জেনে নিন করোনা ভাইরাস কেন এত প্রাণঘাতী

একটি সাধারণ ভাইরাস আমাদের সবার জীবনকে একেবারে থমকে দিয়েছে। আমরা এর আগেও এরকম ভাইরাসের হুমকিতে পড়েছি। মহামারিরও মুখোমুখি হয়েছি।

কিন্তু প্রতিটি নতুন সংক্রমণ বা মৌসুমী ফ্লুর জন্য এর আগে কখনো বিশ্বে সবকিছু এভাবে বন্ধ হয়ে যায়নি।

এই করোনাভাইরাসে তাহলে এমন কি আছে? এর জীবতত্ত্বে এমন কি ধাঁধাঁ আছে যেটি আমাদের শরীর এবং জীবনের জন্য এত বড় হুমকি তৈরি করছে?

‘ছলচাতুরিতে সেরা’

সংক্রমণের শুরুর দিকে এই ভাইরাস আমাদের শরীরকে ধোঁকা দিতে পারে।

করোনাভাইরাস হয়তো আমাদের ফুসফুসে এবং শ্বাসনালিতে বেশ জাঁকিয়ে বসেছে। অথচ আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হয়তো ভাবছে সবকিছু ঠিক আছে।

“এই ভাইরাসটি আসলে দুর্দান্ত। এটি হয়তো আপনার নাকের মধ্যে ভাইরাসের কারখানা খুলে বসেছে, অথচ আপনার মনে হচ্ছে শরীর বেশ ভালোই আছে”, বলছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর পল লেহনার।

আমাদের শরীর যখন কোন ভাইরাস হাইজ্যাক করে, তখন আমাদের দেহকোষ থেকে এক ধরণের রাসায়নিক নির্গত হয়, যার নাম ইন্টারফেরন্স। এই রাসায়নিক আসলে শরীরের অন্যান্য অংশ এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার জন্য একধরণের সতর্কবার্তা।

“কিন্তু করোনাভাইরাসের এক দারুণ ক্ষমতা আছে এই রাসায়নিক সতর্কবার্তাকে থামিয়ে দেয়ার,” বলছেন প্রফেসর লেহনার।

“ভাইরাসটি এই কাজ এত ভালোভাবে করে যে আপনি জানতেই পারেন না আপনি আসলে অসুস্থ‍।”

তিনি বলেন, “যখন আপনি গবেষণাগারে আক্রান্ত কোষগুলো দেখবেন, আপনি বুঝতেই পারবেন না সেগুলোতে সংক্রমণ ঘটেছে। অথচ পরীক্ষা করলে দেখবেন সেগুলো ভাইরাসে পরিপূর্ণ। এই ভাইরাসের আসলে এরকম একটা ছলচাতুরির ক্ষমতা আছে।”

‘আঘাত করে পালিয়ে যায়’

আমাদের শরীরে ভাইরাসের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায় আমরা যেদিন অসুস্থ বোধ করবো, তার আগের দিন। কিন্তু লোকজন হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো অসুস্থ বোধ করতে সময় লাগে আরও প্রায় এক সপ্তাহ।

“এটি আসলে এই ভাইরাসের একটি দারুণ বিবর্তন কৌশল – আক্রান্ত হওয়ার পরও আপনি বিছানায় পড়ে থাকছেন না, আপনি বাইরে যাচ্ছেন, আপনি দারুণ সময় কাটাচ্ছেন”, বলছেন প্রফেসর লেহনার।

কাজেই এই ভাইরাসের আচরণ সেই ড্রাইভারের মতো, যিনি এক্সিডেন্টের পর ঘটনাস্থল থেকে পালাচ্ছেন। আমরা সুস্থ হয়ে উঠা বা মারা যাওয়ার আগেই এই ভাইরাস পালিয়ে যাচ্ছে আরেকজনের দেহে।

সোজা করে বলতে গেল, এই ভাইরাস আসলে জানতে চায় না আপনি মরছেন কীনা, বলছেন প্রফেসর লেহনার। এটি এমন এক ভাইরাস যেটি আঘাত করেই পালাচ্ছে।

দু’হাজার দুই সালের আদি সার্স-করোনাভাইরাসের সঙ্গে এই ভাইরাসের এটি এক বিরাট পার্থক্য। সার্স-করোনাভাইরাসের বেলায় দেখা গিয়েছিল, যখন লোকজন সবচেয়ে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখনই এটি সবচেয়ে বেশি ছড়াতো।

‘এটি নতুন, তাই আমাদের শরীর প্রস্তুত নয়’

সর্বশেষ মহামারির কথা মনে আছে? ২০০৯ সালে এইচ-ওয়ান-এন-ওয়ান নিয়ে ব্যাপক আতংক ছড়িয়ে পড়েছিল। এটির আরেক নাম ছিল সোয়াইন ফ্লু।

তবে পরে দেখা গিয়েছিল এটি আসলে সেরকম প্রাণঘাতী নয়। কারণ বয়স্ক মানুষদের এমনিতেই কিছু সুরক্ষা আছে। এই সোয়াইন ফ্লু ভাইরাস আসলে অতীতের অন্য কিছু ভাইরাসের মতই।

আরও চার ধরণের করোনাভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হয়, যার লক্ষণ সাধারণ ঠান্ডা লাগার মতো।

ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ট্রেসি হাসেল বলেন, “এটি একটি নতুন ভাইরাস। কাজেই এটির বেলায় আমাদের শরীরে আগে অর্জন করা কোন প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই।

প্রফেসর হাসেল বলেন, সার্স-কোভিড-২ আসলে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে একটা বড় ধাক্কা দেয়।

এটিকে তুলনা করা হচ্ছে স্মলপক্স বা গুটিবসন্তের সঙ্গে। ইউরোপীয়ানরা তাদের সঙ্গে এই রোগ নিয়ে গিয়েছিল আমেরিকায়। সেখানকার মানুষের জন্য এই গুটিবসন্ত হয়ে উঠেছিল মারাত্মক প্রাণঘাতী এক রোগ।

যারা বয়স্ক মানুষ, তাদের বেলায় নতুন কোন ভাইরাসের বিরুদ্ধে নতুন প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করা খুব কঠিন, কারণ তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল।

একটি নতুন সংক্রমণের বিরুদ্ধে শরীর যখন যুদ্ধ করতে শেখে, তখন অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার হয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা অনেক ভুল করে, তারপর আবার সেই ভুল থেকে শেখে।

কিন্তু আমাদের যখন বয়স হয়, তখন শরীরে যুদ্ধ করার জন্য দরকার যে বিভিন্ন ধরণের টি-সেল, তা কমে যায়। এটি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুবই দরকারি একটি উপাদান। কাজেই বয়স্ক লোকের ক্ষেত্রে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো টি-সেল পাওয়া যায় কম।

‘অদ্ভুত এবং অপ্রত্যাশিত আচরণ’

কোভিড শুরু হয় ফুসফুসের রোগ হিসেবে। সেখানেও নানা রকম অদ্ভুত এবং অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটায় এটি। এরপর এটি পুরো শরীরকেই আক্রান্ত করতে পারে।

লন্ডনের কিংস কলেজের প্রফেসের মাউরো জিয়াচ্চা বলেন, কোভিডের কিছু বৈশিষ্ট্য একেবারই অনন্য। তিনি বলছেন, “এটি আসলে অন্য যে কোন প্রচলিত ভাইরাল রোগ থেকে আলাদা।”

এটি যে কেবল ফুসফুসের সেলগুলো মেরে ফেলে তা নয়, এটি ফুসফুসের সেলগুলির বিকৃতিও ঘটায়। একটি সেল আরেকটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বড় বড় অকার্যকর সেল তৈরি করে, এগুলোকে বলে সিনসিটিয়া। এই বড় সেলগুলো ফুসফুসে লেগে থাকে।

প্রফেসর জিয়াচ্চা বলেন, অন্য যে কোন ফ্লু’তে আক্রান্ত হলে ফুসফুস নিজে থেকেই আবার ঠিক হয়, ক্ষতি থেকে সেরে উঠে। কিন্তু কোভিড-১৯ এর বেলায় তা ঘটে না।

“এটি আসলে খুবই অদ্ভূত এক সংক্রমণ,” বলছেন তিনি।

কোভিড এর বেলায় রক্ত জমাট বাঁধার ব্যাপারটিও ঘটে বেশ অদ্ভূতভাবে।

অনেক কোভিড রোগীর দেহে রক্ত জমাট বাঁধার যে রাসায়নিক, তার পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে দুশো, তিনশো বা চারশো শতাংশ বেশি, বলছেন লন্ডনের কিংস কলেজের প্রফেসর বেভারলি হান্ট।

“সত্যি কথা বলতে কি আমি আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে এরকম ধরণের রোগী আর দেখিনি যাদের রক্ত এতটা আঠালো।”

অনেক রোগীর শরীরে এই ভাইরাস প্রদাহ তৈরি করে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে অতি সংবেদনশীল করে তোলে, যা বাকী শরীরের ক্ষতি করে।

‘শারীরিক স্থূলতা’

কেউ যদি শারীরিকভাবে স্থূল হন, তার জন্য কোভিড অনেক বেশি ক্ষতিকর। পেটমোটা লোকজনের বেলায় ঝুঁকি অনেক বেশি, তাদের নিবিড় পরিচর্যার দরকার পড়তে পারে, এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকি আছে।

এটিও বেশ অস্বাভাবিক।

শারীরিক স্থূলতার সঙ্গে এই ভাইরাসের যে সম্পর্ক, অন্যান্য ভাইরাসের বেলায় কিন্তু সেটি দেখা যায়নি। অন্যান্য ফুসফুসের রোগে বরং মোটা লোকজন ভালোই সেরে উঠে, বলছেন ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজের প্রফেসর স্যার স্টিভেন ও‌’রাহিলি।।

শরীরে যেসব চর্বি জমে, বিশেষ করে লিভারের মতো প্রত্যঙ্গে, সেটি শরীরের বিপাকীয় কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটায়। আর এ অবস্থায় যদি করোনাভাইরাস হয়, সেটা পরিস্থিতি খারাপের দিকে নিয়ে যায়।

মোটা লোকজনের বেলায় শরীরে প্রদাহ এবং প্রোটিনের মাত্রা অনেক বেশি হতে পারে, যার ফলে রক্ত জমাট বেঁধে যায়।

 

 

 

 

 

বিবিসি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




ফুটবলের রাজা পেলের বিষয়ে যে ১০টি তথ্য হয়তো আপনার জানা নেই

ব্রাজিলের কিংবদন্তী ফুটবলার এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো, সারা বিশ্বে যিনি পেলে নামে বিখ্যাত, ২৩শে অক্টোবর তার ৮০তম জন্ম বার্ষিকী।

চার দশকেরও বেশি সময় আগে ১৯৭৭ সালে অবসর নেওয়ার পরেও সাবেক এই খেলোয়াড় সারা দুনিয়ায় এখনও সবচেয়ে পরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিদের একজন।

মূলত তিন তিনবার বিশ্বকাপ জয় করার জন্য পেলে বিখ্যাত হয়েছেন। তিনিই একমাত্র খেলোয়াড়- নারী কিম্বা পুরুষ- যিনি এতবার বিশ্বকাপ জয় করেছেন। এছাড়াও তিনি তার ক্লাব ও দেশের হয়ে ১,৩৬৩টি ম্যাচ খেলে মোট ১,২৮১টি গোল করেছেন যা বিশ্ব রেকর্ড।

ফুটবল খেলায় পেলে যে দক্ষতা ও পারদর্শিতা দেখিয়েছিলেন সেটা মানুষের কল্পনার সীমাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তার গল্প ছড়িয়ে পড়েছিল খেলাধুলার বাইরের জগতেও।

ইতিহাসের বিখ্যাত এই ব্যক্তি সম্পর্কে এমন কিছু গল্প আছে যা অনেকেই হয়তো এখনও শোনে নি। এখানে এরকম ১০টি গল্প ঘটনা তুলে ধরা হলো:

১. মাঠ থেকে বহিষ্কার

১৯৬৮ সালের ১৮ই জুন। কলাম্বিয়ার রাজধানী বোগোতায় খেলা হচ্ছিল পেলের ক্লাব সান্তোস এফসির সাথে কলাম্বিয়ান অলিম্পিক স্কোয়াডের। ওটা প্রীতি ম্যাচ ছিল।

দর্শকে উপচে পড়ছিল স্টেডিয়াম।

হঠাৎ করেই গ্যালারি থেকে দর্শকদের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ভেসে আসে যখন রেফারি গুইলেরমো ভেলাসকোয়েজ পেলেকে মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তখনও লাল কার্ডের প্রচলন ঘটেনি, সেটা শুরু হয় ১৯৭০ সালে।

কলাম্বিয়ার একজন ডিফেন্ডারকে ফাউল করা এবং রেফারির মতে ওই ফুটবলারকে অপমান করার কারণে পেলেকে মাঠ থেকে চলে যেতে বলা হয়েছিল।

এই সিদ্ধান্তে মাঠের ভেতরে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। সান্তোসের ফুটবলাররা উত্তেজিত হয়ে রেফারিকে ঘিরে ধরেন। ওই খেলার যেসব ছবি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় রেফারি ভেলাসকোয়েজের চোখ কালো হয়ে আছে।

সেসময় দর্শকরাও রেফারির ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছিল।

রেফারি ভেলাসকোয়েজ পরে ২০১০ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে সেসময় তাকে মাঠ থেকে বিদায় নিয়ে বাঁশিটা লাইন্সম্যানকে দিতে বলা হয়েছিল।

এর পরপরই পেলে আবার খেলায় ফিরে আসেন।

২. পেলে কি যুদ্ধ থামিয়েছিলেন

পেলের সান্তোস এফসি ফুটবল ক্লাব ছিল ষাটের দশকে বিশ্বের জনপ্রিয় ক্লাবগুলোর একটি।

বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে এই ক্লাবটি প্রীতি ম্যাচে অংশ নিতো। এই খ্যাতির কারণে তারা বাড়তি কিছু সুবিধাও পেয়েছিল।

এরকম একটি প্রীতি ম্যাচ ছিল যুদ্ধ-বিধ্বস্ত নাইজেরিয়ায়, ১৯৬৯ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি। বেনিন সিটিতে অনুষ্ঠিত ওই খেলায় সান্তোস ২-১ গোলে স্থানীয় একাদশকে পরাজিত করে।

নাইজেরিয়াতে তখন রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ চলছিল। দেশ থেকে বায়াফ্রা রাজ্যটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে এই যুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে।

ফুটবল ক্লাব সান্তোস এফসির ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন এমন একজন গবেষক গুইলহের্ম গুয়াশের মতে, এরকম একটি পরিস্থিতিতে নাইজেরিয়াতে খেলোয়াড়দের পাঠানোর ব্যাপারে ব্রাজিলের কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেক দুশ্চিন্তা ছিল। সেকারণে বিবদমান পক্ষগুলো তখন যুদ্ধবিরতিতে যেতে সম্মত হয়।

তবে এই গল্পটির সত্যতা নিয়ে সম্প্রতি অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। এবং মজার ব্যাপার হলো ১৯৭৭ সালে পেলের যে আত্মজীবনী প্রকাশিত হয় সেখানে এই ঘটনার কোন উল্লেখ ছিল না।

তবে পেলের আরেকটি আত্মজীবনী, যা কীনা আরো ৩০ বছর পর প্রকাশিত হয়, সেখানে কিন্তু তিনি ওই “যুদ্ধবিরতির” কথা উল্লেখ করেছেন।

তিনি লিখেছেন: “এই প্রদর্শনী ম্যাচের জন্য গৃহযুদ্ধ থামানো হবে বলে” খেলোয়াড়দেরকে জানানো হয়েছিল।

“আমি জানি না এই ঘটনা পুরোপুরি সত্য কীনা, তবে নাইজেরিয়ানরা আমাদের নিশ্চিতভাবে জানিয়েছিলেন যে আমরা যখন ওখানে খেলতে যাবো তখন বায়াফ্রানরা সেখানে আক্রমণ করবে না,” পেলে লিখেছেন।

৩. পেলের সঙ্গে দেখা করতে বিটলসের ব্যর্থ চেষ্টা

পেলে নিউ ইয়র্ক কসমস ক্লাবের হয়ে খেলার জন্য ১৯৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে চলে যান।

সেখানে ভাষা শেখার একটি স্কুলে তিনি ইংরেজি শিখতেন। কোন একদিন ক্লাসের ফাঁকে সংগীত গোষ্ঠী বিটলসের জন লেননের সাথে তার সাক্ষাৎ হয়েছিল।

“লেনন ওই স্কুলে যেত জাপানি ভাষা শিখতে,” পেলে এই স্মৃতিকথা লিখেছেন ২০০৭ সালে।

পেলে বলেছেন, জন লেনন তাকে বলেছেন ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ চলার সময় লেনন এবং বিটলসের অন্য শিল্পীরা হোটেলে গিয়ে ব্রাজিলের টিমের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। সেবার বিশ্বকাপ হয়েছিল ইংল্যান্ডে।

পেলে লিখেছেন, সংগীত শিল্পীরা সেসময় তার ও দলের অন্যান্যদের সঙ্গে দেখা করতে চেষ্টা করেছিল কিন্তু ব্রাজিলের ফুটবল এসোসিয়েশনের পরিচালকরা তার অনুমতি দেয়নি।

৪. কেন ইউরোপীয় ক্লাবে খেলেন নি

পেলের সমালোচকরা বলেন, কখনো ইউরোপীয় কোন ক্লাবের হয়ে না খেলার কারণে ব্রাজিলের এই ফুটবল তারকার জীবন অনেক সহজ হয়ে উঠেছিল।

ব্রাজিলের অন্যান্য অখ্যাত ও বিখ্যাত ফুটবলাররা বিদেশি ক্লাবে খেললেও, পেলের ক্যারিয়ারের সোনালী সময়ে তাকে বাইরে খেলতে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

পেলেকে নেওয়ার জন্য সান্তোস এফসিকে প্রস্তাব দিয়েছিল রেয়াল মাদ্রিদ থেকে শুরু করে এসি মিলানের মতো ক্লাবও। সেসময় ফুটবলাররা কোন ক্লাবে খেলবেন সেবিষয়ে তাদের কথা বলার সুযোগ ছিল খুব কম।

পেলেকে ব্রাজিলে রেখে দেওয়ার জন্য চাপ ছিল সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেও: ১৯৬১ সালের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জানিও কোয়াদ্রস পেলেকে “জাতীয় সম্পদ” হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তাকে “রপ্তানি করা যাবে না” বলে একটি ডিক্রি জারি করেছিলেন।

ব্রাজিলের এই ফুটবলার পরে অবশ্য একটি বিদেশি ক্লাবের হয়ে খেলেছিলেন। শুধুমাত্র ১৯৭৫ সালে। সেসময় তিনি যোগ দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফুটবল ক্লাব নিউ ইয়র্ক কসমসে।

৫. ব্রাজিলের অধিনায়ক হয়েছিলেন ৫০ বছর বয়সে

হ্যাঁ, আপনি ঠিকই পড়েছেন। পেলে তার পুরো ফুটবল ক্যারিয়ারে তার হাতে মাত্র একবারই অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরেছিলেন। ক্লাব ও দেশের অধিনায়কত্ব গ্রহণ করার জন্য তাকে যখনই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সেটা তিনি সবসময় প্রত্যাখ্যান করেছেন।

কিন্তু এই ঘটনার ব্যতিক্রম হয় পেলের ৫০ বছর বয়সে।

সেটা ছিল ১৯৯০ সালের ঘটনা, জাতীয় ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার ১৯ বছর পরে।

সেবছর ব্রাজিলের সাথে বাকি বিশ্বের একটি প্রীতি ম্যাচ হয়েছিল মিলানে। তাতে অংশ নিয়েছিলেন পেলে। তার ৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই ম্যাচের আয়োজন করা হয়। প্রথমার্ধের ৪৫ মিনিট তিনি মাঠে ছিলেন।

ওই ম্যাচে ব্রাজিল ২-১ গোলে হেরে যায়।

কিন্তু এই ম্যাচটি আরো একটি কারণে ব্রাজিলে আলোচিত হয়েছিল: ব্রাজিলের ক্লাব ফ্লুমিনেন্সের স্ট্রাইকার রিনাল্ডো পেলেকে একটি গোল উপহার দেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। সেসময় পেলে ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু রিনাল্ডো বল পেলেকে পাস না দিয়ে নিজেই পোস্টের বাইরে মেরেছিলেন।

রিনাল্ডো পরে ২০১০ সালে ব্রাজিলের একটি ওয়েবসাইট গ্লোবো এসপোর্তেকে বলেছিলেন, “এতে তিনি আমার ওপর খানিকটা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।”

৬. পেলেকে যখন “অপহরণ” করা হয়

সান্তোস এফসি ক্লাবের ফুটবলাররা ১৯৭২ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর ত্রিনিদাদ ও টোব্যাগোতে খেলার ব্যাপারে খুশি ছিলেন না।

“সেসময় সেখানে বড় ধরনের অশান্তি চলছিল এবং আমরা রাস্তায় ট্যাঙ্ক চলতে দেখেছি,” ২০১০ সালের ব্রাজিলের একটি পত্রিকা জিরো হোরাকে একথা বলেছেন ডিফেন্ডার ওবেরদান।

“খেলা শেষ করে সাথে সাথেই আমরা প্লেনে উঠে পড়বো এমন আশ্বাস পাওয়ার পরেই আমরা ওই ম্যাচ খেলতে রাজি হয়েছিলাম।”

কিন্তু খেলার ৪৩ মাথায় গোল করে বসেন পেলে। তখনই সবকিছু বদলে যায়।

খেলা শেষে পোর্ট অফ স্পেন স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে থাকা সমর্থকরা দৌড়ে মাঠের ভেতরে চলে আসে এবং পেলেকে কাঁধে নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে যায়।

সেখান থেকে পেলেকে উদ্ধার করে আনতে বেশ কিছু সময় লেগেছিল।

৭. সিলভেস্টার স্ট্যালোনের সঙ্গে ছবিতে অভিনয়

১৯৮০ সালে যখন ‘এসকেপ টু ভিক্টরি’ ছবির শুটিং শুরু হয় তখন চলচ্চিত্রাঙ্গনে খ্যাতির তুঙ্গে ছিলেন সিলভেস্টার স্ট্যালোন।

এই ছবিতে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ের নাৎসি একাদশ ও বন্দীদের মধ্যে একটি কাল্পনিক ফুটবল ম্যাচের গল্প তুলে ধরা হয়।

ছবিটিতে পেলেও অভিনয় করেছেন। তার সাথে ছিলেন ববি মুরের মতো আরো কয়েকজন পেশাদার ও সাবেক ফুটবলারও। ওই খেলায় গোলরক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করেন সিলভেস্টার স্ট্যালোন।

ছবির একটি দৃশ্যে পেলে অ্যাক্রোবেটিক বাইসাইকেল কিক নিয়েছিলেন। এবং জানা যায় যে প্রথম শটেই তিনি এই কিকটি নিতে সফল হয়েছিলেন।

সম্প্রতি পেলে ব্রাজিলের একটি ওয়েবসাইট ইউওএলকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন যেখানে তিনি বলেছেন যে ওই সিনেমাতে স্ট্যালোনের একটি গোল দেওয়ার কথা ছিল।

“সিনেমার আসল যে স্ক্রিপ্ট, সেখানে স্ট্যালোন ছিলেন স্ট্রাইকার আর আমার গোলি হওয়ার কথা ছিল,” বলেন পেলে।

হাসতে হাসতে পেলে জানান, “কিন্তু সিলভেস্টার স্ট্যালোন তো জীবনে একবারও বলে কিক করেন নি।”

৮. পেলে কিন্তু ভাল গোলরক্ষক

পেলে যদি ‘এসকেপ টু ভিক্টরি’ ছবিতে গোলরক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করতেন তিনি কিন্তু দর্শকদের মোটেও হতাশ করতেন না।

বাস্তব জীবনেও তিনি ক্লাব ও দেশের বিকল্প গোলরক্ষক ছিলেন। আসল গোলকিপার আহত হলে তার জায়গায় তিনি নামতেন গোল ঠেকাতে।

পুরো ক্যারিয়ারে পেলে সান্তোস এফসি ক্লাবের হয়ে চারবার গোলরক্ষকের গ্লাভস পরেছিলেন। ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলিয়ান কাপের সেমিফাইনালেও তাকে গোলকিপার হতে হয়েছিল।

তার টিম সবকটি খেলায় জয়লাভ করেছিল এবং পেলে একটি গোলও খাননি।

৯. মাত্র একজনই পেলে…

ভক্তরা আনন্দের সঙ্গে গান ধরতে পারে “আছে মাত্র একজনই পেলে!” কিন্তু আসলে এটি আক্ষরিকভাবে পুরোপুরি সত্য নয়।

তার জনপ্রিয়তার কারণে সারা বিশ্বে মাঠে ও মাঠের বাইরে এই নামের আরো অনেককেই পাওয়া যায়।

আফ্রিকার বিখ্যাত ফুটবলারদের একজন আবেদি এইও-র নাম হয়েছিল আবেদি পেলে। তিনি গানা ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি ক্লাবের হয়ে খেলেছেন।

কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার পেদ্রো মন্টেইরো যিনি ২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটনে যোগ দিয়েছিলেন, তিনিও পেলে নামে পরিচিত ছিলেন। এই ডাকনামটি তিনি পেয়েছিলেন তার শৈশবে।

কিন্তু ফুটবলার পেলের কী প্রভাব পড়েছিল ব্রাজিলের সমাজে সেটা বোঝা যায় পেলের আসল নাম এডসন থেকে।

ব্রাজিলের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ভূগোল ও পরিসংখ্যান ইন্সটিটিউটের হিসেবে প্রচুর শিশুর নাম রাখা হয়েছে এডসন।

তারা বলছে, গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ব্রাজিলে ৪৩ হাজার ৫শ ১১ জনের নাম ছিল এডসন। কিন্তু এর দুই দশক পর, পেলে যখন এক হাজারেরও বেশি গোল করেন এবং তিনটি বিশ্বকাপ জয় করেন, তখন এই নামের মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ১১ হাজারেরও বেশি।

১০. ফুটবলের রাজা কি প্রেসিডেন্ট হতে পারতেন?

পেলে ১৯৯০ সালে সাংবাদিকদের কাছে ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি ব্রাজিলে ১৯৯৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। কিন্তু সেটা আর হয়নি।

তবে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন ঠিকই। ১৯৯৫ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত এই তিন বছর তিনি ব্রাজিলের ক্রীড়া মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

সেসময় তার নেতৃত্বে কিছু আইন তৈরি হয়েছিল যাতে পেশাদার ফুটবলারদেরকে ক্লাবের সঙ্গে দর কষাকষির ব্যাপারে কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল যা তার নিজের প্রজন্মের ফুটবলারদের ছিল না।

ফার্নান্দো দুয়ার্তে

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

 

 

 




জেনে নিন বাংলাদেশে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়া এবং ব্যবহারের যেসব নিয়ম

বাংলাদেশে সম্প্রতি ফরিদপুর জেলার ভাঙা উপজেলার নির্বাহি কর্মকর্তা নিজের বাড়িতে বসে ফাঁকা গুলি ছোড়ার পর, সেখানে পুলিশ গিয়ে উপস্থিত হয়।

বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে জানা যাচ্ছে, ওই কর্মকর্তা দাবি করেছেন, পরীক্ষা চালানোর জন্য নিজের অস্ত্র দিয়ে তিনি গুলি ছুঁড়তে পারেন।

কিন্তু পুলিশ বলছে, আগ্নেয়াস্ত্র থেকে পরীক্ষামূলকভাবে গুলি কেবল কেনার পরপরই চালানো যাবে।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচনা হচ্ছে।

কিন্তু বাংলাদেশে আসলে আগ্নেয়াস্ত্র কেনার, ব্যবহারের নিয়মকানুন কী রয়েছে? কারা কিনতে পারেন?

কারা বৈধভাবে অস্ত্র কিনতে পারবেন?

বাংলাদেশে ছোট বড় যেকোন ধরণের আগ্নেয়াস্ত্র কিনতে হলে তার জন্য সরকারের অনুমতি নিতে হয়, অর্থাৎ অস্ত্র কেনার জন্য আগে লাইসেন্স করতে হয়।

এ সংক্রান্ত নিয়মগুলো কয়েকটি আইনের আওতায় পরিচালিত হয়।

এর মধ্যে মূলত ১৮৭৮ সালের আর্মস অ্যাক্ট এবং ১৯২৪ সালের আর্মস রুলস আইনের আওতায় যে কোন সামরিক বা বেসামরিক নাগরিককে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেয়া হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোঃ মুনিম হাসান বিবিসিকে বলেছেন, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য কিছু মানদণ্ড রয়েছে, সেগুলো পূরণ হলেই একজন নাগরিক আবেদন করতে পারবেন।

আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য একজন ব্যক্তিকে যেসব মানদণ্ড পূরণ করতে হয়:

  • বাংলাদেশের বৈধ নাগরিক হতে হবে
  • আবেদনকারীর জীবনের বাস্তব ঝুঁকি থাকলে, অর্থাৎ কেবলমাত্র আত্মরক্ষার ব্যাপার থাকলে তিনি আবেদন করতে পারবেন
  • ‘শর্ট ব্যারেল’ আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর বয়স ন্যূনতম ৩০ বছর, ‘লং ব্যারেল’ আগ্নেয়াস্ত্রের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ২৫ বছর হতে হবে, এবং এবং ৭০ বছরের নিচে হবে বয়স
  • আবেদনকারীকে অবশ্যই আয়কর দাতা হতে হবে, বছরে ন্যূনতম দুই লক্ষ টাকা আয়কর প্রদান করতে হবে
  • অনুমতি পেলে আবেদনকারী অস্ত্র আমদানি করে আনতে পারেন, অথবা দেশীয় বৈধ কোন ডিলারের কাছ থেকে অস্ত্র কিনতে পারবেন
  • কোন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুইটি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারবেন

লাইসেন্সের জন্য কীভাবে আবেদন করতে হয়

আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পাওয়ার জন্য একজন নাগরিককে তার স্থায়ী ঠিকানা যে জেলায়, সেখানকার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লাইসেন্স ও আগ্নেয়াস্ত্র বিভাগ থেকে আবেদন পত্র সংগ্রহ করতে হবে।

এক্ষেত্রে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ বা এসবি শাখা তদন্ত করে আবেদনকারীর তথ্য মিলিয়ে দেখে একটি রিপোর্ট দেয়।

এরপর জেলা প্রশাসক বা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদনের পর সেটি পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনাপত্তি পত্র দিলে জেলা প্রশাসক ওই আবেদনকারীর বরাবরে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ইস্যু করেন।

এক্ষেত্রে আবেদনপত্রের সাথে বৈধ নাগরিকত্বের সনদপত্র, জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি, ট্যাক্স সার্টিফিকেটের ফটোকপি, ছয় কপি পাসপোর্ট সাইজের ছবি, এবং লাইসেন্স ফি জমা দিতে হবে।

অস্ত্র ব্যবহারের নিয়ম

আগ্নেয়াস্ত্র বিষয়ে সর্বশেষ ‘আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স প্রদান, নবায়ন ও ব্যবহার নীতিমালা ২০১৬’ আইনে কেবলমাত্র আত্মরক্ষার স্বার্থে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

তবে, এই আইনে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান সাধারণভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক কখন ‘টেস্ট ফায়ার’ বা পরীক্ষামূলকভাবে ফাঁকা গুলি চালাতে পারবেন, সে সংক্রান্ত কিছু নিয়ম আছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোঃ মুনিম হাসান বলেছেন, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ‘টেস্ট ফায়ার’ করা যাবে না।

নতুন কেনা অস্ত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতিতে আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক ‘টেস্ট ফায়ার’ করতে পারবেন।

এছাড়া যাদের পুরনো অস্ত্র বছর শেষে বার্ষিক নবায়ন করতে যাবেন, তখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ম অনুযায়ী ‘টেস্ট ফায়ার’ করা হয় অস্ত্রের কার্যকারিতা প্রমাণ করে দেখার জন্য।

এছাড়া গুলি ক্রয় বা সংগ্রহের ক্ষেত্রেও জেলা প্রশাসকের অনুমতি লাগে, এবং গুলির হিসাব সংশ্লিষ্ট থানা এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অবহিত করতে হয়।

গুলি সংগ্রহের বাৎসরিক সীমা বা পরিমাণ লাইসেন্সে নির্ধারিত থাকে।

এছাড়া আগ্নেয়াস্ত্র যিনি ব্যবহার করবেন লাইসেন্সটি তার নামে থাকতে হবে, যেমন মালিক যদি ব্যবহার করেন তার নামে লাইসেন্স থাকতে হবে।

আবার কোন ক্ষেত্রে যদি আগ্নেয়াস্ত্রটি মালিকের দেহরক্ষী ব্যবহার করেন তাহলে বডিগার্ড এর নামে লাইসেন্স থাকতে হবে।

এছাড়া কোন ব্যক্তি যখন নিজের অধিকারে আগ্নেয়াস্ত্র রাখেন, তখন সাধারণ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়।

  • আগ্নেয়াস্ত্র হারিয়ে গেলে সাথে সাথে থানায় জিডি বা সাধারণ ডায়েরী করতে হবে
  • মালিক দেশের বাইরে গেলে, আগ্নেয়াস্ত্রের নিরাপত্তার স্বার্থে সংশ্লিষ্ট থানাকে জানিয়ে যেতে হবে
  • যেকোনো নির্বাচনের আগে আগ্নেয়াস্ত্র স্থানীয় পুলিশের কাছে জমা দিতে হয়
  • এক বছর পর পর আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়।

সাইয়েদা আক্তার

বিবিসি বাংলা, ঢাকা

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




হ্যাকাররা চুরি করা অর্থ কেন দান করছে

একটি হ্যাকিং গোষ্ঠী তাদের চুরি করা অর্থ বিভিন্ন দাতব্য সংস্থাকে দান করছে। সাইবার অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ এভাবে রহস্যজনকভাবে দান করার ঘটনা এটাই সম্ভবত প্রথম এবং এটি বিশেষজ্ঞদের বেশ ধাঁধাঁয় ফেলে দিয়েছে।

‘ডার্কসাইড হ্যাকার্স’ নামের এই গোষ্ঠীটি হ্যাকিং এর মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে এ পর্যন্ত লাখ লাখ ডলার হাতিয়ে নিয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে এই হ্যাকাররা এখন বলছে, বিশ্বকে তারা আরও বাসযোগ্য করতে চায়। ডার্ক ওয়েবে এক পোস্টে তারা জানিয়েছে, দুটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে তারা বিটকয়েনে দশ হাজার ডলার দান করেছে। এই দানের রসিদও তারা সেখানে পোস্ট করেছে।

তবে দুটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের একটি, ‘চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল’ জানিয়েছে, তারা এই অর্থ নেবে না।

এই ঘটনাটি একেবারেই অদ্ভূত এবং বেশ চিন্তিত হওয়ার মতো ব্যাপার- নৈতিক এবং আইনগত, দু’দিক থেকেই।

গত ১৩ই অক্টোবর এক ব্লগ পোস্টে ডার্কসাইড হ্যাকার্স দাবি করেছে যে তারা কেবল বড় বড় লাভজনক কোম্পানিকে টার্গেট করে তাদের ‘র‍্যানসমওয়্যার’ দিয়ে। র‍্যানসমওয়্যার মূলত এমন ধরণের কম্পিউটার ভাইরাস, যার মাধ্যমে কোন প্রতিষ্ঠানের আইটি সিস্টেমকে জিম্মি করে রাখা হয় মুক্তিপণ না দেয়া পর্যন্ত।

ডার্কসাইড হ্যাকার্স এই ব্লগপোস্টে লিখেছে, “আমরা মনে করি, বিভিন্ন কোম্পানি যে অর্থ দিয়েছে, তার একটা অংশ দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে দেয়া উচিৎ, এটাই ন্যায্য।

“আমাদের কাজকে আপনারা যতটা খারাপ বলেই ভাবুন না কেন, আমরা আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি, আমরা কোন একজনের জীবন বদলাতে সাহায্য করেছি। আজ আমরা আমাদের প্রথম দানের অর্থ পাঠিয়েছি।”

এই সাইবার অপরাধীরা বিটকয়েনে তাদের অর্থ দান করে ‘দ্য ওয়াটার প্রজেক্ট’ এবং ‘চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল’ নামে দুটি দাতব্য সংস্থাকে। তারা দান করেছে শূন্য দশমিক ৮৮ বিটকয়েন। দান করার পর তারা যে ট্যাক্স রসিদগুলো পেয়েছে, সেগুলোও পোস্ট করেছে।

চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল মূলত শিশুদের নিয়ে কাজ করে। ভারত, ফিলিপাইন, কলম্বিয়া, জাম্বিয়া, ডোমিনিকান রিপাবলিক, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাদের কাজ আছে। প্রতিষ্ঠানটির একজন মুখপাত্র বিবিসিকে জানিয়েছেন, “এই দানের অর্থ যদি কোন হ্যাকারের কাছ থেকে এসে থাকে, আমাদের কোন ইচ্ছে নেই সেই অর্থ নেয়ার।”

অন্য দাতব্য সংস্থা, দ্য ওয়াটার প্রজেক্ট এখনো এ ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেনি। এই প্রতিষ্ঠানটি মূলক সাব-সাহারান আফ্রিকায় সুপেয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে কাজ করে।

একটি সাইবার সিকিউরিটি কোম্পানি ‘এমসিসফট‌ের’ বিশ্লেষক ব্রেট ক্যালো বলেন, “এভাবে অর্থ দান করে এই অপরাধীরা আসলে কী অর্জন করতে চায়, তা পরিস্কার নয়। হয়তো তাদের মধ্যে যে অপরাধবোধ কাজ করছে, সেটি কাটাতে চায়? অথবা হয়তো তারা একধরণের অহমিকা থেকে এটা করছে। নিজেদেরকে তারা হয়তো বিবেকহীন চাঁদাবাজের পরিবর্তে রবিনহুডের মতো কেউ বলে ভাবছে।”

“তাদের উদ্দেশ্য যাই হোক, এটা খুবই অস্বাভাবিক এক ঘটনা। আমার জানা মতে এই প্রথম কোন র‍্যানসমওয়্যার হ্যাকার গোষ্ঠী এভাবে তাদের আয় করা অর্থ কোন দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করলো।”

ডার্কসাইড হ্যাকার্স তুলনামূলকভাবে নতুন এক গোষ্ঠী। তবে ক্রিপটো-কারেন্সি মার্কেট বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে এরা তাদের ভিক্টিমদের কাছ থেকে জোর করে অর্থ আদায় করছে।

তবে অন্যান্য সাইবার অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে বলেও প্রমাণ আছে। এরকম একটি সাইবার অপরাধী গোষ্ঠী গত জানুয়ারীতে ট্রাভেলেক্সের ওপর হামলা চালিয়েছিল, র‍্যানসমওয়্যার দিয়ে তাদের প্রায় অচল করে দিয়েছিল।

এই হ্যাকাররা যেভাবে দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে অর্থ দান করেছে, সেটিও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে চিন্তায় ফেলেছে।

সাইবার অপরাধীরা এজন্য ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি সেবা, ‘দ্য গিভিং ব্লক।’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৬৭টি সংস্থা এই সেবা ব্যবহার করে। এদের মধ্যে আছে ‘সেভ দ্য চিলড্রেন’, ‘রেইনফরেস্ট ফাউন্ডেশন’ এবং ‘শী ইজ দ্য ফার্স্টে’র মতো দাতব্য প্রতিষ্ঠান।

দ্য গিভিং ব্লক দাবি করে, তারাই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যাদের মাধ্যমে ক্রিপটো-কারেন্সি দিয়ে অর্থ দান করা যায়।

দু’হাজার আঠারো সালে এই প্রতিষ্ঠানটির শুরু। তারা ক্রিপটো-কারেন্সির মাধ্যমে যারা কোটিপতি হয়েছে, তাদেরকে ক্রিপটোকারেন্সীতে অর্থ দানের সুযোগ করে দেয়, যেটি তাদের করের দায় কমাতেও সাহায্য করবে।

দ্য গিভিং ব্লক বিবিসিকে জানিয়েছে, এই অর্থ যে সাইবার ক্রিমিনালরা দান করেছে, সেটা তাদের জানা ছিল না। তারা বলেছে, “আমরা এখনো খোঁজ নিয়ে দেখছি এই অর্থ আসলেই চুরি করা কীনা।”

