বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে মহমারি করোনার প্রভাব সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড,আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বললেন, আমাদের শিক্ষার্থীদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সংসদ সদস্য বিত্তবান শ্রেণি সবাইকে স্ব স্ব এলাকার শিক্ষার্থী এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নিতে হবে। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, করোনার অন্ধকার চলে যাবে। শিক্ষার্থীদের মনোবল হারালে চলবে না। এখন শিক্ষকদের মহা দায়িত্ব রয়েছে তাদের ছাত্র-ছাত্রীদের উপর। সার্বিকভাবে তাদের পাশে থাকতে হবে।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পরপরই বাংলাদেশে লকডাউন দেয়া হয়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় নতুন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে-জানা যাচ্ছে সেপ্টেম্বর মাসও বন্ধ থাকবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্তকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: দেখুন, করোনার যে মহাসংকট আমরা এই মুহূর্তে অতিক্রম করছি সেই সময় শিক্ষাসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে বড় ধরণের প্রভাব ফেলছে। আর সেটি মূলত নেতিবাচক প্রভাব। আমরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু রাখা কোনো অবস্থাতেই সম্ভব নয়; বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে। এখানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। আর শ্রেণিকক্ষের তুলনায় ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা এত বেশি যে আমাদের স্বাভাবিক সময়ে শ্রেণিকক্ষে ছেলে-মেয়েরা বলা চলে গায়ে গা ঘেষে, কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে তারা ক্লাস করে। সেই জায়গায় বর্তমান করোনা প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাদের শ্রেণিকক্ষে আনা অসম্ভব ব্যাপার। সেক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সেটি প্রাথমিক বিদ্যালয় হোক কিংবা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক-কোনোটাই কিন্তু খোলা যাচ্ছে না।

সর্বশেষ সরকারি নির্দেশে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে। যেমন তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ছেলে-মেয়েদের সাথে কিছুটা যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছে। আর প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো- মূলত সরকারের যে টেরিস্টরিয়াল টেলিভিশন চ্যানেল আছে সেই চ্যানেলকে ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে। আর সেভাবেই তারা শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

তবে করোনার সাথে সাথে বাংলাদেশে আমরা একটা দীর্ঘস্থায়ী বন্যার মোকাবেলা করছি। বন্যার সময় দেশের ৩০ শতাংশ জায়গা এখন পানির নিচে আছে। এই ৩০ শতাংশ বন্যা কবলিত স্থানে যেসব শিক্ষার্থী আছে তারা তো অনলাইনের সুযোগটা নিতে পারছে না। শুধু তাই নয় সাধারণভাবে আমাদের বহু ছেলে-মেয়ে অনলাইনে তথ্য প্রযুক্তির সুযোগ সুবিধা নেয়ার জন্য যে অবকাঠামোগত ব্যবস্থা ল্যাপটপ, স্মার্টফোন এগুলোর অভাব রয়েছে। তো সার্বিক অবস্থায় বেশ কিছু ছেলে-মেয়ে সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকছে। এই ধরণের একটা পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু শিক্ষা ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর লেখাপড়া, আদান প্রদান, সাক্ষাতে আলাপ আলোচনা এর কোনো বিকল্প কিন্তু নেই। আর সেজন্য আমাদের আরও কিছু দিন অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো সুযোগ তো আমি দেখছি না।

রেডিও তেহরান: জ্বি আপনি বলছিলেন শ্রেণিকক্ষে সরাসরি পাঠদান পদ্ধতি হচ্ছে উৎকৃষ্ট পদ্ধতি। তো সেই অবস্থা তো এখন কোনোভাবেই সম্ভব না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এভাবে বন্ধ করার ফলে বা বন্ধ রাখার ফলে দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী কি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ছে বলে অনেক মনে করেন, আপনি কি তেমনটি মনে করেন?

অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: আমিও তেমনটি মনে করি যে শিক্ষার্থীরা একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। কিন্তু তার চেয়ে আমি বেশি গুরুত্ব দেই- আমাদের শিক্ষার্থীরা যারা আগামী দিনের বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেবে তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বেঁচে থাকলে একবছর পরে হলেও তারা আবার লেখাপড়া শুরু করতে পারবে। লেখাপড়ার সঙ্গে আবার তারা যুক্ত হতে পারবে। এই সময়ে যেভাবে করোনার সংক্রমণ ঘটছে তাতে যদি আমরা শিক্ষার্থীদের বাঁচিয়ে না রাখতে পারি সেটা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক। করোনার কারণে অনেক শিক্ষার্থীদের বাবা-মায়েরা আয়-উপার্জনহীন হয়ে পড়েছে। তাঁদেরকে এখন দুবেলা খাদ্য সংস্থান করে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি। এটি আমাদের বড় দায়িত্ব। প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা জানেন যে তাদের শিক্ষার্থীদের আজ কি অবস্থা! তাদেরও উচিত হবে তথ্য-প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেয়া এবং তাদের খবরাখবর নেয়া। তারা কি সত্যিকারার্থে খাদ্য পাচ্ছে কি না; নাকি অনাহারে অর্ধাহারে তারা আছে। সেসব দেখা এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর এখন অতিরিক্ত দায়িত্ব পড়েছে। সেই দায়িত্ব এখন আমাদের পূরণ করার সময় এসেছে।

রেডিও তেহরান: অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক আপনি চমৎকার একটি বিষয় বললেন, সেটি হচ্ছে এই দুর্যোগের সময় জৈবিকভাবে শিক্ষার্থীদের বাঁচিয়ে রাখতে হবে এবং তাদের পাশে থাকতে হবে। কিন্তু করোনাভাইরাসের কারণে এভাবে যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয় তাহলে অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনে নানাভাবে জটিলতা দেখা দেবে। তাছাড়া বাংলাদেশের মতো দেশে আর্থ সামাজিক কারণে শিক্ষার্থীদের মানসিক যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে বা হচ্ছে সে বিষয়ে আপনি কি বলবেন?

অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: দেখুন, আমি সেটাই বলছিলাম। এখন বাংলাদেশ তথ্য-প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছে। সারা দেশেই মোটামুটিভাবে তথ্য-প্রযুক্তির স্পর্শ আছে। হয়তো কোনো কোনো প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছেলে-মেয়েরা সরাসরি তথ্য প্রযুক্তির সুযোগ নিতে পারছে না। কিন্তু কাছাকাছি উপজেলা পর্যায়ে সরকারের যে তথ্য প্রযুক্তি কেন্দ্রগুলো আছে সেখান থেকে তাদের সে সুযোগ দেয়া যেতে পারে। এইসব সুযোগের সদ্ব্যহার করে যারা এখন অধ্যায়নরত শিক্ষার্থী আছে তাদের মানসিক শক্তি জোগাতে হবে। তাদেরকে মানসিকভাবে সাহায্য সহযোগিতা করা।তাদেরকে দৈহিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য সংস্থানসহ বিভিন্ন ধরণের সুযোগ সুবিধার সম্প্রসারণ করা, পরামর্শ দেয়া, চিকিৎসা পরামর্শ দেয়া একইসাথে পাঠক্রমের সাথে কিছুটা যুক্ত রাখার চেষ্টা করা যাতে তাদের সময়টা কিছুটা অর্থপূর্ণভাবে ব্যয় করতে পারে। এসব সার্বিক বিষয়গুলো কিন্তু একসাথে দেখতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যদি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে শারীরিকভাবে সুস্থ থেকে কিন্তু খুব লাভ হবে না। অন্যদিকে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মানসিকভাবে সুস্থ বলা যাবে না। এই সমস্যাগুলো একসাথে দেখা প্রয়োজন। কারণ আমরা এখন মহা সংকটে আছি। আর মহাসংকটময় মুহূর্তে আমাদের দায়িত্বও মহা পর্যায়ে পড়েছে।

রেডিও তেহরান: করোনাভাইরাসের যে পরিস্থিতি আমরা দেখতে পাচ্ছি বিশ্বজুড়ে তাতে খুব সহসা এ সমস্যা দূর হবে বলে মনে হয় না। সেক্ষেত্রে কতদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা সম্ভব হবে? আর এক্ষেত্রে সরকারের করণীয় সম্পর্কে আপনার কি পরামর্শ?

অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: সরকারের প্রতি পরামর্শ হচ্ছে এই আপৎকালীন সময় যতদিন পর্যন্ত করোনার কার্যকর প্রতিষেধক টিকার সন্ধান না পাই ততদিন পর্যন্ত অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের বাড়িতে রেখে সব ধরণের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা। আর এজন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এলাকার জনপ্রতিনিধি ও জাতীয় সংসেদর সদস্যদের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হবে। তাঁরা স্ব স্ব এলাকার শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখবেন। একইসাথে আমার আশা থাকবে- বড়ধরণের যে বিত্তবান শ্রেণি দেশে বিদেশে আছেন তারা যদি তাদের স্ব স্ব এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নেন-তাহলে খুব ভালো হয়। বিশেষকরে শিক্ষকদের অবস্থাও কিন্তু এখন খুব খারাপ। যেহেতু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা আসছে না; অনেক প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা এখন বেতন পাচ্ছেন না। কারণ ছাত্র-ছাত্রীদের টিউশন ফি’র ওপর তাদের মাসিক  বেতন নির্ভর করে। এ জায়গাতে আমাদের বিত্তবান পরিবারগুলোকে এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

জনাব অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: সবশেষে বাংলাদেশসহ বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা আপনার ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে এই করোনা মহামারিকালে আপনার কি পরামর্শ থাকবে?

অধ্যাপক আরেফিন সিদ্দিক: আমার পরামর্শ থাকবে যে, আমরা করোনা মহামারিকালে একটা সংকটের মধ্যে আছি। কিন্তু কোনোভাবে মনোবল হারালে চলবে না। মনোবল শক্ত রেখে সামনের দিকে তাকাতে হবে। এই সংকটকালে যে যতটকু পারে শিক্ষার সাথে জড়িত থাকতে হবে। হতে পারে সেটা তথ্য-প্রযুক্তির মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রমের সাথে যুক্ত থাকা অথচ স্ব উদ্যোগে বাড়িতে বসে তার নিজ নিয়মিত পড়াশুনা এগিয়ে নেয়া। সব সময় মনে রাখতে হবে এই অন্ধকার সময় চলে যাবে। আমি একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমারই দায়িত্ব বেশি থাকবে। কারণ আমি দেখতে পাচ্ছি নতুন প্রজন্মের উপরই সারা পৃথিবীর এগিয়ে যাওয়া নির্ভর করছে। ফলে প্রত্যেকেরই নিজেদের যে সক্ষমতা আছে, যে অভিজ্ঞতা তাদের আছে তা দিয়ে এই করোনাকালীন সংকট মোকাবেলা জন্য নিজেদের তৈরি রাখবে। এই সময়টাতে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। পাশাপাশি মানসিকভাবে প্রত্যেকে প্রত্যেকের কাছে থাকতে হবে। মানসিক নৈকট্য সৃষ্টি করা দরকার। এতে মানবতাবোধের জায়গাটা আরো জাগ্রত হবে। করোনা পরবর্তী সময় আরো বেশি মানবিক হবে  আমাদের শিক্ষার্থীরা এটিই আমি আশা করব।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print