে যেহেতু কোনো জাতীয় নির্বাচন নেই তাই ভোটের ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব পড়বে না। কিন্তু রাজনীতির অন্য জায়গাতে এর প্রভাবটা নানা দিক থেকে হিসেব কষতে হবে।

এসব হিসেবের মধ্যে একটি হচ্ছে নানা কারণে জামায়াত এই মুহূর্তে নিজেদের মধ্যে অস্থিরতায় আছে। জামায়াতের ভেতরে থেকে এতদিন যারা জামায়াতকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন এখন তারা জামায়াতকে সমালোচনা করছেন। কাজেই জামায়াত এই মুহূর্তে বহুমুখী আক্রমণের মধ্যে আছে। আর এই মুহূর্তে বিএনপির অবস্থান খুব দুর্বল। কিন্তু সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিএনপি যখন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তখন দলটির নিজের অস্তিত্বই প্রায় বিলীন হওয়ার পথে। বিবৃত্তি দেয়া ছাড়া তাদের কোনো কর্মসূচি নেই। তাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া শর্তসাপেক্ষে জেলের বাইরে এসেছেন।

রেডিও তেহরান: বিএনপি-জামাতের সম্পর্কচ্ছেদের খবরে নানামুখী বিশ্লেষণ চলছে। অনেকে বলছেন এতে বিএনপি-জামায়াতের লাভ ক্ষতির চেয়ে সরকারি দল আওয়ামী লীগের লাভ বেশি হবে। এই মতকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল: দেখুন, জামায়াতকে বিএনপি থেকে বিচ্ছন্ন করা হলে সরকারের বা আওয়ামী জোটের কি লাভ হবে বা লাভ বেশি হবে।এ বিষয়ে আমি বলব-যখন বিএনপি জামায়াত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এই পরিবর্তনের খবর আমরা যখন পাচ্ছি তখন দেশীয় রাজনীতি আসলে ঘরোয়া রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কারণ বিএনপির মতো বড় দল বিবৃতির বাইরে বেশি কিছু করছে না। আওয়ামী লীগ সরকার চালাচ্ছে। আওয়ামী জোট সরকারের সঙ্গে আছে। কাজেই সেই অর্থে রাজনীতির মাঠের কোনো উত্তাপ নেই। কিন্তু যারা রাজনীতির পর্যবেক্ষক তাঁরা নিশ্চয়ই বিষয়টি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করবেন।

তবে আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই মুহূর্তে কেন বিএনপি এমন একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনল? যখন দলটি নিজেই তাদের অস্তিত্ব নিয়ে টানাপড়েনে আছে।এক্ষেত্রে আমি যেটা মনে করে করি সেটি হচ্ছে, এতদিন বিএনপির ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি যারা খুব মিনমিনেভাবে জামায়াতের সাথে ঐক্যটাকে মেনে নিয়েছিল তারা হয়তো সোচ্চার হয়েছে। আরেকটি বিষয় হতে পারে আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক রাজনীতির প্রেক্ষাপট। কারণ বিএনপি এখন স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছে রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা এখন দাঁড়াতেই চায় তাহলে জামায়াতের সাথে তাদের সম্পর্কের পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। আর সেদিক থেকে আওয়ামী লীগ একটা সুবিধাজনক জায়গায় থাকবে। বিএনপি যখন এরকম একটি বড় সিদ্ধান্তে যাবে তখন আওয়ামী লীগ উচ্চকণ্ঠে বলতে পারবে এতদিন আমরা যেকথা বলে এসেছিলাম যে বিএনপির আশ্রয়-প্রশ্রয়ের কারণে জামায়াত এতটা বেড়ে উঠেছে আজকে বিএনপি সেই জামায়াতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার মধ্য দিয়ে তাদের পাপ মোচন করল।

অন্যদিকে জামায়াত দলগতভাবে বিব্রতকর অবস্থায় পড়বে। তাদের জায়গাটা এমনিতেই সংকীর্ণ হয়ে গিয়েছিলে এখন সেটি আরও সংকীর্ণ হয়ে যাবে। তবে জামায়াত একদম মরে যাবে এমনটি আমি মনে করি না। কিন্তু জামায়াত নিজের মতো করে বা এককভাবে পথ চলার জন্য নিজেদের মধ্যে গোছানোর চেষ্টা করবে। তারা রেজিষ্ট্রেশনের জন্য প্রস্তুতি নেয় তাহলে তারা নিজেদের মতো করে হয়তো ভাববে। কারণ এখনও পর্যন্ত যে পরিস্থিতি জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের যুদ্ধাপরাধের বিচার,ফাঁসী,দল ভাঙা, যাদের বিরুদ্ধে এখন মামলা চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে তাদের চূড়ান্ত শুনানীর পর আরও দু একজনের যদি ফাঁসী হয় এই ট্রমাগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা। তারসঙ্গে যুক্ত হলো বিএনপির সঙ্গে তাদের সম্পর্কহীনতা। আর যদি সেটি কৌশলগত না হয়ে থাকে তাহলে জামায়াতে ইসলামী হয়তো নিজেদের মতো করে এগোতে থাকবে।