“যদি দেখা যায় যে এই অর্থ আসলে চুরি করা, আমরা তখন এই অর্থ যাদের, তাদের ফেরত দেয়ার কাজ শুরু করবো।”

তবে কোম্পানিটি এটা স্পষ্ট করেনি, তারা কি এই অর্থ সাইবার অপরাধীদের কাছেই ফিরিয়ে দেয়ার কথা বলছে, নাকি এই অপরাধীদের শিকার হয়েছিল যারা, তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার কথা বলছে।

দ্য গিভিং ব্লক ক্রিপটো-কারেন্সির বড় সমর্থক। তারা আরও বলেছে, “ওরা যেহেতু ক্রিপটো-কারেন্সিতে অর্থ দান করেছে, তাই তাদের ধরাটা বরং সহজ, কঠিন নয়।”

তবে দাতাদের ব্যাপারে দ্য গিভিং ব্লক কী ধরণের তথ্য সংগ্রহ করে, তার বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান বিটকয়েনের মতো ডিজিটাল কারেন্সি কেনা-বেচা করে, তারা ব্যবহারকারীদের পরিচয় যাচাই করে। কিন্তু দ্য গিভিং ব্লকের ক্ষেত্রে সেটি করা হয়েছে কীনা, তা নিশ্চিত নয়।

বিবিসি পরীক্ষামূলকভাবে পরিচয় প্রকাশ না করে দ্য গিভিং ব্লকের অনলাইন সিস্টেমের মাধ্যমে কিছু দান করতে চেয়েছিল, সেখানে দাতার পরিচয় যাচাই করার জন্য কোন প্রশ্ন করা হয়নি।

ফিলিপ গ্রাডওয়েল কাজ করেন ‘ক্রিপটো-কারেন্সি অ্যনালিসিস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে, তিনি ক্রিপটো-কারেন্সির বিষয়ে তদন্ত করেন।

“আপনি যদি মুখোশ পরে কোন চ্যারিটি শপে যান এবং তাদেরকে নগদ ১০,০০০ পাউন্ড দান করেন, তারপর একটি রসিদ দাবি করেন, তখন আপনাকে সম্ভবত অনেক প্রশ্ন করা হবে- এক্ষেত্রেও কোন ব্যতিক্রম নেই।”

“এটা সত্য যে গবেষকরা এবং আইন প্রয়োগকারীরা ক্রিপটো-কারেন্সি অর্থ কোত্থেকে কোথায় যাচ্ছে তা খুঁজে বের করতে এখন অনেক বেশি দক্ষ হয়ে উঠেছেন। কারণ এই ক্রিপটো-কারেন্সি এখন হাতবদল হয়ে ঘুরছে বিশ্বের নানা জায়গায়। তবে প্রতিটি ক্রিপটো-কারেন্সি ওয়ালেটের আসল মালিক কে, সেটি খুঁজে পাওয়া অনেক বেশি জটিল কাজ। অজ্ঞাতপরিচয় লোকজনকে যখন সম্ভাব্য অবৈধ উৎস থেকে পাওয়া অর্থ এভাবে দান করতে দেয়া হচ্ছে, তা কিন্তু অর্থ পাচারের জন্য দরোজা খুলে দেয়ার বিপদ তৈরি করছে।”

“সব ক্রিপটো-কারেন্সি ব্যবসাতেই কিন্তু বহু ধরণের ‘এন্টি-মানি লন্ডারিং’ পদক্ষেপ নিতে হয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে ‘নো ইউর কাস্টমার‌’ (কেওয়াইসি), অর্থাৎ আপনার গ্রাহককে জানুন। এর মাধ্যমে গ্রাহকের ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করা হয়, যাতে করে কোন লেন-দেনের পেছনের ব্যক্তিটি আসলে কে, সেটা বোঝা যায়।”

দ্য গিভিং প্রজেক্টের মাধ্যমে আরও যেসব দাতব্য প্রতিষ্ঠান অনুদান নেয়, তাদের সঙ্গে কথা বলেছে বিবিসি।

সেভ দ্য চিলড্রেন বিবিসিকে জানিয়েছে, তারা কখনোই জেনেশুনে এমন দানের অর্থ নেয় না, যা অপরাধের মাধ্যমে অর্জন করা।

মেয়ে শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করে ‘শী ইজ দ্য ফার্স্ট‌’। তারা বলেছে, অজ্ঞাতপরিচয় এবং সম্ভাব্য অপরাধমূলক উৎস থেকে আসার অনুদান তারা নিতে স্বস্তিবোধ করবে না।

সংস্থাটি বলেছে, এটি খুবই লজ্জার ব্যাপার যে খারাপ কিছু লোক ক্রিপটো-কারেন্সির মাধ্যমে দান করার এই সুযোগটি অপব্যবহার করছে। আমরা আশা করবো নামপরিচয় গোপন রাখতে চান এমন দাতারাও যেন আমাদের সমাজের মূল্যবোধের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।”

জো টাইড

সাইবার রিপোর্টার

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

 

 




বয়স্ক লোকদের করোনা ভাইরাসের টিকা দেওয়া যেসব কারণে খুব কঠিন

করোনাভাইরাসের টিকা যখন বের হবে তখন বিশ্ব নেতাদের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে এই প্রতিষেধক কীভাবে সব মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়।

এই ভাইরাসের কারণে যেসব মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে তারাসহ সম্ভবত নার্স, ডাক্তার, কেয়ার ওয়ার্কারদের কাছেই এই টিকা পৌঁছানো হবে সবার আগে।

কোভিড-১৯ মহামারিতে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় আছে বয়স্ক লোকেরা। কিন্তু দুঃখজনক হলো তাদেরকে টিকা দেওয়া হলে তাদের শরীরে তা ঠিক মতো কাজ করে না।

কানাডায় টিকা সংক্রান্ত একজন গবেষক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শায়ান শরিফ বলেছেন, “বৃদ্ধ লোকজনকে দেওয়ার মতো টিকা আমাদের খুব কমই আছে। গত শতাব্দীতে যতো টিকা তৈরি হয়েছে তার বেশিরভাগই হয়েছে শিশুদের রোগের চিকিৎসার জন্য।”

তবে তার মধ্যে ব্যতিক্রম হচ্ছে শিঙ্গেলস। সাধারণত বয়স্ক লোকেরা এই রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকে। এটি ভাইরাসের আক্রমণে ঘটা স্নায়ুর এক ধরনের প্রদাহ। তাদেরকে এই রোগের টিকা দেওয়া হয়। এছাড়াও তরুণ বয়সের জন্যে আছে আরো দুয়েকটি টিকা: মেনিনজাইটিস বা মস্তিষ্কে সংক্রমণ এবং হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাসের মতো চর্মরোগ।

এসব ছাড়া রোগ প্রতিরোধের বেশিরভাগ টিকাই তৈরি হয়েছে শিশুদের জন্য।

“শিশুদের অসুখ বিসুখের ব্যাপারে আমাদের অনেক জ্ঞান আছে। তবে তরুণ, মধ্য এবং বৃদ্ধ বয়সের রোগের ব্যাপারে আমাদের তেমন একটা অভিজ্ঞতা নেই,” বলেন অধ্যাপক শায়ান শরিফ।

কেন জটিল?

বৃদ্ধ মানুষকে টিকা দেওয়া কেন কঠিন সেটা বুঝতে হলে প্রথমে তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থার দিকে তাকাতে হবে।

অনেক সংক্রামক রোগ আছে যেগুলো বয়স্কদের জন্য বিপদজনক। কিন্তু তরুণদের জন্য এসব রোগ ততোটা ঝুঁকিপূর্ণ নয়।

এসব রোগের কাছে বৃদ্ধ লোকজনের নাজুক হওয়ার কিছু কারণ আছে: সারা জীবন ধরে তারা নানা ধরনের কার্সিনোজেনের সংস্পর্শে আসে, বিভিন্ন সময়ে তারা আরো কিছু সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হয়, ফলে তাদের দেহে নতুন কোন জীবাণুর সংক্রমণ থেকে অসুখ বিসুখ হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

একই সঙ্গে বয়স বাড়ার বাড়ার সাথে তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ে। একে বলা হয় ইমিওনোস্নেসেন্স।

শরীরের অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মতো আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থারও বয়স বৃদ্ধি পায়। সময়ের সাথে সাথে তার বিভিন্ন লক্ষণও চোখে পড়ে। শরীরে রোগ প্রতিরোধী অনেক কোষ তাদের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে।

মানুষের দেহের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা বিভিন্ন কোষের সমন্বয়ে গঠিত জটিল এক নেটওয়ার্ক। এসব কোষ একটি আরেকটির সঙ্গে যোগাযোগ করে। কখনও এই নেটওয়ার্কের কোথাও যদি কিছু কাজ না করে তখন তারা নিজেরাই এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে।

বয়স্ক লোকের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে

আপনি যখন একটি জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হন তখন আপনার দেহের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থার প্রথম ধাপটি সক্রিয় হয়ে ওঠে। যেখানে সংক্রমণ হয়েছে ঠিক সেখানে তারা ওই জীবাণুটিকে আক্রমণ করতে শুরু করে। শ্বাসপ্রশ্বাস-জনিত রোগের ক্ষেত্রে সেটা হতে পারে ফুসফুস, শ্বাসনালী অথবা নাকে।

রক্তের শ্বেত কণিকা ওই জীবাণুকে আক্রমণ করে এবং ধ্বংস করে আগে সেটিকে গিলে ফেলে।

এসব শ্বেত কণিকাকে বলা হয় ম্যাক্রোফেজ। এই ম্যাক্রোফেজ জীবাণুকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে ফেলে এবং এসব টুকরোকে তুলে দেয় টি সেল নামের আরেকটি রোগ প্রতিরোধী কোষের কাছে।

এই টি সেল রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থার স্মৃতিশক্তি হিসেবে কাজ করে। অর্থাৎ একই জীবাণু যদি পরে কখনও আক্রমণ করে তখন তারা মনে করতে পারে যে আগেরবার তারা কীভাবে তাকে ধ্বংস করেছিল।

টি সেল নিজেরা কিন্তু জীবাণুকে দেখতে পায় না। জীবাণু দেখার জন্য তাদের একটি নির্দিষ্ট ম্যাক্রোফেজের দরকার হয়। এগুলোকে বলা হয় এন্টিজেন প্রেজেন্টিং সেল।

এটি রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থার পরবর্তী স্তরকে সক্রিয় করে তোলে।

শরীরে বিভিন্ন ধরনের টি সেল আছে। সাইটোটক্সিন নামে এক ধরনের টি সেল, ইতোমধ্যে যেসব কোষ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, সেগুলোকে আক্রমণ করে।

এটা তারা করে জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধটা আরো একটু সহজ করে তোলার লক্ষ্যে অর্থাৎ এই জীবাণু যাতে আরো ছড়াতে না পারে সেজন্যে। এসব টি সেলকে বলা হয় কিলার টি সেল।

আরেক ধরনের টি সেল আছে যেগুলোকে বলা হয় সাহায্যকারী বা হেল্পার টি সেল। এসব কোষ রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থার বি সেলকে জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে সহায়তা করে।

এই বি সেল কিন্তু জীবাণুকে দেখতে পায়। কিন্তু জীবাণুর বিরুদ্ধে পূর্ণ লড়াই-এ তাদের হেল্পার টি সেলের সহায়তার প্রয়োজন হয়। বি সেল এন্টিবডি তৈরি করে। কিন্তু সবচেয়ে কার্যকরী এন্টিবডি উৎপাদনের জন্য তাদেরকে টি সেলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। এটিও একটি জটিল প্রক্রিয়া।

রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থাকে উদ্দীপ্ত করা

টিকা দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থাকে উদ্দীপ্ত করে তোলা যাতে তারা কোন ধরনের জীবাণু দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার আগেই সেটি আক্রান্ত মানুষের শরীরে কার্যকর এন্টিবডি তৈরি করতে পারে।

কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকলে সেটা এই এন্টিবডি টেস্টের মাধ্যমে জানা সম্ভব হয়।

তবে সব এন্টিবডি যে কাজ করে তা-ও নয়। এছাড়াও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে সবার দেহে এন্টিবডি না-ও পাওয়া যেতে পারে। আবার কোন কোন এন্টিবডির আয়ুষ্কাল হয় খুবই কম।

টিকা তৈরিতে যারা কাজ করেন তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এই সব ধরনের কোষের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। এই কাজটি খুব স্পর্শকাতর। তবে বয়স্ক লোকের দেহে এই ভারসাম্য যখন বিঘ্নিত হয় তখন সেটা ফিরিয়ে আনা বিজ্ঞানীদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।

তাহলে বয়স্ক লোকজনের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থায় কী ঘটে?

“আসলে সব ধরনের কোষের কার্যকারিতা তখন নষ্ট হয়ে যায়,” বলেন ইন্সব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরগিট ওয়েইনবার্গার, যিনি বয়স্ক লোকজনের দেহে রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা এবং তাদের টিকা দেওয়ার বিষয়ে গবেষণা করছেন।

“তারা ভিন্ন এক ধরনের সাইটোকাইন্স উৎপাদন করে (এটি এক ধরনের প্রোটিন যা রোগ প্রতিরোধী কোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগে সাহায্য করে থাকে) তবে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তা হলো কোন কোষই এককভাবে কাজ করতে পারে না।”

বয়স্ক ব্যক্তির দেহে ম্যাক্রোফেজের এন্টিজেন ব্যবস্থাপনা নষ্ট হয়ে গেলে টি সেলের কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে এটি তখন জীবাণু প্রতিরোধে বি সেলকে তেমন একটা সাহায্য করতে পারে না। একারণে শরীরে যথেষ্ট পরিমাণে এন্টিবডিও তৈরি হয় না।

“রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থার ভিন্ন ভিন্ন অংশগুলো কীভাবে একত্রিত হয়ে কাজ করে সেটা আমাদের মাথায় রাখতে হবে,” বলেন বিরগিট ওয়েইনবার্গার।

শায়ান শরীফ বলেন, “আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থায় বি ও টি সেলের সংখ্যাও কিন্তু সীমিত এবং সময়ের সাথে এসব সেল আমরা হারাতে থাকি। জীবনের শেষ বয়সে এটাও সমস্যা তৈরি করতে পারে।”

“যখন আমরা নতুন কোন জীবাণুর মুখোমুখি হই সেটা প্রতিরোধের ক্ষমতাও তখন সীমিত হয়ে পড়ে।”

ভালো দিকও আছে

মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সবার রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থায় পরিবর্তন ঠিক একইভাবে ঘটে না। বয়স হওয়ার পরেও অনেকে সুস্থ থাকেন। হয় তারা তাদের নিজেদের শরীর ভালোভাবে দেখাশোনা করেন, অথবা তারা হয়তো ভাগ্যবান যে বয়স বাড়লেও তাদের শরীরের জিনগত গঠন ঠিক থাকে।

সেকারণে বয়স বাড়াটা যে রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থার জন্য পুরোপুরি খারাপ খবর তা কিন্তু নয়। এই প্রতিরোধী ব্যবস্থার কিছু কিছু অংশ আছে যা বয়স বাড়ার সাথে সাথে আরো উন্নত হয়।

“আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থায় কিছু কিছু কোষ আছে যা বয়সের সাথে সাথে আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আমরা যদি নানা রকমের জীবাণু দিয়ে আক্রান্ত হই, সেই জীবাণু মোকাবেলার স্মৃতির কারণে নতুন এন্টিজেনে সাড়া দিতে প্রচুর কোষের প্রয়োজন হয় না,” বলেন শায়ান শরীফ।

কিন্তু করোনাভাইরাস হচ্ছে এমন একটি ভাইরাস যার দ্বারা আমরা এর আগে কখনো আক্রান্ত হইনি। ফলে সেটি মোকাবেলার কোন স্মৃতি আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থার নেই।

সুতরাং বলা যায় বয়স্ক লোকজনের দেহে যে রোগ প্রতিরোধী ব্যবস্থা, জীবাণু মোকাবেলায় তাদের প্রচুর স্মৃতি রয়েছে। কারণ ইতোমধ্যেই তারা এসব জীবাণু মোকাবেলা করে সেগুলোকে ধ্বংস করেছে। তারা জানে কিভাবে ওই জীবাণুকে প্রতিহত করতে হয়। কিন্তু নতুন কোনো রোগে আক্রান্ত হলে সেটি মোকাবেলায় তাদের অভিজ্ঞতা সীমিত।

সাধারণভাবে বলা যায় যে এসব হয়তো ঠিকই আছে। কিন্তু মানবদেহে যেহেতু অন্যান্য প্রাণী থেকেও জীবাণু আসে তখন সেই নতুন জীবাণুটি মোকাবেলা করার ক্ষমতাও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

টিকা কীভাবে কাজ করে

মানব দেহে যখন কোন টিকা পরীক্ষার করা হয় তখন সেটা তিনটি পর্যায় অতিক্রম করে।

প্রথম ধাপে অল্প কিছু মানুষের দেহে পরীক্ষা করে দেখা হয় এটি কতটা নিরাপদ। দ্বিতীয় ধাপে দেখা হয় এটি কতখানি ফলপ্রসূ অর্থাৎ আপনার চাওয়া অনুসারে এটি সাড়া দেয় কীনা। আর সর্বশেষ অর্থাৎ তৃতীয় ধাপে পরীক্ষা করে দেখা হয় এই টিকা জীবাণু প্রতিরোধে কতোটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে অর্থাৎ যতোটা ও যেভাবে সাড়া দিচ্ছে সেটা ওই রোগটিকে ঠেকাতে পারছে কীনা।

এই টিকা কিন্তু আবার এক দল মানুষের শরীরে ভালোভাবে কাজ করতে পারে, আবার অন্যদের শরীরে এই একই টিকা এতোটা কার্যকর নাও হতে পারে।

বর্তমানে করোনাভাইরাসের টিকা তৈরির জন্য বেশ কয়েকটি পরীক্ষা চলছে এবং এগুলোর একেকটি একেক পর্যায়ে রয়েছে।

বিজ্ঞানী বিরগিট ওয়েইনবার্গার এবং শায়ান শরীফ উভয়ের কাছেই এটা ভালো একটা দিক। কারণ এখান থেকে আমরা কোন একটি পরিস্থিতির জন্য সঠিক টিকাটি বেছে নিতে পারবো। তার মধ্যে কোন একটি টিকা হয়তো অন্য টিকাগুলোর তুলনায় বয়স্ক মানুষের শরীরে ভাল কাজ করতে পারে।

“কোন টিকাই পুরোপুরি নিখুঁত নয়,” বলেন শায়ান শরিফ, “এমন একটি টিকাও নেই যা ১০০% কার্যকর।”

যেসব টিকা রোগটি প্রতিরোধ করতে পারবে শুধু সেগুলোকে অনুমোদন দেওয়া হবে কিন্তু সব টিকাই যে সংক্রমণ ঠেকাতে পারবে তা নয়।

বেশিরভাগ টিকার কাজ হচ্ছে জীবাণুটি যাতে রোগ তৈরি করেত না পারে সেজন্য তাকে বাধা দেওয়া। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ওই টিকা শরীর থেকে জীবাণুটিকে পুরোপুরি নির্মূল করে ফেলবে।

অর্থাৎ কাউকে টিকা দেওয়ার পরেও তার শরীরে ভাইরাসটি থেকে যেতে পারে এবং সেকারণে তিনি অন্যদেরকেও এই জীবাণু দিয়ে সংক্রমিত করতে পারেন।

একারণে কাদেরকে আগে টিকা দেওয়া হবে সেটি নির্ধারণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এক্ষেত্রে যাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি তাদের কথা বিবেচনা করতে হবে।

কিন্তু এখন যদি রোগীদের আগে টিকা না দিয়ে নার্স, ডাক্তার ও কেয়ার ওয়ার্কারদের দেওয়া হয়, তারা হয়তো এই রোগে আক্রান্ত হবে না, কিন্তু তাদের মাধ্যমে আরো অনেক লোকের দেহে জীবাণুটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।

“একটি টিকা হয়তো রোগের সংক্রমণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে কিন্তু ভাইরাসের বিস্তার একেবারে থামাতে পারবে এরকম টিকা পাওয়ার সম্ভাবনা কম,” বলেন শায়ান শরীফ।

“ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা তার একটি ভাল উদাহরণ: এই টিকা রোগের বিস্তার ঠেকাতে তেমন ভূমিকা রাখতে পারে না, কিন্তু রোগের মাত্রা কমাতে পারে।”

টিকা দেওয়ার কৌশল

বিজ্ঞানীরা বলছেন, টিকা দেওয়ার কৌশল তৈরি করা এমন একটি জটিল প্রক্রিয়া যার সঙ্গে সামাজিক, চিকিৎসা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা বিষয় যুক্ত রয়েছে।

তবে যেসব গ্রুপের মানুষের মধ্যে মৃত্যুর হার বেশি, টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদেরকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। আর বাকি লোকজনকে এই ভাইরাসটি সাথে নিয়ে কীভাবে বেঁচে থাকতে হয় সেই কৌশল রপ্ত করতে হবে।

ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে বয়সের ভূমিকা এখনও রহস্যময়। তবে বিরগিট ওয়েইনবার্গার বলছেন, করোনাভাইরাসের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে যে শিশুদের মাধ্যমে এই রোগ কম ছড়ায়। তবে এই গবেষণা নিয়েও তার প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেছেন, এসব গবেষণা থেকে কোন উপসংহারে পৌঁছানো যায় না। কারণ ইউরোপে শিশুরা যখন স্কুলে যায় নি তখন এসব গবেষণা চালানো হয়েছে। এখন এই শিশুরা স্কুলে যাচ্ছে। তারাই হয়তো ভাইরাসটি স্কুল থেকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তাদের দাদা দাদী / নানা নানীকে আক্রান্ত করতে পারে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভাইরাসটি কীভাবে ছড়ায় সেটা ভাল করে জানা গেলে কাদেরকে আগে টিকা দিতে হবে সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ হবে।

“টিকা তৈরির প্রক্রিয়া দ্রুত করায় ভাল হয়েছে, কিন্তু কিছু কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমাদের কিছু জ্ঞানের প্রয়োজন,” বলেন বিরগিট ওয়েইনবার্গার।

শায়ান শরিফ বলেন, “আমরা অনেকেই মনে করি টিকা হচ্ছে আমাদের একমাত্র উদ্ধারকর্তা। কিন্তু বিষয়টা আসলে তা নয়। একটি টিকা কাজ করতে ১৪ থেকে ২৮ দিন সময় লাগতে পারে এবং বেশ কয়েকটি ইনজেকশন নিতে হতে পারে।”

“আমরা যদি এমন ওষুধ তৈরি করতে পারি যাতে বয়স্ক লোকজনকে করোনাভাইরাসের চিকিৎসার জন্য খুব বেশি সময় হাসপাতালে থাকতে হবে না তাহলে সেটাই হবে বড় পাওয়া।”

নতুন আশা

কোভিড-নাইনটিন রোগের চিকিৎসায় শত শত ওষুধের ওপর গবেষণা চলছে।

বর্তমানে এরকম একটি সম্ভাবনাময় ওষুধের নাম ডেক্সামেথাসোন। এটি একটি স্টেরয়েড যার সাহায্য অক্সিজেন দিতে হচ্ছে এমন রোগীদের মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হতে পারে।

ব্রিটেন ও জাপানে এটি ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর তাকেও হাসপাতালে এই ওষুধটি দেওয়া হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে এরকম পাঁচটি ওষুধকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে জরুরি কারণে ব্যবহারের জন্য। বিজ্ঞানীরা বলছেন, একারণে করোনাভাইরাসের টিকা তৈরির কাজ অন্য যেকোন টিকা তৈরির চেয়ে দ্রুততর হবে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, করোনাভাইরাসের টিকা বের না হলেও এর ওষুধ নিয়ে যেসব গবেষণা চলছে তা থেকে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বয়স্ক লোকেরা লাভবান হবেন।

 

 

 

 

 

 

 

 

বিবিসি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




জেনে নিন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী’র না জানা সংক্ষিপ্ত জীবনী

মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (৬ ডিসেম্বর, ১৮৫৩ – ১৭ নভেম্বর, ১৯৩১) ছিলেন বিখ্যাত বাঙালি ভারততত্ত্ববিদ, সংস্কৃত বিশারদ, সংরক্ষণবিদ ও বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতা। তার আসল নাম ছিল হরপ্রসাদ ভট্টাচার্য। তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের আবিষ্কর্তা। তিনি সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত রামচরিতম্ বা রামচরিতমানস পুঁথির সংগ্রাহক।

শিক্ষা
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ব্রিটিশ বাংলা প্রদেশের খুলনা জেলার কুমিরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাদের আদি নিবাস ছিল উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার নৈহাটিতে। তার পারিবারিক পদবী ছিল ভট্টাচার্য। গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের পর হরপ্রসাদ কলকাতার সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুল ও প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন। কলকাতায় তিনি তার বড়দা নন্দকুমার ন্যায়চঞ্চুর বন্ধু তথা বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ও পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে থাকতেন।১৮৭১ সালে হরপ্রসাদ প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৮৭৩ সালে পাস করেন ফার্স্ট আর্টস পরীক্ষা। ১৮৭৬ সালে বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৮৭৭ সালে সংস্কৃতে সাম্মানিক হন। পরে এম.এ. পরীক্ষায় পাস করে তিনি ‘শাস্ত্রী’ উপাধি লাভ করেন। উক্ত পরীক্ষায় হরপ্রসাদই ছিলেন প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ একমাত্র ছাত্র।

কর্মজীবন
১৮৭৮ সালে তিনি হেয়ার স্কুলে শিক্ষকরূপে যোগদান করেন।১৮৮৩ সালে তিনি সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। এই সময়ই বাংলা সরকার তাকে সহকারী অনুবাদক নিযুক্ত করে। ১৮৮৬ থেকে ১৮৯৪ সাল পর্যন্ত সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি বেঙ্গল লাইব্রেরিতে গ্রন্থাগারিকের দায়িত্বও পালন করেন। ১৮৯৫ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের সংস্কৃত বিভাগীয় প্রধান হন।এরপর ১৯০০ সালে তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হন। ১৯০৮ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে অবসর নিয়ে তিনি সরকারের তথ্যকেন্দ্রে যোগ দেন।

১৯২১ থেকে ১৯২৪ পর্যন্ত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান।অধ্যাপনা ও সরকারি কাজের পাশাপাশি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দু বছর এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি, বারো বছর বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি এবং লন্ডনের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির সাম্মানিক সদস্য ছিলেন।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর প্রথম গবেষণাপত্রটি ভারত মহিলা নামে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সেই সময় তিনি ছিলেন ছাত্র। পরে হরপ্রসাদ এই পত্রিকার নিয়মিত লেখকে পরিণত হন এবং নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। হরপ্রসাদকে ভারততত্ত্ব বিষয়ে আগ্রহী করে তোলেন বিশিষ্ট ভারততত্ত্ববিদ রাজেন্দ্রলাল মিত্র। তিনি রাজেন্দ্রলালের দ্য সংস্কৃত বুদ্ধিস্ট লিটারেচার অফ নেপাল গ্রন্থে সঙ্কলিত বৌদ্ধ পুরাণগুলির অনুবাদ শুরু করেন। এশিয়াটিক সোসাইটিতে তিনি রাজেন্দ্রলালের সহকারী ছিলেন। রাজেন্দ্রলালের মৃত্যুর পর সোসাইটিতে সংস্কৃত পুঁথি অন্বেষণ বিভাগের পরিচালক হন।অল্প কয়েকজন সহকারী নিয়ে হরপ্রসাদ এশিয়াটিক সোসাইটির দশ হাজার পুঁথির ক্যাটালগ প্রস্তুত করেন।এই ক্যাটালগের যে দীর্ঘ মুখবন্ধটি তিনি রচনা করেছিলেন, তা সংস্কৃত সাহিত্যের একটি মূল্যবান ইতিহাস। সংস্কৃত পুঁথি নিয়ে চর্চা করতে করতেই হরপ্রসাদ বাংলা পুঁথির বিষয়েও আগ্রহী হয়ে ওঠেন।পুঁথির সন্ধানে তিনি অনেকবার নেপাল গিয়েছিলেন। সেখানেই ১৯০৭ সালে তিনি আবিষ্কার করেন চর্যাগীতি বা চর্যাপদের পুঁথি।এই পুঁথিগুলি নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন এগুলিই বাংলা সাহিত্যের আদিতম নিদর্শন।

ব্যক্তির বিষয়ে সংক্ষিপ্ত কথা
কাআ তরুবর পঞ্চ বি ডাল। চঞ্চল চীএ পইঠো কাল॥ ধ্রু॥ দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ। লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ॥ ধ্রু॥ সঅল সমাহিঅ কাহি করিঅই। সুখ দুখেতেঁ নিচিত মরিঅই॥ ধ্রু॥ এড়ি এউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস। সুনুপাখ ভিতি লেহু রে পাস॥ ধ্রু॥ ভণই লুই আম্‌হে ঝানে দিঠা। ধমণ চমণ বেণি পিণ্ডি বইঠা॥ ধ্রু॥

অনুবাদ: শরীরের গাছে পাঁচখানি ডাল– চঞ্চল মনে ঢুকে পড়ে কাল। দৃঢ় ক’রে মন মহাসুখ পাও, কী–উপায়ে পাবে গুরুকে শুধাও। যে সবসময় তপস্যা করে দুঃখে ও সুখে সেও তো মরে। ফেলে দাও পারিপাট্যের ভার, পাখা ভর করো শূন্যতার– লুই বলে, ক’রে অনেক ধ্যান দেখেছি, লভেছি দিব্যজ্ঞান।

অনুবাদ না করে দিলে পড়া যেত না তাই না প্রিয় পাঠক? ভাবছেন এটা আবার কোন ভাষা?

যদি বলি বাংলা? বলবেন এই পাগলটা কি না বলে? এই কাঠখট্টা ভাষা কি করে আমার প্রিয় বাংলা হয়। বিশ্বাস করুন আর নাই করুন এটা বাংলা ভাষাই। তবে এই আমলের বাংলা ভাষা নয়। আজ থেকে কমপক্ষে এক হাজার বছর আগের বাংলা ভাষা।

এটা বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম, এবং বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনযুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদের অংশ।বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনযুগের এই একটাই নিদর্শন পাওয়া গেছে; তবে তার মানে এই নয়, সে যুগে বাংলায় আর কিছু লেখা হয়নি। হয়তো লেখা হয়েছিল, কিন্তু সংরক্ষিত হয়নি। একবারও কি জানতে ইচ্ছা করে না কে ইতিহাসের ধুলোমাখা অতীত থেকে আবার আবিষ্কার করেছিলেন এই চর্যাপদ? তার নাম মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। আজ তারই গল্প শোনাবো।

মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৮৫৩ সালের ৬ ডিসেম্বর তারিখে চব্বিশপরগনার নৈহাটিতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম পিতার নাম রামকমল ন্যায়রত্ন। ১৮৬৬ সালে গ্রামের স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন এবং সংস্কৃত কলেজে প্রবেশ করেন। ১৮৭১ সালে নানারকম প্রতিবন্ধকতার মধ্যে এন্ট্রান্স পাশ করেন। ১৮৭৩ সালে এফ.এ পাশ করেন।

১৮৭৬ সালে প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে বি.এ পাশ করেন।বি.এ পরীক্ষায় তিনি ৮ম স্থান অধিকার করেছিলেন। ‘ভারত মহিলা’ প্রবন্ধ রচনা করে হোলকার পুরস্কার পান। ‘বঙ্গদর্শন’-এ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হলে বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা হয়। কলকাতায় তিনি তার বড়দা নন্দকুমার ন্যায়চঞ্চুর বন্ধু তথা বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ও পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে থাকতেন। ১৮৭৭ সালে সংস্কৃত কলেজ থেকে এম.এ পরীক্ষায় একমাত্র তিনিই প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং ‘শাস্ত্রী’ উপাধি পান। ১৮৭৮ সালের মার্চ মাসে বিবাহ করেন।

১৮৭৮ সালে কর্মজীবনের সুচনায় কলিকাতা হেয়ার স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। ক্রমে লক্ষ্ণো ক্যানিং কলেজ, কলিকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও কলিকাতা সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা করেন। পরে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন।

পুরাতন পুঁথি সংগ্রহের মাধ্যমে চর্যাপদ গবেষণা করে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনত্বকে প্রমাণিত করেন। ‘গোপাল তাপনি’ উপনিষদের ইংরেজি অনুবাদে তিনি রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সহযোগী ছিলেন। ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ গ্রন্থ রচনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের ফলে প্রাপ্ত লেখা থেকে পাঠোদ্ধার এবং পুঁথি আবিষ্কার ও টীকা রচনা করে ভারতবর্ষের প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিষয়ে বিশেষ অবদান রাখেন। ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে রাজেন্দ্রলাল মিত্রের মৃত্যুর পর এশিয়াটিক সোসাইটি কর্তৃক সংস্কৃত পুঁথিসংগ্রহের কাজে অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। এই কাজে তিনি নেপাল. তিব্বত ভ্রমণ করেন।

রচনাসমগ্র
১৯১৬ সালে চর্যাপদের পুঁথি নিয়ে রচিত তার গবেষণাপত্র হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোঁহা নামে প্রকাশিত হয়।হরপ্রসাদ অনেক প্রাচীন গ্রন্থ সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বহু গবেষণাপত্রও রচনা করেন। তিনি ছিলেন এক খ্যাতনামা হিস্টোরিওগ্রাফার। স্বীয় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ লাভ করেছিলেন বহু পুরস্কার ও সম্মান।তার বিখ্যাত বইগুলি হল বাল্মীকির জয়, মেঘদূত ব্যাখ্যা, বেণের মেয়ে (উপন্যাস), কাঞ্চনমালা (উপন্যাস), সচিত্র রামায়ণ, প্রাচীন বাংলার গৌরব ও বৌদ্ধধর্ম।তার উল্লেখযোগ্য ইংরেজি রচনাগুলি হল মগধান লিটারেচার, সংস্কৃত কালচার ইন মডার্ন ইন্ডিয়া ও ডিসকভারি অফ লিভিং বুদ্ধিজম ইন বেঙ্গল।

“ বাঙালিয়ানা, বাঙালিত্ব, আমি বাঙালি এই বোধ। আমার বাঙালি বলিয়া যে একটা সত্তা আছে, এই জ্ঞান। বেশি সংস্কৃত পড়িলে লোকে ব্রাহ্মণ হইতে চায়, ঋষি হইতে চায়। সেটা খাঁটি বাংলার জিনিস নয়; তাহার সঞ্চার পশ্চিম হইতে। বেশি ইংরাজি পড়িলে কী হয় তাহা আর বলিয়া দিতে হইবে না। …
বাঙালিয়ানার অর্থ এই যে, বাংলার যা ভালো তাহা ভালো বলিয়া জানা, আর যাহা মন্দ তাহা মন্দ বলিয়া জানা। ভালো লওয়া ও মন্দ না লওয়া তোমার নিজের কাজ। কিন্তু জানাটা প্রত্যেক বাঙালির দরকারি কাজ। জানিতে হইলে বুদ্ধিপূর্বক বাংলা দেশটা কী দেখিতে হইবে, বাংলায় কে থাকে দেখিতে হইবে, বাংলার আচার ব্যবহার, রীতি-নীতি, সমাজ-সংসার, উৎসব-আনন্দ, দুঃখ-শোক, কুস্তি লাঠিখেলা টোল পাঠশালা দেখিতে হইবে। ইহার গান গীতি পয়ার পাঁচালী, নাচ খেমটা, কীর্তন ঢপ যাত্রা কবি সব দেখিতে হইবে। মন প্রাণ দিয়া দেখিতে হইবে। আবার এখনকার কালে যাহা যাহা বদলাইতেছে, তাহাও দেখিতে হইবে। খবরের কাগজ, মাসিক পত্র, কনসার্ট, থিয়েটার, ইস্কুল, কলেজ, আপিস, আদালত সবই দেখিতে হইবে। বাংলার এবং বাঙালি জাতির সমস্ত জীবনটা ভালো করিয়া দেখিতে হইবে, তবেই তুমি বাঙালি হইবে।
-হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচনা সংগ্রহ, ২য় খণ্ড

 

 

 

 

উইকিপিডিয়া

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




ঔপনিবেশিক ভারতে কেন নারীদের যৌনাঙ্গ পরীক্ষায় বাধ্য করতে আইন করা হয়েছিল

১৮৭০ সালে তোলা দুই ভারতীয় নারীর ছবি

আঠারোশ’ আটষট্টি সালের কথা। ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের কলকাতা শহরে সুখীমণি রাউর নামে এক নারীর কারাদণ্ড হলো। তার অপরাধ ছিল তিনি তার যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করাতে অস্বীকার করেছিলেন।

সে সময় নিবন্ধিত যৌনকর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক একটি আইন ছিল যে তার যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করাতে হবে।

সুখীমণি সেই আইন লঙ্ঘন করেছিলেন, কারণ তার দাবি ছিল – তিনি যৌনকর্মী নন।

ঔপনিবেশিক ভারতে ওই আইনটির উদ্দেশ্য ছিল যৌনসম্পর্কবাহিত রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা।

সংক্রামক ব্যাধি আইন নামে ওই আইনের বিধান ছিল: যৌনকর্মীদের থানায় গিয়ে নিজেদেরে নিবন্ধন করাতে হবে, তাদের ডাক্তারি পরীক্ষা করাতে হবে এবং পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকতে হবে।

সুখীমণি রাউর সেই আইনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তিনি আদালতে এক আবেদন করলেন তাকে মুক্তি দেবার দাবি জানিয়ে।

“আমি যৌনকর্মী ছিলাম না এবং তাই আমি এক মাসে দুবার সেই পরীক্ষা করাতে যাইনি” – আদালতে বলেন সুখীমণি।

তিনি আরো জানান যে তিনি কখনোই যৌনকর্মী ছিলেন না।

শেষ পর্যন্ত ১৮৬৯ সালের মার্চ মাসে কলকাতা হাইকোর্ট সুখীমণির পক্ষে রায় দেয়।

রোগের বিস্তার ঠেকাতে যৌনকর্মীদের পরীক্ষা

বিচারকরা রায়ে বলেন, সুখীমণি রাউর একজন “নিবন্ধিত গণ যৌনকর্মী ছিলেন না”।

শুধু তাই নয়, আদালত বলেন, যৌনকর্মী হিসেবে নিবন্ধন হতে হবে স্বেচ্ছামূলক, অর্থাৎ নিবন্ধন করানোর জন্য কারো ওপর জোর খাটানো যাবে না।

এ নিয়ে এক বিস্তারিত গবেষণার পর একটি বই লিখেছেন অধ্যাপক দুর্বা মিত্র। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী ও লিঙ্গ বিষয়ে অধ্যাপনা করেন।

অধ্যাপক মিত্র বলছেন, ঔপনিবেশিক যুগের দলিলপত্র ঘেঁটে তিনি দেখেছেন যে, সেসময় হাজার হাজার নারীকে তাদের যৌনাঙ্গ পরীক্ষার মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশনের নিয়ম লংঘনের অভিযোগে সে যুগে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল।

‘ভারতের যৌনজীবন’ বা ‘ইন্ডিয়ান সেক্স লাইফ’ নামের বইটি প্রকাশ করেছে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি প্রেস।

এই বইটিতে সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এবং ভারতের বুদ্ধিজীবীরা আধুনিক ভারতের সমাজকে নিয়ন্ত্রণ ও সংগঠিত করতে নারীদের যৌন বিচ্যুতির ধারণা গড়ে তুলেছিলেন।

‘ঘৃণ্য পরীক্ষা পদ্ধতি’

দুর্বা মিত্র বলছেন, যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণের একটি উপায় ছিল যে নারীদের যৌনকর্মী হিসেবে দেখা হয় তাদের শ্রেণীবিভাগ, নিবন্ধন এবং ডাক্তারি পরীক্ষা করা।

এর প্রতিবাদে ১৮৬৯ সালে কোলকাতার কিছু যৌনকর্মী ওপনিবেশিক কর্তৃপক্ষের কাছে এক আবেদন পেশ করেন। তারা অভিযোগ করেন, নিবন্ধীকরণ এবং যৌনাঙ্গ পরীক্ষায় বাধ্য করার মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ তাদের নারীত্বের অবমাননা করছে।

তারা এই “ঘৃণ্য পরীক্ষা পদ্ধতির” প্রতিবাদ জানান যাতে তাদের কুৎসিতভাবে দেহের গোপন অংশ দেখাতে হয়।

