নরেন্দ্র মোদী এবং শি জিন পিংয়ের সম্পর্ক এখন হিমঘরে

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর একজন অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. অসীমা গয়াল বলেছেন সীমান্ত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে চীনের সাথে বাণিজ্যে ভারতকে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

দিল্লিতে বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, চীনের সাথে বাণিজ্যে ভারত লাভবান হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এই সম্পর্কে অবস্থান কঠোর করতে হবে ভারতকে, চীনের বাজারে ঢোকার সমান সুযোগ আদায় করতে হবে।

“এখনই সময় চীনকে বলার যে তোমরা আচরণ ঠিক করো,“ বলেন ড. গয়াল যিনি মুম্বাইতে ইন্দিরা গান্ধী ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট রিসার্চের একজন অধ্যাপক।

নরেন্দ্র মোদীর এই উপদেষ্টার বক্তব্যে চীনকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প সরকারের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি স্পষ্ট। কিন্তু চীনের ওপর চাপ প্রয়োগের সেই ক্ষমতা কি ভারতের রয়েছে?

জুনের মাঝামাঝি লাদাখ সীমান্তে চীনের সাথে সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সৈন্যের মৃত্যুর পর ভারতে চীন বিরোধী মনোভাব তুঙ্গে।

ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দেয়া হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। জনরোষের মাঝে, নরেন্দ্র মোদীর সরকার দুই দফায় দেড়শরও বেশি চীনা সফটওয়্যার অ্যাপ নিষিদ্ধ করেছে। চীনা বিনিয়োগের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। চীন থেকে রঙিন টিভি আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এসব পদক্ষেপ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. গয়াল বলেন, “ভারতকে এই পদক্ষেপ নিতে হবে। কারণ তথ্যের নিরাপত্তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এবং ক্রেতাদের আবেগকে প্রাধান্য দিতে হবে।“

চীন এখন ভারতের বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগী দেশ, কিন্তু বছরে বর্তমানে যে প্রায় ১০,০০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য হয় তার ভারসাম্যের দুই-তৃতীয়াংশই চীনের পক্ষে।

২০১৮ সালে ভারত ও চীনের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৯৬০০ কোটি ডলার। কিন্তু ভারসাম্য একচেটিয়া ভারতের বিপক্ষে। সে বছরই বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫৮০০ কোটি ডলার।

এই ঘাটতি নিয়ে ভারতের সরকারের ভেতর অস্বস্তি রয়েছে, অভিযোগ রয়েছে। সীমান্ত নিয়ে চরম বৈরিতা শুরু হওয়ার পর সেই অসন্তোষ এখন মাথা চাড়া দিয়েছে।

শর্ত আরোপর ক্ষমতা কতটুকু ভারতের

কিন্তু চীনের সাথে বাণিজ্যে সরকারের অবস্থান কঠোর করার যে কথা ড. গয়াল বলেছেন, বাস্তবে সেই ক্ষমতা ভারতের এখন কতটা রয়েছে? চীনের ওপর নিজের পছন্দমত শর্ত আরোপ কি সম্ভব?

দিল্লির জওয়াহারলাল ইউনিভারসিটির (জেএনইউ) অর্থনীতির অধ্যাপক জয়তী ঘোষ বিবিসি বাংলাকে বলেন, তিনি মনে করেন না চীনের ওপর কোনো শর্ত দেওয়ার ক্ষমতা এখন ভারতের রয়েছে।

জয়তী ঘোষ বলেন, “চীন এখন ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক পার্টনার, কিন্তু চীনের কাছে ভারত আদৌ তা নয়। চীনের সাথে বাণিজ্য ভারতের কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই বাণিজ্যের ওপর তাদের যে নির্ভরতা, চীনের কাছে ভারতের বাজারের গুরুত্ব আদৌ ততটা নয়।“

চীনা রপ্তানির সর্বশেষ পরিসংখ্যান সেটাই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। ২০১৮ সালে ভারতে চীনের রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬৫০০ কোটি ডলার, কিন্তু ঐ একই বছরের ভিয়েতনামের মত ছোট একটি দেশে চীন ৮,৫০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। জাপানে তাদের রপ্তানি ছিল ১৪,৮০০ কোটি ডলার, এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনের রপ্তানি আয় ছিল ৫৫, ৮০০ কোটি ডলার।

তাছাড়া, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বয়লার, কারখানার ভারী যন্ত্র, শিল্পের কাঁচামাল, মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে পাড়ার দোকানে বৈদ্যুতিক ফ্যান এবং বাচ্চাদের খেলনা এর সবকিছুর যোগানের জন্য চীনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে ভারত।