রেডিও তেহরান: মিডিয়ার খবরে বলা হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যেসব দেশ জামায়াতকে একসময় সমর্থন দিত তারা এখন জামাতকে ত্যাগ করেছে। তাহলে কি জামায়াতে ইসলামী দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে হয়ে পড়ল? এই অবস্থায় জামায়াতের রাজনীতির কৌশল কি হতে পারে?

মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল : দেখুন, জামায়াতের রাজনীতির একটা কৌশল আছে। আমরা দেখেছি জামায়াতে ইসলামীর চিহ্নিত নেতা বা কর্মীরা হয়তো পারেননি কিন্তু ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মধ্যে তাদের অনেকের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। কাজেই অন্যদলে জামায়াতের যাওয়াটা খুব কঠিন ব্যাপার না। কিন্তু আমার ধারণা জামায়াত যেহেতু নিষিদ্ধ হয় নি সেহেতু বিএনপির সাথে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্তটি যদি হয়ে যায় তখন যদি সরকার ঐ সিদ্ধান্তটি ব্যবহার করে জামায়াত ইস্যুতে; সেক্ষেত্রে জামায়াতকে তাদের আত্মরক্ষার জন্য নানা দলের মধ্যে হয়তো ঢুকে পড়তে হবে। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত সেটা না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত জামায়াত নিজেদের দিকে তাকাবে এবং নিজেরা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করবে।

তবে এই মুহূর্তে যে প্রশ্নটির উত্তর পাওয়া খুবই জরুরি সেটি হচ্ছে, বিএনপি এই মুহূর্তে যখন নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে টানাপড়েনের মধ্যে তখন তারা এরকম বড় সিদ্ধান্ত কেন নিতে যাচ্ছে? আমার ধারনা বিএনপি একটি সুদূরপ্রসারী চিন্তা করছে। বেগম খালেদা জিয়া জেলের বাইরে আসার পর কিম্বা তারেক জিয়া লন্ডনে থাকার পর তারা খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছে যে- আমাদের নিকট প্রতিবেশী ভারতের একটি বড় উষ্মা হচ্ছে-জামায়াতের সম্পর্ক। কেউ পছন্দ করুক বা না করুক বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ পছন্দ অপছন্দের বিষয়টি আছে। এটি নানা দলের মধ্যে আমরা প্রত্যক্ষ করি। আমাদের রাজনৈতিক নানা ঘটনা প্রবাহের মধ্যে এটা সত্য।

তার পাশাপাশি বৈশ্বিক রাজনীতিতে জঙ্গিবিরোধী যে আন্তর্জাতিক জোট এবং সে ব্যাপারে ইউরোপ, যুক্তরাজ্য ও আমেরিকার যে শক্তিশালী অবস্থান এমনকি চীনেরও শক্তিশালী অবস্থান আমরা প্রত্যক্ষ করি। কারণ তারা ধর্মভিত্তিক যে জঙ্গিগোষ্ঠী আছে বিশ্বে তারসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীকে ব্রাকেট বন্দি করে। আর এরমধ্যে পরিষ্কারভাবে মনে করা হতো যে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সহায়তা ও সমর্থন হয়তো জামায়াতের মধ্যে ছিল! হ্যাঁ একসময় হয়তো ছিল কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যেভাবে উন্নুক্ত হচ্ছে তাতে এটা স্পষ্ট যে তারা কোনো দেশের কোনো ধর্মভিত্তিক দলকে এখন ঐভাবে তাদের ছায়াতলে রাখবে না। কাজেই সব মিলিয়ে বিএনপিকে এখন স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে তারা যদি আন্তর্জাতিকভাবে তাদের মিত্র চায় সেটি ইউরোপ, ভারত কিম্বা মধ্যপ্রাচ্যে সেক্ষেত্রে তাদেরকে নিজ উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের সাথে জামায়াত আছে এই ক্রটি যাতে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত না করে-আমার ধারনা বিএনপি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চায়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print