তারা লিখেছিলেন, “যারা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে তাদেরকে ডাক্তার ও তার অধীনস্থ লোকদের কাছে নিজেদের অনাবৃত করতে হয়” এবং “নারীর সম্মানবোধ তাদের মন থেকে এখনো পুরোপুরি মুছে যায়নি।”

কর্তৃপক্ষ খুব দ্রুতই এ আবেদন খারিজ করে দেন।

কারণ শহরের ক্ষমতাধর কর্মকর্তারা বলেন, গোপন যৌনকর্মীরা যারা নিবন্ধন এড়িয়ে যাচ্ছে তারা নতুন আইনের প্রতি হুমকি হয়ে উঠেছে।

কলকাতার একটি বড় হাসপাতালের প্রধান ডা. রবার্ট পেইন বলেন, বেঙ্গল প্রদেশের যৌনকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব একটি কাজ এবং নিবন্ধনের কাজটা নারীদের সম্মতি ছাড়াই করা উচিত।

অধ্যাপক মিত্র বলছেন, ১৮৭০ থেকে ১৮৮৮ সালের মধ্যে এই আইন লংঘনের জন্য শুধু কলকাতাতেই দৈনিক ১২ জন নারীকে গ্রেফতার করা হতো।

ভারতের যৌনকর্মীদের ব্যাপারে ঔপনিবেশিক আমলে এক ব্রিটিশ কর্মকর্তার বর্ণনা

কর্তৃপক্ষ আরো খেয়াল করেছিলেন নজরদারির ব্যাপারটা টের পেলে অনেক নারীই শহর থেকে পালিয়ে যেতেন।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এক পর্যায়ে একটা বিতর্ক শুরু করেন যে বাংলা প্রদেশের পুলিশ আইনগতভাবে যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করতে পারে কি না – বিশেষ করে যে নারীদের বিরুদ্ধে শিশুহত্যা এবং ভ্রুণহত্যার অভিযোগ আছে।

একজন ম্যাজিস্ট্রেট যুক্তি দেন যে, যৌনাঙ্গ পরীক্ষা বাধ্যতামূলকভাবে করা না হলে ধর্ষণ ও গর্ভপাতের মিথ্যা অভিযোগ বেড়ে যাবে।আরেকজন যুক্তি দেন যে, মেয়েদের সম্মতি নিতে হলে তা বিচার প্রক্রিয়াকে পঙ্গু করে দেবে।

প্রদেশের সচিবকে লেখা এক চিঠিতে কলকাতার পুলিশ কমিশনার স্টুয়ার্ট হগ আভাস দেন যে, আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে নারীদের থেকে পুরুষদের যৌন রোগে সংক্রমিত হওয়া অব্যাহত রয়েছে।

হিজড়ারাও ছিল আইনের লক্ষ্যবস্তু

ইতিহাসবিদ জেসিকা হিঞ্চি বলছেন ঔপনিবেশিক ভারতে শুধু যে যৌনকর্মীদেরই যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করানো হতো তা নয়, বরং খোজা বা হিজড়াদেরও ১৮৭১ সালের একটি বিতর্কিত আইনের অধীনে যৌনাঙ্গ পরীক্ষা করানো হতো।

ওই আইনে কিছু জনগোষ্ঠীর লোককে ‘বংশানুক্রমিকভাবে অপরাধী’ বলে চিহ্নিত করা হয়।

মিজ হিঞ্চির মতে ওই আইনটির লক্ষ্য ছিল হিজড়াদের ভারতীয় সমাজ থেকে ক্রমশঃ নিশ্চিহ্ন করে ফেলা।

এ জন্য তাদের ওপর নাচগান ও মেয়েলি পোশাক পরাসহ বিভিন্ন রীতিনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা, হিজড়াদের বাড়ি থেকে বাচ্চাদের নিয়ে যাওয়া, পুলিশ নিবন্ধন – ইত্যাদি নানা রকম নিয়মকানুন চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল।

নিম্নবর্ণের সকল নারীই সম্ভাব্য যৌনকর্মী’

ঔপনিবেশিক ভারতের এক লজ্জাজনক অধ্যায় বলে মনে করা হয় এই আইনকে।

একজন যৌনকর্মীকে কিভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে – তার জন্য এক প্রশ্নমালা দেয়া হয়েছিল ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ ও ডাক্তারদের।

অধ্যাপক মিত্র বলছেন, ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ জবাব দিয়েছিল যে “ভারতের সকল নারীই” সম্ভাব্য যৌনকর্মী।

একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা এ এইচ জাইলস যুক্তি দেন যে “উচ্চবর্ণের নয় এবং বিবাহিত নয় এমন সকল নারীকেই” যৌনকর্মী হিসেবে শ্রেণীভুক্ত করা যেতে পারে।

বাংলা ভাষার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক এবং ‘বন্দেমাতরম’ গানের রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জি সেসময় ছিলেন একজন মাঝারি শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা। তিনি বিস্তারিত বর্ণনা করেছিলেন যে, ভারতে বহু ধরণের নারী গোপনে যৌনকর্মীর কাজ করেন।

অধ্যাপক মিত্র বলছেন, উচ্চবর্ণের হিন্দু ও বিবাহিত মহিলাদের বাইরে প্রায় সকল নারীকেই তখন যৌনকর্মী বলে বিবেচনা করা হতো।

এর মধ্যে তথাকথিত ড্যান্সিং গার্ল বা নাচ-গান করা মেয়ে, বিধবা, একাধিকবার বিয়ে হওয়া হিন্দু ও মুসলিম নারী, ভিক্ষুক, গৃহহীন, নারী কারখানা-শ্রমিক, গৃহকর্মী – সবাই ছিল।

১৮৮১ সালে বেঙ্গল প্রদেশে যে ঔপনিবেশিক আদমশুমারি করা হয়েছিল – তাতে ১৫ বছরের বেশি বয়সের সকল অবিবাহিত নারীকেই যৌনকর্মী বলে বিবেচনা করা হয়েছিল।

কলকাতা শহর ও তার আশপাশের এলাকাগুলোর আদমশুমারিতে ১৪৫,০০০ নারীর মধ্যে ১২,২২৮ জনকে যৌনকর্মী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ১৮৯১ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ হাজারে।

অধ্যাপক মিত্র বলছেন, ওই আইনটা ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন – যেখানে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের জ্ঞানের একটি বিষয় হয়ে দাঁড়ায় ভারতীয় নারীদের যৌন আচার-আচরণ। অন্যদিকে পুরুষদের যৌন আচরণ রাষ্ট্রের আওতার সম্পূর্ণ বাইরে থেকে যায়।

তিনি আরো বলছেন, বাংলা প্রদেশের মতো জায়গায় নারীদের যৌনতাকে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি ভারতীয় পুরুষরা সমাজের ব্যাপারে তাদের নিজেদের ভাবনার একটি বিশেষ দিকে পরিণত করেছিলেন – যা একটি-বিয়ে-করা উচ্চবর্ণের হিন্দু আদর্শ অনুযায়ী সাজানো। এখানে মুসলিম ও নিম্নবর্ণের মানুষদের ঠাঁই হয়নি।

তার কথায়, “বিপথগামী” নারীরা তাদের চোথে এমন একটি সমস্যা ছিলেন যা সমাধান করা সহজ ছিল না। ফলে নানাভাবে তাদের বিচার, জেল, জোরপূর্বক দেহ পরীক্ষা ইত্যাদির শিকার হতে হতো। নারীদের ক্ষেত্রে এখন যা হচ্ছে তাতে ওই ইতিহাসেরই প্রতিধ্বনি দেখা যায় – মনে করেন অধ্যাপক দুর্বা মিত্র।

সৌতিক বিশ্বাস
ভারত সংবাদদাতা

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




নাইজেরিয়া পুলিশের গোপন এক বাহিনী যে কারণে ভেঙে দেয়া হচ্ছে

আন্দোলনকারীরা পুলিশ বাহিনীতে বড় ধরনের সংস্কারের দাবি জানিয়েছে।

নাইজেরিয়ায় পুলিশের এক বিশেষ বাহিনীর বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে গত কয়েক বছর ধরে। ওই বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরীহ লোকজনের ওপর বর্বর ও নিষ্ঠুর নির্যাতন, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বহু অভিযোগ রয়েছে।

কিন্তু সম্প্রতি এই সার্স বাহিনীর হাতে নির্যাতনের প্রতিবাদে নতুন করে ফুঁসে উঠেছে নাইজেরিয়া, যাতে উত্তাল হয়ে পড়েছে সারা দেশ।

প্রতিবাদকারীদের বিক্ষোভ এখন নাইজেরিয়ার ছোট বড় বিভিন্ন শহর ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশেও। প্রতিবাদ বিক্ষোভ হচ্ছে লন্ডন থেকে নিউ ইয়র্ক, বার্লিন থেকে টরন্টো থেকে।

বিশ্বের যেখানেই নাইজেরিয়ানরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন সেখানেই তারা এই আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করছেন।

নাইজেরিয়ায় তোলপাড় ফেলে দেওয়া এই আন্দোলনের মুখে প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ বুহারি পুলিশের এই সার্সি বাহিনী ভেঙে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। একই সাথে যেসব পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, বিচারের মাধ্যমে তাদেরকে কঠোর শাস্তি দেওয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। কিন্তু তারপরেও এই বিক্ষোভ থামেনি।

সার্স-বিরোধী সবশেষ এই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর মি. বুহারি টেলিভিশনে দেওয়া তার প্রথম ভাষণে বলেছেন, “সার্স ভেঙে দেওয়া পুলিশ বাহিনীতে সংস্কারের প্রথম ধাপ।”

কিন্তু বিক্ষোভকারীরা বলছেন, এই বাহিনীকে বিলুপ্ত করলেই নির্যাতনের ঘটনা বন্ধ হবে না। এজন্য তারা অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিচার, নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোকে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং পুলিশের পুরো বাহিনীতে সংস্কারের দাবি জানাচ্ছেন।

তারা বলছেন, প্রেসিডেন্ট বুহারির বক্তব্য পর্যাপ্ত নয়। তিনি অনেক দেরি করে ফেলেছেন। তরুণ নাইজেরীয়রা এই প্রতিশ্রুতিতে সন্তুষ্ট হতে পারেনি।

একজন বিক্ষোভকারী বিবিসিকে বলেছেন, “সরকার ২০১৭, ২০১৮ এবং ২০১৯ সালেও এই বাহিনী ভেঙে দিয়েছিল। কিন্তু এবার আমরা তাদের আর এই প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করি না। এটা ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছু নয়।”

কেন এই সার্স বাহিনী

নাইজেরিয়ায় জাতীয় পুলিশের বিশেষ এই বাহিনী বা ইউনিটের নাম স্পেশাল এন্টি-রবারি স্কোয়াড। সংক্ষেপে সার্স।

দেশটিতে সশস্ত্র ডাকাতি ও অপহরণের ঘটনা বন্ধ করার জন্য ১৯৯২ সালে এই বাহিনীটি গঠিত হয়।

এই বাহিনীকে প্রাথমিকভাবে নাইজেরিয়ার বড় একটি শহর লেগোসে সহিংস অপরাধ সামলানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাদের কাজ ছিল পরিচয় গোপন রেখে সশস্ত্র ডাকাত দল, গাড়ি ছিনতাইকারী, অপহরণকারী, গবাদি পশু চোরদের পাকড়াও করা।

শুরুতে সার্সের সদস্য সংখ্যা ছিল ১৫। নাম-পরিচয় গোপন রেখে তারা অভিযান পরিচালনা করতো।

দুটো বাসে করে তারা অপারেশন চালাত। সেই বাসের গায়ে এই বাহিনীর নাম উল্লেখ থাকতো না এবং অফিসাররাও ইউনিফর্ম পরতেন না এবং তাদের গায়েও কারো নাম লেখা থাকতো না।

সেসময় অপরাধী চক্রকে দমন করতে তাদের এই অজ্ঞাত পরিচয়কে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

পরে পুলিশের এই বাহিনীটি ধীরে আরো বড়ো হতে থাকলে সেটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং একই সাথে বিতর্কিত ও কুখ্যাত হয়ে ওঠে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে।

সমালোচকরা বলছেন, নাম পরিচয় গোপন রাখার অধিকার তাদেরকে ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানুষের ওপর নির্যাতন চালানোর সুযোগ করে দেয়।

কারণ, এর ফলে সুনির্দিষ্টভাবে কারো বিরুদ্ধে হত্যা, গুম খুন কিম্বা নির্যাতনের অভিযোগ আনা কঠিন হয়ে পড়ে। তারা থেকে যায় বিচারের ঊর্ধ্বে।

এই বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন, চুরি, ধর্ষণ, নির্যাতন, বেআইনি গ্রেফতার, বিনা বিচারে আটক করে রাখা, বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ উঠেছে।

এর মধ্যে বেশ কয়েকবারই এই বাহিনীটি ভেঙে দেওয়ার দাবি উঠেছে। ২০১৭ সালে এরকম একটি পিটিশনে ১০ হাজারেরও বেশি মানুষ সই করেছিল যা নাইজেরিয়ার জাতীয় পরিষদে জমা দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু পুলিশ বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয় যারা সার্সের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে তারা আসলে বিভিন্ন অপরাধে অপরাধী।

সার্সের প্রতি এতো ঘৃণা কেন

আফ্রিকার দরিদ্র এই দেশটিতে পুলিশ সম্পর্কে মানুষের ধারণা এমনিতেই খারাপ। এই বাহিনীর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রায়শই দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নিষ্ঠুর ও অমানবিক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে।

আন্দোলনকারীরা বলছেন, মানবাধিকারের বিষয়ে তারা বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করে না।

এসব অভিযোগের কারণে পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের বিরূপ মনোভাব থাকলেও সার্স বাহিনীর প্রতি তাদের ঘৃণা আরো প্রবল। বিশেষ করে তরুণদের কাছে। কারণ এই বাহিনীর কর্মকর্তারা সবসময় তরুণদের টার্গেট করে থাকে।

মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, যেসব তরুণের “স্বাস্থ্য ভাল”, যারা ভাল কাপড় পরে, কিম্বা যারা একটু সচ্ছল পরিবারের, যাদের গাড়ি, দামী মোবাইল ফোন কিম্বা ল্যাপটপ আছে, যাদের নাকে মুখে রিং লাগানো কিম্বা গায়ে ট্যাটু আঁকা, চুলে রঙ করা – তারাই সার্সের কর্মকর্তাদের টার্গেটে পরিণত হয়।

রাস্তায় তাদের গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি করা হয়। বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়।

তাদের লক্ষ্য হলো এসব তরুণের পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং কেউ এই চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করলে তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়, এমনকি হত্যাও করা হয়।

নাইজেরিয়ায় খুব সহজেই ধরে নেওয়া হয় যে এসব তরুণরা কোন না কোন অপরাধের সাথে জড়িত। এই সমস্যা দেশটির রক্ষণশীল সমাজের গভীরেও প্রোথিত।

প্রেসিডেন্ট মুহাম্মদ বুহারিও একবার আন্তর্জাতিক এক অনুষ্ঠানে তার দেশের তরুণদের ‘অলস’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। সম্প্রতি করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হওয়ার পর চাকরি হারানো তরুণদেরকে কৃষিকাজে মনযোগী হতে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

এবছরের জুন মাসে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০২০ সালের মে মাস পর্যন্ত সার্স বাহিনীর হাতে ৮২টি নির্যাতন এবং বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

মানবাধিকার গ্রুপটি বলছে, “দেশটিতে পুলিশের নির্যাতন বন্ধে ২০১৭ সালে একটি আইন প্রণীত হলেও সরকার অভিযুক্ত একজন কর্মকর্তারও বিচার করতে পারেনি। বরং এই বাহিনীর বিরুদ্ধে হত্যা, নির্যাতন থেকে শুরু করে সন্দেহভাজনদের কাছ থেকে তথ্য আদায়ের জন্য তাদের ওপর নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।”

পুলিশ কী বলছে

সারা দেশে তীব্র আন্দোলনের মুখে পুলিশ বাহিনীর প্রধান মোহাম্মদ আদামু গ্রেফতার হওয়া প্রতিবাদকারীদের ছেড়ে দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে।

তিনি বলেন, নাইজেরীয়দের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে। পুলিশ যাতে তাদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ না করে তিনি তারও নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি স্বীকার করেছেন, প্রতিবাদকারীরা যেসব কারণে আন্দোলন করছেন সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং তাদের এসব অভিযোগ নিরপেক্ষ কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত করে দেখা হবে।

প্রেসিডেন্ট বুহারিও অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারদের বিচারের মাধ্যমে শাস্তি প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

আন্দোলন ফুঁসে ওঠার কারণ

সার্স বাহিনীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন হলেও এবছরের অক্টোবর মাস থেকে বিক্ষোভ ফুঁসে ওঠতে শুরু করে।

নাইজেরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় একটি শহর ডেল্টা স্টেটে পুলিশের স্টপ এন্ড সার্চ তল্লাশির সময় এক তরুণ নিহত হওয়ার খবর আসে ৩রা অক্টোবর।

পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে এর সাথে সার্সের কোন কর্মকর্তা জড়িত ছিল না।

কিন্তু পুলিশের এই বক্তব্য তরুণরা বিশ্বাস করেনি। সেসময় সোশাল মিডিয়াতে একটি ভিডিও ভাইরাল হয় যাতে একজন পুলিশ অফিসারকে দেখা যায় একটি হোটেল থেকে দুজন তরুণকে রাস্তায় টেনে নিয়ে এসে তাদের একজনকে লক্ষ্য করে গুলি করছেন।

অভিযোগ ওঠে যে ওই পুলিশ অফিসার তরুণের দামি গাড়ি নিয়ে গেছেন।

পরে সোশাল মিডিয়াতে এনিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। “এন্ডসার্স” বা “সার্সের অবসান ঘটুক” এই হ্যাশট্যাগ দিয়ে সেই আন্দোলন টুইটারে ছড়িয়ে পড়ে।

পরে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সার্স-বিরোধী আন্দোলন বড় শহর লেগোস ও রাজধানী আবুজাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

আন্দোলন দমন করতে রাস্তায় নেমে আসে নিরাপত্তা বাহিনী। এসময় তারা বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা করে, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে এবং বহু প্রতিবাদকারীকে গ্রেফতার করা হয়।

পুলিশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলি বর্ষণেরও অভিযোগ উঠেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, সহিংস বিক্ষোভে এখনও পর্যন্ত কমপক্ষে ১০ জন নিহত হয়েছে।

সাংবাদিকরা বলছেন, সাম্প্রতিক কালে নাইজেরিয়াতে এতো বড়ো বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেনি। দেশটির দুর্বল সরকার এবং নেতৃত্বের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও ধর্মীয়, জাতিগত বিভাজনের কারণে লোকজনকে এভাবে রাস্তায় নেমে আসতে দেখা যায় নি।

পরে এই আন্দোলন সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে নাইজেরিয়াসহ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।

কারা আন্দোলন করছে

আন্দোলনকারীদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ যারা পুলিশের নির্যাতনের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে এসেছে। তাদের বয়স ১৮ থেকে ২৪। জাতিসংঘের জনসংখ্যা বিষয়ক পরিসংখ্যানে দেখা যায় নাইজেরিয়ার ৬০ শতাংশেরও বেশি মানুষের বয়স ২৪ বছরের নিচে।

তরুণরা অভিযোগ করছে, তাদের আন্দোলন থামাতে ব্যর্থ হয়ে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের গায়ে অপরাধী তকমা লাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, যাদের বেশিরভাগই খেটে খাওয়া ও দরিদ্র পরিবারের সদস্য।

এই পরিবারগুলো বাড়িতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও পানি পায়নি কখনো, পায়নি শিক্ষাও। চাকরি বাকরিও জুটেনি। তাই অনেকে বলছেন, হতাশ এই তরুণদের আন্দোলন আসলে ৬০ বছর আগে স্বাধীন হওয়া এই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ।

রাজধানী আবুজাতে একজন নারী বিক্ষোভকারী ২২-বছর বয়সী ভিক্টোরিয়া প্যাং বলেন, “জন্মের পর থেকে এই দেশের কাছ থেকে আমি কী সুবিধা পেয়েছি? আমাদের পিতা মাতারা বলেন, একসময় নাকি পরিস্থিতি ভাল ছিল। কিন্তু আমরা তো সেরকম কখনো দেখিনি। তাহলে অবস্থা এতো খারাপ হয়ে গেল কেন?”

যেভাবে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে

সম্প্রতি এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে সোশাল মিডিয়াতে। এর পেছনে একটি বড় কারণ হচ্ছে তরুণরা সেখানে তাদের পরিচয় আড়াল করে রাখতে সক্ষম হচ্ছে।

রাস্তায় যারা আন্দোলন করছে তাদের জন্য খুব সহজেই সংগৃহীত হয়ে যাচ্ছে পানি, খাবার দাবার ও ব্যানার। কেউ গ্রেফতার হলে আইনি সাহায্য দিয়ে তার জামিনেরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

আন্দোলনের জন্য অর্থও তোলা হচ্ছে সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে। বিদেশ থেকেও অনেক অর্থ যাচ্ছে, বিশেষ করে নাইজেরীয় আইটি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে, কারণ বেশিরভাগ সময় এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা পুলিশের সহজ টার্গেটে পরিণত হয়।

এই আন্দোলনের কোন নেতা নেই। যারা সমন্বয় করছেন তারা বলছেন, এর পেছনে কারণ হলো যে তারা চায় না কেউ গোপনে তাদের হয়ে সরকারের সঙ্গে দেন-দরবার করুক।

এখনও পর্যন্ত এই আন্দোলনের সাফল্যের পেছনে বড় কারণ হচ্ছে খেলাধুলা, সঙ্গীত, অভিনয় থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনপ্রিয় ব্যক্তি ও সোশাল মিডিয়া বিশেষ করে ইন্সটাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট ও টুইটারে যারা প্রভাব বিস্তারকারী তারাও এই আন্দোলনে শরিক হয়েছেন।

মিজানুর রহমান খান

বিবিসি বাংলা, লন্ডন

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




বাংলাদেশে প্রচলিত যেসব খাবার ক্ষতিকর, এমনকি এগুলো খেয়ে আপনার মৃত্যুও হতে পারে

বাংলাদেশের মানুষ চাল, মাছ, মাংস, শাক-সবজি মিলিয়ে কয়েক হাজার ধরনের খাবার খেয়ে থাকেন, তবে এসবের মধ্যে বেশ কিছু খাবার রয়েছে, যা অনেক সময় মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

আপাত দৃষ্টিতে এসব খাবারের অনেকগুলোকেই নিরাপদ মনে হলেও বিশেষ কারণে বা বিশেষ অবস্থায় এগুলো বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে, হয়ে উঠতে পারে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।

আবার কোন কোন খাবার রয়েছে যা তাৎক্ষণিকভাবে মানুষের মৃত্যুও ঘটাতে পারে।

আবার কোন কোন খাবারের কারণে হওয়া ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা না গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ক্ষতি করে।

এসব খাবার সম্পর্কে বিবিসি বাংলা পুষ্টিবিদ ও খাদ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছে। যেসব খাবার অবস্থাভেদে আপনার শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে, এরকম কয়েকটি খাবারের বর্ণনা তুলে ধরা হলো:

জাপানের মতো অনেক দেশে পটকা মাছ অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাবার

পটকা মাছ

বাংলাদেশ, চীন, জাপান, কোরিয়া-সহ বেশ কিছু দেশের মানুষের কাছে পটকা মাছ বা পাফার ফিশ বেশ জনপ্রিয় একটি মাছ। কিন্তু এই মাছটি ঠিকভাবে প্রসেস করা সম্ভব না হলে সেটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মানুষের মৃত্যু ঘটাতে পারে।

এর শরীরে থাকে বিষাক্ত টিউরোটক্সিন নামক উপাদান, যা সায়ানাইডের তুলনায় বহুগুণ বেশি কার্যকর।

পুষ্টিবিদ অধ্যাপক খালেদা ইসলাম বলছেন, এই মাছ খাওয়ার আগে দক্ষতার সঙ্গে মাছের শরীরের বিষাক্ত অংশটি আলাদা করে ফেলতে হবে।

তি নি বলেন, এমনিতে মাছটি হয়তো ক্ষতিকর নয়, কিন্তু বিষাক্ত অংশটি কোনওভাবে মাছের শরীরে রয়ে গেলে আর তা মানুষের পাকস্থলীতে গেলে অল্পক্ষণের মধ্যে এটা মানুষকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করতে পারে – এমনকি মৃত্যুও ঘটাতে পারে।

মাশরুম

বিশ্বের অনেক দেশেই মাশরুম একটি জনপ্রিয় এবং পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার।

মাশরুম রক্তচাপ কমাতে, টিউমার কোষের বিরুদ্ধে, বহুমূত্র রোগীদের জন্য, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে, হজম ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে, বাত-ব্যথার মতো রোগের বিরুদ্ধে উপকারী বলে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন।

তবে প্রকৃতিতে মাশরুমের হাজার রকমের জাত রয়েছে এবং এগুলোর অনেকগুলো মানবদেহের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

যেমন শুধু উত্তর আমেরিকায়ই মাশরুমের ১০ হাজারের বেশি প্রজাতির রয়েছে। খাবার হিসেবে গ্রহণ করলে এগুলোর ২০ শতাংশই মানুষকে অসুস্থ করে দিতে পারে, আর শতকরা এক ভাগ তাৎক্ষণিকভাবে মানুষ মেরেও ফেলতে পারে।

মাশরুমের নানা জাতের মধ্যে বাংলাদেশে ৮-১০টি জাতের চাষ হয়ে থাকে।

কিন্তু বাংলাদেশেই পাওয়া যায় মাশরুমের এমন অনেক জাত, বিশেষ করে বুনো মাশরুম, অনেক সময় শরীরের জন্য বিষাক্ত ও ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম বলছেন, ”পরিচিত জাতের বাইরে অন্য মাশরুম, বিশেষ করে বুনো মাশরুম কখনোই খাওয়া উচিত নয়। কারণ মাশরুম শরীরের জন্য উপকারী হলেও সব মাশরুম উপকারী নয়। বরং অনেক মাশরুম মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “বিশেষ করে ব্যাঙের ছাতা বলে পরিচিত বুনো মাশরুমে এক ধরণের ছত্রাক থাকে, যা লিভার-কিডনির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।”

খেসারি ডাল

বাংলাদেশে মসুর ও মুগডালের পাশাপাশি অনেকের খাদ্য তালিকায় খেসারি ডালও থাকে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ডালে বোয়া (BOAA) নামের এক প্রকার অ্যালানাইন অ্যামিনো অ্যাসিড থাকতে পারে, যা বিষাক্ত নিউরোটক্সিন তৈরি করে। এই অ্যাসিড ‘নিউরো-ল্যাথারিজম’ বা স্নায়ুবিক পঙ্গুতা তৈরি করতে পারে।

এই রোগের লক্ষণ অনেক সময় হঠাৎ করেই দেখা দেয়। এতে করে হাঁটতে গিয়ে অসুবিধা এবং অসহ্য যন্ত্রণা হওয়া কিংবা পা অবশ হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পরে।

পুষ্টিবিদ আয়েশা সিদ্দিকা বিবিসি বাংলাকে জানান, বেশিদিন ধরে খেসারির ডাল খেলে এই রোগ হতে পারে।

আলু

আলুতে শেকড়ের জন্ম হলে সেখানে গ্লাইকোঅ্যালকালোইড নামের এক ধরণের উপাদান তৈরি হয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন যাবৎ আলু পড়ে থাকলে এই ধরণের উপাদানের জন্ম হয়।

অনেক সময় গাছের পাতায় বা কাণ্ডেও এই উপাদান থাকে। বিশেষ করে আলুর গায়ে শেকড় জন্মালে যে লাল রঙের গাদ তৈরি হয়, সেখানে এই উপাদান বেশি থাকে।

বারডেম হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, এই গ্লাইকোঅ্যালকালোইড শরীরে প্রবেশ করলে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া ডায়ারিয়া, মাথাব্যথা, এমনকি মানুষ কোমায়ও চলে যেতে পারেন।

বলা হয়ে থাকে, কেউ কোনভাবে তিন থেকে ছয় মিলিগ্রাম পরিমান এই উপাদান খেয়ে ফেললে মৃত্যু হতে পারে।

এছাড়া আলুতে অনেক সময় সবুজ রঙের এক ধরণের পদার্থ দেখা যায়। সেটা হলো কারসিনোজেনিক নামের একটা উপাদান, যার ক্যানসারের কারণ হতে পারে। এ ধরণের আলু খাওয়া উচিত নয়।

টমেটো

টমেটো গাছের পাতা এবং কাণ্ডে অ্যালকালাই থাকে, যা পাকস্থলীর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কাঁচা টমেটোর ভেতর এই উপাদান থাকে বলে মনে করা হয়।

পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ বলছেন, এই কারণে ভালো করে রান্না না করে কাঁচা টমেটো খাওয়া উচিত নয়। কারণ বেশি পরিমাণে কাঁচা টমেটো খেলে যে কেউ মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন।

“কাঁচা টমেটো খেয়ে মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।”

টমেটো গাছের পাতাও কোনভাবে খাওয়া উচিত নয় বলে জানান তিনি।

কাজু বাদাম

কাজু বাদামের দুইটি জাত রয়েছে – একটি মিষ্টি, অপরটি তিতকুটে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি একটি পুষ্টিকর খাবার হলেও তেতো কাজুবাদামের ভেতর সায়ানোজেনিক গ্লাইকোসাইড নামের একটি বিষাক্ত উপাদান থাকে, যা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে, কারণ তা শরীরে হাইড্রোজেন সায়ানাইড তৈরি করতে পারে।

কাঁচা অবস্থায় তেতো কাজুবাদাম খাওয়া একেবারে উচিত নয়।

বলা হয়, প্রতিটা তেতো কাজুবাদামের ভেতর ছয় মিলিগ্রাম হাইড্রোজেন সায়ানাইড থাকে। কারো শরীরে ১০০ মিলিগ্রাম হাইড্রোজেন সায়ানাইড প্রবেশ করলে তা তার মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট হতে পারে।

আপেল

আসলে ঠিক আপেল নয়, আপেলের বিচির ভেতর খানিকটা পরিমাণে সায়ানাইড থাকে। ফলে কারো শরীরের ভেতর যদি বেশি পরিমাণে আপেল বিচি বা বিচির নির্যাস প্রবেশ করে, তাহলে তা তাকে মেরে ফেলার মতো সায়ানাইড তৈরি করতে পারে।

আর সায়ানাইড হলো একটি মারাত্মক ধরণের বিষ।

বারডেম হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ বলেন, “অনেক সময় অনেকে আপেলের জুস তৈরি করে খান। তখন যদি অনেকগুলো বিচি-সহ আপেলের জুস করা হয়, তাহলে সেই বিচির কারণে ওই জুসে মারাত্মক বিষ তৈরি হতে পারে।”

তবে বিচি বাদ দিলে আপেলের বাকি অংশে অনেক পুষ্টি রয়েছে।

কাঁচা মধু

মৌমাছির চাক ভাঙ্গা তাজা মধু সংগ্রহ করতে অনেকেই পছন্দ করেন।

কিন্তু খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাস্তুরায়িত করা হয়নি এমন কাঁচা মধু শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। কারণ কাঁচা মধুর মধ্যে অনেক বিষাক্ত উপাদান থাকতে পারে, যার কারণে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

এছাড়া এমন মধু খাওয়ার ফলে ঘোর ঘোর ভাব আসা, দুর্বল লাগা, অতিরিক্ত ঘাম হওয়া, বমি করার মতো সমস্যা তৈরি হতে পারে।

পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ বলছেন, কাঁচা মধুর ভেতর গ্রায়ানোটক্সিন নামের একটি উপাদান থাকে। এর এক চামচ পেটে গেলে হালকাভাবে এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে। কিন্তু বেশি খাওয়া হলে সেটার ফলাফল হতে পারে মারাত্মক।

তাই বিশেষজ্ঞরা কাঁচা মধু না খেয়ে সেটা প্রক্রিয়াজাত করে খাওয়ার পরামর্শ দেন। বিশেষ করে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে সেই মধুর ভেতর যেন মৌমাছির চাকের বা মৌমাছির কোন অংশ না থাকে।

কাসাভা

আফ্রিকার অনেকগুলো দেশে এই খাবারটি অত্যন্ত জনপ্রিয়।

বাংলাদেশে কাসাভা এখনো ততোটা জনপ্রিয় নয়, তবে দেশের কোন কোন স্থানে অল্প পরিমাণে চাষাবাদ এবং এর খাওয়ার চল শুরু হয়েছে।

ড. খালেদা ইসলাম বলছেন, কাসাভা যদি ঠিকমতো প্রক্রিয়াজাত করা না হয়, তাহলে সেটা স্বাস্থ্যর জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হতে পারে।

এর কারণ হিসেবে তিনি বলছেন যে কাসাভার পাতা ও শিকড়ে অনেক বেশি পরিমাণে সায়ানাইড থাকে। এটি একটি বিষাক্ত উপাদান, যা মানুষের শরীরে গেলে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

মটরশুঁটি-শিমের বিচি

বাংলাদেশে মটরশুঁটি ও শিমের বিচি অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাবার। শিমের বিচি অবশ্য সারা বিশ্বেই একটি জনপ্রিয় খাবার।

কিন্তু পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ বলছেন, ”মটরশুঁটি ও শিমের মধ্যে ফাইটোহেমাগ্লুটিনিন নামের একটা পদার্থ থাকে, যা অনেকের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

এ কারণে তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন যে রান্নার আগে মটরশুঁটি ও শিমের বিচি অবশ্যই ১৫ মিনিটি ধরে পানিতে সেদ্ধ করে সেই পানি ফেলে দিয়ে আবারও রান্না করতে হবে।

কামরাঙ্গা

এটি বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ফল।

সাধারণ মানুষ এটি খেলে কোন সমস্যা নেই। তবে যাদের কিডনির বা স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এই ফলটি ক্ষতিকারক বলে জানাচ্ছেন পুষ্টিবিদ আয়েশা সিদ্দিকা।

কচু

কচু বাংলাদেশে একটি সবজি এবং এর পাতা শাক হিসাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ বলছেন, কচু গাছ যদি ছায়ায় জন্মে বা বড় হয়, তাহলে এর মধ্যে এমন একটি কম্পোনেন্ট তৈরি হয়, যা অনেকের জন্য অ্যালার্জি তৈরি করে।

ফলে কচু খেলে তাদের চুলকানি হয়, গলা ফুলে যায়। এর কারণ হলো, কচুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অক্সালেট। অনেক সময় এতে করে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক খালেদা ইসলাম বলছেন, কচু জাতীয় জিনিস খেতে হলে সঙ্গে লেবু খেতে হবে। সেটা কচুর অক্সালেটের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ করে বলে তিনি জানান।

ডিম

বারডেম হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ শামসুন্নাহার নাহিদ জানান, ডিম খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ভালো – কিন্তু কাঁচা ডিম খাওয়া, আধা সেদ্ধ ডিম খাওয়া, বা ডিমের এক পাশ পোঁচ করে খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।

বিশেষ করে গর্ভবতী মায়েদের জন্য এটা খুবই ক্ষতিকর, বলছেন তিনি।

ক্যান বা প্রসেস ফুড

ব্যস্ততার কারণে এখন অনেকেই ক্যানে থাকা খাবার বা প্রক্রিয়াজাত খাবার খেতে পছন্দ করেন, কারণ এগুলো অনেকটা প্রস্তুত অবস্থায় থাকে বলে সহজেই খাওয়া যায়।

তবে পুষ্টিবিদ আয়েশা সিদ্দিকা বিবিসি বাংলাকে বলেন, এ জাতীয় ক্যানড খাবার মানসম্পন্ন না হলে বা তৈরি প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকলে তা ডায়রিয়া, ক্যানসার ইত্যাদির মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে।

এছাড়া, শুটকি মাছ, শুকনো ফল ইত্যাদি খাবারে অনেক সময় সালফার ব্যবহার করা হয়, যা পেটে গেলে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

ধুতরা ফুল ও ফল

একসময় বাংলাদেশি বিভিন্ন কবিরাজি ওষুধে এই ফলের ব্যবহার হতো। কিন্তু এটি অত্যন্ত বিষাক্ত একটি ফল এবং এর পাতাও বিষাক্ত হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে এখন অবশ্য এই গাছটি অনেকটাই দুর্লভ হয়ে উঠেছে।

সায়েদুল ইসলাম

বিবিসি বাংলা, ঢাকা

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

 

 

 

 

 

 

 

 

 




জেনে নিন সাইরাস এসআর ২২ এর সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত তথ্য

এসআর২২ (ইংরেজি: SR22), সাইরাস নকশায় নির্মিত এক ইঞ্জিন ও চার আসন বিশিষ্ট একটি কম্পোজিট বিমান। এই মূলত বিশিষ্ট সাইরাস এসআর২০-এর একটি উন্নত সংস্করণ। পূর্বের সাথে এটির পার্থক্য এই যে, এটি পাখার বিস্তার ও তেল ধারণ ক্ষমতা আগেরটির চেয়ে বেশি।

এছাড়া এটির ইঞ্জিন ৩১০ অশ্ব ক্ষমতা বিশিষ্ট (২৩১ কিলো ওয়াট)। ব্যক্তিগত বিমান হিসেবে এটি ক্রেতাদের কাছে যথেষ্ট জনপ্রিয়, এবং এক ইঞ্জিন বিশিষ্ট চার সিটের বিমান গুলোর মধ্যে অনেক দিন ধরে এটি বিশ্বে সর্বাধিক বিক্রিত বিমান।যার সাথে তুলনা করা যায় সেসনা ৪০০ বিমানটির, কিন্তু এই শ্রেণীর বিমানগুলোর মধ্যে এটিই সেরা হিসেবে বিবেচিত।

সম্ভবত এই বিমানটি সবচেয়ে বেশি পরিচিত এর সাইরাস এয়ারক্রাফট প্যারাশুট সিস্টেমের জন্য। এটি একটি বিশেষ প্যারাশুট ব্যবস্থা যেখানে শুধু বিমানের আরোহীকে প্যারাশুটের সুবিধা না দিয়ে পুরো বিমানটিকেই প্যারাশুটের মাধ্যমে জরুরী ক্ষেত্রে ভূমিতে অবতরণ করানো যায়।

সংস্করণ

এসআর২২ (SR22)
মূল সংস্করণ।
এসআর২২ জি২ (SR22 G2)
উন্নত সংস্করণ।
এসআর২২ জি৩ (SR22 G3)
২০০৭ সালে নির্মিত আরো উন্নত সংস্করণ।
তেল ধারণ ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং পাখার ওজন কমিয়ে হাল্কা করা হয়েছে।
এসআর২১ টিডিআই (SR21 tdi)
প্রস্তাবিত ডিজেল চালিত সংস্করণ।

 

 

 

 

 

 

উইকিপিডিয়া

জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঠিক ৩৫ বছর আগে যেভাবে ধসে পড়েছিল ছাত্রাবাসের টিভি রুমের ছাদ

জগন্নাথ হলে ১৯৮৫ সালের ওই ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন ৪০ জন

ঠিক ৩৫ বছর আগে, ১৯৮৫ সালের ১৫ই অক্টোবর জগন্নাথ হলের একটি হলরুমের ছাদ ধসে পড়ে মারা গিয়েছিলে ৪০ জন, যে ঘটনার স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শোক দিবস পালন করা হচ্ছে।

যেই ভবনটির ছাদ ধসে দুর্ঘটনাটি ঘটে, ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সেটিকে বলা হতো ‘পরিষদ ভবন’ বা ‘অ্যাসেম্বলি হল।’ একশো বছরেরও বেশি পুরনো অডিটোরিয়ামটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের পরিষদ ভবন বা সংসদ ভবন ছিল, তাই এটি অ্যাসেম্বলি হল বা পরিষদ ভবন হিসেবে পরিচিত ছিল।

পরে নতুন পরিষদ ভবন তৈরি হলে ওই ভবনটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এরপর ১৯৮৫ সালের ১৫ই অক্টোবরের মর্মান্তিক ঘটনার আগে পর্যন্ত এটি জগন্নাথ হলের টেলিভিশন কক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

তুমুল বৃষ্টির মধ্যে ওই রাতে পুরনো ভবনটির ছাদ ধসে পড়ে, আর মারা যান ৪০ জন, আহত হন শতাধিক।

ওই সময়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে সেই রাতটি আজও অক্টোবরের ট্রাজেডি।

