ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়া এবং তার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার যে চেষ্টা চলছে শেষ বিচারে তা ভালো হবে না। এতে ইসরাইলের ঔদ্ধত্য ও আগ্রাসী আচরণ আরও বেড়ে যাবে। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড.আকমল হোসেন।

তিনি বলেন,সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন যে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করেছে এতে আরবদের এবং মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থানকে দুর্বল করছে। তারা তাদের নিজেদের স্বার্থকে বড় করে দেখছে। এসবের মাধ্যমে ফিলিস্তিনে শান্তি আসবে না।

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছন গাজী আবদুর রশীদ। পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো।

রেডিও তেহরান: জনাব অধ্যাপক আকমল হোসেন, এবার আরবদেশ বাহরাইন ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করেছে। বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?

অধ্যাপক আকমল হোসেন: দেখুন,ইসরাইল বিষয়ে এতদিন পর্যন্ত আরবদের মধ্যে যে একটা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ছিল সেটা নিঃসন্দেহে দুর্বল করছে। আমি বিষয়টি সম্পর্কে আরেকটু পেছনে গিয়ে বলতে চাই,এর আগে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল মিশর এবং জর্ডান। আর সেই স্বীকৃতি দেয়ার পেছনে আমরা দেখতে পাই ১৯৭৮ সালে মিশরের সাথে ইসরাইলের একটা শান্তি স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তার আগে অর্থাৎ যখন ইসরাইলের জন্ম হয়েছিল তখন শুধুমাত্র ইসলামি বিপ্লব পূর্ব ইরান এবং তুরস্ক স্বীকৃতি দিয়েছিল।

আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইন ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করেছে। আর সেটি তাদের স্বার্থে। অর্থাৎ এই সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মাধ্যমে তারা ইসরাইলের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য জোরেশোরে শুরু করার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এটি তাদের এককভাবে গৃহীত সিদ্ধান্ত। এব্যাপারে আরব লীগ কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। আরব দেশগুলোর সংগঠন আরব লীগের এখানে কোনো ভূমিকা নেই।

তবে এই সিদ্ধান্তের পেছনে সৌদি আরবের প্রচ্ছন্ন সমর্থন আছে। যদিও সৌদি আরব প্রকাশ্যে বলছে তারা ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেবে না। অথচ তাদের উপর দিয়ে ইসরাইলের বিমান চলাচলের সুযোগ দেয়া হয়েছে। এতে বোঝা যায় সৌদি আরবের ভূমিকাটা সন্দেহজনক। আর এসবের পেছনে ভূমিকা রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। আমেরিকার বর্তমান প্রশাসন চায় আরব রাষ্ট্রগুলো ধীরে ধীরে এভাবে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করুক। সুতরাং সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এই যে পদ্ধতি অর্থাৎ শান্তি চুক্তি করা এটা ইসরাইলকে মোকাবেলার আরবদের যে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান সেই অবস্থানকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

রেডিও তেহরান:শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে আরবদেশগুলো একের পর এক ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক করছে। কিন্তু এ ধরণের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার মাঝ দিয়ে কি মধ্যপ্রাচ্যে বিশেষ করে ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে?

অধ্যাপক আকমল হোসেন: কোনোভাবেই তা সম্ভব না। কেননা শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নির্ভর করছে ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সঙ্গত যে অধিকার অর্থাৎ তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রগঠনের অধিকার, নিজেদের ভূ-খণ্ডের উপর সার্বভৌমত্ব প্রয়োগের অধিকার-এসব অধিকারের বাস্তবায়নের উপরই নির্ভর করে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়টি। আমরা দেখেছি ষাটের দশক কিংবা সত্তুরের দশকে আরবদেশগুলোর প্রধান যারা ছিলেন এবং তাদের জনগণের পক্ষ থেকে ফিলিস্তিনের ওপর সমর্থন ছিল। যেমন ধরুন মিশর, সিরিয়া এর বাইরে যেসব রাজা বাদশা কিংবা প্রজাতন্ত্র যারা ছিল তারা বিভিন্নভাবে ফিলিস্তিনকে সমর্থন দিত। ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ আন্দোলনকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করা হতো। রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিকভাবে সমর্থন দেয়া হতো। তবে আজকে কিন্তু তাদের সেই সমর্থন আর সেভাবে নেই। বরং বলা যায় ফিলিস্তিনের জনগণের সাথে আরব রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের মধ্যে একধরণের ফাটল তৈরি হয়েছে। আর যেসব রাষ্ট্র এখন ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করেছে তারা নিজেদের স্বার্থে সেটা করেছে।

একটা সময় বলা হতো আমরা আরব জাতি। সেই আরব জাতীয়তাবাদের বিষয়টিকে বর্তমানে গুরুত্বহীন করে তোলা হয়েছে। আর এসব করতে গিয়ে তারা ফিলিস্তিনিদের যে দাবি এবং অধিকার তাকে নগণ্য করে তুলছে।

রেডিও তেহরান:পারস্য উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য এবং গুরুত্বপূর্ণ দেশ কাতার এবং পাকিস্তান পরিষ্কার করে বলেছে, তারা ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করবে না। পাকিস্তান এবং কাতারের এই অবস্থানকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এই দুটি দেশের অবস্থানের গুরুত্ব কতটা?

