মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির ছক পাল্টে যাচ্ছে। এরইমধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন-ইসরাইলের সাথে পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক স্থাপনের চুক্তি করেছে। তবে ঐ চুক্তিকে ফিলিস্তিনের সব দল ও সংগঠন বিশ্বাসঘাতকা বলে উল্লেখ করেছে। বাহরাইনে এর বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে বিক্ষোভ চলছে। সেখানকার জনগণ বলছে আমরা ফিলিস্তিনের জনগণের পাশেই রয়েছি।

তো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের চুক্তি নিয়ে কথা বলেছি বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ক ভাষ্যকার অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামানের সঙ্গে। রেডিও তেহরানকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে সুনির্দিষ্ট করে তিনি বলেছেন, ইসরাইলের এই ধরণের স্বীকৃতি নতুন অস্থিতিশীলতা ও অস্থিরতার দিকে নিয়ে যাবে। আরব বিশ্বের জন্য ভবিষ্যতে এটি সর্বনাশের পথ খুলে দিতে পারে

তাঁর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ:

বিশিষ্ট এই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক  আরও বলেছেন, ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইরানের অবস্থানের কারণে আজকে ইরানকে বিশ্ব শক্তির মর্যাদা দেয়া হয়।

‘Iran is unstopable. ইরানের সামরিক এবং নিরাপত্তা সামর্থ্য মধ্যপ্রাচ্যে অতুলনীয় হয়ে যাবে। ইসরাইলের জন্য এটা একটা বড় চিন্তার কারণ। তাই তারা ডোনল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সহযোগিতায় এসব করছে।

কিছু জনবিচ্ছিন্ন আরব দেশ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ও নিজেদের ভবিষ্যত নিরাপত্তার জন্য ইসরাইলের সঙ্গে এধরনের চুক্তি করছে।

ইসরাইল তার সীমারেখা বৃদ্ধি করে গ্রেটার ইসরাইল করার পরিকল্পনা করছে। আর তাতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র বাদ যাবে। কিন্তু বিশ্ববাসীর কাছে এটা হবে চরম অনৈতিক বাস্তবতা হবে।

পুরো সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। এটি গ্রহণ ও উপস্থাপনা করেছেন গাজী আবদুর রশীদ।

রেডিও তেহরান: জনাব, অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান, সম্প্রতি ইহুদিবাদী ইসরাইল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার একটি চুক্তি করেছে এবং এরইমধ্যে দু’দেশের মধ্যে বিমানের সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে। কিভাবে দেখছেন এই চুক্তিকে?

অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান: দেখুন, এই যে ইসরাইল এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার যে একটি চুক্তি হয়েছে এতে নতুন কিছু নেই। এটা জাস্ট একটা ফর্মালাইজ করা অর্থাৎ বিশ্ববাসীকে জানানো। আর সৌদি আরবের জন্য ভবিষ্যতে সরাসরি সম্পর্ক করার পথ খুলে দেয়া।

আসল কথা হচ্ছে এখানে যে শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতায় আছে তারা তো জনবিচ্ছিন্ন। তারা ক্ষমতায় থাকার জন্য এবং ভবিষ্যতে তাদের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।

কেননা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের উত্থান তাদেরকে অনেক বেশি চিন্তিত করে দিয়েছে। আর সেদিক থেকে ইসরাইল তাদেরকে যে গোয়েন্দা নির্ভরশীলতা দেয় এবং তাদের নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতেও যে সহযোগিতা করে সেটাই এখন একটা নতুন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ইউএই বলতে প্রায় সাতটার মতো ছোটো ছোটো রাজ্য-এগুলো সবই প্রায় গণবিচ্ছিন্ন রাজ্য। তবে তারা অর্থনৈতিক দিক থেকে উন্নতি করছে শুধুমাত্র তেলের কারণে। আর ইসরাইলের সাথে তাদের একটা বড় ধরণের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে উঠবে। এটাই বোঝা যায়।

রেডিও তেহরান: বিভিন্ন খবর থেকে জানা যাচ্ছে যে, আরব আমিরাতের পরে সৌদিসহ আরো কয়েকটি আরব দেশ ইসরাইলের সঙ্গে চুক্তি করবে বলে ভেতরে ভেতরে কাজ চলছে। এরইমধ্যে বাহরাইন চুক্তি করেছে।

প্রশ্ন হচ্ছে- আরব দেশগুলো কেন ইসরাইলের সঙ্গে চুক্তি করতে এতটা মরিয়া হয়ে উঠেছে?

অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান: এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে একটা মেরুকরণ সৃষ্টি হয়েছে। যেটা অনেকটা ফর্মাল অ্যালায়েন্স নিরাপত্তা চুক্তিতে রুপ নিচ্ছে। এখানে মার্কিন উপস্থিতি নিশ্চিত তা বলা যায়। তাদের সেন্ট্রাল কমান্ড রয়েছে। তাছাড়া আরব বিশ্বের দেশগুলো স্পষ্টভাবে জানে এবং দেখতে পাচ্ছে ইরানের সাথে চীনের যে বিশাল একটা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেটা ইরানকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাবে যে Iran is unstopable. ইরানের সামরিক এবং নিরাপত্তা সামর্থ্য মধ্যপ্রাচ্যে অতুলনীয় হয়ে যাবে। ইসরাইলের জন্য এটা একটা বড় চিন্তার কারণ।

‘Iran is unstopable. ইরানের সামরিক এবং নিরাপত্তা সামর্থ্য মধ্যপ্রাচ্যে অতুলনীয় হয়ে যাবে। ইসরাইলের জন্য এটা একটা বড় চিন্তার কারণ।’

আর এই যে সৌদি আরবসহ আরব দেশগুলো যাদের সাথে ইসরাইলের মিত্রতা রয়েছে তারাও এটাকে একটা বড় হুমকি হিসেবে দেখছে। কাজেই ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক করাটা একটা বড় স্ক্রিন তৈরি করা। একদিকে ইসরাইল তার বাস্তব সীমারেখা বৃদ্ধি করছে এবং গ্রেটার ইসরাইল করার পরিকল্পনা করছে। আর এই গ্রেটার ইসরাইল পরিকল্পনায় কিন্তু ফিলিস্তিন রাষ্ট্র বাদ যাবে। ইসরাইলের যতই সামর্থ থাকুক না কেন বিশ্ববাসীর কাছে এটা হবে চরম অনৈতিক বাস্তবতা হবে। আর সেদিক থেকে গ্রেটার ইসরাইলের ধারনাকে বৈধতা দেবে সৌদি আরবসহ অন্যান্য কয়েকটা আরব রাষ্ট্র। আমরা সৌদি আরবের আচরণ থেকে দেখতে পাচ্ছি তারা ফিলিস্তিনিদের বিষয় থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে। বর্তমানে ইসরাইলের এই ধরণের স্বীকৃতি মেরুকরণকে একটা নতুন অস্থিতিশীলতা ও অস্থিরতার দিকে নিয়ে যাবে।

রেডিও তেহরান: ইসরাইলের সঙ্গে যেকোনো মুসলিম দেশের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে আসছে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। বিষয়টি নিয়ে ইরানের অবস্থান সম্পর্কে আপনার পর্যবেক্ষণ কি?

অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান: ইরানের অবস্থান অত্যন্ত নৈতিক শক্তির দ্বারা নিশ্চিত হয়েছে। ইরানের কমিটমেন্ট, চিন্তাধারার ধারাবাহিকতা এবং তার যে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি সেটা খুবই স্পষ্ট। মুসলমানদের ওপর  যে অন্যায় করা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের ওপর যে অত্যাচার করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং এ সত্যটাকে অত্যন্ত কুণ্ঠার সাথে ইরান বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছে।

ইরান ফিলিস্তিনিদের পক্ষে এই অবস্থান নিয়েছে বলেই আমাদের বাংলাদেশের মতো অনেক দেশ এখনও ইসরাইল থেকে নিজেদের দূরে রাখতে পারছি। আর ফিলিস্তিনিদের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় ইরানকে অনেক মূল্য দিতে হয়। আমেরিকা তাকে একঘরে করে রাখতে চায়। নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইরানের বিরুদ্ধে তারা চরম অবস্থান নিয়েছে কিন্তু তারপরও ইরান ফিলিস্তিন ইস্যুতে তার নৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসেনি। যারফলে আজকে ইরানকে বিশ্ব শক্তির মর্যাদা দেয়া হয়।

তার হয়তো সামরিক সামর্থ ঐ পর্যায়ে যায়নি কিন্তু তার নৈতিক অবস্থান ইরানকে এমন একটা পর্যায়ে নিয়েছে যার ফলে ইউরোপের দেশগুলো এবং মুসলিম বিশ্ব ইরানের এই অবস্থানকে অত্যন্ত সম্মান করে। এমনকি অ্যাফ্রো এশিয়ান দেশগুলোও ইরানকে অত্যন্ত সম্মান করে। এর প্রমাণ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘে ইরানের বিরুদ্ধে প্রস্তাব এনে পরাজিত হয়েছে।

একমাত্র ইরানের পক্ষেই সম্ভব হয়েছে আমেরিকাকে নিশ্চিতভাবে শান্তির বিপক্ষ শক্তি হিসেবে প্রমাণিত করা। অপরদিকে একথাও সত্যি আজকে ইরানের এই অবস্থান আছে বলেই ইসরাইল ভয় পায় ইসরাইল আরও অনেক বেশি আঘাত করতে পারত ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে কিন্তু সেটা ইরানের কারণে করতে সাহস পাচ্ছে না

রেডিও তেহরান: সবশেষে আপনার কাছে যে বিষয়টি জানতে চাইব-সেটি হচ্ছে-ইহুদিবাদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর সমন্বিতভাবে তেলআবিবের আগ্রাসন মোকাবেলা ও নানা কৌশল ঠিক করার জন্য ওআইসি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একই উদ্দেশ্য নিয়ে আরব লীগ গঠিত হয়েছিল। মূলত ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরাইলের সাথে কোনো রিকগনেশন না, সম্পর্ক না এবং বৈধতা না- এ কয়েকটি না’র ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু যখন আরব দেশগুলো ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করছে তখন আরব লীগ এবং ওআইসি প্রতিষ্ঠার বৈধতা কি অকার্যকর হয়ে গেছে বলে মনে হয়?

অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান: দেখুন, ওয়াইসি কিংবা আরব বিশ্বের এইসব দেশগুলোর নৈতিকতা অত্যন্ত নিম্ম পর্যায়ে চলে এসেছে। বিশেষভাবে এখন যে টা খুবই ডিসটার্বিং বাস্তবতা সেটা হচ্ছে, ইসরাইল কর্তৃক তার যে গোলান হাইড এনেক্সেসন পলিসিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বৈধতা দিয়েছে। আর এই বৈধতা দেয়ার অর্থ হচ্ছে ইসরাইল যে জোরপূর্বক আরব ভূমি দখল করে রেখেছিল এবং এখনও দখল করছে। ১৯৬৮ সালের সেই অবস্থানকে দীর্ঘসময় ধরে সমর্থন দিয়ে এসেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেটাকে আরব বিশ্ব সৎ দালাল হিসেবে বিবেচনা করত।

সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন যে বিশ্বাসঘাতকতা করল এখন ইসরাইল গোলান মালভূমিকে বৈধকরণ করার পথে আরও উদ্দীপনা পেয়ে গেল এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না আরব বিশ্বের জন্য ভবিষ্যতে এটি সর্বনাশের পথ খুলে দিতে পারে

একবার গোলান মালভূমির বৈধতা পেয়ে গেলে ফিলিস্তিনের যে বাকি অংশ আছে সেগুলোও দখল করে সেখানে বৈধতা আনতে চাইবে। তবে ভালো কথা হচ্ছে ইসরাইলের এই অ্যানেক্সেসন ইউরোপে মার্কিন মিত্ররা কেউ মেনে নেয় নি। মুসলিম বিশ্ব কিংবা আরব বিশ্ব বুঝতে পারছে যে ইসরাইলের বাস্তব আচরণ কতটা ধ্বংসাত্মক।

আমি তো মনে করি ইসরাইলের এসব আচরণ সেই দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের হলোকস্টের স্মৃতির কথাই মনে করিয়ে দেবে বিশ্বকে, যে কেন ইহুদিবাদের এই পরিণতি হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে।

আজকে আমরা ইসরাইলের এই আচরণ থেকে বুঝতে পারি এরা কত মারাত্মক ও ভয়ঙ্কর একটা জাতি যারা আন্তর্জাতিক আইনের কোনো তোয়াক্কাই করে না।

রেডিও তেহরান: ওয়াইসি  সম্পর্কে আপনি কি কিছু রেফার করবেন..

অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান: দেখুন, ওয়াইসির সীমাবদ্ধতা যতই থাকুক না কেন- এটি  না থাকার চেয়ে থাকা প্রয়োজন। কেননা তাদের মধ্যে যে মারাত্মক ভিন্নতা রয়েছে বলতে গেলে একেবারে অকার্যকর একটা সংস্থা সেটা ফুটে ওঠাটা প্রয়োজন। এটা বুঝতে পারাটা দরকার এবং ওয়াইসি আছে বলেই আমরা জানতে পারি লুকোনো নীতি আর সন্মুখ নীতির দূরত্ব কমে গেছে।

আজকে আরব বিশ্বের যারা ইসরাইলের সাথে হাত মেলাচ্ছে তারা এক্সপোজড হচ্ছে এবং তারা যে নৈতিক দিক থেকে দুর্বল সেটা ওয়াইসির মাধ্যমেই বুঝতে পারা যাচ্ছে। কাজেই ওয়াইসি থাকাতে আমরা একটা মাপকাঠি পাচ্ছি। যার কারণে আমরা বুঝতে পারছি  ওয়াইসির সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের পররাষ্ট্র নীতিতে কতখানি বিভক্ত হয়ে আছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে ওয়াইসির ভবিষ্যত একেবারে অন্ধকার। আমরা যেহেতু ওয়াইসির সীমাবদ্ধতাগুলো বুঝতে পারছি তার মাধ্যমেই কিন্তু ভবিষ্যতে আমরা ওয়াইসির ব্যাপারে একটা আদর্শ অবস্থান নেয়ার কথা ভাবতে পারি; চিন্তা করতে পারি।

রেডিও তেহরান: তো অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে রেডিও তেহরানকে সময় দেয়ার জন্য  আপনাকে আবার ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাদেরকে সময় দেয়ার জন্য।

অধ্যাপক শাহীদুজ্জামান: আপনাদেরওকে ধন্যবাদ।

 

 

 

 

 

 

 

 

পার্সটুডে/গাজী আবদুর রশীদ

জনস্বার্থে প্রকাশ করা হলো

image_pdfimage_print