প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে সেদিনের ঘটনা

ঘটনার রাতে টিভি রুমের ভেতরে ছিলেন স্বপন কুমার দে, যিনি বর্তমানে জগন্নাথ হল কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সভাপতি। সেই সময়ের কিশোর স্বপন কুমার দে’র বর্তমান বয়স ৫১।

তার বাবা জগন্নাথ হলের বাগানের মালী হিসেবে কর্মরত ছিলেন, সেই সূত্রে হল এলাকার ভেতরেই বাস করতো তার পরিবার।

“সেদিন বিকেল থেকেই প্রচুর ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। দুর্ঘটনার সময়ও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি চলছিল,” – সেই রাতের কথা স্মরণ করছিলেন স্বপন দে।

সেদিন রাতে সাড়ে আটটার সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় নাটক ‘শুকতারা’ দেখার জন্য তিনি টিভি কক্ষের ভেতরে গিয়ে বসেছিলেন তিনি।

ওই সময় রুমের ভেতরে আনুমানিক দেড় থেকে দুইশো’ মানুষ ছিল বলে ধারণা করেন স্বপন কুমার দে। তবে পরের দিনে প্রকাশিত পত্র-পত্রিকা এবং ওই ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন লেখকের লেখায় উপস্থিত মানুষের সংখ্যা তিনশো’ থেকে চারশো’ ছিল বলেও উল্লেখ করা হয়।

দক্ষিণের বঙ্গোপসাগরে একটি নিম্নচাপ চলছিল তখন, আর এর প্রভাবে ঢাকায় বাতাস বইছিল, সাথে ছিল ভারী বৃষ্টিপাত।

“হলের ভেতরে সারিবদ্ধভাবে অনেকগুলো চেয়ার রাখা ছিল। আর চেয়ারগুলোর সামনে টেলিভিশনের কাছে একটি কাঠের চৌকি ছিল। আমি আরও বেশ কয়েকজনের সাথে ঐ চৌকিতে গিয়ে বসি,” স্মরণ করেন স্বপন দে।

সাড়ে আটটায় নাটক শুরু হওয়ার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই দুর্ঘটনাটি ঘটে।

“নাটক চলতে চলতেই হঠাৎ এক সময় মনে হয় ছাদ থেকে বালির গুড়া পড়ছে মাথায়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রচণ্ড শব্দ শুনি, আর বুঝতে পারি যে আমাকে দুই দিক থেকে শূন্যে তুলে সরিয়ে নেয়া হলো।

“কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখতে পাই আমি আরও কয়েকজনের সাথে টিভির পেছনে দাঁড়িয়ে আছি।

“ছাদ ধসে পড়ার আগের মুহূর্তে দু’জন ছাত্র দুই পাশ দিয়ে আমাকে ধরে টেলিভিশনের পেছনের জায়গাটায় নিয়ে আসে। চৌকিতে যারা বসে ছিল, তাদের অনেকেই শেষমুহুর্তে ঐখানে এসে আশ্রয় নিতে পেরেছিল।”

এরপরের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বারবার বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে স্বপন কুমার দে’র কণ্ঠ।

“একটু ধাতস্থ হওয়ার পর আশেপাশে থেকে শুধু ‘বাবারে, মা’গো, বাঁচাও’ এসব আর্তনাদ শুনছিলাম। তখনও মাথায় ছিল না দুর্ঘটনায় মানুষ মারা গিয়েছিল কি-না। অনেকটা পাগলের মত ছুটে বের হয়ে যাই ওখান থেকে।

“বাইরে গিয়ে সবাইকে একটা কথাই বলতে থাকি, ‘ছাদ ধসে পড়েছে।'”

আশেপাশের মানুষকে খবর জানিয়ে ঘটনাস্থলে ফিরে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ অপ্রকৃতস্থ ছিলেন বলে জানান স্বপন কুমার দে।

“তখন আমার বয়স কম ছিল। রক্ত, মৃত্যু, আর্তনাদের মধ্যে কিছুতেই মাথা ঠিক রাখতে পারছিলাম না।”

ওই সময়ের সংবাদপত্র থেকে জানা যায় যে ঘটনায় তাৎক্ষণিকভাবে ৩৪ জন মারা যায়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ৫ জনের মৃত্যু ঘটে।

জগন্নাথ হলের ভবন ধসেন ঘটনায় ঠিক কতজন আহত হয়েছিলেন, তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে পত্রিকাগুলোর রিপোর্টে শতাধিক আহত হওয়ার খবর বলা হয়।

পরে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত এক তদন্তে বলা হয় যে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে পুরনো ও জীর্ণ ভবনটি ধসে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

ভবন ধসের পর পুরো ভবনটিই গুড়িয়ে দেয়অ হয়। পরে ওই একই জায়গায় ‘অক্টোবর স্মৃতি ভবন’ নামে জগন্নাথ হলের নতুন একটি ছাত্রাবাস তৈরি হয়।

আর ঘটনার পরের বছর থেকেই ১৫ই অক্টোবর পালিত হয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শোক দিবস’ হিসেবে।

নাগিব বাহার

বিবিসি বাংলা, ঢাকা

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




জেনে নিন বাংলাদেশ ছাড়া আরও যে ছয় দেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

গত ১২ই অক্টোবর বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান যোগ করার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে মন্ত্রিসভা।

এর পরদিন এ সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশে সই করেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, যার ফলে সংশোধিত আইনটি কার্যকর হয়েছে।

বাংলাদেশে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ধর্ষণ, ধর্ষণ জনিত কারণে মৃত্যুর শাস্তি প্রসঙ্গে ৯(১) ধারায় এতদিন ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

তবে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে বা দল বেধে ধর্ষণের ঘটনায় নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে বা আহত হলে, সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। সেই সঙ্গে উভয় ক্ষেত্রেই ন্যূনতম এক লক্ষ টাকা করে অর্থ দণ্ডের বিধানও রয়েছে।

সেই আইনে পরিবর্তন এনে ধর্ষণের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলেই মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনের বিধান রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে অর্থদণ্ডের বিধানও থাকছে।

এর ফলে ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেয়া সপ্তম দেশ হলো বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ছাড়া আর যেসব দেশে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড

ভারত

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে পাস করা এক নির্বাহী আদেশে ভারতে ১২ বছরের কম বয়সী মেয়ে শিশু ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা হয়। ওই সময়ে ভারতজুড়ে চলতে থাকা ধর্ষণবিরোধী বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

ভারতের ফৌজদারি আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের কারণে যদি ভুক্তভোগী মারা যান অথবা এমনভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন যে তিনি কোনো ধরণের নাড়াচাড়া করতে অক্ষম, সেই ক্ষেত্রেও অপরাধীর শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

এছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে ধর্ষণ প্রমাণিত হলে ন্যুনতম দশ বছর শাস্তির বিধান রয়েছে ভারতের আইনে।

পাকিস্তান

পাকিস্তানের ফৌজদারি আইন অনুযায়ী ধর্ষণ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। ভারতের মত পাকিস্তানের আইনেও ধর্ষণ প্রমাণিত হলে সর্বনিম্ন ১০ বছর কারাদণ্ডের শাস্তির কথা বলা হয়েছে।

এছাড়া দুই বা অধিক ব্যক্তি একই উদ্দেশ্য নিয়ে ধর্ষণের মত অপরাধ সংঘটন করলে বা সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করলে, প্রত্যেকের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে পাকিস্তানের পেনাল কোডে।

গত মাসে একটি হাইওয়েতে হওয়া এক ধর্ষণের ঘটনায় পাকিস্তানে তোলপাড় তৈরি হওয়ার পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ধর্ষকদের জনসম্মুখে হত্যা কিংবা রাসায়নিক প্রয়োগ করে খোজা করার পক্ষে তার মতামত প্রকাশ করেছিলেন।

ধর্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখার পাশাপাশি ধর্ষণের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করা হলেও তিন বছর পর্য্ত কারাদণ্ডের শাস্তির বিধান রয়েছে পাকিস্তানে।

সৌদি আরব

সৌদি আরবের শরিয়া আইনে ধর্ষণ একটি ফৌজদারী অপরাধ এবং এর শাস্তি হিসেবে দোররা মারা থেকে শুরু করে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে সৌদি আরবে ১৫০টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, যার মধ্যে আটটি ছিল ধর্ষণ অপরাধের জন্য।

ইরান

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ইরানে মোট ২৫০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২ জনকে শাস্তি দেয়া হয়েছে ধর্ষণের দায়ে।

অ্যামনেস্টি বলছে, চীনের পর পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়ে থাকে ইরানে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আইন অনুযায়ী, কোন নারীর সঙ্গে জবরদস্তিমূলক যৌনমিলনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

তবে দেশটির আইনে অপরাধ সংঘটনেরর সময় ভুক্তভোগীর বয়স ১৪ বছরের নিচে হলেই কেবল সেটিকে জোরপূর্বক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

২০১৯ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে মৃত্যদণ্ড কার্যকর করা না হলেও অন্তত ১৮ জনকে হত্যা, ধর্ষণ ও সশস্ত্র ডাকাতির অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি দিয়েছে।

চীন

চীনে কোন নারীকে ধর্ষণ কিংবা ১৪ বছরের কম বয়সী কোন মেয়ের সঙ্গে যৌনমিলনের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে যদি ঘটনার শিকার মারা যান অথবা মারাত্মকভাবে আহত হন।

সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণের ক্ষেত্রে, ধর্ষণের পর ভুক্তভোগী মারা গেলে বা মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হলে, অথবা পাবলিক প্লেসে ধর্ষণ হলে বয়স বিবেচনা ছাড়া মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে দেশটিতে। এছাড়া, অপরাধী একাধিক ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হলেও তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায়।

সাধারণ ক্ষেত্রে ধর্ষণ প্রমাণিত হলে ন্যূনতম তিন বছর থেকে ১০ বছর কারাদণ্ডের শাস্তি রয়েছে চীনের আইনে।

মৃত্যুদণ্ড বিধানের সমালোচনা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের

বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান কার্যকর করার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বিবৃতি প্রকাশ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তারা মন্তব্য করেছে ‘চরম শাস্তি সহিংসতাকে অব্যাহত রাখে, তা প্রতিরোধ করে না।’

সংগঠনের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক গবেষক সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়ার বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিশোধের দিকে মনোনিবেশ না করে যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া ভুক্তভোগীর সুবিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ধর্ষণ মহামারি নির্মূলে এবং এর পুনরাবৃত্তি রোধে দীর্ঘমেয়াদে সংস্কার করার জন্য পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

একই সাথে অপরাধীদের শাস্তি যেন নিশ্চিত হয় এবং শাস্তি থেকে দায়মুক্তির সংস্কৃতি যেন বন্ধ হয়, সেদিকেও নজর দেয়ার তাগিদ দিয়েছে অ্যামনেস্টি।

যে কারণে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির বিরোধিতা করছে অ্যামনেস্টি

অ্যামনেস্টি’র সুলতান মোহাম্মদ জাকারিয়া বিবিসি বাংলাকে বলেন, “পৃথিবীর কোনো বিচার ব্যবস্থাই ত্রুটিমুক্ত নয়। যার ফলে বিচার ব্যবস্থার ত্রুটিতে একজন মানুষের প্রাণ নিয়ে নেয়ার পর যদি জানা যায় যে ঐ ব্যক্তি নির্দোষ, তখন আসলে কিছু করার থাকে না।”

আর বাংলাদেশে বর্তমানে ধর্ষণ এবং নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাগুলোর সাথে শাস্তির মাত্রা বাড়ানো বা কমানোর সম্পর্ক খুব সামান্য বলে মনে করেন তারা।

“আমাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের সমস্যাটা পদ্ধতিগত। অর্থাৎ, আমাদের এখানে আইনে এবং বিচার প্রক্রিয়ায় কিছু সমস্যা আছে। আর এই বিচার প্রক্রিয়া সংশোধন করা না হলে শাস্তি বাড়িয়ে-কমিয়ে আসল পরিস্থিতির উন্নয়ন করা সম্ভব না”, বলেন মি. জাকারিয়া।

তিনি বলেন, সরকারের নিজের হিসেবেই নারী নির্যাতনের মামলার একটা বড় অংশেরই শাস্তি হয় না। শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারার অন্যতম প্রধান একটি কারণ আইনের ফাঁক-ফোকর এবং সামাজিক চাপের কারণে ভুক্তভোগীদের আইনের সহায়তা না চাওয়া।

“সরকারের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী ভুক্তভোগীরা ২৬ ভাগ ঘটনায় আইনের সহায়তা নেয়, যার মধ্যে শাস্তি দেয়া হয় ০.৩৭ ভাগের।”

সুতরাং সুলতান জাকারিয়া মনে করেন যে শাস্তির মাত্রা বাড়ালেই যে এই চিত্র পরিবর্তন হবে, সে রকম মনে করার কোনো কারণ নেই।

মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের উপাত্ত উদ্ধৃত করে তিনি জানান, ২০০১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মোট ১,৫০৯ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের পর মারা গেছেন এবং ১৬১ জন আত্মহত্যা করেছেন। তিনি যোগ করেন যে এই সংখ্যাটি প্রকৃত চিত্র উপস্থাপন করে না, বরং যা ঘটছে এটি তার অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি অংশ।

 

 

 

 

 

 

 

 

বিবিসি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




জেনে নিন চীন-অস্ট্রেলিয়া সম্পর্কের এতো অবনতি হওয়ার কারণ কী

অস্ট্রেলিয়া ও চীনের মধ্যে উত্তেজনা বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে এই সম্পর্ককে এক শ্বাসরুদ্ধকর ভূ-রাজনৈতিক থ্রিলারের মতো মনে হতে পারে।

কেউ জানে না এই গল্পটি কোন দিকে যাচ্ছে অথবা এটা কোথায় গিয়ে শেষ হতে পারে।

“অস্ট্রেলিয়া-চীন সম্পর্ক এতো জটিল ও এতো দ্রুত পাক খেয়েছে যা ছয় মাস আগেও চিন্তা করা যায়নি,” লিখেছেন গবেষক জেমস লরেনসেন, তিনি ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি সিডনিতে অস্ট্রেলিয়া-চায়না রিলেশন্স ইন্সটিটিউটের পরিচালক।

শুধু গত কয়েক সপ্তাহে এই সম্পর্কের কতোটা অবনতি হয়েছে তার দিকে তাকালে এই পরিস্থিতি কিছুটা আঁচ করা সম্ভব হবে।

পাল্টাপাল্টি পুলিশি অভিযান

চীনা কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে অস্ট্রেলীয় নাগরিক এবং চীনে ইংরেজি ভাষার টিভি চ্যানেল সিজিটিএনের প্রখ্যাত সাংবাদিক চেং লেইকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি সন্দেহে আটক করা হয়েছে।

এর অল্প কিছুদিন পর, সর্বশেষ যে দুজন সাংবাদিক চীনে অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ মাধ্যমের সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করতেন কূটনীতিকদের পরামর্শে তারাও তড়িঘড়ি করে অস্ট্রেলিয়াতে ফিরে গেছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব ঘটনার বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে দুটো দেশের সম্পর্কের ওপর।

এবিসি চ্যানেলের রিপোর্টার বিল বার্টলস যখন তড়িঘড়ি করে বেইজিং ছেড়ে অস্ট্রেলিয়াতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন চীনের সাতজন পুলিশ অফিসার মধ্যরাতে তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়।

শাংহাই-এ অস্ট্রেলিয়ান ফাইনান্সিয়াল রিভিউর সাংবাদিক মাইকেল স্মিথের বাড়িতেও পুলিশ একই ধরনের অভিযান চালায়।

তারা দুজনেই অস্ট্রেলিয়ার কূটনৈতিক মিশনে আশ্রয় গ্রহণ করেন। কিন্তু “জাতীয় নিরাপত্তার” বিষয়ে চীনা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের আগে তাদের চীন ছেড়ে যেতে বাধা দেওয়া হয়।

এরা দুজন অস্ট্রেলিয়াতে ফিরে যাওয়ার পরদিন চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমে বলা হয় যে এই ঘটনার আগে জুন মাসে অস্ট্রেলিয়ার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বেশ কয়েকজন চীনা সাংবাদিককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে এবং তাদের কাছ থেকে কম্পিউটার, মোবাইল ফোন জব্দ করে নিয়ে গেছে।

অস্ট্রেলিয়ার সংবাদ মাধ্যমে বলা হয়েছে সেদেশে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও পুলিশের তদন্তের অংশ হিসেবে চীনা সাংবাদিকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।

এর আগে নিউ সাউথ ওয়েলস রাজ্যের একজন এমপি শওকত মুসেলমানের অফিসে পুলিশ তল্লাশি চালিয়েছিল। তিনি চীনের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত। পরে তিনি বলেছেন যে, ব্যক্তিগতভাবে তিনি ওই তদন্তের আওতায় ছিলেন না।

অতি সম্প্রতি বেইজিং অস্ট্রেলিয়ার দুজন শিক্ষকের চীনে প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর আগে অস্ট্রেলিয়া দুজন চীনা শিক্ষকের ভিসা প্রত্যাহার করে নেয়।

অন্য যে কোন সময় এরকম একটি ঘটনা ঘটলেই সেটা বেশ কিছু দিন ধরে সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়ে থাকার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু এবার একের পর এক এধরনের পাল্টাপাল্টি ঘটনা ঘটতে থাকে।

এছাড়াও এসব ঘটনা এতো দ্রুত গতিতে ঘটে যায় যে পর্যবেক্ষকরাও বুঝতে পারছেন যে পরিস্থিতি আসলে কোন দিকে গড়াচ্ছে।

পিছনের গল্প

এই দুটো দেশের মধ্যে ক্ষোভ ও অবিশ্বাস গত কয়েক বছর ধরেই ভেতরে ভেতরে তৈরি হচ্ছিল।

এর মধ্যে মোড় ঘোরানো ঘটনাটি ঘটে যায় ২০১৭ সালে যখন অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা এসিও সতর্ক করে দেয় যে সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় চীনের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বেড়ে গেছে।

চীনা ব্যবসায়ীরা অস্ট্রেলিয়ার স্থানীয় রাজনীতিকদের অর্থ দান করেছে এরকম একটি অভিযোগও তখন সামনে চলে আসে।

সেবছরেই প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুল অস্ট্রেলিয়ায় বিদেশি হস্তক্ষেপ ঠেকাতে কিছু আইন করার কথা ঘোষণা করেছিলেন। এর জবাবে চীন অস্ট্রেলিয়ায় তাদের কূটনৈতিক সফর স্থগিত রাখে।

আরো যেসব কারণ

এর পর ২০১৮ সালে অস্ট্রেলিয়া জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সরকারিভাবে তাদের ফাইভ জি নেটওয়ার্কে চীনা প্রযুক্তি কোম্পানি হুয়াওয়ের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। অস্ট্রেলিয়াই প্রথম দেশ যারা এমন সিদ্ধান্ত নেয়। এর পর আরো বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন হয়তো অস্ট্রেলিয়ার প্রতি ক্ষুব্ধ হতে পারে, আবার এটাও ঠিক যে চীনের ক্রমবর্ধমান বৃহৎ অর্থনীতির চোখ পড়েছে অস্ট্রেলিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর।

এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে আকরিক লোহা, কয়লা এবং তরল গ্যাস। চীন থেকে এসব সম্পদ অস্ট্রেলিয়ায় রপ্তানি করা হয়।

এর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ায় চীনা পর্যটক ও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকেও ক্যানবেরা প্রচুর অর্থ আয় করতে থাকে।

এধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা স্বত্বেও ২০২০ সালে দুটো দেশের সম্পর্কে নাটকীয় সব পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে।

অধ্যাপক লরেনসেন বলেন, “১৯৭২ সালে দুটো দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর বর্তমানে তাদের রাজনৈতিক সম্পর্ক সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে।”

বিষয়: করোনাভাইরাস

করোনাভাইরাসের উৎস খুঁজে বের করতে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক তদন্তের আহবান জানানোর পর এই সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটেছে। এই ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল চীনের উহান শহরে।

প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন এজন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে “অস্ত্র পরিদর্শকের মতো” ক্ষমতা প্রদানের আহবান জানান।

এছাড়াও অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পিটার ডাটন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে বলেন ভাইরাসটি কীভাবে ছড়িয়েছে তার তথ্য প্রমাণ রয়েছে। তবে মি. ডাটন এও বলেন যে এসব কাগজপত্র তিনি দেখেননি।

চীনা কূটনীতিকরা কড়া ভাষায় এর জবাব দেন। তারা বলেন, মি. ডাটনকে হয়তো “যুক্তরাষ্ট্রের প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে” সামিল হতে বলা হয়েছে।

প্রফেসর লরেনসন বলেন, সারা বিশ্বে শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় অস্ট্রেলিয়ার অবস্থানও চীনকে ক্ষুব্ধ করেছে বলে তিনি মনে করেন।

“চীন দেখতে পাচ্ছে যে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় অস্ট্রেলিয়া যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে,” বলেন তিনি।

বাণিজ্য বিরোধ

এবছরের এপ্রিল মাসে অস্ট্রেলিয়ায় চীনা রাষ্ট্রদূত চেং জিংগে হুমকি দিয়েছিলেন যে চীনের লোকজন অস্ট্রেলিয়ার পণ্য বয়কট করতে পারে।

চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, “পরিস্থিতি যদি আরো খারাপ হয়… হয়তো সাধারণ লোকজন বলবে আমরা কেন অস্ট্রেলিয়ার ওয়াইন পান করবো? কেন অস্ট্রেলিয়ার গোমাংস খাবো?”

এর পরে চীন অস্ট্রেলিয়া থেকে বার্লি আমদানির ওপর ৮০% শুল্ক আরোপ করে। কিছু গোমাংস আমদানিও সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়। ওয়াইন আমদানির ওপরেও তদন্তের ঘোষণা দেয়।

এই বিরোধ এখানেই থেমে থাকেনি। কোভিড-নাইনটিনের কারণে চীনারা জাতিগত বিদ্বেষের শিকার হতে পারেন- এই কারণ দেখিয়ে চীনা ছাত্রছাত্রী ও পর্যটকদের অস্ট্রেলিয়ায় ভ্রমণের ব্যাপারে সতর্ক করে দেয় বেইজিং।

অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতির ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে চীনের প্রতি অস্ট্রেলিয়ার সাধারণ লোকজনের মনোভাবও তিক্ত হতে শুরু করে।

“ভয়ভীতি দেখানোর এই কৌশলের কারণে অস্ট্রেলিয়ার মনোভাব আরো শক্ত হয়েছে,” বলেন নাতাশা কাসাম। লোওই ইন্সটিটিউট নামের একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষক তিনি।

এই প্রতিষ্ঠানটির চালানো এক জরিপে দেখা গেছে অস্ট্রেলিয়ার ২৩% নাগরিক বিশ্বাস করে না যে চীন সারা বিশ্বে কখনো দায়িত্বপূর্ণ কোন ভূমিকা পালন করতে পারে।

মিস কাসাম আরো বলেন, চীন যখনই অস্ট্রেলিয়াকে ভয় দেখাতে চেয়েছে তখনই বেইজিং-এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্যে অস্ট্রেলিয়ার ভেতরে সরকারের ওপর চাপ জোরালো হয়েছে।

হংকং-এ চীন যে নতুন নিরাপত্তা আইন জারি করেছে তারও কঠোর সমালোচনা করেছে প্রধানমন্ত্রী মরিসনের সরকার। শুধু তাই নয় হংকং-এর অনেক বাসিন্দাকে অস্ট্রেলিয়ায় চলে আসার জন্যও প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। হংকং-এর সাথে থাকা বন্দী প্রত্যর্পণ চুক্তিও বাতিল করা হয়েছে।

এসব কিছুই চীনকে ক্ষুব্ধ করেছে।

অধ্যাপক লরেনসেন বলেন, “তিন বছর ধরে দুটো দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরোধ যে মাত্রায় গিয়ে পৌঁছেছে তাতে আমি বিস্মিত হয়েছি। মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার বার্লি, গোমাংস, ওয়াইন এবং চীনা শিক্ষার্থী ও পর্যটকের ব্যাপারে বেইজিং এমন কঠোর অবস্থানে চলে গেছে।”

“এখন দুশ্চিন্তার বিষয় হলো এটা কোথায় গিয়ে ঠেকে সেটাও পরিষ্কার নয়,” বলেন তিনি।

মিস কাসামও মনে করেন সম্পর্কের তিক্ততা যে পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে সেটা যে “ভাল কূটনীতির মাধ্যমে” ঠিক করে ফেলা যাবে সেটাও তার মনে হয় না।

“বর্তমান বৈশ্বিক পৃথিবীতে এটা কখনো সম্ভব নয় যেখানে চীন ক্রমশই একটি বৃহৎ শক্তিশালী রাষ্ট্র হয়ে উঠছে,” বলেন তিনি।

দুটো দেশই জানে উত্তেজনা বৃদ্ধির সাথে সাথে ঝুঁকিও বাড়বে। গত সপ্তাহে চীনের একজন শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিক পরস্পরের প্রতি আক্রমণাত্মক বক্তব্য দেওয়া বন্ধ করার আহবান জানিয়েছেন।

অস্ট্রেলিয়ায় চীনের সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বেইজিং সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি ফু ইং দুপক্ষের মধ্যে আরো ভালো যোগাযোগের আহবান জানিয়ে বলেছেন, বাণিজ্যের জন্য দুটো দেশেরই পরস্পরকে প্রয়োজন।

তার এই বক্তব্যই শুধু তাৎপর্যপূর্ণ নয়, তিনি যাকে একথা বলেছেন তাও সমান তাৎপর্যপূর্ণ। অস্ট্রেলিয়ান ফাইনান্সিয়াল রিভিউর যে মাইকেল স্মিথকে চীন থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল তার কাছে তিনি এই মন্তব্য করেছেন।

অধ্যাপক লরেনসেন বলেন, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার উৎপাদন কাঠামো এতোটাই পরিপূরক যে এরকম আরো দুটো দেশ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তিনি বলেন, “অস্ট্রেলিয়া যা উৎপাদন করে চীনের সেটা দরকার।”

মিস কাসাম বলেন, বাণিজ্যকে রাজনৈতিক উত্তেজনা থেকে আলাদা করে রাখা যাবে না।

তিনি মনে করেন না যে দুটো দেশের মধ্যে খুব শীঘ্রই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। তবে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক কেমন হবে সেটা নির্ভর করে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাত কতদূর গড়ায় তার ওপর।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

বিবিসি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




ধর্ষণের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড: নতুন অধ্যাদেশে কী বলা হয়েছে?

বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান সংক্রান্ত একটি অধ্যাদেশে সই করেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।

রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের ফলে সংশোধিত আইনটি এখ্ন থেকেই কার্যকর হিসেবে জারি হল।

ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভের পর সোমবার আইনের সংশোধনীটি অনুমোদন করে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা।

রাষ্ট্রপতির জারি করা নতুন এই অধ্যাদেশে কি রয়েছে?

২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ধর্ষণ, ধর্ষণ জনিত কারণে মৃত্যু শাস্তি ইত্যাদি প্রসঙ্গে ৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি এতদিন ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

তবে ধর্ষণের শিকার নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে বা দল বেধে ধর্ষণের ঘটনায় নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে বা আহত হলে, সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। সেই সঙ্গে উভয় ক্ষেত্রেই ন্যূনতম এক লক্ষ টাকা করে অর্থ দণ্ডের বিধানও রয়েছে।

সেই আইনেই পরিবর্তন এনে ধর্ষণ প্রমাণিত হলেই মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনের বিধান রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে অর্থদণ্ডের বিধানও থাকছে।

প্রথমে ২০০০ সালে জারি করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৩৪টি ধারার মধ্যে ১২টি ধারাতেই বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার বিধান ছিল।

তবে পরবর্তীতে অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ ও মানব পাচার সংক্রান্ত দুইটি আইনের অংশ আলাদা হয়ে যাওয়ার পর এই আইন থেকে বাদ দেয়া হয়।

ফলে এই আইনের সাতটি ধারায় মৃত্যুদণ্ডের বিষয়টি বহাল থাকে।

নতুন অধ্যাদেশে ৯ (১) ধারাটি সংশোধন করে যাবজ্জীবন অথবা মৃত্যুদণ্ডের বিধান আনা হয়েছে।এর আগে এই ধারায় বলা হয়েছিল যে, যদি কোন পুরুষ নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং অতিরিক্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

বাংলাদেশের মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, এখন আইন সংশোধন করে ‘যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের’ বদলে ‘ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’ শব্দগুলো প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

অধ্যাদেশে ৮ নং ধারার ৩২ সংশোধন করে ‘অপরাধের শিকার ব্যক্তির মেডিকেল পরীক্ষা’ শব্দের পরিবর্তে অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং ‘অপরাধের শিকার ব্যক্তির মেডিকেল পরীক্ষা’ প্রতিস্থাপিত করা হয়েছে। অর্থাৎ এখন থেকে যিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তার মেডিকেল পরীক্ষার পাশাপাশি যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারও মেডিকেল পরীক্ষা করাতে হবে।

বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী বলেছেন, ধর্ষণের সাজা মৃত্যুদণ্ড করায় এই অপরাধ কমে আসবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

সংসদ চলমান না থাকায় সংশোধিত আইনটি অধ্যাদেশ আকারে জারি করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

তবে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, এর আগেও এই আইনে কয়েকটি অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের সাজা রয়েছে। তার সঙ্গে নতুন একটি ধারায় মৃত্যুদণ্ড যোগ করে সমস্যার সমাধান আসবে না।

ইরান, সৌদি আরব, মিশর, ইরাক, বাহরাইন ও উত্তর কোরিয়ার মতো বেশ কয়েকটি দেশে ধর্ষণের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

 

 

 

 

 

 

বিবিসি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




জেনে নিন যেভাবে ধরা পড়লো উত্তর কোরিয়ার গোপন অস্ত্র ব্যবসা

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে

উত্তর কোরিয়ার ওপর অনেক রকম নিষেধাজ্ঞা আরোপিত থাকলেও তারা কীভাবে আন্তর্জাতিক আইন ফাঁকি দিচ্ছে, অস্ত্র বিক্রি করছে – তা বের হয়ে এসেছে এক নতুন প্রামাণ্যচিত্রে।

‘দি মোল’ নামের এই ছবিটি মূলত একটি “স্টিং অপারেশন” বা ছদ্মবেশী প্রামাণ্য চিত্রকারের কাজ। এর ড্যানিশ পরিচালক ম্যাডস ব্রুগার বলছেন, এই জটিল স্টিং অপারেশনের জাল বিছাতে তাকে অনেক বছর ধরে কাজ করতে হয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর উচ্চাভিলাষের কারণে ২০০৬ সাল থেকেই জাতিসংঘ দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।

জাতিসংঘের একটি বিশেষজ্ঞ দল ২০১০ সাল থেকে নজর রাখছে উত্তর কোরিয়ার অস্ত্র কর্মসূচির অগ্রগতি ও নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর। তারা এ বিষয়ে নিয়মিত রিপোর্টও দিচ্ছে।

কিন্তু এই প্রামাণ্যচিত্রে যা দেখা যাচ্ছে, তা সত্যি নজিরবিহীন।

এতে দেখা যাচ্ছে, উত্তর কোরিয়ার কর্মকর্তারা ক্যামেরার সামনে আলোচনা করছেন, কীভাবে অস্ত্র রপ্তানি করার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাগুলোকে এড়ানো যায়।

ছবিটিতে একটি মুহূর্ত আছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে দেখা যাচ্ছে, মি. জেমস নামধারী একজন ছদ্মবেশী “অস্ত্র ব্যবসায়ী” এবং উত্তর কোরিয়ার একটি অস্ত্র কারখানার প্রতিনিধি একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করছেন।

এই ‘চুক্তি স্বাক্ষর’-এর দৃশ্য ভিডিও করছেন প্রামাণ্যচিত্রটির মূল চরিত্র, এবং সেখানে উত্তর কোরিয়ার কিছু সরকারি কর্মকর্তাও উপস্থিত রয়েছেন।

ঘটনাটা ঘটেছে পিয়ংইয়ং-এর শহরতলীতে, একটি চটকদার রেস্তোরাঁর বেজমেন্টে।

এগুলো কি বিশ্বাসযোগ্য?

প্রশ্ন হলো, ছবিটিতে যা দেখানো হয়েছে, তা কি সত্যি হতে পারে?

উত্তর কোরিয়ার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ একজন সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, তার মনে হয়েছে এটা “অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য।”

এই ছবিটি নির্মিত হয়েছে বিবিসি এবং কয়েকটি স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সম্প্রচার কোম্পানির যৌথ প্রযোজনায়।

প্রামাণ্যচিত্রটি একই সাথে মজার, বিদঘুটে এবং একেক সময় অবিশ্বাস্য।

ব্রুগার নিজেই এ ছবিতে এক জায়গায় বলেছেন, আমি এমন একজন ফিল্মমেকার যে সবসময় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে চায়।

উত্তর কোরিয়া বিষয়ে ২০১৪-১৯ সালে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের যে প্যানেল ছিল, তার সমন্বয়কারী হচ্ছেন হিউ গ্রিফিথ।

তিনি বলছেন, এ ছবিতে যা উদঘাটিত হয়েছে তা “অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য।”

“চেয়ারম্যান কিম জং উনকে লজ্জায় ফেলতে পারে এমন যত কিছু আমরা আগে দেখেছি, তার মধ্যে এটাই সবচেয়ে গুরুতর। এ ছবিতে এমন অনেক কিছু আছে, যা আমরা ইতিমধ্যেই যা জানি তার সাথে মিলে যায়।”

বিচিত্র সব চরিত্র

প্রামাণ্যচিত্রটিতে আছে বিচিত্র কিছু চরিত্র ।

একজন হলেন বেকার ড্যানিশ শেফ বা রাঁধুনী – যিনি কমিউনিস্ট একনায়কদের সম্পর্কে ভীষণ আগ্রহী। একজন স্প্যানিশ অভিজাত ব্যক্তি, যিনি উত্তর কোরিয়া বিষয়ে প্রচারণার সাথে জড়িত – এবং তার আগ্রহের বিষয় হলো সামরিক বাহিনীর পোশাক। আরেক জন সাবেক ফরাসী সৈন্য এবং দাগী কোকেন বিক্রেতা – যিনি একজন রহস্যময় ‘আন্তর্জাতিক’ ব্যক্তি।

বেকার রাঁধুনীটি হচ্ছেন উলরিখ লারসেন। তিনি ব্রুগারের সাহায্য নিয়ে কোরিয়ান ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশন (কেএফএ) নামে একটি স্পেন-ভিত্তিক সংগঠনে অনুপ্রবেশ করেন – যা উত্তর কোরিয়ার শাসকগোষ্ঠীর সমর্থক।

লারসেন ধীরে ধীরে এ সংগঠনের ওপরের কাতারের নেতা বনে যান এবং শেষ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার সরকারি কর্মকর্তাদের ‘আস্থা’ অর্জন করেন।

এই কেএফএ-র সদস্য হবার সূত্রেই তার সাথে যোগাযোগ হয় আলেইয়ান্দ্রো কাও দে বেনোসের সাথে। ইনি হচ্ছেন একজন স্প্যানিশ অভিজাত ব্যক্তি, যাকে সারা দুনিয়া চেনে “উত্তর কোরিয়ার দ্বাররক্ষী” হিসেবে।

এই লোকটিকে কখনো কখনো ছবিতে দেখা যায় উত্তর কোরিয়ার সামরিক পোশাক পরে থাকতে।

প্রামাণ্যচিত্রে তিনি গর্বের সাথেই বলেন, পিয়ংইয়ং-এর শাসকগোষ্ঠীর ভেতরে তার পরিচিতি এবং প্রভাব কতটা আছে।

এর পরে আছেন জিম লাত্রাশ-কুভোরট্রাপ। তাকে বর্ণনা করা হয় ফ্রান্সের একজন সাবেক লেজিওনেয়ার বা সৈনিক হিসেবে। তিনি কোকেন নামের মাদক বেচাকেনার জন্য দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। প্রামাণ্যচিত্রে তাকে নিয়ে আসা হয় দামী স্যুট পরে একজন আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ীর ভূমিকায় ‘অভিনয়’ করতে।

এর পরে আছেন ব্রুগার নিজে। তিনি নিজেকে বলেন পাপেট মাস্টার, এবং দাবি করেন যে তিনি এই প্রামাণ্যচিত্রের জন্য ১০ বছর ধরে কাজ করছেন।

ভুয়া কোম্পানির সাথে অস্ত্র বিক্রির চুক্তি

ওই চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে যে নর্থ কোরিয়ানরা আছেন, তাদের সবাইকে ঠিকমত শনাক্ত করা যায়নি।

লাত্রাশ-কুভোরট্রাপ বলছেন, কোরিয়ার কর্মকর্তারা যখন তাকে নানাভাবে জেরা করছিলেন, তখন তাকে একটা কোম্পানির নাম বানিয়ে বলতে হয়েছিল। এখন ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য মনে হয় যে তারা এমন একটা প্রাথমিক তথ্য আগে থেকে ভেবে রাখেননি।

তার ওপর এটাও বিশ্বাস করা কঠিন যে কোরিয়ান কর্মকর্তারা এমন একটা বৈঠক এবং দলিলপত্র স্বাক্ষর করা ফিল্মে ধরে রাখার অনুমোদন দিয়েছিলেন।

দলিলে স্বাক্ষর রয়েছে যার, তিনি হলেন কিম রিয়ং-চল। তিনি হচ্ছেন নারে ট্রেডিং অর্গানাইজেশনের প্রেসিডেন্ট। কোরিয়ায় এটি একটি খুবই সাধারণ নাম। কিন্তু জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে একই নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কথা আছে।

২০২০ সালের অগাস্টের ২৮ তারিখের ওই দলিলে বলা হয়, কোরিয়া নারে ট্রেডিং করপোরেশন নামে একটি কোম্পানি নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর নানা কর্মকান্ডে জড়িত আছে – যার উদ্দেশ্য উত্তর কোরিয়ার নিষিদ্ধ কর্মকান্ডের সমর্থনে অর্থ আয় করা।

‘আপনি কি সিরিয়ায় অস্ত্র সরবরাহ করতে পারবেন?

সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা গ্রিফিথ বলছেন, এটা একটা লক্ষণীয় ব্যাপার যে একজন ব্যবসায়ীর সম্পর্কে ওই কোরিয়ানরা কিছুই না জানলেও তার সাথে অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে চুক্তি করতে আপত্তি করছেন না।

“এতে বোঝা যায়, জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞায় কাজ হচ্ছে। উত্তর কোরিয়ানরা তাদের অস্ত্র বিক্রি করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে”, বলেন তিনি।

ছবিটির এক পর্যায়ে ২০১৭ সালে কাম্পালায় অনুষ্ঠিত একটি বৈঠক দেখানো হয়।

এতে উত্তর কোরিয়ার অস্ত্র ব্যবসায়ী বলে কথিত “মি. ড্যানি” লাত্রাশ-কুভোট্রাপকে জিজ্ঞেস করতে দেখা যায় যে তিনি সিরিয়ায় উত্তর কোরিয়ার অস্ত্র সরবরাহ করতে পারবেন কি-না।

মি. গ্রিফিথস বলেন, এ প্রশ্ন থেকে বোঝা যায় উত্তর কোরিয়া নিজে থেকে এসব কাজ করার ক্ষেত্রে অসুবিধার মধ্যে রয়েছে।

অবকাশকেন্দ্রের মাটির নিচে অস্ত্র-মাদকের কারখানা?