ড. জয়তী ঘোষ বলেন, “ওষুধ শিল্পের মত জরুরি খাতের ৯০ শতাংশ কাঁচামাল আসছে চীন থেকে। সেটা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া অসম্ভব। খেলনা আমদানি বন্ধ করতে পারবেন, কিন্তু কলকারখানার যন্ত্রের হঠাৎ বিকল্প কী? চীন থেকে টিভি আমদানি না হয় বন্ধ করলেন, কিন্তু দাম তো অনেক বেড়ে যাবে।“

তার মতে – চীনের ওপর ব্যাপক ভিত্তিক এই নির্ভরতা হয়তো কমানো সম্ভব, কিন্তু “সময় লাগবে।“

বাণিজ্য কমার লক্ষণ নেই

আর সে কারণেই তীব্র চীন-বিরোধী মনোভাব, চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ এবং নরেন্দ্র মোদীর “আত্ম-নির্ভরতার“ স্লোগান স্বত্বেও দুই দেশের বাণিজ্যে বড় কোনো হুমকি তৈরির কোনো লক্ষণ এখনও নেই।

বরঞ্চ গত তিন মাসে চীনের সাথে বাণিজ্য গত বছর একই সময়ের তুলনায় বেড়েছে, এবং সবচেয়ে যেটা মজার ব্যাপার যেটা তা হলো চীনের তুলনায় ভারতের রপ্তানি বেশি বেড়েছে।

চীনা সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুনের ভেতর চীন থেকে ভারতের আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ২৪.৭ শতাংশ, কিন্তু চীনে ভারতের রপ্তানি বেড়েছে ৬.৭ শতাংশ। এপ্রিলে চীনে ভারতের রপ্তানি ছিল ২০০ কোটি ডলার যা জুলাইতে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৫০ কোটি ডলার।

বিশেষ করে গত তিন মাসে চীনে ভারতের রপ্তানি বাড়ার প্রধান কারণ ভারত থেকে কাস্ট আয়রনের রপ্তানি কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। চীনের কাস্টমস বিভাগের তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ভারত থেকে কাস্ট আয়রন আমদানি হয়েছে ২ কোটি টন, যেখানে ২০১৯ সালের পুরো বছরে আমদানি হয়েছে ৮০ লাখ টন।

বিষফোঁড়া এবং ওষুধ – দুটোই চীন

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ভারতে সরকারের পক্ষ থেকে যে হম্বিতম্বি করা হচ্ছে তা মূলত সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। বাস্তবে ভারত সরকার জানে প্রতিবেশি চীনের বাজার কতটা লোভনীয় এবং বহু চীনা পণ্যের কোনো বিকল্প তাদের সামনে নেই।

দিল্লিতে এফওআরই স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের চীন বিশেষজ্ঞ ড ফয়সল আহমেদ বিবিসি হিন্দি ভাষা বিভাগকে বলেন, “চীনা পণ্য এবং বিনিয়োগের ওপর ভারতের চাপানো এসব বিধিনিষেধ প্রধানত সীমান্ত নিয়ে অসন্তোষ এবং ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ।“

তার মতে, চীন যদি ভারতের ‘বিষফোঁড়া‘ হয়, তাহলে তার ‘ওষুধও‘ আবার চীনই।

ভারতে অর্থনীতিবিদ বিবেক কাউল বলেন, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের সাম্প্রতিক সব পরিসংখ্যান দেখলে মনে হয়, রাজনীতিক এবং ব্যবসায়ীরা মানুষের সামনে যত কথাই বলুন না কেন, তলে তলে তাদের স্বার্থের অনুকূলেই তারা কাজ করে যাচ্ছেন।

মি. কাউল মনে করেন, ভারতীয় ব্যবসায়ীরা এবং শিল্প মালিকরা মনে করছেন চীনের সাথে ব্যবসা এখন তাদের কাছে সবচেয়ে ভালো বিকল্প।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ভবিষ্যতে এই বাণিজ্য সম্পর্ক কোনদিকে মোড় নেবে। ভারত কি আমেরিকার দেখানো পথে চীন থেকে অনেক আমদানির পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়াবে যাতে চীন থেকে আমদানি আর লোভনীয় না থাকে?

সে সম্ভাবনার অনেকটাই নির্ভর করবে সীমান্তে ঘটনাবলী কোনে দিকে গড়ায় তার ওপর।

শাকিল আনোয়ার

বিবিসি বাংলা

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print