দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার মতিউর রহমান চৌধুরী করোনাকালে বাজেটের স্বাস্থ্যখাত নিয়ে রেডিও তেহরানকে বললেন, বরাদ্দ যথেস্ট নয়। যেটুকু তাও চুরি-চামারি, লুটপাট ও দুর্নীতির কারণে ব্যবহার করা যায় না। তিনি বলেন, যারা এসব করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হয় না। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ উপস্থাপনা ও তৈরি করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

  • স্বাস্থ্যখাতে বাজে বরাদ্দ যথেস্ট নয়।
  • যে-টুকু বরাদ্দ দেয়া হয় তা চুরি-চামারি, লুটপাট ও দুর্নীতির কারণে যথাযথ ব্যবহার হয় না।
  • চুরি, লুটপাট ও দুর্নীতি বন্ধ না হলে বরাদ্দের চেয়ে তিনগুণ বাড়ালেও কোনো লাভ হবে না।
  • অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় না।
  • স্বাস্থ্য খাতের প্রকট সমস্যা;বেহাল দশায় আমরা মানুষ বড় অসহায়।
  • বিদেশে মানুষ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যেতে পারে, এখানে আক্রান্ত মানুষ হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না, চিকিৎসা পাচ্ছে না। অনেক হাসপাতালেও যাচ্ছে না। এমনিতেই মারা যাচ্ছে।
  • করোনায় মানুষ ভীষণ কষ্টে আছে।
  • এখানে মানুষের জীবনও বাঁচছে না জীবিকাও হচ্ছে না। আমরা এখন এই পর্যায়ে আছি।

রেডিও তেহরান: জনাব, মতিউর রহমান চৌধুরী, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশ্ব থমকে গেছে। মৃত্যুর মিছিল লম্বা হচ্ছে প্রতিমুহূর্তে। আর বাংলাদেশ সম্পর্কে আপনি লিখেছেন, আমরা ‘করোনা’ এক্সপ্রেসে উঠে বসেছি। তো এরইমধ্যে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের বাজেট পেশ করা হয়েছে। এতে স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা কি চলমান বাস্তবতায় যথেষ্ট বলে আপনি মনে করেন?

মতিউর রহমান চৌধুরী: দেখুন, দেশের চলমান বাস্তবতায় মহামারি করোনাভাইরাসের সময় ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তা যথেস্ট বলে আমি মনে করি না।

তবে আমার কাছে অবাক লাগে এ কারণে যে স্বাস্থ্য খাতে যে-টুকু বরাদ্দ থাকে সে-টুকুও যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয় না। সেখানে চুরি-চামারি, দুর্নীতি এবং লুটপাট হয় অথচ কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। ফলে এবারও যেটকু বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সে-টুকুরও তো যথাযথ ব্যবহার হবে না। যে কারণে স্বাস্থ্যখাতে সমস্যা প্রকট হচ্ছে।

দেশের ইতিহাসে বিগত বছরগুলোতে স্বাস্থ্যখাতে কম হলেও যে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে তার থেকে বেশিরভাগ চুরি হয়ে গেছে। চুরি বন্ধ না করে যদি স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ আরও তিনগুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়; তাতে তো কোনো উপকার হবে না। এটা হচ্ছে আমার ধারণা। তবে স্বাস্থ্যখাতের যে বেহাল দশা- সেই বেহাল দশায় দাঁড়িয়ে আমরা যে কত অসহায় অবস্থার মধ্যে আছি! আপনি নিশ্চয়ই জানেন এবং আমার লেখায় আমি বলেছি, যারা বিদেশি কূটনীতিক ছিলেন তারা ঢাকা ছেড়ে চলে গেছেন। কারণ হচ্ছে তারা বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতির এবং চিকিৎসার ভেতরের খবরা খবর জানেন। এখানে মানুষ কিন্তু চিকিৎসা পাচ্ছে না। মানুষ ভীষণ কষ্টে আছে। অনেকে হাসপাতালেও যাচ্ছে না। এমনিতেই মারা যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশে! বিদেশে মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে যাচ্ছে; চিকিৎসা পাচ্ছে। কিন্তু এখানে আক্রান্তরা হাসপাতালে যাওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না।

