ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে সম্প্রতি একাধিক ‘গবেষণামূলক নিবন্ধে’ প্লেইজারিজম-এর প্রমাণ পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি। এ বিষয়ে শাস্তির সুপারিশ করতে একটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

একাডেমিক জগতে প্লেইজারিজমের বাংলা শব্দ না থাকলেও অনেকে বিষয়টিকে ‘চৌর্যবৃত্তি’ বা ‘চুরি’ হিসেবে বর্ণনা করেন।

এ বিষয়টি সম্প্রতি বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে বিষয়টি নিয়ে নানা মন্তব্য করছেন।

একাডেমিক জগতে প্লেইজারিজম একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।

পাশ্চাত্যের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়েবসাইটে এই ধরণের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটে দেয়া সংজ্ঞা অনুযায়ী, অন্য কারো কাজ বা লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেয়াকে প্লেইজারিজম বলা হয়। এটা ইচ্ছাকৃত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিংবা অনিচ্ছাকৃতও হতে পারে।

কেউ যদি ইচ্ছাকৃত অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে এ কাজ করে তাহলে সেটি শৃঙ্খলা ভঙ্গের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।

অন্য কারো কাজ – সেটি হতে পারে লেখা, গ্রাফিক্স, পরিসংখ্যান, বিবৃতি – নিজের লেখা বা কাজে অন্তর্ভুক্ত করলে সেখানে যথাযথ সূত্র উল্লেখ করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির ওয়েবসাইটে বলা আছে, প্লেইজারিজম একটি গুরুতর অ্যাকাডেমিক অপরাধ।

কেউ যদি এই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়, তাহলে সে শুধু অকৃতকার্যই হবে না, তাকে বহিষ্কারও করা হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন ১৯৯৫ সালে নিউজিল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন।

অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন বলেন, তিনি যখন পিএইচডি করতে গিয়েছিলেন তখন গবেষণাপত্র লেখার জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছিল।

“আমি যদি সরাসরি কারো কোন বাক্য ব্যবহার করি তাহলে অবশ্যই কোটেশন মার্ক ব্যবহার করতে হবে,” বলেন অধ্যাপক নাসরিন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকে ভালো একাডেমিক চর্চা থাকলে প্লেইজারিজম এড়ানো সম্ভব।

গবেষকরা মনে করেন, পরীক্ষক যাতে বুঝতে না পারে সেজন্য অন্যের লেখা থেকে ভাষা পরিবর্তন করে দিলেই প্লেইজারিজম এড়ানো যায় না।

প্লেইজারিজম এড়ানোর অর্থ হচ্ছে, নিজের কাজ বা লেখাকে ভালো করার জন্য অ্যাকাডেমিক দক্ষতা দেখানো।

যারা শিক্ষকতা, লেখালেখি কিংবা গবেষণার সাথে জড়িত, তারা যখন অন্য কারো লেখা বা তথ্য নিজের লেখায় অন্তর্ভুক্ত করেন, তখন যথাযথ সূত্র উল্লেখ করার বিষয়টি তাদের ঋণ পরিশোধের মতো।

এটি এক ধরণের বুদ্ধিবৃত্তিক সততা বজায় রাখা।

অধ্যাপক নাসরিন বলেন, “আমি যখন দেখি আমার কোন লেখা অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছে সেটা তো আমার কাজ হিসেবে থাকলো না। আপনি আমার লেখা নিতে পারেন, কিন্তু অবশ্যই আমাকে রেফার করবেন।”

তিনি বলেন, গবেষণার মূল বিষয়টিই হচ্ছে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা।

ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড মনে করে, প্লেইজারিজমের ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের মান ক্ষুণ্ণ হয়। তাছাড়া সে প্রতিষ্ঠান যে ডিগ্রি প্রদান করে সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড-এর ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, প্লেইজারিজমের ফলে একাডেমিক সততার গুরুতর লঙ্ঘন হয়। অন্যের কাজকে নিজের বলে চালিয়ে দেয়া শুধু একাডেমিক দীনতাই নয়, এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির শেখার প্রক্রিয়ায় গলদ আছে। অর্থাৎ তিনি শিখতে ব্যর্থ হয়েছেন।

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষায় প্লেইজারিজমের বিষয়টি গুরুতর অন্যায়। এ ধরণের বিষয়গুলো তদন্ত করা হয়।

প্লেইজারিজমের অভিযোগ প্রমাণিত হলে পরীক্ষায় নম্বর কাটা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার পর্যন্ত করা হয়।

প্লেইজারিজম যাচাই করার জন্য এক ধরণের সফটওয়্যার রয়েছে যেটি বিশ্বজুড়ে ব্যবহার করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন বলেন, যখন কেউ কোন গবেষণামূলক প্রবন্ধ জমা দেয় তখন সেটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে যাচাই করে দেখা হয়।

কয়েকবছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এই সফটওয়্যার কিনেছে।

“আমার কাছে যখন কোন রিসার্চ পেপার আসে আমি তখন সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে রাখা সফটওয়্যারে পাঠিয়ে দেই চেক করার জন্য। টেকনিশিয়ান সেটি চেক করে আমাকে জানিয়ে দেয় যে সেখানে কত পার্সেন্ট প্লেইজারিজম রয়েছে।”

“টেকনিশিয়ানরা কোন জাজমেন্ট দেন না। তারা শুধু আমাদের জানিয়ে দেন যে কোথায় কতটুকু প্লেইজারিজম আছে। গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি থাকলে সেটি গ্রহণ না করে সংশোধন করতে বলা হয়,” বলছিলেন অধ্যাপক মাহবুবা নাসরিন।

 

আকবর হোসেন

বিবিসি বাংলা, ঢাকা

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print