মি. জেমসকে দেখা যায় যে তিনি উগান্ডায় গেছেন এবং তার সাথে পিয়ংইয়ং-এ যে উত্তর কোরিয়ার কর্মকর্তাদের দেখা গিয়েছিল, তারাও আছেন। তারা লেক ভিক্টোরিয়ায় একটি দ্বীপ কিনে সেখানে একটি বিলাসবহুল অবকাশকেন্দ্র বানাতে চান।

উগান্ডার কর্মকর্তাদের কাছে এ উদ্দেশ্যের কথা বললেও কোরিয়ানরা গোপনে পরিকল্পনা করছেন, সেখানে একটি ভূগর্ভস্থ কারখানা তৈরি হবে – যাতে উৎপাদিত হবে অস্ত্র ও মাদক।

শুনলে যতই কল্পকথার মত মনে হোক, উত্তর কোরিয়া এমন কাজ আগেও করেছে। নামিবিয়ার লেপার্ড ভ্যালিতে একটি পরিত্যক্ত তামার খনিতে একটি গোলাবারুদ তৈরির কারখানা বানিয়েছিল উত্তর কোরিয়ার শাসকচক্র ।

কোরিয়া মাইনিং ডেভেলপমেন্ট ট্রেডিং কর্পোরেশন বা কোমিড নামে সংস্থাটির কার্যকলাপ তদন্ত করেছিল জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা ২০১৫ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত।

পরে নামিবিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করে জাতিসংঘ, এবং হয়ত সে কারণেই উত্তর কোরিয়ানরা উগান্ডার দিকে দৃষ্টি ফেরায়, বলেন গ্রিফিথ।

এই কর্মকর্তা বলছেন, “নামিবিয়ায় উত্তর কোরিয়ার প্রকল্পগুলো কার্যত বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, এবং ২০১৮ সাল নাগাদ উগান্ডা ছিল হাতেগোনা কয়েকটি আফ্রিকান দেশের একটি – যেখানে উত্তর কোরিয়ার অস্ত্রের দালালেরা ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়াতে পারতো।”

‘দূতাবাস কিছু জানে না’

ডকুমেন্টারিটিতে আরেকটি জিনিস উঠে এসেছে। তাহলো, নর্থ কোরিয়ান কূটনীতিকরা দৃশ্যত বিদেশে বিভিন্ন দূতাবাসে বসে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গের প্রয়াসে সহযোগিতা করছেন।

একটি দৃশ্যে দেখা যায়, উলরিখ লারসেন স্টকহোমে উত্তর কোরিয়ার দূতাবাসে গিয়েছেন। সেখানে মি. রি নামে একজন কূটনীতিকের কাছ থেকে একটি খাম পান, যাতে উগান্ডা প্রকল্পের পরিকল্পনার কাগজপত্র আছে।

লারসেন গোপনে এই সাক্ষাতের চিত্র ধারণ করেন।

তিনি যখন দূতাবাস থেকে বিদায় নিচ্ছেন তখন মি. রি তাকে গোপনীয়তার ব্যাপারে সতর্ক করে দিচ্ছেন।

“যদি কিছু ঘটে যায়, তাহলে কিন্তু দূতাবাস বলবে আমরা এ ব্যাপারে কিছুই জানি না। ঠিক আছে?”

গ্রিফিথস বলছেন, এ দৃশ্যটিও বাস্তবতার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।

তিনি বলেন, “জাতিসংঘের প্যানেলের তদন্তে দেখা গেছে, নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করা বা ভাঙার চেষ্টার সথে জড়িত আছে উত্তর কোরিয়ার কূটনৈতিক অফিসগুলো বা সে দেশের পাসপোর্টধারীরা।”

যেসব চুক্তি নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রটিতে আলোচনা হয়, তার কোনোটিই বাস্তবে রূপ পায়নি।

চুক্তির অংশীদারেরা এক পর্যায়ে অর্থ দাবি করতে শুরু করলে মি. জেমসকে ‘উধাও’ করে দেন পরিচালক ব্রুগার।

চলচ্চিত্র নির্মাতারা বলছেন, তাদের সাক্ষ্যপ্রমাণগুলো স্টকহোমের উত্তর কোরিয়ার দূতাবাসে উপস্থাপন করা হয়েছিল, কিন্তু কোন জবাব আসেনি।

কেএফএ-র প্রতিষ্ঠাতা কাও দে বেনোস বলেছেন যে তিনি ভান করছিলেন, এবং চলচ্চিত্রটি পক্ষপাতদুষ্ট, সাজানো এবং স্বার্থসিদ্ধির জন্য করা।

পল অ্যাডামস

কূটনৈতিক সংবাদদাতা, বিবিসি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




অনলাইনে ধর্ষণের হুমকি দেয়ার কী শাস্তি আছে বাংলাদেশের আইনে?

ন্যায় বিচারের দাবী: নোয়াখালীতে নারী নির্যাতনের প্রতিবাদে ঢাকায় বিক্ষোভ।

ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ধর্ষণে উস্কানি দেয়ার অভিযোগে শনিবার ঢাকার খিলক্ষেত থেকে একজনকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব। তারা বলছে, ঐ যুবক ছাড়াও আরো কয়েকটি ফেসবুক আইডি তাদের নজরদারিতে আছে যেখান থেকে ধর্ষণের হুমকি বা ধর্ষণকে সমর্থন করে পোস্ট বা কমেন্ট করা হয়েছে।

র‍্যাবের কর্মকর্তা মুশফিকুর রহমান জানান, র‍্যাবের পক্ষ থেকে অনলাইন মনিটরিং-এর জন্য একটি সেল তৈরি করা হয়েছে। সেখানে তারা দেখতে পেয়েছেন, ফেসবুকে বিভিন্ন সময় নারী মডেল, সেলিব্রেটি ও লেখকের পোস্টে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হয়।

বর্তমানে যারা ধর্ষণবিরোধী আন্দোলন করছেন তাদের নিয়েও বেশ কুরুচিপূর্ণ পোস্ট করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়ায় ও অনলাইনে নারীদের এভাবে ধর্ষণের হুমকি দেয়া, আক্রমণাত্মক বা অপমানজনক মন্তব্য করা বা কুরুচিপূর্ণ প্রস্তাব দেয়ার নজির হরহামেশাই শোনা যায়।

বিশেষ করে কোনো ফেসবুক গ্রুপে বা পেইজে অথবা সংবাদমাধ্যমগুলোর পোস্টে কোনো নারীর কমেন্টের বিপরীতে প্রায়ই এধরনের মন্তব্য চোখে পড়ে।

দেখা গেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা পুলিশের কাছে এবিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ করেন না।

তবে আইনজীবীরা বলছেন, অনলাইনে এ ধরনের হুমকি এবং হয়রানির ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা আইনসহ ফৌজদারি দণ্ডবিধি অনুযায়ীও অভিযোগ করার বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

কী ধরনের আইনি পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব?

অনলাইনে এধরনের হয়রানিমূলক আচরণের শিকার হলে তথ্য-প্রমাণসহ সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ করার পরামর্শ দেন আইনজীবী মিতি সানজানা।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের আইনে কাউকে কোনো হুমকি দেয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এছাড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সুস্পষ্টভাবে বলা আছে যে, কোনো ব্যক্তি যদি ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে ইচ্ছাকৃত বা অজ্ঞাতসারে অন্য ব্যক্তির জন্য আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক কোনো তথ্য প্রকাশ করেন, অথবা এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করেন যা অন্য ব্যক্তিকে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ করতে পারে এবং মিথ্যা জানা সত্বেও অন্যদেরকে অপমান, অপদস্থ, বিরক্ত বা হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে কোনো মন্তব্য করা হলে তার কারাদণ্ড ও জরিমানা করার বিধান রয়েছে।”

আইন অনুযায়ী এরকম ক্ষেত্রে তিন বছরের কারাদণ্ড ও তিন লাখ টাকা শাস্তির বিধান রয়েছে বলে তিনি জানান।

এছাড়া এই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে, অর্থাৎ অনলাইনে এই ধরনের কন্টেন্ট ছড়িয়ে দিতে থাকলে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও দশ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় শাস্তির বিধান রয়েছে বলে জানান মিতি সানজানা।

তিনি বলেন, এরকম ক্ষেত্রে নিকটস্থ থানায় সরাসরি অভিযোগ করে, সাইবার ইউনিটে মেইল করে এবং কাউন্টার টেররিজম বিভাগের ‘হ্যালো সিটি’ অ্যাপের মাধ্যমেও অভিযোগ করা সম্ভব।

ই-মেইল এবং অ্যাপে অভিযোগ করার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী নিজের পরিচয় গোপন রেখেও অভিযোগ দায়ের করতে পারেন বলে জানান মিতি সানজানা।

তবে তিনি বলেন যত দ্রুত সম্ভব অভিযোগ করা উচিত এবং অভিযোগের পক্ষে কিছু তথ্য প্রমাণ জোগাড় করে রাখা ভালো।

“স্ক্রিনশট, লিঙ্ক, অডিও-ভিডিও ফাইল বা সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রসহ অভিযোগ করা প্রয়োজন। আর স্ক্রিনশটের ক্ষেত্রে আমরা পরামর্শ দেই যেন অ্যাড্রেস বারের ওপর যে ইউআরএল দেখা যায়, সেটিও যেন স্ক্রিনশটে থাকে।”

অনলাইনে কোনো ব্যক্তিকে সরাসরি এধরনের আক্রমণ না করে পরোক্ষভাবে আক্রমণ করা হলেও আক্রমণকারীকে আইনের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে বলে জানান মিতি সানজানা।

“প্রত্যক্ষভাবে না করেও কেউ যদি এমন কোনো মন্তব্য করেন যেখানে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে কাকে উদ্দেশ্য করে এই মন্তব্য করা হয়েছে, সেক্ষেত্রেও মানহানি হওয়া বা সুনাম ক্ষুণ্ণ হওয়ার বিষয়টি শনাক্ত হলে আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে।”

তিনি জানান, অনলাইনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনো সংবাদমাধ্যম বা পাবলিক প্ল্যাটফর্মে এ ধরনের মন্তব্য করা হলে ঐ প্ল্যাটফর্মের কর্তৃপক্ষ অথবা যে ব্যক্তির উদ্দেশ্যে মন্তব্য করা হয়েছে, সেই ব্যক্তিরও আইনি পদক্ষেপ নেয়ার অধিকার রয়েছে।

নাগিব বাহার

বিবিসি বাংলা, ঢাকা

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




জেনে নিন কবুতর সম্পর্কে কিছু জানা-অজানা তথ্য

কবুতর- পায়রা বা কপোত বা পারাবত নামে পরিচিত। এটি এক প্রকারের জনপ্রিয় গৃহপালিত পাখি। মানুষ খুব মজা করে কবুতরের গোশত খায়।

প্রাচীনকালে কবুতরের মাধ্যমে চিঠি আদান-প্রদান করা হতো। কিন্তু বর্তমানে এটি পরিবারের পুষ্টি সরবরাহ, সমৃদ্ধি, শোভাবর্ধনকারী এবং বিকল্প আয়ের উৎস হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। কবুতর ওড়ানোর প্রতিযোগিতা প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রচলিত আছে।

পৃথিবীতে প্রায় ২০০ জাতের কবুতর পাওয়া যায়। বাংলাদেশে প্রায় ৩০ প্রকার কবুতর রয়েছে। বাংলাদেশে কবুতরের জাতের মধ্যে গিরিবাজ সবচেয়ে জনপ্রিয়। এছাড়া, জালালী, শিরাজী, গিরিবাজ, সোলা, লোটন, সিলভার কিং ও হোয়াইট কিং কবুতরও পরিচিত।

পৃথিবীতে ২০০ জাতের কবুতর থাকলেও সব কবুতর কিন্তু তথ্য আদান-প্রদানের কাজে ব্যবহার করা হয় না। সাধারণত হোমার জাতীয় কবুতর তথ্য আদান প্রদানের কাজে ব্যবহার করা হয়। এসব কবুতরের ডানা মাংসল ও শক্ত। এরা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার বেগে উড়তে পারে এবং তার বাসস্থল থেকে ১৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত গিয়ে ফেরত আসতে পারে।

কবুতর প্রতিপালন এখন শুধু শখ ও বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই বরং তা এখন একটি লাভজনক ব্যবসা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। কবুতর বাড়ি ও পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা ছাড়াও অল্প খরচে এবং অল্প ঝামেলায় প্রতিপালন করা যায়।

অল্প স্থান ও কম খরচে কবুতর পালন করা যায়। কবুতর ছয় মাসে ডিম দেয়, বার মাসে তের জোড়া বাচ্চা দেয়, ১৮ দিনে বাচ্চা ফুটে, চার সপ্তাহে বাচ্চা খাওয়া যায়, বাচ্চা সুস্বাদু ও পুষ্টকর, খনিজ ও ভিটামিনসমৃদ্ধ, খাদ্য খরচ কম, রোগ-বালাই নেই ও কবুতর পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে।

ডিম পাড়ার বাসা তৈরির জন্য ধানের খড়, শুকনো ঘাস, কচি ঘাসের ডগাজাতীয় উপাদান দরকার হয়। খোপের ভেতর মাটির সরা বসিয়ে রাখলে কবুতর সরাতে ডিম পাড়ে এবং বাচ্চা ফুটায়।

সাধারণত একটি ভালো জাতের কবুতর বছরে ১২ জোড়া ডিম দিতে সক্ষম। এই ডিমগুলোর প্রায় প্রতিটি থেকেই বাচ্চা পাওয়া যায়। এই বাচ্চা ৪ সপ্তাহের মধ্যেই খাওয়া বা বিক্রির উপযোগী হয়। একটি পূর্ণাঙ্গ বয়সের কবুতর ডিম দেবার উপযোগী হতে ৫ থেকে ৬ মাস মাস লাগে।

কবুতরের জীবনকাল প্রায় ১৫ বছর।

 

 

 

 

 

 

পার্সটুডে

জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেন সুদানের ওপর চাপ দিচ্ছেন

সুদানের অবস্থা তখন বেশ শোচনীয়। অর্থনীতি ধসে পড়ছে। মূদ্রাস্ফীতি লাগামহীন। দেশজুড়ে খাদ্য সংকটের আশংকা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েল সরকার যেন এখানে তাদের জন্য একটা সুযোগ দেখতে পেলেন।

আঠারো মাস ধরে এক অহিংস আন্দোলন করে সুদানের দীর্ঘদিনের শাসক ওমর আল-বশিরকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর দেশটির গণতান্ত্রিক আকাঙ্খা তখন সুতার ওপর ঝুলছে।

যুক্তরাষ্ট্রের খাতায় সুদানের নাম তখনো সন্ত্রাসবাদে রাষ্ট্রীয় মদত দেয় এমন দেশগুলোর তালিকায়। কিন্তু যদি সুদান ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে এই তালিকা থেকে সুদানের নাম বাদ দেয়া হবে। এর ফলে সুদানের জন্য অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার অনেক পথ খুলে যাবে।

সুদানের এই কাহিনী অনেক জটিল, এর পেছনে আছে ৩০ বছরের দীর্ঘ ইতিহাস। সুদানে যখন ইসলামপন্থী সরকার ক্ষমতায় এলো, তখন থেকে।

উনিশশো উননব্বই সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশির। ক্ষমতায় এসেই তিনি খার্তুমকে পরিণত হরেন বিশ্বের জঙ্গি জিহাদি মতাদর্শের একটি কেন্দ্রে।

আল-কায়েদা এবং অন্যান্য চরমপন্থী গোষ্ঠী সুদানে গিয়ে ঘাঁটি গাড়ে। তারা যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, মিশর, ইথিওপিয়া, উগান্ডা, কেনিয়া এবং অন্যান্য জায়গায় হামলা চালায়।

তারপর ১৯৯৩ সালে যখন নিউ ইয়র্কে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে প্রথম সন্ত্রাসবাদী হামলা চলে, তারপর যুক্তরাষ্ট্র সুদানকে সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় মদতদাতা বলে চিহ্ণিত করে।

সিআইএ-র সহযোগিতা

সুদানের বিরুদ্ধে জারি হয় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা। প্রতিবেশী দেশগুলো সুদানের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন জানায়। এর ফলে চাপ তৈরি হয় সুদানের ওপর। তখন তারা বাধ্য হয়ে তিন বছর পর ওসামা বিন লাদেন এবং অন্যান্য জিহাদিদের বহিস্কার করে।

দু’হাজার এক সালের ১১ই সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর সুদানের নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সিআইএ-র কাছে খুবই মূল্যবান হয়ে উঠে, তাদের মধ্যে সহযোগিতা শুরু হয়।

এই সহযোগিতার বিনিময়ে সুদানের নাম সন্ত্রাসবাদে মদত যোগানো দেশের তালিকা থেকে বাদ পড়ার কথা।

কিন্তু মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যরা তখনো নানা কারণে খার্তুমের ওপর ক্ষিপ্ত। এর একটা কারণ তখনো সুদান সরকার দার্ফুরে যে যুদ্ধ চালাচ্ছে সেটি। সেখানে ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আসছিল। কাজেই সুদানের নাম এই তালিকায় থেকেই গেলো।

ওমর আল-বশিরের সরকার তখনো তলে তলে অনেক কিছু করছে: তারা ইরান এবং হামাসের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ইসরায়েলের যুদ্ধ বিমান অন্তত দু’বার সুদানের লোহিত সাগর উপকূলে গাড়ি বহরের ওপর হামলা করেছিল। এসব গাড়ি বহরে করে নাকি হামাসের জন্য অস্ত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ২০১৬ সালে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের চাপে ওমর আল-বশির বাধ্য হলেন ইরানের সঙ্গে সম্পর্কে ছেদ ঘটাতে।

কিন্তু সুদানে গত বছরের গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরও যুক্তরাষ্ট্র তার অবস্থান বদলাতে দেরি করছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের কর্মকর্তারা চাপ প্রয়োগের জন্য তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী উপায়গুলো বহাল রাখতে চাইছিলেন। তারা একই সঙ্গে মনে করছিলেন, নতুন গণতান্ত্রিক শাসন বেশিদিন টিকবে না।

সেনেটররা আটকে দিলেন

কিন্তু সুদানের ওপর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখলে সেটাতে বরং উল্টো ফল হতে পারে। কারণ এই নিষেধাজ্ঞার কারণেই বরং দেশটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।

যতদিন সুদানের নাম কালো তালিকায় থাকবে, ততদিন দেশটির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি থাকবে। এর ফলে সুদান অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে থাকবে।

সুদানের বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের হাত-পাও যেন এই নিষেধাজ্ঞার কারণে বাঁধা পড়ে আছে। বিদেশি বিনিয়োগ আটকে আছে। সুদানের ৭,০২০ কোটি ডলারের যে বিপুল ঋণের বোঝা, যেটি দিনে দিনে আরও বাড়ছে, সেটা থেকে উদ্ধার করতে আইএমএফ এবং বিশ্ব ব্যাংকেরও কিছু করার নেই।

সুদানে ক্ষুধার সমস্যাও আঁতকে উঠার মতো: জাতিসংঘের হিসেবে দেশটির ৯৬ লাখ মানুষ মারাত্মক খাদ্য নিরাপত্তা সংকটে আছে।

এরপর কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সবকিছু বন্ধ হয়ে গেল। সুদানে বন্যা হলো। পরিস্থিতি যেন আরও খারাপের দিকে মোড় নিল।

এরকম একটি সংকট কেবল খাদ্য বিতরণ করে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দরকার ব্যাপক আকারে অর্থনৈতিক সহায়তা।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সুদানের নাম সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দেয়ার জন্য একটা সমঝোতার চেষ্টা চলছিল মার্কিন কংগ্রেসে। এই প্রচেষ্টাটি আটকে ছিল পূর্ব আফ্রিকা এবং ইয়েমেনে আল-কায়েদার হামলার শিকার হওয়া মানুষদের পরিবারের আপত্তির কারণে। তারা ক্ষতিপূরণের দাবি জানাচ্ছিলেন।

সুদান ৩৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে রাজী হলো। কিন্তু সেপ্টেম্বরে দুজন ডেমোক্রেটিক সেনেটর, চাক শুমার এবং বব মেনেনডেজ এই উদ্যোগ আটকে দিলেন। কারণ তারা চাইছিলেন, নাইন-ইলেভেনের ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলো যাতে মামলা করতে পারে, সেরকম একটা সুযোগ খোলা রাখা।

তখন ট্রাম্প প্রশাসন সুদানকে এখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি প্রস্তাব দিল।

অগাস্টের শেষে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও খার্তুম সফর করলেন। তিনি সুদানের বেসামরিক প্রধানমন্ত্রী আবদাল্লা হামদককে একটি প্রস্তাব দিলেন: সুদান যদি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়, তখন কংগ্রেসে এই সমঝোতার পথে যেসব বাধা, সেগুলো অপসারণের চেষ্টা করবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

গত মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সুদান আরব লীগের সদস্য। যদি তারাও একই সিদ্ধান্ত নেয়, সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর তারা হবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়া ৪র্থ আরব রাষ্ট্র।

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের আগে যদি এটা ঘটে, তা হবে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক বিরাট অর্জন। ট্রাম্প প্রশাসন আরবদের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়া হলে সেটি হবে সুদানের জন্য এক বিরাট এবং গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

জেনারেলদের জন্য ভালো চুক্তি

ইসরায়েলের সঙ্গে এরকম সমঝোতার ঘোরতর বিরোধী হচ্ছে ইসলামপন্থীরা। কিন্তু তারা এখন ক্ষমতার বাইরে। কিন্তু শুধু ইসলামপন্থীদের কাছে নয়, সুদানের রাজনীতিতে সবপক্ষের কাছেই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের বিষয়টি বেশ বিতর্কিত। বেসামরিক রাজনৈতিক জোটে অন্তর্ভুক্ত অনেক দলই মনে করে, যে কোন কিছুর আগে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী হামদক জানেন যে, যদি তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত নেন, তার বেসামরিক জোটে ফাটল ধরবে।

সফররত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে তিনি বললেন, নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় না আসা পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে না। এই নির্বাচন হওয়ার কথা তিন বছরের মধ্যে।

যদিও মি. হামদক এবং তার বেসামরিক সরকারই দেশ চালাচ্ছেন, সুদানের প্রকৃত ক্ষমতা এখনো আসলে জেনারেলদের হাতেই।

সুদানে যে ‘ট্রানজিশনাল কাউন্সিল’ বা অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ আছে, তার প্রধান হচ্ছেন লে. জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান। তার ডেপুটি হচ্ছেন লে. জেনারেল মোহাম্মদ হামদান ডাগুলো, যিনি মানুষের কাছে হেমেটি নামে পরিচিত। তাদের দুজনের অধীনেই সুদানের সেনাবাহিনী। সরকারের আর্থিক নিয়ন্ত্রণও আসলে তাদের হাতে। এই অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের পেছনে আছে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মিশরের সমর্থন।

ইসরায়েলের সঙ্গে যেসব কথাবার্তা চলছে, সেগুলো কিন্তু মূলত এই জেনারেলদের সঙ্গেই হচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জেনারেল বুরহান ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি এই কাজটা করেছেন সুদানের প্রধানমন্ত্রী হামদককে না জানিয়েই। এই দুজনের মধ্যে আবার শীগগীরই দেখা হওয়ার কথা।

জেনারেল বুরহান এবং জেনারেল হেমেটি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগকে তাদের জন্য একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন। এই জেনারেলরা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আকাঙ্খা পোষণ করেন, কিন্তু তারা সেটা চান গণতন্ত্রের ঝামেলায় না গিয়ে। যদি ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারেন, তারা মনে করছেন, এটি সম্ভব।

আর এজন্যেই সুদানের গণতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলনকারীরা দাবি তুলেছেন, এরকম যে কোন সমঝোতা সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করে দেখতে হবে।

গত বছর যখন প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে ওমর আল-বশির ক্ষমতাচ্যূত হন, তখন সামনে এসে দায়িত্ব নেন জেনারেল বুরহান এবং জেনারেল হেমেটি। দু’মাস পর তাদের বাহিনী প্রায় একশো বিক্ষোভকারীকে গুলি করে হত্যা করে।

এটি তখন ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি করেছিল। এরপর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যস্থতায় এই দুই জেনারেল একটি বেসামরিক মন্ত্রিপরিষদের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগিতে রাজী হন।

‘পৃথক ইস্যু’

মোদ্দা কথা হচ্ছে, সুদানের জেনারেলরা এই বেসামরিক প্রশাসনকে সহ্য করছে কেবল এই কারণে যে, তাদের একটা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দরকার। অপরদিকে এই জেনারেলরা যে নৃশংসতা এবং নীতিহীন আচরণ দেখিয়েছেন, সেজন্য সুদানের সাধারণ মানুষ তাদের ক্ষমা করেনি।

তবে সুদানের আগের প্রজন্মের মানুষের মনে আছে ‘অপারেশেন মোজেস’ নামের এক অভিযানের কথা। ১৯৮৪ সালে সুদানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জাফর নিমেরি এবং ইসরায়েলের মধ্যে এক গোপন চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তির অধীনে সুদানে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া ইথিওপিয়ান ইহুদীদের বিমানে করে তুলে নিয়ে যেতে পেরেছিল ইসরায়েল। এরপর অভিযোগ উঠেছিল, জাফর নিমেরি আসলে ইসরায়েলি গুপ্ত সংস্থা মোসাদের কাছ থেকে লাখ লাখ ডলার ঘুষ নিয়ে নিজের পকেটে ভরেছেন।

সুদানে ওমর আল-বশিরের আমলে আমলা এবং ব্যবসায়ীদের যে আঁতাত গড়ে উঠেছিল, তারাই বিরাট বিরাট ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। এসব ব্যবসায়িক আঁতাত দিনে দিনে আরও জোরালো হচ্ছে।

সুদানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন অর্থ ফুরিয়ে যাওয়ায় কর্মীদের বেতন দিতে পারে না, তখন তারা এই জেনারেলদের কাছেই হাত পাতে। যদি এখন এই আমলা-ব্যবসায়ী আঁতাতকে আরও আশকারা দেয়া হয়, সুদানে এই জনগণের সম্পদ লুঠ করা দুর্নীতিতন্ত্রই বহাল থাকবে।

তবে আরেকটি আরব রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ইসরায়েলিদের জন্য নিঃসন্দেহে এক বড় পুরস্কার। কিন্তু যে তরুণ ইসরায়েলি এবং মার্কিনীরা ১৫ বছর আগে দার্ফুরে সুদানের নৃশংসতার প্রতিবাদ করেছিল, তাদের কাছে নয়। যে জেনারেলরা এসব মিলিশিয়া বাহিনীর নেতৃত্বে ছিল, সেই নৃশংসতার জন্য দায়ী, তাদেরকে বৈধতা দেয়াকে এরা একটি ভুল নৈতিক পদক্ষেপ বলেই মনে করে।

তবে মি. হামদকের অবস্থান বেশ যৌক্তিক। সুদানের নাম সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্রের তালিকা থেকে বাদ দেয়া এবং ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়া – এই দুটি ইস্যু একেবারেই আলাদা।

তিনি বলছেন, সুদানকে এখনই সন্ত্রাসবাদী দেশের তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। কারণ সুদান তার দেশের মাটি থেকে সন্ত্রাসবাদীদের অপসারণ করেছে। কারণ সুদানের গণতন্ত্রকে রক্ষা করতে হবে।

আর ইসরায়েল যদি একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক আরব রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পায়, সেটাই হবে ইসরায়েলের জন্য সত্যিকারের পুরস্কার।

অ্যালেক্স ডি ওয়াল হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের টাফট্ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেচার স্কুল অব ল এন্ড ডিপ্লোমেসির ওয়ার্ল্ড পিস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক।

অ্যালেক্স ডি ওয়াল

শিক্ষক, টাফট্ বিশ্ববিদ্যালয়

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




জেনে নিন ট্রাম্প নাকি বাইডেন – চীন ও রাশিয়া কাকে বিজয়ী হিসেবে দেখতে চায়?

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিখ্যাত সেই স্লোগান “মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন” অনুসারে ক্রেমলিন কি এবারও চেষ্টা করবে আমেরিকাকে একটি “অসাধারণ রাষ্ট্র” হিসেবে ধরে রাখতে? বেইজিং কি চায় যে এবারের নির্বাচনে জো বাইডেন জয়ী হোক?

যুক্তরাষ্ট্রে তেসরা নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এই প্রশ্নগুলোই ঘুরপাক খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা, দুই প্রার্থী এবং তাদের সমর্থকদের মাথায়।

শীর্ষস্থানীয় একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন যে রাশিয়া, চীন এবং ইরান এই তিনটি দেশ ভোটারদের প্রভাবিত করার জন্য প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ এমনকী গোপনেও তৎপরতা চালাবে।

তবে তারা এই তিনটি দেশের ইচ্ছা ও ক্ষমতাকে একসাথে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না বলে সতর্ক করে দিয়েছেন। বলেছেন, এসব দেশের নিজস্ব উদ্দেশ্য ও সক্ষমতা রয়েছে।

গোয়েন্দাদের এসব সন্দেহ ও পর্যালোচনা এখনও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা অবশ্য সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন: নির্বাচনে রাশিয়ার দিক থেকে যেসব ঝুঁকি রয়েছে সেগুলোকে খুব বেশি গুরুত্ব না দেওয়ার জন্য তাকে বলা হয়েছে।

নির্বাচনের আর তিন সপ্তাহের মতো বাকি। এখনও পর্যন্ত এবিষয়ে রাশিয়া ও চীনের ভূমিকা সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে?

রাশিয়া

প্রথমে দেখা যাক গোয়েন্দারা কী বলছেন:

আপনারা হয়তো জানেন যে ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ও পরে রাশিয়ার ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর কথাবার্তা হয়েছে। এনিয়ে ক্রেমলিনের বিরুদ্ধে অভিযোগও উঠেছে বিস্তর।

মার্কিন গোয়েন্দারা বিশ্বাস করেন গত নির্বাচনে ভোটারদেরকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে নিয়ে যেতে চেষ্টা চালিয়েছে রাশিয়া।

এর প্রমাণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছেন মি. ট্রাম্পের নির্বাচনী টিমের সাথে রুশ কর্মকর্তাদের বৈঠক, হিলারি ক্লিনটন ও ডেমোক্র্যাট দলের নির্বাচনী প্রচারণায় সাইবার হামলা, বিভিন্ন রাজ্যের ভোটারদের তথ্যভাণ্ডারে প্রবেশ এবং অনলাইনে এমন সব ভুয়া খবর ছড়িয়ে দেওয়ার কথা যেগুলো নাকি শেষ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে গেছে।

এবছরের সেপ্টেম্বর মাসে সেনেটে রিপাবলিকান-নেতৃত্বাধীন একটি প্যানেলও এমন মতামত দিয়েছে। রাশিয়া যে গতবার ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চেয়েছিল তাদের মতামত এই ধারণাকেই আরো বেশি সমর্থন দিয়েছে।

এই প্যানেল বলেছে, মি. ট্রাম্পের প্রচারণায় বিদেশিদের হস্তক্ষেপ খুব সহজ ছিল। তবে এই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় তারা কোন অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র দেখতে পাননি।

এবার ২০২০ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনের জায়গায় জো বাইডেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি সেন্টারের (এনসিএসসি) পরিচালক উইলিয়াম ইভানিনা তার পর্যালোচনায় বলেছেন, “প্রাথমিকভাবে সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মানহানি করার জন্য রাশিয়া নানা ধরনের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।”

আরো এক ধাপ এগিয়ে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই-এর পরিচালক ক্রিস্টোফার রে-এর অভিমত হচ্ছে রাশিয়া কখনোই এই তৎপরতা বন্ধ করেনি।

তিনি মনে করেন, ২০১৮ সালের কংগ্রেস নির্বাচনেও রাশিয়া প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়েছে এবং সেটাকে তারা নিয়েছে “২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের একটি মহড়া” হিসেবে।

বিদেশি নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ শুরু থেকেই বারবার অস্বীকার করেছে রাশিয়া।

এবছরের আগের দিকে ক্রেমলিনের একজন মুখপাত্র বলেছেন, “এধরনের অভিযোগ আনা মানসিক বৈকল্য এবং এর সাথে সত্যের কোন সম্পর্ক নেই।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাশিয়া দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে দেখতে চায় কীনা সেটি একটি প্রশ্ন। কিন্তু তাদের আরেকটি বড় উদ্দেশ্য হচ্ছে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোতে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করা।

যেমন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত ভুয়া খবর ছড়িয়ে দিয়ে রাশিয়া এই জোটকে মহামারি মোকাবেলার বিষয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে।

রাশিয়া অবশ্য এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

এবারে দেখা যাক প্রার্থীরা কী বলছেন:

ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেন হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন যে রাশিয়া যদি হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখে তাহলে “এর মূল্য দিতে হবে।” শুধু তাই নয়, রাশিয়াকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের “প্রতিপক্ষ” বলেও উল্লেখ করেছেন।

অন্যদিকে, রাশিয়ার হস্তক্ষেপের বিষয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সবসময়ই তাকে খাটো করে দেখেছেন। তবে এবিষয়ে তার নিজের গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞদের সাথেও মাঝে মধ্যে মতবিরোধ হয়েছে।

ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বৈঠকের পর মি. ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তিনি কি মার্কিন গোয়েন্দাদের নাকি মি. পুতিনের দাবী বিশ্বাস করেন? জবাবে মি. ট্রাম্পের উত্তর ছিল: “প্রেসিডেন্ট পুতিন বলছেন রাশিয়া কিছু করেনি। তারা কেন সেটা করবে আমি তার কোন কারণ দেখি না।”

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য পরে বলেছেন যে তিনি ভুল বলেছিলেন।

চীন

প্রথমে দেখা যাক মার্কিন গোয়েন্দারা কী বলছেন:

ট্রাম্প প্রশাসনের প্রখ্যাত ব্যক্তিরা বলছেন, এবারের নির্বাচনে রাশিয়া নয় বরং চীনই হবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আসল হুমকি।

“আমি গোয়েন্দা তথ্য দেখেছি। এটাই আমার উপসংহার,” বলেন এটর্নি জেনারেল উইলিয়াম বার।

হাউজ অফ রিপ্রেজেনটেটিভে ইন্টেলিজেন্স কমিটির প্রধান ডেমোক্র্যাট রাজনীতিক অ্যাডাম শিফ অবশ্য এটা মানতে রাজি নন। মি. বারের বিরুদ্ধে তিনি “মিথ্যা বলার” অভিযোগ এনেছেন।

মি. ইভানিনা তার পর্যালোচনায় বলেছেন, মার্কিন গোয়েন্দারা বিশ্বাস করেন যে চীন চায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যাতে পুনরায় নির্বাচিত না হন। কারণ বেইজিং-এর কাছে মি. ট্রাম্প ‘নির্ভরযোগ্য’ নন।

“যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ব্যাপারে চীন তার প্রভাব আরো বিস্তৃত করছে। বেইজিং যাদেরকে চীনা স্বার্থ-বিরোধী বলে মনে করে তাদের ওপর চাপ বৃদ্ধি করছে, একই সাথে চীনের সমালোচনারও জবাব দিচ্ছে,” বলেন তিনি।

‘প্রভাব’ শব্দটির ব্যবহার উল্লেখ করার মতো। যদিও অনেকে মনে করেন মতামতকে প্রভাবিত করতে চীনের অনেক সূক্ষ্ম কৌশল রয়েছে।

মি. ইভানিনা নিশ্চিত নন যে চীন এবারের নির্বাচনে ঠিক কতদূর অগ্রসর হতে পারে। তবে তিনি বলেন, “আগ্রাসী তৎপরতা থেকে সুবিধা নেওয়ার জন্য চীন এই ঝুঁকি নেওয়া অব্যাহত রাখবে।”

চীনের ইচ্ছা হয়তো সারা বিশ্বের ব্যাপারে তাদের যে মতামত সেটা তুলে ধরা। ফেসবুক সম্প্রতি কিছু চীনা অ্যাকাউন্ট সম্পর্কিত একটি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দিয়েছে। এসব নেটওয়ার্ক থেকে দক্ষিণ চীন সাগরের মতো বিরোধের ইস্যুতে বেইজিং-এর স্বার্থের পক্ষেই কাজ করছিল।

অন্যান্য দেশের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে চীন। বেইজিং বলছে, এধরনের কাজ করতে তারা অনিচ্ছুক এবং এরকম কিছু করতে তারা আগ্রহীও নয়।

এবার দেখা যাক প্রার্থীরা কী বলছেন:

অক্টোবর মাসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি নিবন্ধ রিটুইট করেছেন যেখানে বলা হয়েছে, “এবারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চীন জো বাইডেনের পক্ষ নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে।”

জো বাইডেনের ছেলে হান্টারের কথা উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লিখেছেন, “অবশ্যই তারা বাইডেনকে চায়। আমি চীনের কাছ থেকে শত শত কোটি ডলার নিয়ে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগার এবং আমাদের দরিদ্র কৃষকদের দিয়েছি। বাইডেন আর হান্টার জিতে গেলে চীন যুক্তরাষ্ট্রকেও জিতে নেবে।”

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন খুবই খারাপ পর্যায়ে। করোনাভাইরাস থেকে শুরু করে হংকং-এ চীনের আরোপিত নতুন নিরাপত্তা আইন নিয়ে দুটো দেশের মধ্যে তিক্ত বিরোধ তৈরি হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন যে চীনের ব্যাপারে জো বাইডেনের অবস্থান নরম। মি. বাইডেন এই অভিযোগ খণ্ডনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেছেন, মানবাধিকারসহ অন্যান্য ইস্যুতে তিনি চীনের বিরুদ্ধে কঠোর হবেন।

তবে তার দল ডেমোক্র্যাটদের যুক্তি হচ্ছে অন্তত নির্বাচনের ব্যাপারে চীনের চেয়েও রাশিয়া অনেক বেশি আগ্রাসী।

চীন নাকি রাশিয়া- কাকে বেশি ভয় পায় যুক্তরাষ্ট্র?