অধ্যাপক আকমল হোসেন: দেখুন, পাকিস্তান শুরু থেকেই ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার বিরোধী ছিল। একসময় মধ্যপ্রাচ্যে পাকিস্তানের একটা ভালো প্রভাব ছিল। যেমন ষাটের দশকে ইরান, তুরস্ক এবং পাকিস্তান মিলে আরসিডি বলে একটি আঞ্চলিক সংগঠনের জন্ম দিয়েছিল। এছাড়া পাকিস্তান সৌদি আরব, জর্ডানসহ এ অঞ্চলের আরও দেশে সেনাবাহিনী দিয়ে সাহায্য করত। তাদের সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ দিত। তবে আজকের প্রেক্ষাপটে আমার মনে হয় না পাকিস্তানের সেই আগের মতো প্রভাব আছে। তা সত্ত্বেও তার যে ইসরাইলকে স্বীকৃতি না দেয়ার ইচ্ছা সেটা তাদের নীতির ধারাবাহিকতায় তারা প্রকাশ করবে সেটাই স্বাভাবিক।

আর কাতার হচ্ছে একটি আরব রাষ্ট্র। তা সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে তাদের প্রতিবেশী সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও ওমানের সাথে সম্পর্কের মধ্যে একটা ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। কিংবা আমি অন্যভাবে বলব কাতারের সঙ্গে ঐসব দেশ একটা সংঘাতমূলক সম্পর্কের দিকে গেছে। তারা কাতারের ওপর একটা অবরোধ দিয়ে রেখেছে।

অন্যদিকে আমরা দেখছি ইরানের সাথে কাতারের সম্পর্ক অনেক বেশি গাঢ়। ইরান, কাতার, লেবাননের হিজবুল্লাহ,ফিলিস্তিনের হামাস তারা সবাই মিলে ফিলিস্তিনকে সহযোগিতা করছে। ফলে আরব রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিন ইস্যুতে কাতারের অবস্থান শুধু মাত্র ইসরাইলকে অস্বীকৃতি জানানোই না এটা তার বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির সাথেও সম্পর্কিত।

রেডিও তেহরান:ইসরাইলকে কেন্দ্র করে একসময় মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্বে একটি ঐক্য গড়ে উঠেছিল এবং আরব লীগ ও ইসলামি সম্মেলন সংস্থা বা ওআইসি’র মতো সংস্থা গড়ে উঠেছিল। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। তাহলে কি বলা যায় ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত?

অধ্যাপক আকমল হোসেন: আপনার পর্যবেক্ষণ ঠিক আছে বলে আমি মনে করি। ১৯৬৯ সালে মুসলিম দেশগুলো মিলে ওয়াইসির জন্ম দিয়েছিল। মুসলমানদের অত্যন্ত পবিত্র স্থান প্রথম কেবলা আল-আকসা মসজিদের পবিত্রতা লঙ্ঘিত হওয়ার প্রেক্ষিতে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো মিলে ওয়াইসির জন্ম দিয়েছিল। পরবর্তীতে ইসরাইলের বিরোধীতার ব্যাপারে সব মুসলিম রাষ্ট্র কিন্তু একমত ছিল। ইসরাইল প্রসঙ্গে সবাই এক নীতিতে বিশ্বাস করত। সবাই তখন ইসরাইলের বিরোধীতা করত এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সমর্থন করত। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সেই নীতি এবং অবস্থান আর তারা ধরে রাখতে পারছে না। ইসরাইলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার নীতি বা ভাবনা কখনই এর আগে আরবদের মধ্যে এবং মুসলিম রাষ্ট্রগুলো মধ্যে ছিল না। এর সুস্পষ্ট কারণ হচ্ছে ইসরাইল যেহেতু ফিলিস্তিনের অধিকারকে স্বীকার করেনি আর সেকারণে মুসলিম এবং আরব রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলের অস্তিত্বকেও স্বীকার করত না। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে একের পর এক তারা ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করছে, ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এটা আরব জগতে এবং মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে। শেষ বিচারে এটা ভালো হবে বলে আমার মনে হয় না।

কারণ- ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়ার ফলে তার যে ঔদ্ধত্য ও আগ্রাসী আচরণ তা আরও বাড়াবে বলেই আমার মনে হয়।

রেডিও তেহরান:তো জনাব অধ্যাপক ড. আকমল হোসেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইসরাইলের সাথে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি এবং আগামীতে কি হতে পারে সেসব বিষয়ে রেডিও তেহরানকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে আবারও অনেক অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

অধ্যাপক আকমল হোসেন: আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print