১৯৫২ সালের এই দিনে বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করতে গিয়ে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকেই জীবন দিয়েছিলেন। সে হিসেবে এই দিনটি একটি শোকের দিন। আবার ২০০০ সালে জাতিসংঘের অঙ্গ সংগঠন ইউনেস্কো একে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করায় এটি একটি আনন্দের দিন। তবে একটি কেবল শোক কিংবা আনন্দের দিনই নয়, এটি একটি শিক্ষা গ্রহণের দিন। ভাষা শহীদরা তাদের জীবন দিয়ে আমাদের শিখিয়েছেন, একুশ মানে অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা। সে অন্যায় কেবল ভাষার ক্ষেত্রেই নয়, যে কোনো বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর শিক্ষা দিয়েছেন ভাষা শহীদেরা। তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, বর্তমান বিশ্বের ৭০০ কোটি মানুষ ছোট-বড় মিলিয়ে সাত হাজারেরও বেশি ভাষায় কথা বলে। তবে ভাষাতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, আগামী একশ বছরের মধ্যে প্রায় তিন হাজার ভাষা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কারণ অতীতেও অনেক ভাষা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। একসময় পাশ্চাত্যের একটি বিখ্যাত ভাষা ছিল ‘ল্যাটিন’। কিন্তু এ ভাষায় এখন আর কেউ কথা বলে না। ভারতীয় উপমহাদেশের এমন একটি ভাষার নাম ‘সংস্কৃত’। ধর্মীয় কাজের বাইরে এর কোন ব্যবহার নেই। মধ্যযুগে ব্রিটেনের একটি ভাষা ছিল ‘কর্নিশ’। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত একজন মহিলা জীবিত ছিলেন যিনি ঐ ভাষায় কথা বলতেন। তার মৃত্যুর পর ঐ ভাষাটিও বিলুপ্ত হয়ে যায় । এছাড়া, কুয়েতে লা আইয়োলা ভাষায় ২ জন, রাশিয়ায় টের সমি ভাষায় ২ জন, রাশিয়ায় ভটিগ ভাষায় ২০ জন, নরওয়ে ও সুইডেনে উসি সামি ভাষায় ২০ জন মানুষ কথা বলে। হয়তো খুব শিগগিরি এসব ভাষাও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এক হিসাবে দেখা গেছে,আজকের পৃথিবীতে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে এমন ৫১টি ভাষা আছে যেগুলোর প্রতিটিতে মাত্র একজন করে ব্যবহারকারী রয়েছে! এ চিত্র থেকে একটা বিষয় পরিস্কার যে,বিশ্বের জীবন্ত ভাষাগুলো দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। এই বিলুপ্তির হার বন্যপ্রাণী কিংবা গাছপালা বিলুপ্তির হারের চেয়েও বেশী। কিন্তু বাংলাভাষার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত দেখা যায়। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান বিশ্বের প্রায় ২৬ কোটি মানুষ বাংলাভাষায় কথা বলে। বাংলা ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা বিশ্বে বর্তমানে ৬ষ্ঠ তম। শুধু বাংলাদেশের মানুষই যে এ ভাষায় কথা বলে তা নয় বরং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মণিপুর, বিহার ও উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের রোহিঙ্গারাও বাংলাভাষায় কথা বলে। বাংলাই বিশ্বের একমাত্র ভাষা যা ভাষাভিত্তিক একটি রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। বিশ্বে বাংলাই একমাত্র ভাষা-যার মর্যাদা রক্ষার জন্য ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী ঢাকায় পুলিশের গুলিতে আব্দুস, সালাম,রফিক,বরকত,জব্বার সহ আরো অনেকে প্রাণ দিয়েছেন। এই ঘটনার প্রতিবাদে সারা পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ও তীব্র আকার ধারণ করে। অবশেষে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে উর্দুর সম-মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়। তবে বাংলা ভাষার জন্য কেবল বাংলাদেশের মানুষ জীবন দেয়নি; ভারতের আসামের কয়েকজন মানুষও এ ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করতে গিয়ে জীবন দিয়েছেন। ১৯৬১ সালের মে মাসে বাংলা ভাষার ব্যবহার বন্ধ করার প্রতিবাদে ভারতের আসামের শিলচর শহরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছেন ১১ জন।