নিরাপত্তা বিষয়ক বিবিসির সংবাদদাতা গর্ডন করেরা বলছেন, ২০১৬ সালের নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের ব্যাপারে খুব আস্তে ধীরে কাজ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের সরকারসহ সোশাল মিডিয়া কোম্পানিগুলো।

কিন্তু গত চার বছরে পরিস্থিতি বদলে গেছে এবং এবার আর কেউ চুপ করে বসে নেই।

তিনি বলেন, এবার কোম্পানিগুলো এবিষয়ে অনেক বেশি সোচ্চার এবং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বাহিনীগুলোও নিয়মিত তাদের পর্যালোচনা প্রকাশ করছে।

তবে এটাও ঠিক যে এই বিষয়টি নিয়ে রাজনীতিও হচ্ছে।

“ডেমোক্র্যাটরা মনে করেন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সহযোগিতা করার জন্য রাশিয়া হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছে, কিন্তু মি. ট্রাম্পের সমর্থকরা মনে করছেন তিনি যাতে পুনরায় নির্বাচিত হতে না পারেন সেজন্য এবার চেষ্টা করছে চীন।”

গর্ডন করেরা বলেন, নিরাপত্তা বিষয়ক কর্মকর্তারা এই দুটো অবস্থানের মাঝখান দিয়ে চলার চেষ্টা করছেন। তারা স্বীকার করছেন যে দুটো ঘটনাই ঘটছে। চীন ও রাশিয়ার ভূমিকার মধ্যে পার্থক্যের বিষয়ে মুখ খুলতে তারা রাজি নন। কারণ সেরকম কিছু হলে তাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠতে পারে।

“রাশিয়ার হস্তক্ষেপ অনেক সংগঠিত এবং গোপন, তবে এটা এখনও ২০১৬ সালে ডেমোক্র্যাটদের ইমেইল হ্যাক করার পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়নি,” বলেন তিনি।

তার মতে সময়ের সাথে সাথে এসব দেশের কৌশলেও পরিবর্তন ঘটেছে। তবে নির্বাচনের সময় যতো ঘনিয়ে আসবে এধরনের অভিযোগের কথা ততো বেশি শোনা যাবে।

 

 

 

 

 

 

বিবিসি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




হেপাটাইটিস সি ভাইরাস নিয়ে যেসব তথ্য জেনে রাখা ভালো

হেপাটাইটিস সি ভাইরাস শনাক্ত এবং নিরাময় কৌশল আবিষ্কারের জন্য এই বছর চিকিৎসা শাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিন বিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভি জে অল্টার ও চার্লস এম রাইস এবং ব্রিটিশ বিজ্ঞানী মাইকেল হগটন।

পৃথিবীতে বর্তমানে সাত কোটি ১০ লাখের বেশি হেপাটাইটিস সি রোগী রয়েছে বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ধারণা করছে।

স্বাস্থ্য সংস্থার ধারণা অনুযায়ী, ২০১৬ সালে এই রোগে আক্রান্ত হয়ে বিশ্বে প্রায় চার লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।

ঠিক সময়ে শনাক্ত এবং চিকিৎসা না হলে লিভার সিরোসিস এবং ক্যান্সার হতে পারে।

এখনো হেপাটাইটিস-সির কোন টীকা আবিষ্কার হয়নি।

বাংলাদেশে হেপাটাইটিস- সি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে দেখা যায়, বাংলাদেশে হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাসে প্রায় এক কোটি মানুষ আক্রান্ত। বেসরকারি হিসেবে হেপাটাইটিসে প্রতি বছর ২২ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় বাংলাদেশে।

ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী বিবিসি বাংলাকে বলছেন, বাংলাদেশে শুধুমাত্র হেপাটাইটিস সি-তে কতো মানুষ আক্রান্ত তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, দেশটিতে অন্তত এক শতাংশ মানুষ হেপাটাইটিস সিতে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে।”

সেই হিসাবে বাংলাদেশে এই রোগে আক্রান্ত অন্তত ১৬ লাখ মানুষ।

”এই রোগের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটির লক্ষণ উপসর্গ খুব কম, তাই এতে আক্রান্ত হলেও সহজে ধরা পড়ে না। দীর্ঘদিন ধরে এটা শরীরের ভেতরে নীরবে থেকে যায়, সেটাই এই ভাইরাসের সবচেয়ে মারাত্মক দিক। রোগী কিছু বুঝতেই পারেন না। আস্তে আস্তে সেটা লিভারের ক্ষতি করতে শুরু করে। ফলে একসময় লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সার তৈরি হয়।”

”ফলে বাংলাদেশে যেটা দেখা যায়, রোগীদের রোগটি এমন সময়ে শনাক্ত হয়েছে, যখন অনেক বেশি ছড়িয়ে পড়েছে।” তিনি বলছেন।

হেপাটাইটিস সিতে কীভাবে মানুষ আক্রান্ত হয়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত এটা রক্ত এবং রক্তের উপাদান বাহিত হয়ে মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হেমাটোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মাসুদা বেগম বলছেন, রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে অনেক সময় হেপাটাইটিস-সিতে আক্রান্ত হতে পারেন। ফলে এখন রক্ত দেয়ার সময় হেপাটাইটিস বি, সি পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।

”অনেক সময়েই আগে কোন লক্ষণ-উপসর্গ দেখা যায় না। কিন্তু রক্ত পরীক্ষার পরেই হেপাটাইটিস-সি ধরা পড়ে।” তিনি বলছেন।

যেভাবে হেপাটাইটিস সি-তে আক্রান্ত হতে পারেন:

  • স্ক্রিনিং ছাড়া রক্ত-রক্তজাত সামগ্রী পরিসঞ্চালন
  • একই ইনজেকশন বহুবার ব্যবহার প্লাজমা
  • সার্জারির সময়
  • নাক-কান ছিদ্র করার সময়েও রক্তের সংস্পর্শে এসে ভাইরাসটি শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
  • মাদক নেয়া
  • অরক্ষিত যৌনমিলন
  • সমকামিতা
  • শিশুর জন্মের সময় মায়ের হেপাটাইটিস থাকা
  • এইচআইভির রোগী
  • কারাগারে থাকা ব্যক্তিরা
  • ট্যাটু করার মাধ্যমে

বিশ্বে এখন মদ্যপান জনিত কারণের পরেই হেপাটাইটিস সি ভাইরাসের কারণে লিভার সিরোসিস রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা বেশি ঘটছে।

অধ্যাপক ডা. মাসুদা বেগম বলছেন, ”বি ও সি ভাইরাস রক্তে সংক্রমণের পর একটা উইন্ডো পিরিয়ড থাকে ২ থেকে ৬ মাস। এ সময়ে সাধারণ রক্ত পরীক্ষায় এ ভাইরাস ধরা পড়ে না। এ সময় কেউ যদি রক্ত আদান-প্রদান করেন তাহলে অগোচরেই ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে পড়ে। এটি নিরূপণে ডিএনএ ভাইরাল মার্কার বা এইচভিসি টোটাল টেস্ট প্রয়োজন হয়। এটা একটা প্রাণঘাতী রোগ যা নির্মূল করতে চাইলে নিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের কোনো বিকল্প কোনো কিছু নেই।”

হেপাটাইটিস সি’র লক্ষণ ও উপসর্গ

হেপাটাইটিস সিতে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কোন উপসর্গ দেখা দেয় না। অনেক সময় লক্ষণ বুঝতে আট-দশ বছর পার হয়ে যায়। ততদিনে শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায়।

তবে যেসব উপসর্গ দেখা দিলে অবশ্যই অন্যান্য পরীক্ষার পাশাপাশি হেপাটাইটিস পরীক্ষা করাতে হবে, সেগুলো হলো:

  • জ্বর
  • দুর্বলতা ও অবসাদ
  • খাবারে অরুচি
  • বমিবমি ভাব
  • ক্লান্তি বোধ হওয়া
  • জন্ডিস হওয়া, পেটে পানি আসা

    হেপাটাইটিস সি’র চিকিৎসা

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হেপাটাইটিসে আক্রান্ত হওয়ার পর অনেক সময় শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতায় অনেকে এমনিতেও সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে অনেক দিন আক্রান্ত থাকলে চিকিৎসার দরকার হয়।

    ন্যাশনাল লিভার ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের মহাসচিব অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী, ”ইদানীং হেপাটাইটিস সি রোগের চিকিৎসায় বেশ কিছু ভালো ওষুধ তৈরি হয়েছে। সেগুলো মুখেও খাওয়া যায়। এসব ওষুধ দিয়ে ৮০ থেকে ৯০ ভাগ ক্ষেত্রেই কার্যকরী প্রমাণিত হচ্ছে।”

    তিনি জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত হলেও তো খুবই ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। এমনকি সিরোসিসের প্রাথমিক দিকেও ভালো ফলাফল পাওয়া যায়। তবে বেশি দেরি হয়ে গেলে বা ক্যান্সার হয়ে গেলে তখন এটি আর খুব বেশি কাজ করে না।

    তবে এসব ওষুধ বেশ ব্যয়বহুল। যেমন তিনমাসের ওষুধের পেছনে ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। এক্ষেত্রে লিভার ফাউন্ডেশনের মতো বেশ কিছু সংস্থা সহায়তা করে।

    অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী বলছেন, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে লিভার-হেপাটাইটিস জাতীয় রোগে জন্ডিস মনে করে অনেকে কবিরাজ, ঝাড়ফুঁক, গ্রাম্য চিকিৎসা করান। এসব কাণ্ডের ফলেও অনেকের শরীরের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায়। তারা যখন চিকিৎসকের কাছে আসেন, তখন আর চিকিৎসকদের কিছু করার থাকে না।

    হেপাটাইটিস-বির টিকা বেশ কার্যকরী বলে প্রমাণিত হলেও এখনো হেপাটাইটিস-সির কোন টিকা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।

    আবার ঢাকার বাইরে বেশিরভাগ জেলাতেই হেপাটাইটিস সি পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা যকৃতের চিকিৎসার ভালো ব্যবস্থা নেই।

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের হেপাটাইটিস সি রোগে চিকিৎসার সুযোগ এখনো অনেক সীমিত। বিশ্বের মোট আক্রান্তদের মাত্র ১৯ শতাংশ এখন চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছেন।

    ফলে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার চেয়ে বরং রোগটি প্রতিকারে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।

    অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আলী বলছেন, যেহেতু কোন টিকা নেই, তাই ব্যক্তিগত সুরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করাই হচ্ছে সবচেয়ে উত্তম। এজন্য তিনি যেসব পরামর্শ দিচ্ছেন:

    • একই সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহার না করা
    • অন্যের ব্যবহার করা কোন সুই ব্যবহার না করা
    • পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া বা অচেনা উৎস থেকে রক্ত গ্রহণ না করা
    • যেকোনো সরঞ্জাম ব্যবহার করার সময় সুরক্ষা গ্রহণ করা
    • বছরে অন্তত দুইবার রক্তের পরীক্ষা করা, যাতে আক্রান্ত হলে শুরুতেই চিকিৎসা করা যায়
    • আক্রান্ত হলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখা

      হেপাটাইটিস সি প্রতিরোধে কি করছে বাংলাদেশের সরকার

      ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও নির্মূলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বেশকিছু লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

      বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের সাবেক পরিচালক ডা: সানিয়া তাহমিনা বিবিসি বাংলাকে বলছেন, হেপাটাইটিস প্রতিরোধে বেশ কিছু কর্মসূচী রয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের।

      ”হেপাটাইটিস বি’র টিকা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু পোলিও বা হামের মতো জাতীয় পর্যায়ে টিকা কার্যক্রমের মতো কোন কর্মসূচী শুরু হয়নি।”

      হেপাটাইটিস-সি ভাইরাসের যেহেতু কোন টিকা এখনো আবিষ্কার হয়নি, তাই এক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধে সতর্কতা এবং নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ দিচ্ছেন এই বিশেষজ্ঞ।

 

সায়েদুল ইসলাম

বিবিসি বাংলা, ঢাকা

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




জিডি বা মামলা কীভাবে করবেন? আইনি সহায়তা নিতে যেসব কাজ করতে হয়

নানা কারণে অনেক সময়েই অনেকের আইনি সহায়তা নেয়ার দরকার হয়ে পড়ে। সাধারণ জিডি থেকে শুরু করে মামলা করা, আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়।

কিন্তু আইনগত জটিলতায় পড়ার আগে পর্যন্ত কীভাবে সহজে আইনের সহায়তা নেয়া যায়, কোন সহায়তার জন্য কোথায় যেতে হবে, সেই সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা থাকে না।

আবার ঠিক সময়ে মামলা করা সম্ভব না হলে অনেক সময় মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যায়।

কোন পরিস্থিতিতে কীভাবে আইনের সহায়তা নেয়া যেতে পারে- এখানে তার সংক্ষিপ্ত একটি নিয়মকানুন তুলে ধরা হলো।

পুলিশে অভিযোগ

চুরি, হুমকি, মারামারি বা যেকোনো নিরাপত্তাহীনতা দেখলেই যেকোন সচেতন নাগরিক পুলিশে খবর দিতে পারেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মোঃ ওয়ালিদ হোসেন বলছেন, ‘’মানুষের যেকোনো বিপদে প্রথম যোগাযোগের ক্ষেত্র পুলিশ। স্থানীয় থানার ওসি, ডিউটি অফিসার, থানার নম্বর সবার বাসায় সংরক্ষণ করে রাখা উচিত। এছাড়া ৯৯৯ নম্বরটি রয়েছে। স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের নম্বর সবার ফোনে সেভ করে রাখা উচিত। নিজে বিপদের সম্মুখীন হলে, বা কোন অপরাধের প্রত্যক্ষদর্শী হলে সরাসরি পুলিশকে জানানো উচিত।‘

তিনি বলছেন, কোন কারণে স্থানীয় থানা থেকে দ্রুত সহায়তা না পেলে সেখানকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও জানাতে পারেন।

অপরাধ সংঘটিত হলে প্রত্যক্ষদর্শীরা নিজেরা মামলার বাদী অথবা সাক্ষী হতে পারেন। অথবা শুধুমাত্র পুলিশকে জানানো হলে পুলিশ নিজেরাও ব্যবস্থা নিতে পারে।

সাধারণ ডায়েরি বা জিডি

আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রাথমিক এবং সাধারণ একটি বিষয় হচ্ছে জেনারেল ডায়েরি বা জিডি।

বিশেষ করে কোন কিছু হারিয়ে গেলে, আইনগত রেকর্ড সংরক্ষণ বা পুলিশে প্রাথমিক তথ্য জানানোর জন্য করার জন্য সাধারণ ডায়েরি করা হয়ে থাকে। অনেক সময় কারো বিরুদ্ধে অভিযোগও মামলা না করে জিডি আকারে করা হয়ে থাকে।

জিডি সবসময়ে স্থানীয় থানায় করতে হয়। আপনার বাসা বা অফিস যেখানেই হোক না কেন, যে এলাকায় হারিয়ে গেছে বা ঘটনা যে এলাকায় ঘটেছে, সেখানকার স্থানীয় থানাতেই জিডি করতে হবে। অন্য কোন থানা জিডি নেবে না।

সাদা কাগজে বরাবর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, স্থানীয় থানা, বিষয়: ‘সাধারণ ডায়রি প্রসঙ্গে’ লিখে বিস্তারিত বিবরণ সহ জিডির আবেদন লিখতে হয়। সেখানে যিনি জিডি করবেন, তার নাম, ফোন নম্বরসহ বিস্তারিত থাকতে হবে। হারিয়ে যাওয়া জিনিসপত্রের ক্ষেত্রে যা হারিয়ে গেছে, সেসব জিনিসের বিস্তারিত বর্ণনা থাকতে হবে।

এনআইডি, আইডি কার্ড, দলিল ইত্যাদি হারিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটা ফটোকপি সংযুক্ত করতে হতে পারে।

এরকম দুইটি কপি নিয়ে স্থানীয় থানায় গেলে জিডি নথিভুক্ত করে সেই নম্বর বসিয়ে একটি কপি জিডি করা ব্যক্তিকে দিয়ে দেয়া হয়।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মোঃ ওয়ালিদ হোসেন বলছেন, নিয়ম অনুযায়ী সব জিডির তদন্ত হবার কথা। কারণ প্রতিটি জিডি তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন দিতে হয়।

তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আলোচিত বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না হলে হারিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়ের সাধারণত পরবর্তীতে আর কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না।

ঢাকায় পাইলট প্রকল্প আকারে অনলাইনে জিডি চালু করা হলেও সেটি খুব বেশি ব্যবহৃত হয় না।

মামলা

মামলা করা মানে হচ্ছে কোন ঘটনার আইনি বিচার চাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা।

মামলার কয়েকটি প্রকার রয়েছে।

যেমন ফৌজদারি ও দেওয়ানী মামলা।

ফৌজদারি মামলা বা ক্রিমিনাল কেস থানায় অথবা আদালতে- উভয় স্থানে দায়ের করা যায়। দেওয়ানী মামলা বা সিভিল কেস আদালতে দায়ের করা হয়ে থাকে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হালিমা ফেরদৌস বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ‘’হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, অপহরণ, হুমকি, অগ্নিসংযোগ, চুরি, ছিনতাই ইত্যাদির মতো ঘটনায় ফৌজদারি মামলা করা হয়ে থাকে।‘’

‘’জমিজমা সংক্রান্ত, সম্পত্তি, পারিবারিক বিরোধ, অর্থ সংক্রান্ত বিরোধ, মানহানি ইত্যাদি ক্ষেত্রে দেওয়ানী মামলা করা হয়।‘’

তিনি বলছেন, কোন ফৌজদারি ঘটনার শিকার হলে প্রথমেই স্থানীয় থানার সহায়তা নেয়া উচিত। সেখানেই তাদের মামলা করার কথা। পুলিশ মামলা নিয়ে তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন দেবে, আসামীদের গ্রেপ্তার করবে। তারপর বিচার শুরু হবে।

‘’তবে থানা যদি কোন কারণে মামলা নিতে না চায়, গড়িমসি করে, তাহলে ওই ব্যক্তি সরাসরি আদালতে মামলা করতে পারেন। আদালত বিষয়টি আমলে নিলে থানাকে এজাহার আকারে নিয়ে তদন্ত করার নির্দেশ দিতে পারেন।‘’

থানায় মামলা

ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মোঃ ওয়ালিদ হোসেন বলছেন, ‘’অহেতুক থানার কর্মকর্তাদের মামলা নিতে অস্বীকার করার কথা নয়। এরপরেও এরকম ঘটলে সেটা সেখানকার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো উচিত। তাহলে তারা আইন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবেন।‘’

তিনি জানান, মামলা করার ক্ষেত্রে অবশ্যই যত দ্রুত সম্ভব থানাকে অবহিত করতে হবে। সেখানে ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরার পাশাপাশি আলামত যাতে নষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

যে সাদা কাগজে অভিযোগকারীর বিস্তারিত বর্ণনা, অভিযুক্তদের নাম ঠিকানা ইত্যাদি লিখে অভিযোগটি দেয়া হয়ে থাকে, সেটাকে বলে এজাহার। থানার যে রেকর্ড বইতে এই এজাহার সংযুক্ত করে নথিভুক্ত করা হয়, সেটিকে বলা হয় এফআইআর বা ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট। পরবর্তীতে তদন্তে আরও কারো নাম পাওয়া গেলে, আরও তথ্য যোগ হলে, সেটাও এই এফআইআর ও এজাহারের সাথে সংযুক্ত করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো মামলার ক্ষেত্রে আলামত রক্ষা করা, প্রমাণ সংরক্ষণ করা এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধর্ষণের মতো ঘটনায় অনেকে গোছল করে ফেলেন। সেক্ষেত্রে আলামত অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। আবার অনেক সময় হত্যা বা দড়িতে ঝুলে মৃত্যুর সময় স্বজনরা সেখানকার আলামত নড়াচড়া করেন, যা মামলার তদন্তে ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠে।

অনেক সময় থানায় মামলার সংখ্যা কম দেখানোর উদ্দেশ্যে থানার কর্মকর্তারা ছিনতাই, চুরির মতো ঘটনায় মামলা না করে জিডি করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর মামলা করা উচিত। থানার কর্মকর্তা মামলা নিতে না চাইলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা উচিত।

মামলা হওয়ার পর থানার একজন কর্মকর্তাকে তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়। অনেক সময় ওসি নিজেও তদন্ত কর্মকর্তা হতে পারেন। আবার মামলা গোয়েন্দা পুলিশ, সিআইডি বা র‍্যাবে হস্তান্তরিত হলে সেখানে নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।

তবে যে বাহিনীই তদন্ত করুক না কেন বা আটক করুক না কেন, মামলা স্থানীয় থানায় হতে হবে। এ কারণেই র‍্যাব বা সিআইডি, ডিবি কাউকে আটক করলেও সেটার মামলা স্থানীয় থানায় হয়। তবে সংশ্লিষ্ট বাহিনী সেটার তদন্ত করে থাকতে পারে।

থানার পুলিশ, র‍্যাব, সিআইডি, ডিবি- যেকোনো বাহিনী তদন্ত করার পর আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। সেখানে কাউকে অভিযুক্ত করে অভিযোগ পত্র দেয়া হতে পারে আবার কাউকে তদন্তে নির্দোষ পেলে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়া হতে পারে। তার ভিত্তিতে আদালতে বিচার কার্যক্রম শুরু হবে।

হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে মামলা হতেই হবে। সেক্ষেত্রে অনেক সময় অভিযোগকারী পাওয়া না গেলেও পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করে থাকে।

আদালতে মামলা

কোন কারণে থানা মামলা না নিলে বা থানায় মামলা করা সম্ভব না হলে ভুক্তভোগী ব্যক্তি আদালতে মামলা করতে পারেন।

আদালত গ্রহণযোগ্য মনে করলে মামলাটি গ্রহণ করে সংশ্লিষ্ট থানাকে এফআইআর গ্রহণ করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। অথবা আদালত সেই আবেদন খারিজও করে দিতে পারেন।

রাষ্ট্রদ্রোহের মতো কিছু মামলায় আদালতে সরাসরি বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।

তবে জমি-জমা, সম্পত্তি, পারিবারিক বিষয় (পারিবারিক নির্যাতন, নারী সহিংসতা ব্যতীত), অর্থ ইত্যাদি বিষয়ে আদালতে দেওয়ানী মামলা করা যায়।

মামলার কার্যক্রমে সহায়তার জন্য সবসময়েই আইনজীবীদের সহায়তা নেয়া যেতে পারে।

সাধারণত ফৌজদারি এবং দেওয়ানী- উভয় মামলার ক্ষেত্রে আলাদা ধরণের আইনজীবী কাজ করেন। সুতরাং আইনজীবীর সহায়তা নিতে হলে সেটাও আগে জেনে নেয়া দরকার।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হালিমা ফেরদৌস বলছেন, ‘’মামলা ফাইলিংয়ের ক্ষেত্রে এফিডেভিট লাগে বিধায় একজন আইনজীবীর সহায়তা দরকার হয়। তবে ভুক্তভোগী ব্যক্তি চাইলে নিজের মামলা নিজেও পরিচালনা করতে পারেন।‘’

উচ্চ আদালতে রিট ও অন্যান্য

অ্যাডমিরালটি (সমুদ্র-সংক্রান্ত বিষয়) এবং কোম্পানি সংক্রান্ত বিষয়ে সরাসরি উচ্চ আদালতে বিচার প্রার্থনা করা যায়।

এছাড়া জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কোন বিষয়ে সরকার বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের বিরুদ্ধে আদালতে রিট দায়ের করা যায়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জোবাইদা গুলশান আরা বলছেন, ‘’রিট দাখিলের একটি নির্দিষ্ট কাঠামো আছে। সেটা অনুসরণ করে যেকোনো ব্যক্তি নিজেই রিট দায়ের করতে পারেন। আদালতের সম্মতি নিয়ে তিনি তার রিটের ব্যাপারে শুনানিও করতে পারেন।‘’

তবে এফিডেভিট দাখিলে অভিজ্ঞ না হলে এসব ক্ষেত্রে কোন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

তবে আগাম জামিনের আবেদন করা ছাড়া নিম্ন আদালতের যেসব মামলার বিচার হয়, সেসব মামলার ব্যাপারে সরাসরি উচ্চ আদালতে যাওয়া যায় না।

নিম্ন আদালতে রায় হলে তার বিরুদ্ধে আপীল বা বিচারে অসন্তুষ্ট হলে সেই ব্যাপারে উচ্চ আদালতে প্রতিকার চাওয়া যেতে পারে।

আইনি সহায়তা

যেকোনো মামলায় বিচার কার্যক্রম শুরু হলে মামলা ফাইলিং, আইনজীবীদের খরচ থেকে শুরু করে আদালতে বিভিন্ন খরচ থাকে।

এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের একটি আইনি সহায়তা তহবিল রয়েছে। প্রতিটি জেলা আদালতে এই তহবিল থেকে মামলা চালাতে অক্ষম ব্যক্তিরা সহায়তা নিতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে তাদের তহবিল পাওয়ার শর্ত পূরণ করতে হয়।

এছাড়া বেসরকারি কিছু সংস্থা, যেমন ব্লাস্ট, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস, মহিলা আইনজীবী সমিতির মতো বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থা দুঃস্থ ও মামলা চালাতে অক্ষম ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা দিয়ে থাকে।

পুলিশ বাদী মামলাগুলো পরিচালনা করে থাকেন সরকারি কৌসুলিরা।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট হালিমা ফেরদৌস বলছেন, যেসব মামলা হয়ে থাকে, সরকারি কৌসুলি, যেমন পিপি, এপিপি সাধারণভাবে তার পক্ষের একজন আইনজীবী হয়ে থাকে। এছাড়া যিনি মামলা করেছেন, তিনিও আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন বা নিজেও আদালতের অনুমতি নিয়ে পরিচালনা করতে পারেন।‘’

 

 

 

 

 

 

 

 

 

বিবিসি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ নিয়ে আইনে যা রয়েছে

২০১৯ সালের মার্চ মাসে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া এলাকায় দুই পুলিশ সদস্যের হাতে ধর্ষণের শিকার এক নারীকে কেন ৫০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিল হাইকোর্ট। সেসময় স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতেও এ ঘটনাটি উঠে আসে।

চিলড্রেন চ্যারিটি বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ লিগাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট নামে দুটি সংগঠন জনস্বার্থে একটি রিট করলে সেই রিটের শুনানির পর এই রুল জারি করা হয়েছিল।

তবে এ বিষয়ে ধর্ষণের শিকার ওই নারী আর রিট মামলাটি এগিয়ে নিতে রাজি না হওয়ায় সেটি আর এগোয়নি বলে জানান বাংলাদেশ লিগাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট-ব্লাস্ট এর গবেষণা বিশেষজ্ঞ তাকবির হুদা। বাংলাদেশে ধর্ষণ আইনের সংস্কারের দাবিতে পরিচালিত একটি ক্যাম্পেইন “রেপ ল রিফর্ম নাও” এর নেতৃত্বও দিচ্ছেন তিনি।

তিনি বলেন, ধর্ষণের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ চেয়ে রিট মামলার ঘটনা এটাই প্রথম ছিল।

বাংলাদেশ লিগাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্টের করা এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের আওতায় নিষ্পত্তি হওয়া ৫০টি মামলার মধ্যে মাত্র ৩টি মামলায় জরিমানার অর্থকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য করার আদেশ দেয় আদালত। শতাংশের হিসেবে যা মাত্র ৬%।

অনেকেই মনে করেন যে, ধর্ষণের ঘটনায় কোন অংকের অর্থ দিয়েই আসলে ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সাজাই একমাত্র সমাধান।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্ষণের মতো ঘটনায় ভুক্তভোগীর মানসিক উন্নয়ন এবং পরবর্তীতে তার পুনর্বাসনের মতো বিষয়গুলো জরুরী হয়ে দাঁড়ায়।

এছাড়া মামলা পরিচালনার খরচ, সুচিকিৎসার মতো বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।

মি হুদা বলেন, “ধর্ষণের ক্ষেত্রে যে শুধু অপরাধ-কালীন সাজা সেটা নয়, বরং ধর্ষণের শিকার যে ব্যক্তি তার যে একটা পুনর্গঠনের এবং পুনর্বাসনের বিষয় আছে, তাকে যে প্রতিকার দেয়ার একটা কথা আছে এ ধরনের কোন ধারণাই আমাদের নাই। আমরা ধর্ষণ হলেই মনে করি যে সাজা হতে হবে।”

তিনি বলেন, এসিড সন্ত্রাস, বাল্যবিবাহের মতো ঘটনার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার নিয়ম থাকলে ধর্ষণের ক্ষেত্রেও সেটি প্রযোজ্যও হওয়া উচিত। এছাড়া ধর্ষক এবং ধর্ষণের শিকার- এই দুই পক্ষের মধ্যে বরাবরই ক্ষমতার অসমতা থাকে।

আইনে কী আছে?

২০০০ সালের আগে ধর্ষণের ঘটনায় জরিমানার বিষয়টি বাধ্যতামূলক ছিল না। ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে জরিমানা বাধ্যতামূলক করা হয়।

এই আইনে বলা হয় যে, “যদি কোন ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা উক্ত ধর্ষণ পরবর্তী তাহার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিতা নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহা হইলে ওই ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডে বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন।”

এছাড়া যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন এবং ধর্ষণের ফলে উক্ত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন তাহলে ঐ দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অন্যূন এক লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন।

যদি কোন ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানোর চেষ্টা করে বা আহত করার চেষ্টা করে তাহলে তার যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হবে। আর ধর্ষণের চেষ্টা করলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ড হবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সালমা আলী বলেন, ধর্ষক বা অপরাধীকেই জরিমানার এই অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এক্ষেত্রে অপরাধীর স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি বিক্রি বা নিলাম করেও জরিমানা আদায়ের কথা আইনে বলা হয়েছে।

আইনের ফাঁক কোথায়?

তবে ২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনেও ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়ে কিছু সমস্যা রয়েছে বলে মনে করেন অ্যাক্টিভিস্টরা।

এ বিষয়ে ব্লাস্টের গবেষণা বিশেষজ্ঞ তাকবির হুদা বলেন, বর্তমানে ধর্ষণ বিষয়ক আইনটিতে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিয়ে পরিষ্কারভাবে কিছু উল্লেখ করা নেই।

তার মতে, এই আইনে অর্থদণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে অর্থাৎ কোন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে বাধ্যতামূলকভাবে অর্থদণ্ড দিতে হবে। কিন্তু সেটি ক্ষতিপূরণ হিসেবে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিকে দেয়া হবে কিনা সে বিষয়টি উল্লেখ নেই।

তিনি বলেন, “এই আইন অনুযায়ী, ধর্ষণের শিকার ব্যক্তি ক্ষতিপূরণ পাবে কিনা সে বিষয়টি পুরোপুরি বিচারক তথা আদালতের উপর নির্ভর করে।

“এখানে যে ঘাটতি রয়ে গেছে তা হল, আমরাতো জানি জরিমানাটা রাষ্ট্রের কাছে যায়। জরিমানা যদি ভুক্তভোগীর কাছে যেতে হয়, তাহলে আদালতকে এটাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে কনভার্ট করতে হয়। অর্ডার অব ফাইনকে রূপান্তরিত করতে হয় অর্ডার অব কম্পেনসেশনে। এটা বিচারকদের একটা বিবেচনার বিষয়।”

তবে অধিকাংশ মামলায় জরিমানার অর্থকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে গণ্য করার নির্দেশ আসে না বলেও জানান তিনি।

মি. হুদা বলেন, “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৫ ধারায় ট্রাইব্যুনাল ক্ষতিপূরণ দেয়ার যে ক্ষমতা বিচারকদেরকে দেয়া হয়েছে তা খুব স্বল্প পরিমাণ মামলার ক্ষেত্রে প্র্যাকটিস করা হচ্ছে।”

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সালমা আলী বলেন, এই আইনটির দুর্বলতা হচ্ছে, ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণের অর্থ পেতে হলে মামলা পুরোপুরি নিষ্পত্তি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় যা বেশ লম্বা প্রক্রিয়া।

তিনি বলেন, জরিমানার যে অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেয়া হয় সেটি চলে যায় সংশ্লিষ্ট জেলার কালেক্টরেটের অফিসে। সেখান থেকে দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তবেই ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণের অর্থ পেয়ে থাকে।

ক্ষতিপূরণের অর্থ দ্রুত ভুক্তভোগীর পাওয়ার বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া উচিত বলেও মনে করেন সালমা আলী।

সমাধান কী হতে পারে?

বাল্যবিবাহ, মানব পাচার এবং এসিড সন্ত্রাসের মতো ঘটনার ক্ষেত্রে আলাদা আইন রয়েছে। তাহলে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির ক্ষতিপূরণের পাওয়া নিশ্চিত করতে কি আরেকটি আইন দরকার। বিশেষজ্ঞরা সেটি মনে করছেন না। বরং তারা বলছেন যে, বিদ্যমান আইনেই কিছু সংস্কার এনে এই বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব।

এ বিষয়ে মি. হুদা বলেন, অন্য বিষয়গুলোতে আলাদা আইন করেই যে সে অপরাধগুলো নিশ্চিহ্ন করা গেছে তা কিন্তু নয়।

ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ের সুপারিশ করেছেন তারা।

এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে, বিদ্যমান আইনে অর্থদণ্ডের পাশাপাশি সেই অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভুক্তভোগীকে দেয়ার বিষয়টি উল্লেখ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বিচারকদেরকে জরিমানাকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে রূপান্তরের যে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে তার ব্যবহার আরও বেশি বাড়াতে হবে। সেক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ে এ ধরণের মামলার ক্ষেত্রে উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।

তৃতীয়ত, ভুক্তভোগীর কাছে ক্ষতিপূরণের অর্থ একাধিক উৎস থেকে আসা উচিত। শুধু অপরাধী নয় বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের একটা ব্যবস্থা থাকা উচিত।

মি. হুদা বলেন, উন্নত দেশগুলোতে রাষ্ট্রীয় একটা তহবিল থাকে যেখান থেকে নিষ্ঠুর অপরাধের শিকার ব্যক্তিরা ক্ষতিপূরণ পেতে পারে। বাংলাদেশেও এ ধরণের ব্যবস্থা থাকা উচিত যাতে ভুক্তভোগীরা বিচার শেষে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারে।প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এ ধরণের ব্যবস্থা রয়েছে বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সালমা আলি ভারতের একটি রেলস্টেশনে এক বাংলাদেশি নারীর ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, ওই ঘটনায় রেল কর্তৃপক্ষ ওই নারীকে ২০ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল আদালতের নির্দেশে। কারণ, ওই নারীর নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব রেল কর্তৃপক্ষের উপরও কিছুটা বর্তায় এবং ঘটনা খোদ রেলস্টেশনে হয়েছিল।

বাংলাদেশে এ ধরণের কোন আইনি ধারা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে।

এক্ষেত্রে তিনি সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে এক নারীকে ধর্ষণের ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, এ ধরণের ঘটনার দায় ওই কলেজ কর্তৃপক্ষেরও রয়েছে।

একই ধরণের মত দিয়েছেন মি. হুদাও। তিনি বলেন, অনেক সময় তৃতীয় কোন পক্ষের গাফিলতির কারণে ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটে। যেমন ধর্ষণ যদি কোন হোটেলে ঘটে থাকে বা এমন কোন জায়গায় যেখানে তার সুরক্ষার দায়িত্ব ওই কর্তৃপক্ষের থাকে যেমন কর্মক্ষেত্র- সেখানে সেই কর্তৃপক্ষকেও এ ধরণের অপরাধের ক্ষেত্রে দায় নিতে হবে। ক্ষতিপূরণ এ ধরণের উৎস থেকেও আসতে হবে বলে মনে করেন তিনি।

টর্ট বা দেওয়ানি আইনের অধীনে এ বিষয়ে সমাধান আসতে পারে বলে জানান তিনি।

তবে এ বিষয়ে মহিলা ও শিশু বিষয়ক সংসদীয় কমিটির প্রধান মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, একজন ধর্ষকের শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ দিয়েই তার বিচার শেষ হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। বরং ধর্ষকের সাজা হবে এবং পাশাপাশি অর্থদণ্ড থাকবে।

তবে হত দরিদ্র কেউ ধর্ষণের মতো ঘটনার শিকার হলে সেটি সরকারের নজরে আসে এবং সরকার সেই সহযোগিতা দেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

“আইনের মধ্যে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, তাহলে তো যেকোন সময় যেকোন ঘটনা সত্য কি মিথ্যা ঘটিয়েই চলে আসবে যে আমাকে ক্ষতিপূরণ দেন। সেটা তো সম্ভব না। এটা প্রমাণ সাপেক্ষ বিষয়।”

তবে অপরাধ প্রমাণিত হলে সে সমাজ এবং সরকারের কাছ থেকে সহযোগিতা পায় বলেও দাবি করেন তিনি।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

বিবিসি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সহকারী হোপ হিকস কে?

কাছের একজন সহকারী হোপ হিকস করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফার্স্ট লেডিও কোভিড-১৯ পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন।

কিন্তু হোপ হিকস বিশেষভাবে পরিচিত কোন ব্যক্তি নন। প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ৩১ বছর বয়সী সাবেক এই মডেল আলোচনার বাইরে থাকতেই পছন্দ করেন।

২০১৭ সালে প্রেসিডেন্টের যোগাযোগ বিষয়ক পরিচালকের পদে নিয়োগপ্রাপ্তির ১০ দিনের মাথায় অ্যান্থনি স্ক্যারামুচ্চি বরখাস্ত হলে হোপ হিকস সেই পদে নিয়োগ পান।

রাজনীতিতে তার কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, কিন্তু এর আগের পাঁচ বছর ধরে ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে।

তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে বেশ উত্থান পতন রয়েছে। এর আগে তাকে এক দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করার কিছুদিন পরে আবার অন্য দায়িত্বে ফিরে আসতে দেখা গেছে।

তাহলে কীভাবে এরকম আলোচনার বাইরে থাকা একজন ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাকরিগুলোর একটিতে নিয়োগ পেলেন?

ইভাঙ্কা ট্রাম্পের মাধ্যমে আসা

হোপ হিকসের জনসংযোগ পেশা শুরুর করার সময় যেসব প্রতিষ্ঠান তার গ্রাহক ছিল, তাদের একটি ইভাঙ্কা ট্রাম্পের ফ্যাশন কোম্পানি।

রালফ লরেন পোশাকের মডেলিংয়ের পাশাপাশি ইভাঙ্কা’স কাপড়-চোপড়ের মডেল হিসাবেও তিনি কাজ করেছেন।

বড় মেয়ের সঙ্গে কাজ করার কারণে একসময় তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টের নজরে আসেন।

২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে নিজের রিয়েল এস্টেট কোম্পানির জনসংযোগ কাজের জন্য ব্যক্তিগতভাবে তাকে বেছে নেন ডোনাল্ড ট্রাম্প।

পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ভেবেছিলেন, হোপ অসাধারণ একজন কর্মী।

হঠাৎ করে রাজনীতিতে আসা

২০১৫ সালের প্রথম দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একটি সফরে যাওয়ার পর থেকে তিনি রাজনৈতিক আবহের মধ্যে ঢুকে যান। সেটা ছিল মি. ট্রাম্পের প্রথম দফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণা।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের টুইটার একাউন্ট পরিচালনায় হোপ হিকস সহায়তা করেন। তিনি যা বলতে চাইতেন, তাই তিনি করতেন এবং ট্রাম্পের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলোকেও সেটা করতে বলতেন।

যখন প্রচারণা জমে ওঠে, তখন তার সামনে প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়, তিনি কি পূর্ণকালীন রাজনৈতিক প্রেস সচিব হিসাবে কাজ করবেন নাকি ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিয়েল এস্টেট কোম্পানির কাজে ফিরে যাবেন?