রেডিও তেহরান: করোনাভাইরাসের কারণে যে লকডাউন চলছে তাতে বিশ্বের সব দেশের মতো বাংলাদেশও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে লকডাউন এ মুহূর্তে একটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। কিন্তু সেভাবে হয়তো বাংলাদেশে লকডাউন মানা হচ্ছে না বলে মিডিয়ায় দেখছি। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন যে, করোনাভাইরাসের ভয়ে জনগণকে না খাইয়ে মারতে পারি না। চলমান বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য যৌক্তিক বলে অনেকে মনে করছেন। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

মতিউর রহমান চৌধুরী: দেখুন, আপনি যে লকডাউনের কথা বললেন। আমি বলব বাংলাদেশে লকডাউনটা কোথায়? এখানে তো অদ্ভূত রকমের সাধারণ ছুটি ছিল। আমরা তো লকডাউন কখনও করি নি। ফলে আমরা লকডাউনের সুবিধা পাব কি করে? আমরা শ্রমিকদের বাড়ি পাঠিয়েছি, কারখানা বন্ধ করেছি। আবার চালু করেছি। এখন বলছি আবার ফিরে আস। আবার চলে যাচ্ছে। এভাবে আমরা গত তিন মাস পরীক্ষা করেছি। এখন আমরা অঞ্চলভিত্তিক লকডাউনের কথা চিন্তা করছি। লকডাউন শব্দটা এইমাত্র উচ্চারিত হলো এখানে। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্য সব দেশে লকডাউন হয়েছে কিন্তু বাংলাদেশে লকডাউন হয় নি। যদিও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একাধিকবার বলেছে; চিঠি দিয়েছে এবং তাদের প্রতিবেদনে তারা মন্তব্য করেছে যে লকডাউন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু আমরা সেই লকডাউনের পথে যাই নি।

দেখুন, জীবন যদি না বাঁচে তাহলে জীবিকা দিয়ে কি হবে? আমি যদি না বাঁচি তাহলে আমার জীবিকা দিয়ে তো কোনো লাভ নেই। আজকে কেন বাংলাদেশে করোনায় আক্রান্ত ১ লাখ ছাড়াল। এর কারণ হচ্ছে এতদিন তো টেস্টই হচ্ছিল না। টেস্ট না হলে তো জানা সম্ভব না যে কতজন আক্রান্ত হলো। এখন আপনারা মানুষকে বলছেন যে , জীবন আগে বাঁচাতে হবে। কিন্তু জীবনও বাঁচল না জীবিকাও হলো না। আমরা এখন এই পর্যায়ে আছি। আমি যেকথাটা বলেছি এবং আপনি উল্লেখ করেছেন যে, আসলে আমরা করোনা এক্সপ্রেসে উঠে বসে আছি। আমরা জানি না যে, আমাদের করোনা গন্তব্য কোথায়? যেকোনো জায়গায় আমরা যেতে পারি। এটাই আমাদের পরিস্থিতি! দেখিনা কি হয়!

দেখুন, পৃথিবীর বহু দেশে করোনা সংকট হয়েছে এবং হচ্ছেও। কিন্তু আমরা কী পদক্ষেপ নিয়েছি? আমাদের চিন্তাভাবনার মধ্যে ও কাজে সমন্বয়হীনতা পাবেন বেশি। দেখা গেল আজ একটা সিদ্ধান্ত নিলাম আবার কাল তা বাতিল করে আরেকটা সিদ্ধান্তে গেলাম। ঢাকার পূর্বরাজা বাজারকে আপনি নিশ্চয়ই জানেন। এ অঞ্চলটিকে লকডাউন করা হলো পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে। সেখানে এরইমধ্যে ২৪ জনের বেশি আক্রান্ত হয়েছেন। একজন মারাও গেছেন। কিন্তু লকডাউন কিছুই হয়নি। আমাদের রিপোর্টরা যারা ওখানে ছিলেন তারা বলছেন লকডাউন বলে কিছু নেই- কেবল একটা বাঁশের লঠি দিয়ে আটকানো আছে। আর কিছুই নেই। পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। তারাও আক্রান্ত হচ্ছেন। অর্থাৎ আমরা বিষয়টিকে খুব হেলাফেলা করেছি। যেকারণে সব দেশ থেকে করোনা চলে গেলেও আমাদের দেশে দীর্ঘস্থায়ী হবে। তাছাড়া করোনা নিয়ে বিদেশি প্রতিবেদনগুলোকে আমরা আমলেই নেইনি।

 

 

 

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

প্রতিবেদনটি জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print