১৯৬১ সালে আসাম প্রাদেশিক সরকার শুধু অহমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র সরকারী ভাষা ঘোষণা দিলে বাঙালীদের ভেতর ক্ষোভ দানা বাঁধে। ১৯ মে শিলচরে সকাল ৬টা-সন্ধ্যা ৬টা ধর্মঘট পালন করা হয়। ধর্মঘট চলাকালে আসাম রাইফেলসের গুলিতে ঘটনাস্থনে প্রাণ হারান ১১ জন ভাষাবিপ্লবী। রাজ্য সরকার শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়। এরপর আসামে বাংলাকে ২য় রাজ্যভাষা হিসাবে ঘোষণা করা হয়। বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করতে গিয়ে বাঙালীরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা ইউনেস্কোর নজরে আনার জন্য কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশীদের সংগঠন ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড’ প্রচেষ্টা শুরু করে।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়। ওই দিন ইউনেস্কোর ৩০তম অধিবেশনে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব ২১শে ফেব্রুয়ারীকে ‘আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি জানানোর প্রস্তাব উত্থাপন করে এবং অপর ২৫টি দেশের সদস্যরা সেটিকে অনুমোদন করে। এরপর থেকে সারা বিশ্বে প্রতি বছর পালিত হয়ে আসছে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

ইউনেস্কোর পর জাতিসংঘও একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০৮ সালের গত ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। জাতিসংঘের স্বীকৃতি অনুযায়ী একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

বাংলাদেশ সরকার কয়েক বছর ধরেই বাংলাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা করার দাবি জানাচ্ছে। কিন্তু তোমরা যদি ভালভাবে লক্ষ্য কর তাহলে দেখতে পাবে যে, বাংলাদেশেই এখন পর্যন্ত সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু হয়নি। উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা এখনও উপেক্ষিত।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা ভাষার চর্চা নেই। অনার্স, মাস্টার্স কিংবা পিএইচডি কোর্স কোথাও বাংলা সাহিত্যের জায়গা নেই। আইন-আদালত ওপ্রশাসনে চলছে ইংরেজি ভাষা। জনসাধারণের কাছে বিদ্যুত, পানি ও টেলিফোনের বিল আসে ইংরেজি ভাষায়। ডাক্তাররা মানুষকে ব্যবস্থাপত্র দেন ইংরেজিতে। এতে জনসাধারণকে পড়তে হয় অসুবিধায়। কিন্তু জনসাধারণকে এই অসুবিধায় ফেলার কারণ কী? এখনতো ইংরেজ কিংবা উর্দুভাষীরা দেশ চালান না।

বাংলাভাষীরা দেশ পরিচালনার পরও কেন এতদিনেও বাংলাদেশের সর্বস্তরে বাংলাভাষা প্রতিষ্ঠিত নয়? এসব প্রশ্ন তোমাদের মনে নিশ্চয়ই উঁকি দেয়। মহান ভাষা আন্দোলনের মূল দাবি ছিল- ‘অফিস আদালতে সর্বত্র বাংলাভাষা ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধানের প্রথমেই শেখা আছে,‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। কিন্তু তারপরও সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু এবং ‘শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলাভাষা’ চালু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কোন উদ্যোগ এখনো নেই।

এ অবস্থায় সর্বস্তরে বাংলা চালুর ব্যাপারে সরকারের যেমন দায়িত্ব আছে তেমনি জনগণকেও দায়িত্ব নিতে হবে। আর তোমরা যারা ছোট তারাও কিছু দায়িত্ব নিতে পারো। তোমাদের মধ্যে যেসব বন্ধু লেখাপড়া জানে না, তাদেরকে তোমরা অক্ষরজ্ঞান শিক্ষা দিতে পারো। সেইসঙ্গে এখন থেকেই শুদ্ধভাষায় কথা বলার অভ্যাগ গড়ে তুলতে পারো। তাহলেই ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগ স্বার্থক হবে।

 

image_pdfimage_print