তিনি দ্বিতীয় বিকল্প বেছে নেন। কিন্তু পরবর্তীতে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার তাকে ব্যক্তিগতভাবে তার রাজনৈতিক দলে থাকার অনুরোধ করেন।

সেই প্রস্তাবে তিনি রাজি হন।

নজরের বাইরে থাকার চেষ্টা

হোক হিকস নিজে থেকে কখনো খুব একটা বক্তব্য দেন না, যদিও সাংবাদিকরা যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাক্ষাৎকার নেন, তখন তিনি কাছাকাছিই থাকেন।

যখন তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণার কাজ শুরু করেন, তখন তিনি নিজের টুইটার একাউন্ট মুছে ফেলেন। তার ইন্সটাগ্রাম একাউন্টও ব্যক্তিগত করে রাখা হয়।

যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তিনি হোপ হিকসের জন্য নতুন একটি দায়িত্ব তৈরি করেন। সেটি হলো হোয়াইট হাউজের কৌশলগত যোগাযোগ বিষয়ক পরিচালক।

তার কাজের ধরণটা হলো, প্রেসিডেন্টকে কোন কাজে বাধা দেয়া বা পরিবর্তনের চেষ্টা না করা, বরং শুধুমাত্র তিনি যা করতে চান, সেটাই করতে সহায়তা করা।

পলিটিকোর একটি নিবন্ধ অনুযায়ী, ট্রাম্প পরিবারের একান্ত ঘনিষ্ঠ কয়েকজন ব্যক্তির একজন হোপ হিকস। তিনি এমনকি ইহুদি ধর্মের বিশেষ খাবার, শাবাত ডিনারে ইভাঙ্কা ট্রাম্প এবং জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে অংশ নেন।

২০১৭ সালের মে মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন পোপের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, সেই সময় হাতেগোনা যে কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন, তাদের একজন ছিলেন হোপ হিকস।

হোয়াইট হাউজ থেকে বেরিয়ে……আবার ফিরে আসা

২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কংগ্রেসে দেয়া সাক্ষ্যে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, মাঝেমাঝে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষে তিনি ‘সাদা’ মিথ্যা বলে থাকেন। পরদিন তিনি হোয়াইট হাউজ থেকে পদত্যাগ করেন।

এরপরের কিছুদিন তিনি ফক্স নিউজে কাজ করেন। তবে এই বছরের শুরুর দিকে আবার প্রেসিডেন্টর টিমে ফিরে আসেন।

বিবিসির হোয়াইট হাউজ সংবাদদাতা টারা ম্যাককেলভি যেমন বলছেন, তার ফিরে আসার কারণ খুবই সহজ, ‘তিনি প্রেসিডেন্টের অনেক গোপন তথ্য জানার পরেও, কথা বলেন খুবই সামান্য’।

 

 

 

 

 

 

 

 

বিবিসি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




কোন রোগের টিকা বাজারে আসতে যেসব ধাপ পেরোতে হয়

সারা বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে, এমন অবস্থায় সবার মনে প্রশ্ন একটাই, কবে নাগাদ এই ভাইরাসের প্রতিষেধক বাজারে আসবে।

কিন্তু যেকোনো রোগের প্রতিষেধক বাজারে ছাড়ার আগে সেটা মানবদেহে প্রয়োগ সম্পূর্ণ নিরাপদ কিনা সেটা কয়েক ধাপের পরীক্ষায় নিশ্চিত করা হয়।

এরপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা টিকাটি যে দেশ আবিষ্কার করেছে তাদের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান মানবদেহে প্রয়োগের অনুমোদন দিয়ে থাকে।

টিকা আবিষ্কার, এরপর সেটা অনুমোদন নিয়ে বাজারে আসা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট সময় লাগে এটা নিশ্চিত হতে যে এর কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।

আবার রোগের বৈশিষ্ট্যের ওপরেও নির্ভর করে যে এর ভ্যাকসিন প্রস্তুত হতে কতো সময় লাগবে।

এর আগেও যতো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়েছে সেগুলো বাজারে আসতে ৫ থেকে ২৫ বছর কিংবা তার চাইতেও বেশি সময় নিয়েছে।

উনিশ শতকের শেষের দিকে গুটি বসন্ত, র‍্যাবিস, প্লেগ, কলেরা, টাইফয়েডের মতো বেশ কয়েকটি জটিল রোগের প্রতিষেধক বাজারে এসেছিল।

তবে সেই সময় এই প্রতিষেধকের মান পরীক্ষা ও উৎপাদনের ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি কমিটি আন্তর্জাতিকভাবে ভ্যাকসিনের অনুমোদন দিয়ে থাকে। আবার অনেক দেশের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান অনুমোদন দিলে তারা তাদের দেশে প্রতিষেধক প্রয়োগ করতে পারে।

আশার কথা হল বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রায় ১৮০টি টিকা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছে। তবে কোনটিই এখনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সম্পন্ন করতে পারেনি।

এর মধ্যে কোন প্রতিষেধক আদৌ সফল হবে কিনা এবং কবে নাগাদ বাজারে আসবে, সেটা এখনও বলা যাচ্ছে না।

যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশা করছে দেড় বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০২১ সালের মাঝামাঝি একটি ভ্যাকসিন বাজারে আসতে পারে।

প্রতিষেধক কী:

প্রতিষেধক বা টিকা তৈরি করা হয় রোগের দুর্বল কিংবা মৃত অণুজীব থেকে। সেটা ইনজেকশনের মাধ্যমে রোগীর দেহে ঢোকানো হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এই বহিরাগত ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করতে থাকে।

ফলে ওই ভাইরাসের বিরুদ্ধে শরীর ভেতরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

এর কারণে ওই ভাইরাসটি পুনরায় শরীরে আক্রমণ করলে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।

এই প্রতিষেধক ত্বকে সুচ ফুটিয়ে বা খাবার ড্রপের মতো দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন এবং যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী একটি প্রতিষেধক বাজারে আসার আগে চারটি ধাপে এর মান পরীক্ষা করা হয়। সেই ধাপগুলো হল:

১. অনুসন্ধান ও গবেষণা।

২. প্রাক-ক্লিনিকাল পর্যায়।

৩. ক্লিনিকাল ডেভেলপমেন্ট।

৪. অনুমোদন ও উৎপাদন।

১. অনুসন্ধান ও গবেষণা

এই গবেষণা সম্পূর্ণভাবে পরীক্ষাগারে পরিচালিত হয়।

বিজ্ঞানীরা এই পর্যায়ে মূলত ভাইরাসের জেনেটিক গঠনসহ অন্যান্য তথ্য বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেন।

এ কারণে তারা পরীক্ষাগারে ভাইরাস বা সংক্রমিত কোষগুলির পৃষ্ঠ থেকে প্রোটিন এবং চিনি শনাক্ত করেন, তারপর গবেষণা করেন যে এই প্রোটিনগুলি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে ব্যবহার করা যেতে পারে কিনা।

সেইসঙ্গে তারা ভাইরাসটি থেকে প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম অ্যান্টিজেন শনাক্তের চেষ্টা করেন, যার মাধ্যমে ওই ভাইরাস প্রতিরোধ বা রোগের চিকিৎসায় তা কাজে আসবে।

এই অ্যান্টিজেনে, ভাইরাসের কণা, দুর্বল ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া, দুর্বল ব্যাকটেরিয়া টক্সিন বা রোগজীবাণু থেকে প্রাপ্ত অন্যান্য পদার্থ অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।

সেইসঙ্গে তারা বোঝার চেষ্টা করেন ভাইরাস প্রতিরোধে কত ডোজ প্রতিষেধকের প্রয়োজন হবে।

এর জন্য দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

২. প্রাক-ক্লিনিকাল পর্যায়

গবেষণার মাধ্যমে পাওয়া সেই প্রতিষেধকটি মানবদেহে পরীক্ষার আগে সেটা পরীক্ষাগারে থাকা ইঁদুর, খরগোশ, ভেড়া কিংবা বানরের শরীরে প্রয়োগ করা হয় এর প্রতিক্রিয়া দেখতে।

কারণ নিশ্চিত না হয়ে মানুষের শরীরে এই প্রতিষেধক দেয়া হলে জীবন হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

এছাড়া এই পর্যায়ে ভাইরাসের টিস্যু কালচার ও কোষ কালচার নিয়েও পরীক্ষা করা হয়।

এই ধাপ সম্পন্ন হতে সাধারণত এক থেকে দুই বছর সময় লাগে।

৩. ক্লিনিকাল পরীক্ষা

এই ক্লিনিকাল ট্রায়ালটি সম্পন্ন হয় ৪টি ধাপে।

প্রথমে ধাপে, স্বল্প সংখ্যক প্রাপ্ত বয়স্ক সুস্থ মানুষের ওপর এই প্রতিষেধক বিভিন্ন মাত্রায় দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ২০ থেকে ৮০ জন মানুষের ওপর চালানো এই পরীক্ষায় তিন মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

ভ্যাকসিন প্রয়োগ করে দেখা হয় কারও মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না। সাধারণত গবেষণার সাথে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ও গবেষকরা তাদের শরীরে এই ভ্যাকসিনের প্রথম ধাপের পরীক্ষা করে থাকেন।

এমনকী শিশুদের জন্য তৈরি প্রতিষেধকও আগে প্রাপ্তবয়স্কদের শরীরে প্রয়োগ করে পরীক্ষা করা হয়।

এই পরীক্ষায় যারা অংশ নেন তাদেরকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।

দ্বিতীয় ধাপে বিভিন্ন বয়স, স্বাস্থ্য ভেদে র‍্যান্ডম কয়েকশ মানুষের ওপর নির্দিষ্ট মাত্রায় প্রতিষেধক প্রয়োগ করা হয়। তবে এই পরীক্ষা চালানো হয় ভাইরাসে আক্রান্ত অসুস্থ মানুষের ওপরে।

এর জন্য আট মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত সময় লাগে।

তৃতীয় ধাপে কয়েক হাজার থেকে কয়েক লাখ অসুস্থ মানুষের ওপর ভ্যাকসিন দিয়ে এর কার্যকারিতা ও সুরক্ষা পরীক্ষা করা হয়। এর জন্য সময় লাগে দুই থেকে ১০ বছর।

এরপর প্রতিষেধকটি কার্যকর ও নিরাপদ প্রমাণিত হলে সেটিকে উৎপাদনের অনুমোদন দেয়া হয়। এই অনুমোদন পেতেও সময় লাগে কয়েক মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত।

লাইসেন্স পাওয়ার পর চতুর্থ ধাপে চলে প্রতিষেধকের আনুষ্ঠানিক পরীক্ষা।

৪. অনুমোদন ও উৎপাদন

সব ধাপে প্রতিষেধকটি নিরাপদ প্রমাণিত হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা যেকোনো দেশের সংশ্লিষ্ট সংস্থার থেকে এর লাইসেন্স বা অনুমোদন নিতে হয়।

এরপর এই ভ্যাকসিন বিপুল সংখ্যায় উৎপাদন করে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্রে এই পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং মান নিয়ন্ত্রণ তদারকি করে থাকে এফডিএ।

এর মধ্যে কোন একটি ধাপে প্রতিষেধকটি অনিরাপদ প্রমাণিত হলে এটি সম্পূর্ণ বাতিল হয়ে যাবে।

প্রতিষেধক কাদের আগে দেয়া হবে?

করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক যদি সফল প্রমাণিত হয় তাহলে শুরুর দিকে সেটা দেয়া হবে স্বাস্থ্যকর্মীদের যারা কোভিড-১৯ এর রোগীদের সংস্পর্শে আসবেন।

এরপরে এটি দেয়া হবে বয়স্কদের যেহেতু তাদের ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে ভয়াবহ।

তবে প্রতিষেধক আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত সতর্ক হয়ে চলার ওপরই জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সানজানা চৌধুরী

বিবিসি বাংলা, ঢাকা

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

 

 

 

 




প্রাণীরাও সংখ্যা বোঝে এবং হিসেব করে – কিন্তু কীভাবে করে, কেন করে?

মানুষ তার জীবনের প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রে কোন না কোনভাবে সংখ্যা ব্যবহার করছে। সংখ্যা ছাড়া মানুষের জীবন কল্পনাই করা যায় না।

কিন্তু মানুষ এই সংখ্যার ধারণা বা সংখ্যা বোঝার ক্ষমতা কোথা থেকে পেলো?

গত কয়েক দশকের মধ্যে এটা ছিল একটা গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার যে মানুষ তার সংখ্যা ব্যবহারের ক্ষমতা ভাষা থেকে পায়নি, বরং এটা তার জৈব উত্তরাধিকার থেকেই পাওয়া।

তাই যদি হয়, তাহলে প্রশ্ন: একটা প্রাণীর সংখ্যা বোঝার ক্ষমতার প্রয়োজনটা কী?

যেটা জানা যাচ্ছে তাহলো, একটি প্রাণীর টিকে থাকার জন্য তার সংখ্যা বোঝার ক্ষমতা তাকে এক বড় সুবিধা এনে দেয়।

ঠিক সে কারণেই অনেক ধরণের প্রাণীর মধ্যে এই ক্ষমতা আছে বলে দেখা যায়।

বিভিন্ন প্রাণীকে তাদের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশে পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষা করে দেখা গেছে, তাদের খাদ্যের উৎসকে কাজে লাগানো, শিকার ধরা, অন্য প্রাণীর শিকার হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচানো, তার আবাসভূমির মধ্যে চলাচলের পথ বের করা, এবং নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ – সবক্ষেত্রেই তার সক্ষমতা বাড়িয়ে দেয় এই সংখ্যার ধারণা।

ব্যাকটেরিয়াও সংখ্যা বোঝে

এমনকি ব্যাকটেরিয়ার মতো পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন এককোষী প্রাণী – যাদের খালি চোখে দেখা যায় না – তারাও সংখ্যা-ভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করতে পারতো।

ব্যাকটেরিয়া বেঁচে থাকে তার আশপাশের পরিবেশ থেকে পুষ্টিগুণ সম্পন্ন উপাদান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা নিজেকে ভেঙে ভেঙে বহুগুণ সংখ্যাবৃদ্ধি করে।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাইক্রোবায়োলজিস্টরা আবিষ্কার করেছেন যে এই ব্যাকটেরিয়ারও একটা ‘সামাজিক জীবন’ আছে, এবং তারা তাদের আশপাশে অন্য ব্যকটেরিয়ার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি বুঝতে পারে।

এটাকে আপনি এভাবেও বলতে পারেন যে তারা ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বুঝতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে সামুদ্রিক ব্যাকটেরিয়া ভিব্রিও ফিশেরি-র দিকে তাকানো যাক।

আলো-ছড়ানো ব্যাকটেরিয়া

এদের একটা বিশেষ ক্ষমতা আছে – তারা অনেকটা জোনাকির মত নিজেদের শরীর থেকে আলো সৃষ্টি করতে পারে, যাকে বলা হয় বায়োলুমিনিসেন্স।

দেখা গেছে, তারা যখন পাতলা পানির দ্রবণের মধ্যে একাকী থাকে, তখন তারা কোন আলো ছড়ায় না।

কিন্তু যখন তাদের সংখ্যা বেড়ে একটা বিশেষ অংকে পৌঁছায় – তখন তারা সবাই এক সাথে আলো ছড়াতে থাকে। তার মানে হচ্ছে ভিব্রিও ফিশেরি বুঝতে পারে কখন তারা একা, আর কখন তার আশপাশে অন্যরা আছে।

এটাও জানা গেছে, তারা এই আলো ছড়ায় একটা ‘রাসায়নিক’ ভাষা ব্যবহার করে।

সেটা হলো, ব্যাকটেরিয়া থেকে বিশেষ কিছু রাসায়নিক পদার্থের অণু নিঃসরণ হয়। আর পানিতে যখন ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বাড়ে, তার অনুপাতে সেই রাসায়নিক অণুর পরিমাণও বাড়তে থাকে। বাড়তে বাড়তে যখন তা একটা নির্দিষ্ট সংখ্যায় পৌঁছায়, তাকে বলে ‘কোরাম।’

‘কোরাম’ হলেই ব্যাকটেরিয়ারা টের পায়, সেখানে তারা কতজন উপস্থিত আছে – এবং তখন তারা সবাই আলো ছড়াতে থাকে।

বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন ‘কোরাম সেন্সিং’।

শুধু যে ভিব্রিও ফিশেরির-ই এ ক্ষমতা আছে তা নয়। সব ব্যাকটেরিয়াই নিজেদের মধ্যে তাদের সংখ্যা কত তা জানান দেয়, এবং সে জন্য ব্যবহার করে রাসায়নিক ‘সিগন্যালিং অণু’।

এই কোরাম সেন্সিং যে শুধু ব্যাকটেরিয়ারই আছে তা নয়, অন্য অনেক প্রাণীরই এ ক্ষমতা আছে।

সংখ্যা হিসেব করে বাড়ি বদল করে জাপানি পিঁপড়ে

ধরা যাক জাপানী পিঁপড়ের কথা – যার বৈজ্ঞানিক নাম মায়ার্মেসিনা নিপ্পনিকা। এই পিঁপড়েরা যদি বুঝতে পারে যে তাদের কলোনির সংখ্যা একটা নির্দিষ্ট সংখ্যা বা কোরামে পৌঁছেছে, তাহলে তারা একটা নতুন জায়গায় গিয়ে বসতি স্থাপন করে।

সেই নতুন জায়গাটা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও একটা সংখ্যার হিসেব আছে।

এই পিঁপড়েরা যদি দেখে যে নতুন জায়গাটিতে আগে থেকেই একটা নির্দিষ্ট সংখ্যক পিঁপড়ের বসতি আছে, তাহলেই তারা সবাই মিলে একমত হয় যে নতুন জায়গাটা বসবাসের জন্য নিরাপদ।

তার পরই তারা পুরো দল আর বাচ্চাকাচ্চা মিলে বাড়ি বদল শুরু করে।

যে কোন প্রাণীর পথ চিনে চলা এবং ঘুরে ঘুরে খাদ্যের সন্ধানের জন্য সংখ্যার জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

মৌমাছিরা পথ চেনে কিভাবে?

দুজন জীববিজ্ঞানী – ম্যারি ডেক এবং মান্ডিয়াম শ্রীনিবাসন – ২০০৮ সালে একটা চমৎকার পরীক্ষা চালিয়েছিলেন মৌমাছিদের নিয়ে।

তারা দেখেছিলেন, কোথাও খাদ্যের সন্ধান পাওয়া গেলে পথের কি কি চিহ্ন দেখে সেখানে যাওয়া যাবে – তার সংখ্যা মৌমাছিরা বুঝে নিতে পারে। এই চিহ্নগুলোর স্থান অদল-বদল করে দিলেও তারা পথ ঠিকই চিনে নিতে পারে।

মৌমাছি তাদের আবাসস্থল অর্থাৎ চাক থেকে খাদ্যের উৎস পর্যন্ত পথের দূরত্ব মাপতে বিভিন্ন ল্যান্ডমার্ক বা পথের কোথায় কি আছে, তার ওপর নির্ভর করে।

এই হিসেবটা তাদের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

মেঠো ইঁদুর খাবার হিসেবে জ্যান্ত পিঁপড়ে পছন্দ করে।

কিন্তু পিঁপড়ে আক্রান্ত হলে কামড় দেয়, তাই তারা শিকার হিসেবে বেশ বিপজ্জনক। দেখা গেছে, এই ইঁদুরকে যদি দু’দল পিঁপড়ের সামনে হাজির করা হয়, তাহলে যে দলটিতে পিঁপড়ের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত কম, সেটিকেই তারা আক্রমণ করছে।

এক জরিপে দেখা গেছে, ইঁদুরের ক্ষমতা আছে ৫টি বনাম ১৫টি, ৫টি বনাম ৩০টি, এবং ১০টি বনাম ৩০টির দলের মধ্যে যেটিতে পিঁপড়ে সবচেয়ে কম – সেটাকে বেছে নেবার।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইঁদুর এভাবে সবচেয়ে ছোট পিঁপড়ের দলটিকে বেছে নিচ্ছে, যাতে শিকার করাটা সুবিধাজনক হয়, এবং কামড় খাবার সম্ভাবনাও অনেকটা কমানো যায়।

শিকারী প্রাণীরা শিকার করে হিসেব কষে

যেসব প্রাণী দলবদ্ধভাবে শিকার করে, তাদের ক্ষেত্রেও সংখ্যার বোধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

যেমন ধরা যাক নেকড়ে। তারা প্রায়ই বড় প্রাণী শিকার করে – যেমন ইল্ক বা বাইসন জাতীয় মহিষ। এরা লাথি বা গুঁতো মেরে বা পায়ে মাড়িয়ে একটা নেকড়ে মেরে ফেলার শক্তি রাখে।

সে কারণে দেখা যায়, কখন কোন প্রাণী শিকার করা হচ্ছে, সে অনুযায়ী নেকড়ের দলের সদস্য সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে।

একটা এল্ক শিকারে সাফল্য পেতে হলে নেকড়ের পালে দুই থেকে ছয়জন ‘সদস্য’ থাকতে হবে।

অন্যদিকে একটা বাইসন সফলভাবে শিকার করতে হলে ৯ থেকে ১৩টি নেকড়ের একটা দল দরকার।

তার মানে শিকারে সাফল্য পেতে হলে এই সংখ্যার হিসেবটা নেকড়েদের বুঝতে হয়।

অন্যদিকে আত্মরক্ষার ক্ষেত্রেও একটা দলে কতগুলো প্রাণী আছে, তা গুরুত্বপূর্ণ।

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল জীববিজ্ঞানী ২০০৫ সালে ইউরোপে এক গবেষণা চালান চিকাডি নামে চড়ুইজাতীয় পাখির আচরণের ওপর।

পাখির ডাকের মধ্যে সংখ্যার ইঙ্গিত

সেখানে তারা দেখতে পান যে এই পাখিরা যখন চিল বা প্যাঁচার মতো কোন সম্ভাব্য ‘শত্রু’ দেখতে পায়, তখন তারা বিশেষ এক ধরনের ডাক দিয়ে অন্য চিকাডিদের সতর্ক করে।

সেই ডাক বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন – এই ডাকের মধ্যে কত বার ‘ডি-ডি-ডি’ করা হচ্ছে তার সংখ্যা থেকে বোঝা যায়, সম্ভাব্য শত্রুকে কতটা বিপজ্জনক বলে মনে করা হচ্ছে।

যেমন পাখিটা যদি ‘চিক-আ-ডি-ডি’ বলে ডাকতে থাকে, তাহলে বোঝানো হচ্ছে সম্ভাব্য শত্রু তেমন বিপজ্জনক নয় – হয়তো একটা ধূসর প্যাঁচা। এরা আকারে বেশ বড় এবং ধীরগতির – তাই ছোট এবং দ্রুতগতির চিকাডির সাথে পেরে ওঠে না।

কিন্তু আশপাশে যদি দ্রুতগতিসম্পন্ন শিকারী পিগমি প্যাঁচা দেখা যায়, তাহলে চিকাডিদের ডাক হয় ‘চিক-আ-ডি-ডি-ডি-ডি’ অর্থাৎ ‘ডি’ ধ্বনির সংখ্যা বেড়ে যায় – যা গুরুতর বিপদের সতর্কবাণী।

একটি প্রাণী যদি তার খাদ্যের উৎস বা বিচরণক্ষেত্র একাই রক্ষা করতে না পারে, তাহলে তার কাছে দল এবং সেই দলের কতজন আছে, তা খুব গুরুত্বপূর্ণ ।

সেই দলকে যদি কোন প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করতে হয়, তাহলে বিপক্ষ দলটি কত বড় তার আন্দাজটাও টিকে থাকার জন্য জরুরি।

বেশ কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণী নিয়ে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা চালিয়ে দেখেছেন যে যুদ্ধের ফলাফল কি হবে, তা অনেক সময়ই নির্ধারিত হয় সংখ্যা দিয়ে।

সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞানী কারেন ম্যাককম্ব এবং তার সহযোগীরা দক্ষিণ আফ্রিকার সেরেংগেটি জাতীয় উদ্যানের সিংহীদের আচরণের ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন যে যখন তাদের গোপন স্পিকার থেকে তাদের দলের বাইরের অন্য একটি সিংহীর গর্জন শোনানো হয়, তখন তারা আক্রমণাত্মকভাবে শব্দ যেদিক থেকে এসেছে সেদিকে ছুটে যায়।

কিন্তু এক সাথে তিনটি সিংহীর গর্জন শোনানো হলে তারা কম আক্রমণাত্মক ভাব দেখায়।

তবে যখন তাদের দলে পাঁচ বা তার চেয়ে বেশি সিংহী থাকে, তখন আবার তারা তিনটি সিংহীর আওয়াজ যেদিক থেকে এসেছে সেদিকে ছুটে যায়।

তার মানে তারা অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে যে পাল্টা আক্রমণ করা হবে কি-না।

সামরিক কৌশলবিদ

প্রাণীজগতে মানুষের সবচাইতে নিকট আত্মীয় হচ্ছে শিম্পাঞ্জীরা।

তাদের ওপর একই পদ্ধতিতে একটি গবেষণা চালিয়েছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইকেল উইলসন।

তিনি দেখেছেন, শিম্পাঞ্জীদেরকে যখন অন্য শিম্পাঞ্জীদের ডাক শোনানো হচ্ছে, তখন তারা একজন সামরিক কৌশলবিদের মতোই তার নিজ দলের তুলনায় প্রতিপক্ষের শক্তি কতটা – তা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

এতে দেখা যাচ্ছে, শিম্পাঞ্জীদের দলটি যদি মনে করে যে প্রতিপক্ষের তুলনায় তাদের সদস্য সংখ্যা অন্তত দেড়গুণ বেশি – শুধু তাহলেই তারা যুদ্ধ করতে আগ্রহী হয়।

কারণ জীববৈজ্ঞানিক দিক থেকে তাদের বেঁচে থাকাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং এর লক্ষ্য হচ্ছে তাদের জিনকে পরবর্তী প্রজন্মে ছড়িয়ে দেয়া।

টেনেব্রিও মলিটর নামে এক ধরণের গুবরে পোকাদের মধ্যে দেখা যায় পুরুষ পোকাটি যত বেশি সম্ভব স্ত্রী-পোকার সাথে যৌনমিলন করছে, এবং এ জন্যে প্রতিযোগিতাও হয় তীব্র।

যৌনমিলনের পর পুরুষ পোকাটি স্ত্রী-পোকাকে কিছু সময় ধরে পাহারাও দেয় – যাতে সে অন্য কারো সাথে মিলিত হতে না পারে। মিলনের আগে পুরুষ পোকাটি যত বেশি সংখ্যক প্রতিদ্বন্দ্বীর মোকাবিলা করে – মিলনের পর সে তত বেশি সময় ধরে স্ত্রী পোকাটিকে পাহারা দেয়।

প্রজননের ক্ষেত্রে এই আচরণের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রয়েছে, এবং এখানেও পুরুষ গুবরে পোকা তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সংখ্যা হিসেব করছে।

শুক্রাণুর প্রতিযোগিতা

কারণ, এর পেছনে যে শুধু যৌনমিলন করতে সফল হবার তাড়নাই কাজ করছে তাই নয় – বরং এখানে আসল পুরস্কারটা হচ্ছে, কার শুক্রাণু দিয়ে স্ত্রী-প্রাণীর ডিম্বাণু নিষিক্ত হচ্ছে, সেটা।

শুক্রাণুর এই প্রতিযোগিতা বিভিন্ন প্রাণীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন আচরণের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেতে দেখা যায়।

কিছু পাখি ডিম ফোটানো এবং বাচ্চাদের বড় করার কষ্টকর কাজটি এড়াতে নানা রকম কৌশলের আশ্রয় নেয়।

তারা অন্য পাখির বাসায় গিয়ে তাদের ডিমের মধ্যেই নিজের ডিম পেড়ে আসে।

আমেরিকান কুট নামে এক ধরণের পাখি এভাবেই ডিম পাড়ে।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা এদের ওপর গবেষণা চালাতে গিয়ে দেখেছেন যে প্রতিবেশী অন্য পাখিরা নিজেদের ডিম গুণে রাখে – যাতে তাদের বাসায় আমেরিকান কুট ডিম পেড়ে গেলে তা ধরা পড়ে যায়।

বুদ্ধিমান কাউবার্ড

কাউবার্ড নামে আরেক জাতের পাখিও এই একই কাজ করে।

কিন্তু এতে তারা যেন ধরা না পড়ে এবং ডিমটা থেকে যেন সফলভাবে বাচ্চা ফোটে, তা নিশ্চিত করতে তাদের অনেক হিসেব-নিকেশ করতে হয়।

গবেষকরা দেখেছেন, এ জন্য তারা প্রতিবেশী অনেকগুলো পাখির বাসার ওপর নজর রাখে – কে কখন ডিম দিচ্ছে।

তারপর এমনভাবে সময় হিসেব করে, সুযোগ বুঝে, তাদের বাসায় নিজের ডিম পেড়ে আসে, যেন অন্য পাখির বাচ্চা ফোটার সাথে সাথেই তাদের ডিমও ফোটে।

এই হিসেবে ভুল হলে তার ডিমটা ধরা পড়ে যাবে এবং তা নিশ্চিতভাবেই নষ্ট করে ফেলা হবে।

আর যদি বেশি দেরি হয়ে যায়, তাহলে হোস্ট পাখির ডিমে তা দেয়ার সময় শেষ হয়ে যাবে – কাউবার্ডের ডিম ফোটার আগেই।

তার মানে হচ্ছে, সফলভাবে অন্যকে দিয়ে নিজের ডিম ফোটানোর কাজ করাতে হলে একটি কাউবার্ডকে দিনক্ষণ থেকে শুরু করে ডিমের সংখ্যা – সবকিছুরই এক জটিল হিসেব করতে হয়।

কাউবার্ডের মধ্যে মাফিয়া-প্রবণতাও দেখা যায়।

অন্য পাখিরা তার ডিম ভেঙে দিলে এরা নিজেরা আবার অন্য পাখির ডিম ঠুকরে ফুটো করে দিয়ে আসে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সংখ্যার এই বোধ জীবনধারণ ও বংশবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

সব প্রাণীই এ ক্ষমতাকে কোন না কোনভাবে ব্যবহার করে।

তারা আরো বলছেন, বিবর্তনবাদের দিক থেকে এ ক্ষমতার উৎস যাই হোক না কেন, একটা বিষয় প্রায় নিশ্চিত যে এটি এমন এক ক্ষমতা, যার সাথে প্রাণীদের পরিবেশের সাথে মানিয়ে নেবার প্রক্রিয়ার সম্পর্ক আছে।

(টিউবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোবায়োলজি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক এ্যান্ড্রেয়াস নিডারের এই নিবন্ধটি এমআইটি প্রেস রিডারে প্রথম প্রকাশিত হয়, যা অনুমতি নিয়ে পুনঃপ্রকাশ করা হয়েছে। )

 

 

 

 

 

 

 

 

বিবিসি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের জন্য কনডেমড সেল আসলে কী?

একজন বন্দির জন্য কনডেমড সেলের আয়তন সাধারণত ১০ ফিট বাই ৬ ফিট হয়ে থাকে (প্রতীকী ছবি)

বাংলাদেশে গত বছরের জুন মাসে বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় রিফাতের স্ত্রী মিন্নিসহ ছয়জনকে, যাদের বুধবার মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে, চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী তাদের কারাগারের ‘কনডেমড সেল’ এ রাখা হয়েছে।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের কারাগারের যে বিশেষ সেলে রাখা হয় সেটিকে কনডেমড সেল বলা হয়।

কারাগারে থাকা অন্যান্য বন্দিদের তুলনায় কনডেমড সেলের বন্দিদের জন্য ভিন্ন আচরণবিধি রয়েছে এবং অন্যান্য বন্দিদের থাকার জায়গার সাথেও কনডেমড সেলের বেশ পার্থক্য রয়েছে।

‘কনডেমড সেল’ এর সাথে কারাগারের অন্যান্য সেলের পার্থক্য কী?

কোনো কারাগারে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামিদের অন্যান্য অপরাধীদের চেয়ে আলাদা ধরণের কক্ষে রাখা হলেও বাংলাদেশের জেল কোড বা কারাবিধি মোতাবেক সেরকম কোনো আইন নেই বলে জানান সাবেক কারা উপ মহাপরিদর্শক শামসুল হায়দার সিদ্দিকী।

কারাবিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার পর একজন বন্দীকে কারাগারে সার্বক্ষণিক পাহারায় রাখা, দর্শনার্থীদের সাথে দেখা করার বিষয়ে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হলেও আলাদা কক্ষে রাখার বিষয়টি আইনে নির্দিষ্ট করে উল্লেখিত নেই।

তবে কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণ অপরাধীদের চেয়ে কনডেমড সেলের আসামিদের একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন বলে মন্তব্য করেন শামসুল হায়দার সিদ্দিকী।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের জেল কোড বা কারাবিধিতে ফাঁসির আসামিদের কনডেমড সেলে রাখার মত কোনো বিষয় উল্লেখ না থাকলেও তাদের আলাদা ধরণের কক্ষে রাখা হয়ে থাকে। এটিকে এক ধরণের রেওয়াজ বলা যেতে পারে।”

একটি কনডেমড সেলে সাধারণত একজন বা তিনজন বন্দী রাখা হয়ে থাকে।

শামসুল হায়দার বলেন, “সাধারণত ধারণা করা হয় যে দুইজন বন্দী থাকলে গোপনে পালানোর পরিকল্পনা করতে পারে, তবে তিনজন থাকলে পরিকল্পনা আর গোপন থাকে না। ঐ ধারণা থেকেই দুইজন বন্দী একটি কনডেমড সেলে রাখা হয় না।”

কারাবিধি অনুযায়ী, একজন বন্দীর থাকার জন্য ন্যুনতম ৩৬ বর্গফুট (৬ফিট বাই ৬ ফিট) জায়গা বরাদ্দ থাকতে হবে। তবে বাংলাদেশের জেলগুলোতে কনডেমড সেলের ক্ষেত্রে এই আয়তন কিছুটা বেশি হয়ে থাকে বলে জানান মি. সিদ্দিকী।

একজন বন্দী থাকার কনডেমড সেল সাধারণত ১০ ফুট বাই ৬ ফুট আয়তনের হয়ে থাকলেও বাংলাদেশের অনেক জেলেই সেলের মাপ কিছুটা বড় হয়ে থাকে বলে জানান মি. সিদ্দিকী। আর তিনজন বন্দী যেসব সেলে রাখা হয় সেগুলোর আয়তন আরো বড় হয়ে থাকে।

কনডেমড সেলের ভেতরে আলো-বাতাস চলাচলের জন্য সাধারণত অন্যান্য সেলের তুলনায় অনেক ছোট আকারের জানালা থাকে। আর এসব সেলে থাকা বন্দীদের দিনে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেলের বাইরে চলাচলের অনুমতি দেয়া হয়।

শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, “একসময় কনডেমড সেলের বন্দীদের নিজেদের সেলের বাইরে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। সেল থেকে বছরের পর বছর বের হননি, এমন উদাহরণও আছে। কিন্তু একটা ছোট ঘরের ভেতরে দীর্ঘ সময় থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে মৃত্যু ঝুঁকি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে, তাই বর্তমানে সব বন্দিদেরই দিনের একটা নির্দিষ্ট সময় বাইরে চলাফেরা করতে দেয়া হয়।”

কনডেমড সেলে থাকা বন্দীরা মাসে একদিন দর্শনার্থীদের সাথে দেখা করার সুযোগ পান।

“আগে একসময় জেলের ভেতরেই কনডেমড সেলে থাকা বন্দিদের সাথে দেখা করতে আসতে পারতো দর্শনার্থীরা। তবে এখন মাসে একদিন জেল গেটে তারা দর্শনার্থীদের সাথে দেখা করার সুযোগ পান।”

একজন বন্দি একবারে সর্বোচ্চ ৫ জন দর্শনার্থীর সাথে দেখা করতে পারেন। কারা কর্তৃপক্ষ সাধারণত কনডেমড সেলের প্রত্যেক বন্দির কাছ থেকে তার নিকটাত্মীয়দের তালিকা নেন, নির্দিষ্ট কয়েকজন ছাড়া কনডেমড সেলের বন্দির সাথে দেখা করতে অনুমতি দেয় না কারা কর্তৃপক্ষ।

শামসুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, “সাধারণত মাসে একদিন বন্দিদের সাথে দর্শনার্থীদের দেখা করার অনুমতি দেয়া হলেও বিশেষ বিবেচনায় কখনো কখনো ১৫ দিনের মধ্যেও কনডেমড সেলের আসামির সাথে দর্শনার্থীদের দেখা করতে দেয়া হয়।”

উচ্চ আদালতে দণ্ড পরিবর্তিত হলে কী হয়?

মাঝেমধ্যে দেখা যায় কোনো একটি বিচারিক আদালতে কোনো ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া হলেও পরবর্তীতে উচ্চ আদালতের রায়ে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ পরিবর্তিত হয়েছে।

বাংলাদেশে এই ধরণের বেশকিছু ঘটনা রয়েছে যেখানে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি উচ্চ আদালতে আপিল করার পর তার সাজা কমেছে বা মওকুফ হয়েছে।

আর এই ধরণের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত দীর্ঘসময় লেগে থাকে বলে মন্তব্য করেন শামসুল হায়দার সিদ্দিকী।

এসব ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের রায় উচ্চতর আদালত থেকে বাতিল না হওয়া পর্যন্ত কনডেমড সেলেই থাকতে হয় বন্দীকে।

শামসুল হায়দার বলেন, “যতদিন পর্যন্ত উচ্চ আদালত মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বাতিল না করছে, ততদিন পর্যন্ত এ বন্দিকে কনডেমড সেলেই থাকতে হয়। কারা বিধি অনুসরণ করে কনডেমড সেল থেকে গিয়েই আদালতের কার্যক্রমে যোগ দিতে হয় বন্দীকে।”

আর এরকম অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে বন্দীকে বছরের পর বছর কনডেমড সেলে থাকতে হচ্ছে। বাংলাদেশে দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে কোনো বন্দীর কনডেমড সেলে থাকার নজির আছে বলে জানান মি. সিদ্দিকী।

তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত বহু নারীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো নারীর মৃত্যুদণ্ড আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়নি।

নাগিব বাহার

বিবিসি বাংলা, ঢাকা

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




যেসব কারণে বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকরা বিদেশে আটক হন

বাংলাদেশের বহু প্রবাসী শ্রমিক বর্তমানে বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষের হাতে আটক আছেন – একটি সংস্থার হিসেব মতে যাদের সংথ্যা ১০ হাজারের কাছাকাছি।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর এ বছরেই মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে কারাগার অথবা ডিটেনশন সেন্টারে আটক প্রবাসী বহু বাংলাদেশি শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠিয়েছে সেসব দেশের কর্তৃপক্ষ।

তবে এখনো আরও অনেকে আটক রয়েছেন অনেক দেশে। তাদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে শ্রম আইন ভঙ্গের অভিযোগ আছে।

সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক আটক রয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে, আর একটি বড় অংশ আটক আছেন ভারতের কারাগারগুলোয়।

কত লোক আটক আছেন?

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্রাকের অভিবাসন বিষয়ক যে কর্মসূচি রয়েছে সেখান থেকে আনুমানিক একটি তথ্য দেয়া হয়েছে যে পৃথিবীর নানা দেশে বাংলাদেশি আটকের সংখ্যা দশ হাজারের মতো হবে।

গত বছর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে এই বিষয়ে তথ্য দিয়ে বলেছিলেন – পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় নয় হাজারের মতো বাংলাদেশি আটক রয়েছেন বিভিন্ন কারণে।

তবে এ বছর এখনো পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে এই বিষয়ে কোন তথ্য দেয়া হয়নি।

তবে এই সংখ্যাটি ওঠানামা করে কারণ অনেককেই দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়।

যেমন এবছর করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্যের কুয়েত, কাতার, ওমান, আরব আমিরাত এসব দেশ তাদের কারাগারে আটক এক হাজারের মতো বাংলাদেশিদের দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।

সিরিয়া থেকে মাত্র কদিন আগেই ফেরত পাঠানো হয়েছে ৩২ জনকে। একটি বড় অংশ রয়েছেন ভারতের কারাগারে।

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মালয়েশিয়া এই দেশগুলোতে আটকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে জানানো হয়েছে শুধুমাত্র রিয়াদেই আটক রয়েছেন এগারোশ’র মতো প্রবাসী শ্রমিক।

যে কারণে আটক হন তারা

কারাগার আটক থেকেছেন পরে দেশে এসেছেন এরকম শ্রমিক, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের দূতাবাস এবং ব্রাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেল মূলত শ্রম আইন ভঙ্গ করার জন্য বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকরা আটক হন।

ব্রাকের অভিবাসন কর্মসূচীর প্রধান শরিফুল হাসান বলছেন, “একটি কারণ হল মধ্যপ্রাচ্যের কোন দেশে যাওয়ার সময় শ্রমিকের যে মালিক বা কোম্পানির সাথে কাজের চুক্তি হয়েছিল, সেই চুক্তি ভঙ্গ করে তারা আরও বেশি বেতনের জন্য অন্য কারো সাথে কাজ নিয়েছেন। আর এর মুল কারণ হল তাদের বেতন বা সুবিধাদি দেয়া হবে বলে গন্তব্য দেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সেখানে গিয়ে তারা ভিন্ন কিছু পান।”

“আরেকটি প্রধান বিষয় হল যে খরচ হয় ওসব দেশে যেতে। ধরুন জমি বেচে বা দামি কিছু বিক্রি করে চার-পাঁচ লাখ টাকা এজেন্সিকে দিয়ে তারপর মধ্যপ্রাচ্যে যারা যান তারা তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও ওই টাকা তুলতে দেশটিতে রয়ে যান এবং অন্য কোথাও কাজ নেন। তখন তারা আনডকুমেন্টেড বা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হন। এই দুটিই অভিবাসী শ্রমিকদের আটক হওয়ার মুল কারণ।”

কারাগার ও ডিটেনশন কেন্দ্রে দুইজনের অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশের পিরোজপুরের ছেলে পড়তে গিয়েছিলেন মালয়েশিয়াতে। একদম শেষ বর্ষে ওঠার পর হঠাৎ প্রতারণার অভিযোগে তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ।

তিনি জানিয়েছেন, “আমার ভিসার মেয়াদ তখনো ছিল। কিন্তু খুব বেশি দিন না। কলেজ কর্তৃপক্ষ জানালো যে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। তারা নতুন ভিসার জন্য আমার পাসপোর্ট জমা নিলো। এরপর ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তাদের আশ্বাসে আমি সেখানে রয়ে গিয়েছিলাম।

“নতুন ভিসা ও পাসপোর্ট হাতে পাওয়ার আগেই একদিন কুয়ালালামপুরে বাংলা মার্কেটে গেছি। সেখানে হঠাৎ পুলিশের অভিযান। সেখানে যত বাংলাদেশে পেয়েছে সবাইকে আটক করে নিয়ে গেল। যাদের বৈধ কাগজ ছিল তাদের ছেড়ে দেয়া হল। আমাকে প্রথমে ডিটেনশন সেন্টারে রাখা হল। এরপর আদালত আমাকে ভিসার মেয়াদ শেষ করার পরও সেদেশে থাকার জন্য তিন মাসের কারাদণ্ড দেয়া হল।”

গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষে দেশে ফিরে আসেন আত্মীয়দের সহায়তা।

তিনি বলছেন, পড়াশুনার একদম শেষ পর্যায়ে এসে এই ঘটনা তার জীবন পুরো ওলটপালট করে দিয়েছে। যা থেকে তিনি এখনো ঘুরে দাড়াতে পারেননি।

সৌদি আরবে মাত্র সাত মাসের মতো ছিলেন টাঙ্গাইলের একজন। সেখানে পরিচ্ছন্নতা কর্মী হিসেবে কাজ করতেন।

যাওয়ার পরই দেখলেন মালিক তার বেতন বকেয়া রাখছে।

“যাওয়ার জন্য খরচ হয়েছিল ৪ লাখ টাকার মতো। যাওয়ার পর মালিক ঠিক মতো বেতন দিত না। বেতন চাইতে গেলে মারধোর করতো। খাবার যা দিতো তা খুবই মানে খারাপ। বাইরে কোথাও যেতে দিতো না। এসব নিয়ে আমি আমার দালালকে বললাম। সে আমাকে বলল তুই পালা, তোরে আমি আরও ভাল কাজ দেবো। এই যে না বুঝে তার কথামতো আমি পালিয়ে চাচাতো ভাইয়ের কাছে গেলাম সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় ভুল।”

চাচাতো ভাই তাকে একদিন থাকতে দিয়েছিল। এরপর তাকে চলে যেতে বলেন তিনি।

এরপর মক্কায় এক মামার কাছে গেলেন। সেখানে কয়েকদিন থাকার পর সেও চলে যেতে বলল।

দালালের কাছে নতুন কাজ চাইলে তার কাছে এক লাখ টাকা দাবি করেন তিনি।

এরপর টাঙ্গাইলের এই যুবক নিজেই একটি রুটির দোকানে কাজ খুঁজে নেন। এই পরিস্থিতিতে অবৈধ শ্রমিক হিসেবে পুলিশের হাতে আটক হন।

আটক ব্যক্তিরা কতটুকু সহায়তা পান?

সৌদি দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলছেন, বাংলাদেশের যেকোনো নাগরিক বিদেশে কারাগারে আটক হলে বা আইনি জটিলতায় পড়লে দূতাবাসের সহায়তা পায়।

তিনি বলছেন, শ্রম আইন বিষয়ক কিছু হলে আইনি সহায়তা করা হয়। কিন্তু ফৌজদারি কোন অপরাধ হলে শ্রমিককে নিজেকেই আইনজীবী নিয়োগ করতে হয়।

তিনি বলছেন, যে দুটি প্রধান কারণে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিকরা আটক হন যেমন নিয়োগ চুক্তি ভঙ্গ করে অন্য কোথাও কাজ নেয়া এবং মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরও সেদেশে রয়ে যাওয়া এই দুই ধরনের শ্রমিকদের সাধারণত ‘ডিপোর্ট’ বা দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়।

এর বাইরে তাদের আর কোনভাবে সহায়তার কোন উপায় নেই।

দূতাবাস কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী দুই ধরনের আটক ব্যক্তিদের সাথেই তারা দেখা করেন, পরামর্শ দেন এবং দেশে ফিরতে সহায়তা করেন।

কিন্তু বেশিরভাগ সময় অভিযোগ ওঠে যতটুকু সহযোগিতা আটক ব্যক্তিদের দরকার সেটি তারা পান না।

যেমন মালয়েশিয়াতে তিনমাস কারাদণ্ড ভোগ করা তরুণ বলছেন, “আটক হওয়া, আদালতে বিচার এবং তিনমাস কারাগারে থাকা এই পুরো সময়ে আমার সাথে দূতাবাস থেকে কেউ দেখা করতে আসেনি। তারা জানতো আমি আটক হয়েছি সেটা জানতো কারণ আমি সেখানে অসহায় প্রবাসীদের নিয়ে কাজ করতাম। কিন্তু তারা কেউ আসেনি।”

সৌদি আরবে আটক ব্যক্তি বলছেন, সৌদি আরবে থাকা তার আত্মীয় ও দেশ থেকে পরিবারের পাঠানো টাকা তিনি ডিটেনশন সেন্টারে ঘুষ আকারে দিয়ে তবে দেশে ফিরেছেন।

তবে রিয়াদে দূতাবাস কর্মকর্তা বলছেন, সৌদি আরবে শ্রমিক রয়েছেন ২০ লাখের উপরে।

নানা শহরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে তারা থাকে কিন্তু সেখানকার দূতাবাসে কর্মী সংখ্যা এতই কম যে বিপদে শ্রমিকদের কাছে তাদের পৌছাতে দেরি হয়।

তবে সহায়তা দেয়ার ব্যাপারে তাদের আন্তরিকতার কোন ঘাটতি নেই।

শাহনাজ পারভীন

বিবিসি বাংলা, ঢাকা

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

 




ভারতের অন্যতম শীর্ষ ধনীর সম্পদ কি আসলেই শূন্যের কোঠায়?

অনিল আম্বানি: শীর্ষ ধনী থেকে কপর্দকহীন?

ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হচ্ছেন মুকেশ আম্বানি। তার সম্পদের পরিমাণ ফরচুন ম্যাগাজিনের মতে প্রায় ৬৪ বিলিয়ন বা ছয় হাজার ৪০০ কোটি ডলার। তিনি ভারতের রিলায়েন্স ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের প্রধান।

মুকেশ আম্বানির ছোট ভাই হচ্ছেন অনিল আম্বানি। তিনিও কিছুদিন আগে পর্যন্ত ছিলেন একজন বিলিওনেয়ার। ভারতের অন্যতম শীর্ষ ধনী।

কিন্তু গত সপ্তাহে লন্ডনের এক আদালতে শুনানির সময় মুম্বাইতে বসে ভিডিও লিংকে আইনজীবীদের জেরার মুখে যেসব তথ্য তিনি দিয়েছেন, তাতে তিনি দাবি করেছেন, সঞ্চিত অলংকার বেচে এখন তাকে আইনজীবীর বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।

অনিল আম্বানি এর আগে দাবি করেছিলেন তার সম্পত্তির পরিমাণ এখন ‘নেট জিরো’, অর্থাৎ শূন্যে নেমে এসেছে।

মুকেশ এবং অনিল আম্বানি মূলত উত্তরাধিকার সূত্রেই এই বিপুল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের অধিকারি হন। রিলায়েন্স ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তাদের বাবা ধীরুভাই আম্বানি।

২০০২ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর দুই ভাই ব্যবসার দেখাশোনা করতেন। কিন্তু ব্যবসা পরিচালনা নিয়ে তাদের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হওয়ার পর দুই ভাই রিলায়েন্স গ্রুপ ভেঙে আলাদা হয়ে যান।

কিন্তু মুকেশ আম্বানি যেখানে তার সম্পদ দিনে দিনে আরও বাড়িয়েছেন, সেখানে অনিল আম্বানি কিভাবে এরকম অবস্থায় এসে পৌঁছালেন?

আদালতকে অনিল আম্বানি যা বলেছেন:

অনিল আম্বানিকে শুক্রবার মুম্বাই থেকে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে লন্ডনের এক আদালতের শুনানিতে হাজির থাকতে হয়েছিল তিনটি চীনা ব্যাংকের দায়ের করা এক মামলায়।

সেই শুনানিতে তিনি তার সম্পদ এবং ব্যক্তিগত জীবনযাত্রা সম্পর্কে যা বলেছেন তা ফলাও করে ছাপা হয়েছে ভারতের এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবাপদত্রে।

চীনের এই তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংক অনিল আম্বানির মালিকানাধীন রিলায়েন্স কম্যুনিকেশন্স লিমিটেডের কাছে ৭০ কোটি ডলার পাওনা আদায়ের জন্য মামলাটি করেছে। ২০১২ সালে তারা কোম্পানিটিকে এই অর্থ ঋণ দিয়েছিল অনিল আম্বানি ব্যক্তিগতভাবে এই ঋণের গ্যারান্টি দেয়ার পর।

তিনটি চীনা ব্যাংক বলছে, এর আগে আদালত এক রুলিং জারি করে অনিল আম্বানিকে নির্দেশ দিয়েছে অর্থ পরিশোধের জন্য, কিন্তু তারা এখনো কোন অর্থ পায়নি।

তিন চীনা ব্যাংকের একজন আইনজীবী সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গকে বলেছেন, “আমাদেরকে যাতে এক পয়সাও দিতে না হয় – সেজন্যে তিনি এখন নখ-দন্ত দিয়ে লড়াই করছেন‍।”

আদালতে শুনানি চলাকালে একজন বিচারক মন্তব্য করেছিলেন, অনিল আম্বানি বিলাসী জীবন-যাপন করেন।

এর জবাবে অনিল আম্বানি দাবি করেন যে, তার জীবন যাপন খুবই সাদাসিধে। তিনি বিলাসী জীবন-যাপন করেন বলে যেসব জল্পনা, তা মোটেই সত্য নয়।

প্রায় তিন ঘন্টা ধরে শুনানির সময় অনিল আম্বানির কাছে তার জীবনযাত্রার ব্যয় থেকে শুরু করে নিজের পরিবারের জন্য নেয়া দশ কোটি ডলারের বেশি ঋণ সহ অনেক কিছু জানতে চাওয়া হয়।

শুনানি চলাকালে একজন বিচারক মন্তব্য করেছিলেন, অনিল আম্বানি তো বিলাসী জীবন-যাপন করেন।

সপরিবারে বড় ভাই মুকেশ আম্বানি। তিনি ভারতের সবচেয়ে ধনী ব্যবসায়ী।


উত্তরে অনিল আম্বানি বলেন, এটি ভুল, মোটেই সত্য নয়। তিনি বলেন, তিনি একজন ম্যারাথন দৌড়বিদ, তিনি ধূমপান করেন না এবং জুয়াও খেলেন না।

“আমার মনে হয় জিনিসটা সন্মানের সঙ্গে সঠিকভাবে তুলে ধরা দরকার। আমার প্রয়োজন অত বিশাল নয় এবং আমার জীবন খুবই সুশৃঙ্খল।”

“আমার অতীত, বর্তমান বা ভবিষ্যত বিলাসবহুল জীবন নিয়ে যেসব ইঙ্গিত করা হচ্ছে, তা একেবারেই জল্পনা-কল্পনা।”

পাওনাদাররা যেন অনিল আম্বানির সম্পদের নাগাল না পান, সেজন্যে এসব সম্পদ তিনি বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় স্থানান্তর করে দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।”

তাদের কাছে দামী দামী শিল্প সামগ্রীর যে সংগ্রহ আছে, সেগুলোর মালিক তার স্ত্রী বলে দাবি করছেন তিনি।

যে বিলাসবহুল ইয়ট তার পরিবারের সদস্যরা ব্যবহার করেন, সেটির মালিকও তিনি নন, একটি কোম্পানি, বলছেন মিস্টার আম্বানি। তিনি আরও দাবি করেন, এই ইয়ট তিনি ব্যবহার করেন না, কারণ তিনি সমূদ্রপীড়ায় (সী সিকনেস) ভোগেন।

অনিল আম্বানি সবসময় দাবি করে এসেছেন যে, তিনি কখনোই তিনটি চীনা ব্যাংক-কে ঋণের জন্য ব্যক্তিগত গ্যারান্টি দেননি।

শুক্রবার শুনানির সময় অনিল আম্বানিকে তার ক্রেডিট কার্ডে লন্ডনে যেসব খরচ করা হয়েছে সেসব নিয়েও জেরা করা হয়। এর মধ্যে লন্ডনের হ্যারডসেও এই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা হয়েছে। অনিল আম্বানি জানিয়েছেন, কার্ডটি তাঁর মা ব্যবহার করেছিলেন।

নিজের মা কোকিলাবেন আম্বানিকে দেয়া ৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার এবং ছেলেকে দেয়া ৪ কোটি ১০ লাখ ডলারের ঋণ সম্পর্কেও তাকে জিজ্ঞেস করা হয়। তিনি বলেন, এসব ঋণের শর্ত তার ঠিক মনে পড়ছে না, তবে এই অর্থ উপহার হিসেবে দেয়া হয়নি।

অনিল আম্বানির একজন মুখপাত্র পরে এক বিবৃতিতে বলেন, “অনিল আম্বানি সব সময় সাদাসিধে জীবনযাপন করা মানুষ। তিনি বিলাসবহুল জীবনযাপন করেন বলে যে অতিরঞ্জিত ধারণা দেয়া হয়, তার একেবারে বিপরীত।”

“তিনি নিরামিষাশী, মদ স্পর্শ করেন না এবং ধূমপান করেন না। ফূর্তি করার জন্য শহরে যাওয়ার চেয়ে তিনি বরং বাড়িতে বসে সন্তানদের সঙ্গে মুভি দেখতে পছন্দ করেন।”

 

 

 

 

 

বিবিসি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




নতুন কৃষি বিলের বিরুদ্ধে ভারতে কেন আগুন জ্বলছে?

কৃষি বিলের প্রতিবাদে পাঞ্জাবে কৃষক পরিবারের বধূদের রেল রোকো আন্দোলন

ভারতে সদ্য পাস হওয়া বিতর্কিত তিনটি কৃষি বিলের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী কৃষক বিক্ষোভের আঁচ আজ এসে পৌঁছেছে রাজধানী দিল্লিতেও।

এদিন সকালে দিল্লির প্রাণকেন্দ্র রাজপথে, ইন্ডিয়া গেটের ঠিক সামনে একদল আন্দোলনকারী একটি ট্রাক্টর জ্বালিয়ে দিয়ে এই বিলগুলোর বিরুদ্ধে তাদের প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

কৃষি বিলের বিরুদ্ধে এদিন অবস্থান বিক্ষোভে বসেছেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী অমরিন্দর সিং, প্রতিবাদ হয়েছে দক্ষিণের কর্নাটক বা তামিলনাডুতেও।

কৃষিপণ্যের জন্য সরকারের ‘ন্যূনতম সহায়ক মূল্য’ বা এমএসপি বহাল থাকবে, সরকারের এই আশ্বাসের পরও কৃষক বিক্ষোভ কীভাবে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে?

বস্তুত কৃষিখাতে সংস্কারের লক্ষ্যে আনা নতুন একগুচ্ছ বিলের বিরুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন কৃষক সংগঠন একযোগে প্রতিবাদ শুরু করেছিল শুক্রবার থেকেই।

সেদিন বিক্ষোভকারীদের রাজধানীর সীমান্তে নয়ডাতে আটকে দেওয়া হলেও এদিন সকালে কিন্তু পাঞ্জাবের একদল যুব কংগ্রেস কর্মী কড়া নিরাপত্তার ফাঁক গলে দিল্লির ইন্ডিয়া গেটের সামনে হাজির হয়ে যান।

ট্রাকে করে তারা লুকিয়ে নিয়ে এসেছিলেন একটি ট্রাক্টর, সেটিকে রাজপথের ওপর নামিয়ে তারা আগুন ধরিয়ে দেন।

দিল্লি পুলিশ পরে বিক্ষোভকারীদের গ্রেপ্তার করলেও এই নিরাপত্তার গাফিলতি কীভাবে হল সে প্রশ্নও উঠছে – কারণ ঘটনাস্থল থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বেই ভারতের পার্লামেন্ট ও রাষ্ট্রপতি ভবন।

এবং আরও যে প্রশ্নটা বেশি করে উঠছে, তা হল দেশের কৃষক বিক্ষোভ কি আরও তীব্র আকার নেবে?

চাষীরা সরকারের সহায়ক মূল্য আর পাবেন না?

সরকার দাবি করছে, স্বামীনাথন কমিটির রিপোর্ট বাস্তবায়ন করে এবং কৃষিখাতের দালাল বা মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের ভূমিকাকে খর্ব করে এই বিল চাষীদের জন্য নানা সুবিধা বয়ে আনবে।

কিন্তু আন্দোলনরত চাষীদের আশঙ্কা, বিভিন্ন কৃষিপণ্যের জন্য তারা যে এতদিন সরকারের বেঁধে দেওয়া ‘ন্যূনতম সহায়ক মূল্য’ পেতেন, এই বিলগুলো পাস হওয়ার পর সেই নিশ্চয়তা আর থাকবে না।

বিজেপি-নেতৃত্বাধীন শাসক জোট থেকে বেরিয়ে গিয়ে তাদের সবচেয়ে পুরনো শরিক অকালি দলের সুখবীর সিং বাদলও ঠিক এই যুক্তিই দিচ্ছেন।

তার কথায়, “দুমাস ধরে বিজেপিকে আমরা বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম এই বিলগুলো পাঞ্জাব-সহ সারা দেশের কৃষকদের চরম সর্বনাশ করবে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। ফলে ওই জোটে থাকা আমাদের পক্ষে আর সম্ভব হয়নি।”

অর্থনীতিবিদ সৈকত সিংহরায়ের মতে, “বিভিন্ন কৃষিপণ্যের জন্য সরকারের নির্ধারিত সহায়ক মূল্যের নিশ্চয়তার বদলে বৃহৎ পুঁজিপতি বা কর্পোরেটদের মর্জির ভরসায় থাকা – ভারতের কৃষকরা এটাই আসলে মেনে নিতে পারছেন না।”

নীলকর সাহেবরা এক সময় যেভাবে দাদন দিয়ে কৃষকদের নীলচাষে বাধ্য করতেন, নতুন সিস্টেমে ছোট জমির মালিক ক্ষুদ্রচাষীরা অনেকটা একই রকম আশঙ্কায় ভুগছেন বলেও তার পর্যবেক্ষণ।

পার্লামেন্টে বিলগুলোর তীব্র প্রতিবাদ করেছে তৃণমূল কংগ্রেস।

ওই দলের এমপি দোলা সেন বিবিসিকে বলছিলেন, “দেশে খাদ্যাভাবের সময়, মহামারির সময় যখন আরও বেশি করে কৃষিতে প্রোটেকশন আর মনিটরিং দরকার, ঠিক তখনই এই বিলগুলোর মাধ্যমে কৃষিখাতকে ওপেন করে দিল, একেবারে খুলে দিল!”

“কর্পোরেট হাঙরদের হাতে দেশের কৃষিকে তুলে দেওয়ার বিরোধিতা তো আমাদের করতেই হবে”, বলছিলেন তিনি।

মোবাইলের মতো কৃষির বাজারেও শুধু কর্পোরেটরা?

ভারতের পার্লামেন্টে পাস হওয়া বিতর্কিত এই তিনটি কৃষি বিলের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী কৃষকদের আন্দোলন শুরু হয়েছে শুক্রবার থেকেই।

অব্যাহত এই তুমুল বিক্ষোভে পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ-সহ বিভিন্ন রাজ্যে কৃষক সংগঠনগুলো সড়ক ও রেলপথও অবরোধ করেছেন।

বুলন্দশহরের এক ক্ষুদ্র চাষী রতন লাল বলছিলেন, “যে ছোট বা মাঝারি আড়তদাররা এখন আমাদের পণ্য কিনে নেন তাদের হঠিয়ে বড় কর্পোরেটদের নিয়ে আসতেই এই বিল।”

“ঠিক যেভাবে মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে জিও আর এয়ারটেল ছাড়া আর সব প্লেয়ার বাজার থেকে আজ উধাও, ঠিক সেভাবেই শুধুমাত্র বড় পুঁজিপতিদের কাছে ফসল বেচতে আমাদের বাধ্য করা হচ্ছে।”

মীরাটের কৃষক বলীরাম আবার মনে করেন, “বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চাপেই সরকারের এই পদক্ষেপ। বরং বিভিন্ন কৃষিপণ্যের জন্য মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইস বা এমএসপি দিতে সরকার পার্লামেন্টে কেন বিল আনছে না?”

রাজনীতিবিদ ও অ্যক্টিভিস্ট যোগেন্দ্র যাদব বলছিলেন, পাস হওয়ার মাত্র পাঁচদিনের বিরুদ্ধে সারা দেশের সব রাজ্যে ও সব কৃষক সংগঠন মিলে যেভাবে এই বিলের প্রতিবাদে নেমেছে তা ভারতে আগে কখনও হয়নি।

তার কথায়, “পাঞ্জাবের পাটিয়ালা থেকে তামিলনাডুর সালেম সর্বত্র কৃষকরা একটাই দাবি জানাচ্ছেন – আমাদের মিনিমাম সাপোর্ট প্রাইসের গ্যারান্টি চাই।”

বিলগুলোতে ঠিক আছেটা কী?

ঠিক আটদিন আগে পার্লামেন্টে পাস হওয়া যে তিনটি বিলকে ঘিরে এই ধুন্ধুমার – তার প্রথমটিতে সরকার নিয়ন্ত্রিত পাইকারি কৃষিবাজার বা মান্ডিগুলো কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে।

দ্বিতীয় বিলটি ফসলের আগে থেকে ঠিক করে রাখা দামে চুক্তিভিত্তিক চাষ বা কনট্রাক্ট ফার্মিংয়ের পথ প্রশস্ত করবে।

আর ব্যবসায়ী বা উৎপাদকরা চাল-ডাল-আলু-পেঁয়াজ ইত্যাদি কতটা মজুত করতে পারবেন, এই মুহুর্তে তার ওপর যে সরকারি নিয়ন্ত্রণ আছে তৃতীয় বিলটি সেটাই বিলোপ করবে।

বিলের স্বপক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে সিনিয়র ক্যাবিনেট মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি আবার বলছিলেন, “কৃষিমন্ত্রী থেকে শুরু করে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বারবার নানা মঞ্চে আশ্বস্ত করেছেন, এসএসপি থাকবে – চিন্তার কিছু নেই।”

“বস্তুত কৃষিবিজ্ঞানী এম এস স্বামীনাথনের রিপোর্টে চাষীদের যে উপযুক্ত এমএসপি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল, নতুন বিলগুলো সেটাই নিশ্চিত করবে এবং ভারতে কৃষির জন্য ‘এক দেশ, এক বাজার’ প্রতিষ্ঠা করবে।”

অনেক বিশেষজ্ঞ অবশ্য মানছেন, এই বিলগুলো সংস্কারমুখী – এবং ভারতের কৃষিতে তা হয়তো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনও আনতে পারে। তবে বিলটা নিয়ে যথেষ্ঠ আলাপ-আলোচনা হয়নি, আর সমস্যা সেখানেই।

কৃষি অর্থনীতির বিশেষজ্ঞ ড: হাসরাত আলি বিবিসিকে বলছিলেন, “বিলটা আনা হয়েছে তাড়াহুড়ো করে, এটা আনার আগে অনেক সেমিনার-সিম্পোসিয়াম-আলোচনা দরকার ছিল, কৃষকদের মত নেওয়া উচিত ছিল।”

“সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি একটা কথা বলতেন, সরকার হয়তো সংখ্যা দিয়েই গড়া যায়, কিন্তু সরকার চালাতে হয় সহমত দিয়ে, অর্থাৎ সব দলকে সঙ্গে নিয়ে। এখানে সেটা একেবারেই করা হয়নি।”

বিজেপি জোটের কাছে পার্লামেন্টে সংখ্যা থাকলেও এই বিলগুলো নিয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তারা গড়তে পারেনি, তা স্পষ্ট।

ইতিমধ্যে রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দ গত রাতে বিলগুলোতে সই করে তা আইনে পরিণত করে দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তার বাড়ির দোরগোড়ায় ট্রাক্টর জ্বালিয়ে কৃষকরাও বুঝিয়ে দিয়েছেন তাদের বিক্ষোভ সহজে থামছে না।

শুভজ্যোতি ঘোষ

বিবিসি বাংলা, দিল্লি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো




পৃথিবীর প্রথম টিকা আর তিন ভারতীয় রানির রহস্যময় ছবি

এই ছবি আঁকা হয়েছিল দেভাজাম্মানিকে ছবির মূল বিষয় করে -বলছেন ঐতিহাসিক নাইজেল চান্সেলার

মাত্র ১২ বছর বয়সে দেভাজাম্মানি মহীশূরের রাজপরিবারে বৌ হয়ে আসেন ১৮০৫ সালে। তার সাথে বিয়ে হয়েছিল ১২ বছর বয়সী ওয়াদিয়ারের তৃতীয় রাজ বংশধর কৃষ্ণরাজার।

দক্ষিণ ভারতের নতুন রাজা হিসাবে তখন সিংহাসনে বসেছেন কিশোর কৃষ্ণরাজা।

আর তার স্ত্রী দেভাজাম্মানি নিজের অজান্তেই বিয়ের অল্প দিনের মধ্যে হয়ে উঠেছেন ছবির মডেল। গুটিবসন্তের নতুন টিকার প্রচারণার জন্য কাজে লাগানো হয়েছে তাকে। তাকে টিকার ‘মডেল’ করে একটি ছবি আঁকানোর উদ্যোগ নিয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।

তখন গুটিবসন্তের চিকিৎসা খুবই নতুন। মাত্র ছয় বছর আগে ব্রিটিশ ডাক্তার এডওয়ার্ড জেনার এই রোগের চিকিৎসা আবিষ্কার করেছেন।

কিন্তু তার চিকিৎসা নিয়ে ভারতে তখন তৈরি হয়েছে রীতিমত সন্দেহ আর বিরোধিতা। এর একটা বড় কারণ, তখন উনবিংশ শতাব্দীতে উপমহাদেশে ব্রিটিশরা তাদের শাসনক্ষমতা কায়েম করতে শুরু করেছে।

কিন্তু ব্রিটিশরা তখন ভারতীয়দের গুটিবসন্তের টিকা দিতে মরীয়া। তারা বিশাল অর্থব্যয়ে ভারতে বিরাট টিকাদান কর্মসূচি নিয়েছিল। তার সাফল্য কোনভাবে বাধাগ্রস্ত হোক তা তারা চায় না।

ভারতের মত বিশাল জনসংখ্যার দেশে “অসংখ্য জীবন” বাঁচানোর যুক্তি দিয়ে তারা এই ব্যয়বরাদ্দ পেয়েছিল, তাদের যুক্তি ছিল ভারতের বিশাল জনসংখ্যা ঔপনিবেশিক শক্তির জন্য “বড় সম্পদ”।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি রাজনীতি, ক্ষমতা আর যুক্তি খুবই সুদক্ষভাবে চতুরতার সাথে কাজে লাগিয়ে পৃথিবীর প্রথম টিকাদান কর্মসূচি চালু করতে সক্ষম হয় তাদের সবচেয়ে বড় উপনিবেশ ভারতে। এতে জড়িত হন ব্রিটিশ চিকিৎসকরা, ভারতীয় টিকাদানকারীরা, প্রকল্পে যুক্ত বিভিন্ন কোম্পানির মালিক এবং ভারতে ব্রিটিশদের বন্ধু রাজারাজড়ারা।

ওয়াদিয়ার রাজারা তখন ব্রিটিশদের প্রতি খুবই কৃতজ্ঞ, কারণ তিরিশ বছরের বেশি নির্বাসিত থাকার পর ওয়াদিরাররা আবার মহীশূরের রাজ সিংহাসন ফিরে পেয়েছেন ব্রিটিশদের সহায়তায়।

রহস্যময় ছবির নারীরা

কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক ড. নাইজেল চান্সেলার বলছেন ১৮০৫ সালের এই ছবি ভারতীয় এক রানির ব্রিটিশদের টিকাদান কর্মসূচির প্রচারণায় জড়িয়ে পড়ার রেকর্ড তো বটেই, পাশাপাশি সেসময় কীভাবে গুটিবসন্তের টিকা দেবার কাজ শুরু হয়েছিল তা জানার ক্ষেত্রে এই ছবির একটা বিশাল ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে।

তেল রংয়ে আঁকা এই ছবি যখন ২০০৭ সালে নীলামঘর সদাবিতে বিক্রি হয়, তখন ধারণা করা হয়েছিল এটা ভারতীয় তিন নতর্কীর ছবি। পরে ড. চান্সেলার তার গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণ করেন এটি ওয়াদিয়ারের রানি দেভাজাম্মানির গুটিবসন্তের টিকা প্রচারণার ছবি।

ড. চান্সেলার বলেন ছবির একদম ডানে দাঁড়িয়ে কনিষ্ঠ রানি দেভাজাম্মানি তার বাম হাতে যেখানে টিকা দেয়া হয়েছে সেদিকে ইঙ্গিত করছেন।

ছবির একদম বামে যে নারী, ড. চান্সেলারের ধারণা তিনি ছিলেন ওয়াদিয়ারের রাজার প্রথম স্ত্রী। তার নামও ছিল দেভাজাম্মানি। প্রথম স্ত্রীর নাকের নিচে এবং ঠোঁটের চারপাশে হালকা হয়ে যাওয়া চামড়ার রং থেকে বোঝা যায় তার ওপর গুটিবসন্তের প্রতিষেধক পরীক্ষা করা হয়েছিল।

তিনি বলছেন, সেসময় এই মারণব্যাধি প্রতিরোধের একটা চালু প্রথা ছিল এরকম – গুটিবসন্ত থেকে সেরে ওঠা রোগীর গুটি থেকে পুঁজ সংগ্রহ করা হতো। তারপর সেই পুঁজ শুকিয়ে, গুঁড়ো করে সেই কণাগুলো সুস্থ মানুষকে নাক দিয়ে টানতে বলা হতো। এতে সুস্থ মানুষ হালকাভাবে রোগাক্রান্ত হতো। এটা ছিল নিয়ন্ত্রিতভাবে সংক্রমণ ঘটিয়ে রোগ ঠেকানোর চিকিৎসা। প্রথম নারীর ঠোঁটের চারপাশে তারই চিহ্ণ।

১৭৯৯ সালে ব্রিটিশ চিকিৎসক এডওয়ার্ড জেনার আবিস্কার করেন গুটিবসন্তের টিকা

তথ্যপ্রমাণ

ড. চান্সেলার তার এই তত্ত্বের সমর্থনে ২০০১ সালে প্রথম প্রকাশিত একটি নিবন্ধেরও উল্লেখ করেছেন, যাতে প্রতিষেধকের এই প্রথার উল্লেখ আছে।

এছাড়াও আঁকা এই ছবির তারিখের সাথে ওয়াদিয়ারের রাজার বিয়ের তারিখের সামঞ্জস্য রয়েছে। রাজপরিবারের দলিলেও নথিভুক্ত আছে, দেভাজাম্মানির টিকা নেবার ওই ছবি ভারতীয়দের কতটা গভীরভাবে উদ্বুদ্ধ করেছিল গুটিবসন্তের টিকা নিতে। ১৮০৬ সালের জুলাই থেকে মানুষ টিকা নিতে এগিয়ে আসে।

মহীশূরের ইতিহাস বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ড. চান্সেলার বলছেন, ছবিতে রানিদের যেধরনের পোশাক আশাক, ও গহনাগাটি দেখা যাচ্ছে তা সেসময় ওয়াদিয়ারের রানিদেরই বিশেষত্ব ছিল।

আর এই ছবির শিল্পী টমাস হিকি যদিও আগেও ওয়াদিয়ারের রাজপরিবারের সদস্যদের ছবি এঁকেছেন, কিন্তু সেসময় রাজপরিবারের নারী সদস্যরা সচরাচর ছবির জন্য বিদেশীদের সামনে পোজ দিতেন না। তাই এই ছবি যে বিশেষ কারণে আঁকানো হয়েছিল তা স্পষ্ট।

ওয়াদিয়ারের রাজপরিবার ব্রিটিশদের প্রতি তখন গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। ব্রিটিশরা তাদের বড় শত্রু মহীশূরের শাসক টিপু সুলতানকে পরাজিত করে সিংহাসনে বসিয়েছিল ওয়াদিয়ারের রাজাকে। রাজপরিবার তাই তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে তখন একপায়ে খাড়া ছিল।

তখন ভারতে যেসব ব্রিটিশ থাকতেন, তাদের গুটিবসন্তের সংক্রমণ থেকে বাঁচাতে ব্রিটিশরা সেখানে টিকাদান কর্মসূচি চালু করতে মরীয়া হয়ে উঠেছিল বলে লিখেছেন ঐতিহাসিক মাইকেল বেনেট তার বই ওয়ার এগেনস্ট স্মলপক্সে।

ভারতে তখন গুটিবসন্তের সংক্রমণ খুবই বেশি ছিল এবং মৃত্যুহারও ছিল খুব বেশি। রোগের উপসর্গ ছিল জ্বর, গা ব্যথা এবং মুখ ও শরীরে গুটিগুলো যখন ফেটে যেতো তখন অসম্ভব যন্ত্রণা। যারা বেঁচে যেত তাদের সারা মুখ ও শরীরে থেকে যেত ভয়ানক ক্ষতচিহ্ণ- অনেকের চেহারা ক্ষতে এতটাই বদলে যেত যে তার মানসিক যন্ত্রণাও ছিল প্রবল।

কয়েক শতাব্দী ধরে এই রোগ থেকে বাঁচার জন্য একটাই পথ ব্যবহৃত হতো- রোগীর পুঁজ শুকিয়ে, পাউডার বানিয়ে তা নাক দিয়ে টেনে অল্প মাত্রায় রোগজীবাণু শরীরে ঢোকানো। এটা করা হতো হিন্দু পূজার অংশ হিসাবে। হিন্দুরা বসন্ত রোগ সংহারের দেবী হিসাবে শীতলা দেবীর পূজা করতো। শীতলাকে তুষ্ট করে দেবীর প্রসাদ প্রার্থনা করতো এবং ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা ওই রোগ জীবাণু সুস্থ মানুষের নাক দিয়ে ঢোকানোর কাজ করতেন।

গরুর বসন্ত দিয়ে টিকা

গুটিবসন্তের প্রতিষেধক টিকা তৈরি হয়েছিল গরুর বসন্ত রোগের জীবাণু দিয়ে। মানুষ পশুর শরীরের রোগজীবাণু নিজের শরীরে নিতে চায়নি। আর যেসব ব্রাহ্মণ বসন্তের রোগজীবাণু সুস্থ মানুষের শরীরের ঢোকাতো তারাও ড. জেনারের টিকার বিরোধী ছিলেন কারণ তারা বুঝেছিলেন এতে তাদের রুজিরোজগার হুমকির মুখে পড়বে।

“উদ্বেগের সবচেয়ে বড় জায়গাটা ছিল গরুর দেহের রোগজীবাণু মানুষের শরীরে ঢোকানো,” বলছেন অধ্যাপক বেনেট।

আরেকটা বড় সমস্যা ছিল টিকাদান পদ্ধতি নিয়ে। এই টিকা সবচেয়ে কার্যকরভাবে দেবার পদ্ধতি ছিল একজনের শরীর থেকে জীবাণু নিয়ে আরেকজনের শরীরে ঢোকানো। অর্থাৎ একজনের বাহুতে প্রথম এই টিকা দেয়া হবে। এর এক সপ্তাহ পর যখন সেখানে গরুর গুটিবসন্তে পুঁজ তৈরি হবে, তখন ডাক্তার ওই গুটি কেটে পুঁজ সংগ্রহ করে আরেকজনের শরীরে সেটা স্থানান্তর করবেন। এটাও মানুষের জন্য গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছিল।

এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, ও জাতপাতের নারী পুরুষ নির্বিশেষে একজনের শরীর থেকে আরেকজনের শরীরে জীবাণু ঢোকানোর ব্যাপারটা হিন্দুরা মেনে নিতে পারেনি। তারা মনে করেছিল এতে হিন্দুদের পবিত্রতা নষ্ট হবে। তাই ওয়াদিয়ারের রানি যখন এই টিকা নিলেন, তখন হিন্দু সম্প্রদায় আশ্বস্ত হয়েছিল এই ভেবে যে এতে হিন্দু রাজপরিবারের রক্ত যদি কলুষিত না হয়, আমারও তাহলে ভয়ের কারণ থাকবে না।

ধারণা করা হয়, ওয়াদিয়ারের রানিকে প্রথম যে গুটিবসন্তের টিকা দেয়া হয়েছিল তা শুরু হয়েছিল ভারতে কর্মরত এক ব্রিটিশ নারীর তিন বছরের কন্যা অ্যানা ডাস্টহল-এর শরীর থেকে নেয়া গুটিবসন্তের জীবাণু দিয়ে।

১৮০০ সালের বসন্তকালে ব্রিটেন থেকে জাহাজে করে গুটিবসন্তের পুঁজ প্রথম পাঠানো হয় ভারতে। জাহাজে ওই জীবাণু সক্রিয় রাখতে পুরো যাত্রাপথে একজনের বাহু থেকে আরেকজনের বাহুতে তা প্রবেশ করানো হয়।

কিন্তু ভারতে পৌঁছনর পর ওই মানব চেইন-এ ছেদ পড়ে কারণ ভারতে তখন কেউ টিকা নিতে রাজি হয়নি।

এরপর ভিন্ন উপায়ে টিকা পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। কাঁচের আধারে সক্রিয় জীবাণু শুষ্ক অবস্থায় পাঠানো হয় ভিয়েনা থেকে বাগদাদে ১৮০২ সালের মার্চ মাসে। এরপর ওই জীবাণু টিকা হিসাবে দেয়া হয় বাগদাদে আর্মেনীয় এক শিশুকে। এরপর ওই শিশুর বাহুতে পেকে ওঠা গুটি থেকে পুঁজ নিয়ে যাওয়া হয় ইরাকের বাসরায়। সেখান থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন চিকিৎসক গুটি বসন্তের পুঁজ পাঠান ভারতের বম্বেতে (বর্তমান মুম্বাই)।

১৮০২ সালের ১৪ই জুন ভারতে গুটিবসন্তের টিকা প্রথম সফলভাবে দেয়া হয় অ্যানা ডাস্টহল নামে এক শিশুকে। তার সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। যে ডাক্তার তাকে টিকা দিয়েছিলেন তার নোটবইতে শুধু লেখা ছিল অ্যানা ডাস্টহল “খুবই ঠাণ্ডা মেজাজের” মেয়ে। তার বাবা ছিলেন ইউরোপীয়ান, কিন্তু মা কোন্ দেশের তা জানা যায় না।

অধ্যাপক বেনেট বলছেন, “আমরা জানি, ভারতীয় উপমহাদেশে গুটিবসন্তের যত টিকা দেয়া হয়েছে তার সবগুলোর উৎস ছিল অ্যানার শরীর।”

অ্যানাকে টিকা দেবার পরের সপ্তাহে, তার পেকে ওঠা গুটির পুঁজ থেকে বম্বের আরও পাঁচজন শিশুকে টিকা দেয়া হয়। সেখান থেকে ওই টিকার জীবাণু বাহু থেকে বাহুতে যায় ভারতের বিভিন্ন শহরে যেখানে ব্রিটিশরা কর্মরত ছিলেন সেখানে। যেমন হায়দরাবাদ, কোচিন, তেল্লিচেরি, চিঙ্গলপুত, মাদ্রাজ এবং মহীশূরের রাজপরিবারে।

টিকাদান চেইনে কারা ছিলেন, অর্থাৎ কার বাহু থেকে কার বাহুতে বসন্তের টিকা গিয়ে পৌঁছেছে তার রেকর্ড কোথাও রাখা নেই। তবে টিকার জীবাণু বাঁচিয়ে রাখতে মাদ্রাজে “মিশ্র জাতের” তিনজন শিশুর শরীরে জীবাণু ঢোকানোর বিষয় এবং কলকাতায় এই টিকা নিয়ে যাবার সময় তা জীবিত রাখতে টিকার বাহক হিসেবে মালয় এক কিশোরকে টিকা দেবার বিষয় নথিভুক্ত রয়েছে।

কিশোরী রানি দেভাজাম্মানিকে যখন এই টিকা দেয়া হয় তখন অন্য কারো শরীর থেকে নেয়া পুঁজ তার বাহুতে ঢোকানো হয়েছিল, না কী শুকানো অবস্থায় রাখা জীবাণু তাকে ইনজেক্ট করা হয়েছিল তা জানা যায় না। তবে ড. চান্সেলার বলছেন, মহীশূরের রাজপরিবারে একমাত্র তাকেই টিকা দেয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।

মহীশূরের রাজার মাতামহ লাকশ্মী আম্মানির স্বামী গুটিবসন্তে মারা গিয়েছিলেন। কেম্ব্রিজের ইতিহাসবিদ ড. চান্সেলার মনে করেন টমাস হিকির আঁকা ছবিতে যে তিনজন নারী আছেন তাতে মাঝেরজন হলেন লাকশ্মী আম্মানি।

তার মতে, ওই ছবিতে রাজ মাতামহের উপস্থিতিও তাৎপর্যপূর্ণ এই কারণে যে, গুটিবসন্তের টিকা যে নিরাপদ এবং তা নিলে ভয়ের কারণ নেই, জনসাধারণকে সেই বার্তা দিতেই ছবিতে ওয়াদিয়ার রাজপরিবারের মাতামহকেও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি হাজির করেছিল সফল প্রচারের কৌশল হিসাবে।

এই ছবির কাজ সম্ভব হয়েছিল রাজপরিবারের শীর্ষপর্যায়ের এই নারীর উপস্থিতির কারণে। রাজা তখন নাবালক, তার আপত্তির কোন সুযোগ ছিল না, আর দুই রানিরও মাতামহের নির্দেশ অমান্য করার প্রশ্নই ছিল না।

অধ্যাপক বেনেট বলছেন ভারতের মানুষ ক্রমশ বুঝতে পেরেছিল টিকার উপকারিতা। এবং ঐ ছবির মাধ্যমে প্রচার চালিয়ে ১৮০৭ সাল নাগাদ ভারতে দশ লাখ মানুষকে গুটিবসন্তের টিকা দেয়া সম্ভব হয়েছিল।

আর কালের চক্রে একসময় হারিয়ে যাওয়া এই ছবি উদ্ধারের পর এই তিন রহস্যময়ী নারীকে এবং পৃথিবীতে প্রথম প্রতিষেধক টিকাদানের ইতিহাসে এই ছবির মূল্য যে কতটা তা উদঘাটন করেছিলেন ঐতিহাসিক ড. নাইজেল চান্সেলার।

সফল টিকাদানের কারণে বিশ্বে গুটিবসন্ত নির্মূল সম্ভব হয়েছে।

অপর্ণা আলুরি

বিবিসি নিউজ, দিল্লি

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো